একথা আমি বিশ্বাস করি না যে বারীন দা নেই...

সুবীর সরকার



সেটা ১৯৮৯ সন।তার কিছু আগে পরিচয় হয়েছিল বারীন ঘোষালের সঙ্গে।বলেছিলেন-‘লিখে যা।লেখা পাঠাস আমাকে’।দিয়েছিলেন জামসেদপুরের বাড়ির ঠিকানা।আর এক কপি ‘কৌরব’।সেই শুরু।সম্পর্কের।আজীবন যা বহাল ছিল।শেষ দেখা জানুয়ারীতে।জয়ন্তীর জঙ্গলে।রাত ২ টা পর্যন্ত বারীন দার সাথে চলেছিল কবিতার আড্ডা।ছিলেন অতনু,শান্তিময় দা,ধীমান দা,শৌভিক দত্ত,শৌভিক বনিক এবং উমাপদ দা।সেই আড্ডা তাড়িত করেছিল তুমুল।কথা ছিল ডিসেম্বরে জলপাইগুড়িতে আবার দেখা হবে আমাদের।কিন্ত...!সেদিনে সদ্য লিখতে আসা ১৯ বছরের তরুনকে কি আশ্চর্য ভালোবাসায় জড়িয়ে নিয়েছিলেন বারীন ঘোষাল।আজ নিমেষেই হয়ে উঠেছিলেন আমার বারীন দা।তো ১৯৮৯ এর শেষে ডাকে নিজের দেখা জীবন নিয়ে একটা গদ্য পাঠালাম বারীন দাকে,ওনার মতামত জানবার প্রত্যাশায়।অপেক্ষা করছি কবে চিঠি পাবো বারীন দার।তো কিছুদিন পরে এক দুপুরে পোষ্টম্যান দিয়ে গেলেন একটা পত্রিকা।সামান্য মোটা।খুলে দেখি ‘কৌরব’।তারপর পত্রিকা খুলে আমি তো হতবাক!আমার সেই গদ্যটি প্রকাশিত হয়েছে।এবং ভেতরে ৪/৫ পাতার একটা লম্বা চিঠি বারীন দার।আমাকে লিখেছেন-‘তোর দেখার চোখ আছে।মেধা ও মনন আছে।নিজেকে চুবিয়ে দে লেখাপড়ায়’।আমার তখন ১৯/২০।সেই থেকে বরাবর শিক্ষকের ও বন্ধুর ভূমিকা পালন করেছেন বারীন দা,আমার জীবনে।বস্তুত আমার গদ্য লেখার মূল অনুপ্রেরনা ছিল বারীন দা।সারা জীবন যখনি নিজের লেখা নিয়ে,বিশ্বাস নিয়ে সংশয়ে তাড়িত হয়েছি,বিদ্ধ হয়েছি তখনই দীর্ঘ সব চিঠি লিখে ফেলতাম বারীন দাকে।একেবারে প্রশ্নের মতন করে সাজিয়ে সাজিয়ে।আর যথারীতি লম্বা লম্বা সব উত্তর আসতো বারীন দার।সেই সব চিঠির শরীর জুড়ে নিবিড় ভালোবাসা,কাছে টেনে নেয়া,মায়ায় জড়ানো আর অদ্ভূত সব জীবনদর্শন ছড়ানো।সেই চিঠিগুলি আমার জীবনের অনবদ্য প্রাপ্তি।সযত্নে গুছিয়ে রেখেছি।
আমি ব্যক্তিজীবনে খুব অস্থির ছিলাম অনেকটা সময়।এলোমেলো যাপনে থাক্তাম।উল্টোপাল্টা কান্ড করে ফেলতাম।সব তো বারীন দা খবর পেতেন।বড় ভাইএর মতন,পিতার মতন স্নেহে আমাকে শাষন করতেন উনি।ভুলগুলি ধরিয়ে দিতেন।আর কোথাও কোন লেখা বেরোলে,যদি ওনার চোখে পড়তো উনি জানাতেন।মতামত দিতেন।দিক ও নয়া দিশা পেতাম।
বারীন ঘোষাল মানেই ভালোবাসায় ভরা একজন মানুষ।কি তুমুল পড়াশোনা করতেন।সাঙ্ঘাতিক স্মৃতিশক্তি ছিল।কোথায় কোন নুতন ছেলে বা মেয়েটি লিখছে সেদিকে সবসময় খেয়াল রাখতেন।বাংলাদেশে গিয়ে দেখেছি,ওখানেও বারীন দার প্রচুর পাঠক ও অনুরাগী।বারীন দাও ওখানকার তরুন দের লেখালেখির খবর রাখতেন নিয়মিত।আমার বন্ধু মাসুদার রহমান ছিল বারীন দার প্রবল স্নেহধন্য।
কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে আজ।এই তো হেমন্তের রোদে ভিজতে ভিজতে ভালোপাহাড়ের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন আমাদের বারীন দা।এই তো জলপাইগুড়ি শহরে কবি অতনু বন্দোপাধ্যায়ের বাড়ির দোতলায় কাঠের চেয়ারে বসে বসে কবিতাভূবনের কথা শোনাচ্ছেন।আর জয়ন্তীর বনবাংলোয় শীতরাতের রহস্যের ভিতর বারীন দা শুনে যাচ্ছেন আমাদের হাতীর পাল ও তাদের একযোগে জলপানের সেইসব না ফুরোন গল্পগুলি।বারীন দার চোখে চাঁদের আলো আর তিনশো প্রজাতির পাখিরাও।
বারীন দা নেই,একথা আমি বিশ্বাস করি না।