বারীনদাকে মনে পড়ে

শেখ লুৎফর



লিখতে বসলেই যে দুটি মুখ সবার আগে মনে পড়ে, তাদের একজন পরম পূজনীয় বারীন ঘোষাল। অর্থাৎ আমাদের প্রিয় বারীন দা। অবাক-করা হৃদয়ের এক প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন বারীন দা। হাজার-মনি নৌকার পাটাতনের মতো ছিল তাঁর হৃদয়। দুই হাজার দশ-এগারো সাল তক আমরা পরস্পরকে চিঠি লিখতাম। এই চিঠি চালাচালি কম করে হলেও পাঁচ-সাত বছরের হবে।

আমি তখন কৌরবে প্রায়ই লিখতাম। লেখা পাঠাতাম বারীন দার ঠিকানায়। তিনি গল্পটা কৌরব সম্পাদক কমল চক্রবর্তীর কাছে পাঠাবার আগে নিজে পড়ে নিতেন। তাবাদে তিনি আমাকে লিখতেন। প্রায় আস্ত পৃষ্ঠা ভরা একেকটা চিঠি। বারীন দার চিঠি পেলে ঘরের সবাই খুশি হতাম। আগে বলতেন আমার গল্প বিষয়ে। তাবাদেই জানাতেন চিঠির উত্তর দিতে দেরি হওয়ার কথা। বিহার কিংবা বেনারস থেকে ফিরে এসে দেখেন আমার চিঠি আট-দশদিন আগে এসেছে।

তিনি ছিলেন ইবনে বতুতার জাত ওয়ারিশান। আজ দিল্লী তো কাল আসামে। একটা চিঠিতে তিনি চেরাপুঞ্জির কথা বলেছিলেন। লিখেছিলেন, তিনি লোয়ার চেরাপুঞ্জিতে দাঁড়িয়ে সিলেট খুঁজেছেন। বায়নোকুলার চোখে তিনি আমার অবস্থানটা সিলেটের কোথায় হতে পারে তাই ঠাওরাতে চেয়েছিলেন!

এই লেখাটা লিখতে গিয়ে বার বার আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। দুই হাজার পাঁচের মে মাসে গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে আমার ঘর পুড়ে গিয়েছিল। বারীন দা চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠি পাড়ার সময় আমার বৌ কেঁদে ফেলেছিল। কী মমতা মাখা কথা! আমার মনে হয়েছিল, আমি বুঝি একটা বিরাট বট গাছের ছায়ায় বসে বৌয়ের সাথে আলাপ করছি। আমার প্রতি বারীন দার স্নেহ তাঁর প্রতিটা চিঠিতে কম-বেশি আঁচ করতে পারতাম।

একবার বারীন দা খুব বড় একটা অসুখে পরেছিলেন। দশ দিন জ্ঞান ছিল না। সুস্থ্ হওয়ার পর আমাকে লিখে জানালেন। বারীন দার চিঠি এলেই আমরা তিনজন ( স্ত্রী-কন্যাসহ) এক সাথে বসে পড়তাম। সেই বিশেষ চিঠিটা পড়ে ঋতুসহ আমরা তিনজন খাবার টেবিলে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসেছিলাম। আমরা তিন জনেই বারীন ঘোষালকে বারীন দা বলে ডাকি। আমি আজও আমার মেয়ে, বৌকে বলিনি যে বারীন দা আর নেই।

সপ্তাহখানেক আগে একরাতে খেতে খেতে ঋতু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, বারীন দা কেমন আছেন?
আমি ঠান্ডা গলায় জানিয়ে দিয়েছি, দাদা ভালো আছেন। দু-হাতে লিখছেন।
ঋতু বললে, পড়তে পাড়াটাই সুখের।

আমার মনটা খুশি হয়ে ওঠে। আমি দিব্যি চোখে দেখি বারীন দা বেঁচে আছেন। লেখাই বাঁচিয়ে রাখে। একদিন তালপাতায় যারা লিখত তারা আজও আমাদের চোখের সামনে দিয়ে হাঁটাচলা করছেন।

কাগজের বুকে ঘুমিয়ে থাকা পাখাগুলো মলাট উল্টালেই উড়াল তুলে। কী অসাধরণ মহিমা সেই পাখা ঝাপটানিতে। কবি, লেখক, অভিবাবক, বন্ধু বারীন দার লেখাগুলোও পাখায় উড়াল তুলবে প্রতিদিন। এক হৃদয়ের ভাব, ভালোবাসা শত শত হৃদয়ে জ্বলবে। মানুষ এরচে কী আর বেশি মানুষের কাছে চাইতে পারে?