ভাবারীনতুন

প্রবীর রায়




একজন কবির বড় কবি হয়ে ওঠার পিছনে তাঁর মনন ও চিন্তনের গভীরতা আর প্রকাশের অকপটতা জরুরী। সদ্যপ্রয়াত বারীন ঘোষাল সম্পর্কে ভাবতে বসলে এই কথাগুলি ভীষন ভাবে মনে হয়।কবি ও মানুষের তুল্যমূল্য বিচারে তাঁর অবস্থান একটি বিশেষ জায়গায় রেখে দিতে হয়।

আমরা যারা তাঁর সঙ্গে মিশেছি মানুষ এবং কবি বারীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখিনি।
নিজের কবিতা ভাবনার সাথে মেলেনা এমনকি তাঁর নিন্দুক সম্পর্কেও কটু কথা বলতে শুনিনি তাঁকে। কৌরবের প্রাথমিক দিনগুলিতে তিনি সরব থাকলেও শেষের দিনগুলিতে আমরা দেখেছি বিতর্ক এড়িয়ে যেতে ।বলতেন, আমার যা করার আমি করেছি,এবার পাঠক তা গ্রহন করবে কীভাবে তা ভবিষ্যত বলবে।

কী করে গিয়েছেন তিনি? অজস্র কবিতা, প্রবন্ধ, আলোচনা,গল্প লিখে গিয়েছেন।তাতে সবসময়েই তিনি প্রমান করে গিয়েছেন তিনি অন্য রকম।এই অন্যরকম পথ চলায় বিদ্রুপ আর আক্রমণ তাঁকে টলাতে পারেনি। বরং নতুন লিখতে আসা তরুনেরা আকৃষ্ট হয়েছে তাঁর ভাবনায় তাঁর আন্তরিক গ্রহণে।

ষাটের দশকে জলপাইগুড়ির ছাত্র থাকাকালীন এই শহরের সাথে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।দিনেদিনে তা আরো নিবিড় হয়। এখনকার তরুন কবিদের সাথেও তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে।“এখন বাংলা কবিতার কাগজ” এর বহু আড্ডায় তিনি এসেছেন। শ্যামলছায়ার আড্ডায় তিনি অনেকবার এসেছেন। এছাড়া এখানের বিভিন্ন কবির আমন্ত্রণে তাদের বাড়ীতে আড্ডা দিয়েছেন। শেষ দুটি জন্মদিন এই জলপাইগুড়িতেই কেঁটেছিল তাঁর। আর শেষবার অসুস্থতা নিয়েই একমাস কাটিয়েছিলেন কবি অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ীতে।

কীভাবে সম্ভব হল এইসব? একজন কবি যখন গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মৌলিক ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যান আর মনের দরজা খুলে রাখেন ভালবাসার জন্য,তাকে উপেক্ষা করা কঠিন।

কী নিয়ে বিতর্কিত বারীন ঘোষাল। তাঁর চারিপাশে নতুন কবিদের ভীড় নাকি তাঁর কবিতা ভাবনার গ্রহণযোগ্যতা? প্রথম প্রসঙ্গে যাবোনা।বরং তাঁর কবিতা ভাবনা নিয়েই বলি।তাঁর লেখা কবিতাগুলির পাঠক অপ্রিয়তা সম্পর্কে আমার কোনও দ্বিধা নেই।তিনি তা চানও নি।চাইলে প্রথম থেকেই জনপ্রিয় কবিতা না লিখে স্বতন্ত্রভাবে নিজের কবিতা ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইতেন না।
তাঁর কবিতার চাইতে তাঁর গদ্যগুলি আমাকে সাহায্য করে তাঁকে বুঝতে। শুধু অতিচেতনার কথা নয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গদ্যগুলিও বিভিন্ন মৌলিক ভাবনার প্রকাশ।
‘অতিচেতনার কথা’ প্রকাশিত হয়েছিল কৌরব থেকে১৯৯৬এ।তারপরে পরিবর্তিত সংস্করণ ২০০৪এ। এই বইটির সাথে একই সাথে উচ্চারিত হয় আর একটি দীর্ঘ কবিতা- “সৎকার” ।আবহমানের কবিতা শাস্ত্রসম্মত কবিতা ,এইসব ধারনার সাথে নতুন কবিতার ধারনা মেলান কঠিন।

তিনি বললেন, ‘নতুন কবিতার জন্য চাই নতুন ভাষা,ফলে চালু হল ভাষাকে আক্রমন… পরিচিত শব্দ পালটে গেল।’
তিনি আরও বললেন,’নতুন কবিতা অতিচেতনার হলফনামায় বাংলা কবিতায় চালু হয়ে গেল’
আসলে তিনি নিজের ভাবনায় ছিলেন অনড় এবং আত্মবিশ্বাসী।এই ভাবনার সাথে অনেককেই সামিল করতে পেরেছিলেন।ওনার বলা কিংবা লেখার থেকে কবিতা ভাবনাকে বুঝতে চাইলে মনে হয়,কবিতা থেকে উনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতাকে বাদ দিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।সঙ্গে সঙ্গে বিশৃংখলার থেকে সৃষ্ট অবচেতনার কবিতার দিনও শেষ হয়ে গিয়েছে বলে উনি মনে করতেন ।তাই অতিচেতনার ভাবনা তাঁকে অনুসরণ করতে হয়েছে।

কীভাবে আসবে অতিচেতনার কবিতা? তা আসবে বাইরে থেকে।বস্তুজগত থেকে।তিনি ভাবতেন, জল ও বাতাসের মত চারিদিকে বইছে কবিতা। তাই হল উৎসকবিতা। কবির হাতে শব্দ দ্বারা সে শরীরী হয়ে ওঠে।কবিতার নির্মান হয়।মূল কথা হল কবিতাকে বহির্মূখী হতে হবে,পুরোটাই বহির্জগতের ব্যাপার-এটাই অতিচেতনা।

প্রশ্ন হল, একজন কবি কীভাবে ভাববেন কীভাবে শব্দ বাছবেন,মানুষেরর চিরকালীন ভাবপ্রকাশের অভ্যাসগুলির কী হবে? মানুষ ও বস্তুকে প্রভেদহীন ভাবার মধ্যে কিংবা ইগোর অসারতা প্রমাণ করার সাথে একজন সাধকের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনর পথ কি একই রকম?হয়তো নতুন কিছু ভাবেননি বারীন। নতুবা ভেবেছেন নতুন কবিতায়। তাঁর কবিতায় আমরা তার প্রতিফলন কতটুকু পেলাম বোঝার জন্য আসুন পড়া যাক তাঁর কবিতাগুলি।সঙ্গে অধিকতর আকর্ষনীয় গদ্যরচনাগুলি।
------------------------------------------