ডায়েরির পাতা থেকে

রীনা ভৌমিক

গল্প অল্প অল্প
বান্ধবী খলবলিয়ে বলছিল তার মায়ের সংসারে আসক্তির কথা । আমারো মনে পড়ল মাকে । মায়ের অন্ধ আসক্তি ছিল বাবায় । অস্থিরচিত্ত মা যখন বাবা নামের প্রচন্ড আসক্তির তোড়ে সুগন্ধি আত্মায় রূপান্তরিত হচ্ছিল ; বাবা জানতেও পারলো না । আসলে বাবা তখন অহঙ্কারে আসক্ত , তীব্র মহুলগন্ধে মাতাল হয়ে অগুণিত পাহাড় ভেঙে আর আগুন সেঁকে ক্লান্ত হচ্ছিল !

এই মধ্যবয়সের হেলাফেলায় যখন তুমি প্রিয় পারিবারিক গানের মতো নির্জনে জলতরঙ্গ বাজাও ;মনে পড়ে তোমার চিঠিদের প্রতি আমার ফেলে আসা সাতাশ বছরের নিরঙ্কুশ আসক্তির কথা । আজো তাদের ছুঁলে শরীর শিরশিরায় ! শ্রাবণের প্রথম বর্ষণে মাটির আদুল আহ্লাদ জেগে ওঠে বৃষ্টি ধোয়া চোখের পাতায় !

আ-দেখাই রয়ে গেলে চিরকাল ! এক অবিস্মরণীয় তাজমহল ; যা কোনো পাগল কবির একান্ত একার !

ইয়াদোঁ কী গলি
শ্রীলার ছিল দুরন্ত উড়ালের গল্প । আকাশের রোদ-মেঘ ডানায় মেখে , চেখে ধুন্ধুমার । দু চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম ওর চকচকে বিচ্ছুরণের দিকে । আমার ফড়িং-ভ্রমণ বামন গাছেদের আর হলুদাভ অপুষ্ট ঘাসেদের ধূসরতা ঘিরে ; সীমিত এবং নিষেধ-রঙা !

মাত্র এক সপ্তাহের অগ্রজ শ্রীলা ছিল আমার নায়িকা । ওর বুদ্ধিদীপ্ত চলন-বলন আর পাঁকাল মাছের মতো সমস্যা ঝেড়ে ফেলার মসৃণ দূরদৃষ্টি । ও শেখাতো কিভাবে কৌশলী হয়ে আগত অপ্রিয় থেকে গা বাঁচানো যায় ! ওর মজাকিয়া মেজাজ আমাদের ছেলেবেলার মজলিশকে বিশেষ মাত্রা দিত ।

আজ বয়সের মাঝদুপুরে এ এক ভীষণ আমুদে খেলা । যেখানে শ্রীলাদের ভীড় ! নরম-সরম হাতপায়ের ছেলেবেলা হেলে দুলে মাথা ঝাঁকিয়ে দুদ্দাড় খুলে ফেলে মনের জানালা কপাট । তারপর দখল করে নেয় বারান্দা , ভেতর ঘর , বইয়ের আলমারি...স্বপ্নিল হয়ে আসা মাস্কারা ঘেরা চোখ....ঠোঁটের মুচকি....

সমস্ত ব্যস্ততাকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে লুকোচুরি খেলা চলতেই থাকে..... আহা, মধুর সুগন্ধী খেলা


দেখা

মাথার ওপর খড়ের ফুটো চালও ছিলনা । তবু কি করে যেন ছেঁড়া কাঁথা । অনস্তিত্ব বোধ থেকে রিফুর ফোঁড় ! মুহূর্তেরা দীর্ঘায়িত হতে হতে যেখানে , আমাকে অবাক ক'রে নক্সিকাঁথা । প্রেরণা হয়ে উড়ে আসতো পরিযায়ী চিঠিরা । সেই সময় । যে সময় জীবন জুড়ে শুধুই আগুন আর খরা ।

কিছু কিছু গল্প থাকে ফ্যান্টাসির । ঘরে ফেরার । জীবন চিত্রায়িত হয় চমকে ! দীর্ঘ বাইশ বছর পর মোলাকাত যুদ্ধ রঙে রঙা দুই ভাইবোনের । সমস্ত পরিবেশে তাই গুলালের রঙ , "হোলী হ্যায় সা রা রা রা...." !


গল্প নয় /

জীবনানন্দ পড়ছিলাম , ' পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে....'

