এলেবেলের তর্পন

পূর্ণেন্দু শেখর মিত্র



আপনি নেই। অর্থাৎ আপনার নস্বর দেহটি নেই। আগুন নিয়েছে। পাখীও নিতে পারত, জল, মাটিও। কোন কিছুতেই এখন আর কিছু যায় আসেনা। বিশেষ করে আপনি যখন ‘মৃত’ আর মৃত মানুষের পছন্দ অপছন্দ কিছু থাকে বলে জানা নেই। এক্ষেত্রে আমি জানি আপনি বেঁচে থাকলেও থাকতোনা। সেই কবে বলেছিলেন, বোধহয় দিল্লীতে, ‘মানুষ প্রকৃতির সন্তান তাই প্রকৃতিতে বিলীন হওয়ার যে কোনও উপায়ই ঠিক আছে, চলবে’। এবার, এই সেদিন সেপ্টেম্বরে বললেন একটু অন্যরকম। প্রায় এমনই - ভালো হতো ঘন অরণ্য পেড়িয়ে, মাথায় বরফের টুপিওয়ালা পাহারের চূড়া ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে ক্রমশঃ যদি হেঁটে যেতে পারতেন। নশ্বর দেহ নিয়ে যাওয়া তো বিড়ম্বনা, নিয়মও নেই, তাই পারেননি, পোষাকটা ছেড়ে চলে গেলেন। মহাপ্রস্থানে যাওয়ার মত। বলতেন ‘মহাভারতের গল্প শোনাও’। আপনার জানা তবুও শুনতে চাইতেন কারণ মহাভারত আমার প্রিয় বিষয় আর আমি বলতে ভালবাসি বলে। সেদিনও চাইলেন। মহা মহা বীরের পতনের কথা হলো, নারীশক্তির প্রকাশ আর বিফল স্বর্গারোহনের কথাও, তখনই বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন আপনি আর আমি শুনেছিলাম। কিন্তু আমি তো ভাবিনি আপনি আমার ভালোবাসা নিয়ে এমন ‘কৌতুক’ করে চলে যাবেন। এমন তো কথা ছিলনা।
মনে আছে এক ভোরবেলায় আপনার সঙ্গে আমরা ক’জন বাঁকুড়া শহর থেকে ছান্দার যাচ্ছিলাম। উৎপলদার (চক্রবর্তী) ওখানে। সামনে ড্রাইভারের পাশে আপনি বসেছিলেন, কিছুদূর গিয়ে বললেন –ড্রাইভারের পাশে বসে যাওয়া এক ভয়ানক অসুবিধা, নিজের হাতপাও চলতে থাকে। আমারও সেই কবে থেকে আপনার পাশে বসে থাকার অভ্যাস, আস্তে আস্তে হাত-পা নড়তে থাকে, শিখি, তাল পায় লয় পায়। স্বচ্ছন্দ হতে হতেই দেখি স্টিয়ারিং আমার হাতে আর ড্রাইভার ফুরুৎ। বোধে চেতনায় মিশে গেছে চলনের সেই ‘রিফ্লেক্স’, অনুপস্থিত ড্রাইভারের নিয়ত উপস্থিতি টের পাই। কে নেবে তাঁকে? জল না আগুন, মাটি না পাখী?
