বারীনদাকে যেভাবে পেয়েছি

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়



তিনি আমার নিকট আত্মীয় ছিলেন না কিন্তু তারও বেশি ছিলেন । আমার কবিতার বই তার হাত দিয়ে প্রকাশ পেত । এর জন্য তাকে আগে কোনোদিন খবর দিয়েছি বলে মনে হয় নি । ভালোবাসার এমনই সম্পর্ক । কবিতা ক্যাম্পাস থেকে বেরোবে বিষণ্ণ রেখার পারে । অলোকদা বললেন বারীনদাকে । হাসিমুখে
তিনি বললেন ওর আগের বই আমার হাতেই উন্মোচন হয়েছিলো এবার আমার হাতেইওর এই বই হবে । তিনি পড়ে চিঠি লিখলেন এবং পরে প্রকাশ পেল আমার পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় সেই চিঠি কোনো সম্পাদনা ছাড়াই , সেখানে বিরুদ্ধ মতও ছিল কিন্তু তিনি কখনো তার মত আমার উপর জোর করে চাপিয়ে দেন নি । তিনি মোড়ক উন্মোচন করেছেন সুতরাং প্রকাশিত আমার বই ভেনাস বিউটি পার্লার উন্মোচন করার পর পাঠিয়ে দিতে বলেছিলেন । দেরী হলে বাচ্চা ছেলের মতো আব্দার করেছেন পাঠিয়ে দিতে । পাঠালে বিশাল আলোচনা করে চিঠি দিলেন এবং তা সঞ্জয় ধ্রুবতারাতে প্রকাশ করে । বইমেলা এলে , লিটল ম্যাগাজিন স্টলে খোঁজ নিতেন আমার । ফেসবুকের কিছু লেখার নীচে তার প্রশংসাসূচক মন্তব্য পেয়েছি । অসম্ভব ভালো গদ্য লিখতেন এবং একদিন বইমেলায় কিছু পত্রিকা হাতে দিয়ে বললেন পড়বি এবং গদ্য লিখতে চেষ্টা কর । গল্পাণু পত্রিকায় তার কতো গল্প পড়েছি আমার গল্পও সেখানে বেরিয়েছে । তিনি আমার কবিতার জগতে কোনোদিন সেরকম প্রবেশ করেন নি কিন্তু আমাকে তিনি হতাশ না করে উৎসাহিত করেন । জহুরির চোখ দিয়ে তিনি ভালো কবিতা বেছে নিতে পারতেন । আমি কোনোদিন তার বাড়ি যাই নি , তার সাথে বসে অনেক ক্ষণ আড্ডা মারি
নি কিন্তু তার এই থাকাটা আমি সবসময় চাইতাম । তার লেখা কবিতা বিষয়ক গদ্য পড়তাম । কতো বড়ো বড়ো কবি কথাই বলেন না আর তিনি স্নেহের স্পর্শ দিতেন ।
এইটুকুই পাওয়া বারীনদা শুধু এটুকুর জন্যই আজও লিখে যাচ্ছি ভালোবাসায় ।
বারীনদাকে নিয়ে এই কথা লিখে ছিলাম বারীনদা চলে যাবার পরে । বারীনদা জানতেন আমার শরীর ভালো নেই । তবুও নিজের উদাহরণ দিয়ে সবসময় চাঙ্গা থাকতে বলতেন ।
শেষ লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় আমার পাশে বসে অনেক কথা বললেন । আমার আনা পিঠে খেলেন । কতো তরুণ এলো তার সাথে দেখা করতে । এক তরুণ কবির বই প্রকাশ হলো তার হাত দিয়ে । মুক্ত মঞ্চে তিনি কবিতা পাঠ করলেন । তাকে নিয়ে কতো ইয়ার্কি মারলো অতনুরা ।
তিনি সবসময় লক্ষ্য রাখতেন আমার ফেসবুকের লেখা । ভালো হলে বলতে কসুর করতেন না । সাবধান করতেন উল্টো পাল্টা group আমাকে add করলেই কিংবা একটা ছড়া জাতীয় কোনো লেখা পোস্ট করলেই । আগে sms করে বিজয়ার প্রণাম জানাতাম , খুশি হতেন । আমার বিষন্ন রেখার পারে কবিতার দাঁড়ি দেওয়া তিনি পছন্দ করেন নি তিনি এখন আর নতুন কবিতায় দেখে আমাকে আমার ফর্সা মুখের মতো দাঁড়িচাঁছা রূপ দিতে বলেছিলেন । আমি অবশ্য আমার এই form এ দৃঢ় ছিলাম । পরে তিনি অক্ষর লিপি সিরিজ মেনে নিয়েছিলেন আর আমার কবিতার বই ভেনাস বিউটি পার্লার পড়ে খুব খুশি হয়েছিলেন ।আমাকে একদিন বইমেলায় কিছু বই দিয়ে বলেছিলেন ভালো করে গদ্য লিখতে শিখতে এই বইগুলো লাগবে । উপকার হয়েছিল বেশ ।
ইদানিং কয়েকজন এর বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি তাদের আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন এবং তাদের সেই আক্রমণের ভাষা আমার পছন্দ ছিল না । যাইহোক তিনি বহুবার কুলটি ও
বাগনানে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করছেন জেনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে
কিন্তু তার শরীর সাথ দেয় নি , না হলে আসতেন । গত বইমেলায় তার সঙ্গে আমার ছেলেকে নিয়ে দেখা করেছিলাম । অনেক ভেঙে গিয়েছিল শরীর । রঞ্জন বসু খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন । তার অনুযোগ কেন দেখা করার সময় পাচ্ছিস না ।
কবি তিনি তো ছিলেনই তবে নতুন ভাষা আর আঙ্গিকের । গতানুগতিকরা তো রাগ করবেনই । তার মূল্যায়ন ভবিষৎ করবে । তার চোখ এবং শব্দের বলিষ্ঠ প্রয়োগ তাকে এক নতুন কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল । নিজেকে ভিলেন বলেও তিনি হিরো বাংলা ভাষার এবং কবিতার । শেষ করি তারই লেখা দিয়ে
" শব্দের ভেতরই শব্দের প্ল্যানগুলো ছিল / কাউকে বলি নি ।"
বারীন ঘোষাল