তোমার অর্কিড

শামীম আজাদ



বারীনদা,
তোমাকে দেবে'র বাড়িতে ওর সেই কবিতাচিলেকোঠায় এক বৃষ্টিবসা দিনে জাম্পেশআড্ডায় দেখার আগেই কিন্তু দেখেছিলাম। কিন্তু সেদিনের যে চিত্ররূপ তা চোখের মনিতে স্থায়ী হয়ে আছে। একেক জন ভিজে ভিজে ঢুকছে, চশ্‌মা মুচ্‌ছে, গুটিয়ে রাখা ছাতা থেকে জলের নহর বইছে, ছোট্ট ছোট্ট সট্‌ নেবার মত স্বচ্ছ প্লাস্টিক কাপে আসছে চা। ঘরের দেয়ালে রঙিন লতা পাতা। আমরা ক’জনা মেঝেতে- বিছানো কাপড়ের উপর- পা ভাঁজ করে- গায়ে গায়ে লেগে। কোলে যার যার কবিতার বই। তুমি ঐ ছোট্ট একটু খানি বেঞ্চে- উপরে- বাবলী সুদেষ্ণার পাশে। আর ফেরদৌস বেশ একখানা চেয়ারে একা বাঁয়ে। আমার কাছেই বসেছিলো উমা আর ভাষ্মতী। উল্টোদিকে রঞ্জন সহ আরো ক’জন। তোমার গায়ে টিয়ার পালকের সবুজ। খাবার সাবার ও কবিতা কাবার করাটা চলছিল তোমার ঠোঁটের ঠোকরে ঠোকরে। তুমিই একমাত্র আমাদের সবার কাজ জানো। কি আশ্চর্য! আমরা একেকজন পড়ছি আর পড়ার পর পরই তুমি একটা কথা বলে তা সবাইকে কথার ভাগে বন্দী করে নিচ্ছিলে।
মনে হচ্ছিলো তুমি এক বৃক্ষ। যার গা বেয়ে উঠে ফুটে উঠছি আমরা দুই বাংলার সব চমৎকার অর্কিড। আসলেই তোমার গায়ের জামাটা সবুজ ছিলোগো। টিয়া সবুজ। ওটা ছিলো সে সময়ের স্মার্ট রঙের টিশার্ট।
আমি খাবারের সময় উমার সঙ্গে বন্ধুত্ব আর ভাশ্বতীর সঙ্গে ঠিকানা আদান প্রদান আর রঞ্জনের তীর্যক মন্তব্যে এক ঘোরে চলে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো তোমাদের সঙ্গে যদি এই আমরা একবার ভালো পাহাড়ে যেতে পারতাম। ওই পাহাড়ের সবুজে ও আবাসিক আলোচনায় আমরা কতনা কথা বলতে পারতাম। মনে হচ্ছিলো আমার বিলেতের কবিতা ভুবনের কথা। দেশে ফিরেই চলে আসবো এখানে। মনে হল থেকেই যাই না কেন! কার কি! এক প্রবল আকাঙ্খা জাগলো তোমাদের সঙ্গে কবিতায় বেড়ে উঠবার। তোমার মন্তব্যে কবিতা যা লিখছি তাতে আরো পরিণত হবার। ভালো পাহাড়ে আমাকে আসতেই হবে। রাতে সুদেষ্ণাকে বলতে বল্ল, দিদি বারীনদাই সব। তোমাদের কোন ভাবনা নেই।

সে আমরা বুঝেছিলাম। কারণ সেদিনের আগে চোখে আরো একবার দেখলেও তোমার ‘বাঁশী’ শুনেছিলাম তারও আগে সুদেষ্ণার মুখে ও ফেইস বুকের মেসেঞ্জারে। তারপর আমরা ফেইসবুকে বন্ধু। এই সুদেষ্ণার মাধ্যমেই তোমাকে পাওয়া। তুমি থাকতে জামশেদ পুর। ফেইসবুকে ভেসে উঠতো ভাবনা উষ্কে ওঠার মত লাইনগুলো। সেখানেই বুঝতাম তোমার জামশেদপুরে অর্কিড ফুটছে অন্তহীন। তোমার সবুজে ও স্বরে প্রতিদিন ওরা মেখে নিচ্ছে অশেষ তারুন্য।
আর আমাদের বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তুমি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছিলে। সেদিন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে চার নারী লেখকের গ্রন্থ নিয়ে এসেছে আরেক নারী - সুদেষ্ণা মজুমদার। তোমার অনেক স্নেহের সুদেষ্ণা তার প্রকাশনা সংস্থার নাম রেখেছে বাহান্ন। এই নামেই সে এক করেছিলো এপার ওপার।
বারীনদা’গো তুমি শুধু বৃক্ষ ছিলে না। আমাদের জলের ঘাটলা ছিলে। ভেজা কাঠের গুড়ি ছিলে। সাঁতরে ফিরে এলে জলের তলে বা উপরে যা দেখে এলাম তা বলবার জায়গা ছিলে। এতো হল আমরা যারা এপার থেকে যেতাম তাদের কথা। ওপারের অন্যরা কি বলবে জানি না। তারতো তোমাকে পেয়েছে তাদের শিল্পীজীবন জুড়েই। ওপারের বন্ধুদের তুমি ছিলে সোনার নোঙর।

ইতি তোমার
অর্কিড
লন্ডন ১ নভেম্বর ২০১৭