গত বছরের অক্টোবরে এলেন। তর্ক জুড়লাম বস্তু আগে না ভাবনা আগে তাই নিয়ে। অনেক পুরানো যুদ্ধ আপনার সঙ্গে। আপনি বললেন আমার যুক্তি positivist দের মতো। আমি মহারোষে তূনে যত তীর ছিল ছোড়া শুরু করলাম। দেকার্তে থেকে দেরিদা। রবিঠাকুর, আইনষ্টাইন মায় লেনিন পর্য্যন্ত। আপনাকে স্পর্শ করলনা। আপনি ধীরে ধীরে আমায় পেড়ে ফেলতে ফেলতে বললেন - নদীর কাছে যাবো। বেশ তাই চলুন ফলতার কাছে গঙ্গা। যেতে যেতে নদীর কথা হলো। নদীর উপরে বয়ে যাওয়া তরীর কথা, পোতের কথা, সময়ের কথা, স্থির (Constant) অস্থিরের (Variable) কথা। হতে হতেই -
- রাতে কোনদিন এরোপ্লেন চেপেছো? জানলার পাশে বসে দেখেছ নীচের পৃথিবীকে।
- দেখেছি তো, ঘন অন্ধকার আর মাঝে মাঝে বিন্দু বিন্দু আলো। ক্রমশঃ বড় হতে হতে ঝলমলে রানওয়ে।
- ওই আলোর রোশনাই যেমন আছে অন্ধকারও তেমন আছে। আলোয় সব স্পষ্ট দেখা যায়, রাস্তাঘাট, শহর, বাজার, দোকানপাট সব। অন্ধকারে কি আছে তুমি কিছুই দেখতে পাবেনা। জানতেও পারবেনা। আলো এগোলে অন্ধকার সরে যাবে, স্পষ্ট হয়ে ঊঠবে অন্ধকারে গর্ভে যা ছিল। তুমি ভাবছো আবিষ্কার। আসলে কিছু সৃষ্টি হয়না সব ‘সৃষ্ট’। সবই আছে। শান্ত নদীর উপর দিয়ে তখন জাহাজ ভেসে চলেছে।
আপনি কি এখন ঝর্ণাতলায়? স্নানঘরে নয়, কোন এক ঝর্ণাতলায় স্নান করতে চেয়েছিলেন আপনি। ধৌত হতে চেয়েছিলেন। ভরপুর স্নান। গভীর অবগাহন। এমন রোমান্টিক ভাবনা আপনি শোনাননি কখনও আগে, আমি কেঁপে উঠেছিলাম। এক নিঃসঙ্গ মানুষের ব্যাঞ্জনা ছিল কোথাও। বিশ্রামের বাসনাও। মনে হলো, আপনি সেই স্বঘোষিত কবিতার ‘ভিলেন’ যে ভবিষ্যতে পৌছোনোর চিরন্তন ভাবনাগুলিকে, রূপ দিতে গিয়ে এগারোটা স্বরবর্ণ আর পয়ত্রিশটা ব্যাঞ্জনবর্ণের চারপাশের অভিধানিক শব্দাবলীর পাচিঁল ভেঙ্গে দিতে চেয়েছিলেন। মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন অক্ষরমালাদের। আপনি মনে করতেন আন্দোলন, অনেকেই মনে করে এমনটাই ঠিক, নাহলে সব পুনরাকৃতি। এখনো তো অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। হাঁটতে হবে এখনও।
সেপ্টেম্বরের ভোর। সামান্য হিম। আকাশের দিকে তাকালাম। আমি আর দীননাথ। ঠিক আকাশ নয় কিন্তু আকাশের সমতুল, উপরের খোলা বারন্দায় আপনি দাঁড়িয়ে। হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে আপনার ডান হাত। সামান্য উপরে। বিদায় জানানোর মুদ্রায়। আপনার অস্পষ্ট উচ্চারণ ভেসে আসছিল আমার কানে। অর্ধেক রাস্তায়ই আমি ফিরিয়ে দিয়েছি আমন্ত্রন। কারণ আমি জানতাম আপনার সাথে আর দেখা হবেনা কখনও। সত্যকে অস্বীকার করার কোনও উপায় ছিলনা আমার। করতে নেই আপনিই শিখিয়েছেন।
সোজা রাস্তা বেয়ে দীননাথ আমায় তার অটোতে চাপিয়ে স্টেশনে পৌছে দেবে। যেমন দেয় প্রতিবারেই।
দীননাথ আমায় স্টেশনে পৌছে দিয়েছিল ঠিকঠাক।
ক্রমশ গন্তব্য থেকে দূরে।