"চোখ" শব্দটা মগজে ঢুকতেই আমি বাঁদর-ডিগবাজিতে সময়-ঘড়ি উল্টে ফেল্লাম । ওমনি ইলশে গুঁড়ির মতো ঝিরঝির থ্রি-ডায়মেনশনাল ছবিরা দেঁতো হাসিতে ঝরতে লাগলো....ঝরতেই লাগলো ভুলে-বিসরে স্মৃতির অ্যলবাম থেকে...বাপস্ , স্মৃতিরা কী বাবল্ বাবল্ সাতরঙ্গী...

তখন ভরন্ত টীন-এজ ! উসখুশ সারাখন । মাথায় যত রকম এলেবেলে কীটের কুটকুটানি । পুতুল শরীরে বেলবটস পাঞ্জাবি ; হাতে রঙ তুলি । ভাবখানা , ' হাম সব জানতা , দাদা কুছ নেহী...' । ইচ্ছে ছিল নদী বা পাহাড় আঁকি ....

তখন ফাগুন আরো বেশী চনমনে...শিমুল-পলাশের লালে সে কী ঝাঁঝ...জীবন কবুতর কবুতর সহজ । একদিন এক শ্যমলা ছেলে আড়ালে ডেকে নরম গলায় বলেছিল , ' জানিস , তোর চোখদুটো না...', সংলাপের মাঝপথে গণেশ উল্টে হিসহিসে গলায় তাকে নিমফল খাইয়েছিলাম , 'বাড়িতে বলে দেব...'।

আমার তখন উদ্ভূতুড়ে উচ্চাকাঙ্খা । ম্যাকবেথের উইচেসদের কারসাজি গো ! আদা জল খেয়ে পাহাড় নির্মাণে । ধুপ ধাপ ঘটঘটাং...সময় গলিয়ে রক্ত জ্বালিয়ে শেষে দেখি , ধুস্...কিম্ভূত মাটির ঢিপ...

নদী আঁকতে গিয়ে জলের নীল এমন 'যুদ্ধং দেহী' মুখ বাঁকালো ! তুলি কেঁদে কঁকিয়ে যা গড়লো তা একটা খাল । সেই খাল নিজেই কুমির ডেকে এনে আমায় দাঁত খিঁচায়....

বিন্দাস নৌকোয় চড়ে থোড়াই কেয়ার মন কেন জানি মাঝদুপুরের নির্জনে আফসোস ভাঙে । যদি উইচেসদের হিং টিং ছটে একটু বুদ্ধি করে সর্সে-পড়া ছিঁটিয়ে 'চোখ আর নীড়' এঁকে ফেলতাম...নির্ঘাত কয়ামত থেকে কেয়াবাত ঘটতো...বুকে উথলে উঠতো খুশবু খুশবু দারুচিনি দ্বীপ...

পাখিটির গায় । আর ঠোঁট চেপে গোপন মন্ত্রোচ্চারণে ব্যস্ত হই , "ওঁম শান্তি...ওঁম শান্তি...ওঁম শান্তি ..." ।
স্মৃতিচারণা : গোপা ও ফরোর নামে..

গোপা সেদিন নিমতলার কথা উঠালো । ওখানেই ছিল আমাদের জামতলা ঘর । ওর আর ফরোর ঝগড়া মিটিয়ে দিতাম !

ভোজুডির লাইনপারের জামতলা ঘর । আজও ভোজুডি গেলে ঘাসেরা পায়ে জড়িয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে মাটির কথা বলে । আজ আর ভোজুডির সে রৌনক নেই । ইয়ার্ড ছোট হয়ে গেছে । তবু কী মায়া !

ফরোর বাবা দত্তমামা যখন মারা যান ফরো খুবই ছোটো । কোলে । মামাবাড়ি কাঁচড়াপারা বহুদূর । নীহারদা ( ফরোর বড়দা ) তখন ম্যাট্রিকে । আমার মণিমামার নামে কোয়ার্টার এলর্ট হলো । জামতলাঘর ! কোয়ার্টারের সাথে শান বাঁধানো বিশাল জামগাছ । নীহারদার চাকরি হবার আগে ফরোরা অনেকদিন এখানেই ছিল ।

পাকা পাকা দেদার জামফল । বাচ্চাদের প্রিয় খেলার জায়গা । চবুতরায় এক্কা দোক্কা পুতল খেলা ।ঝগড়া খুনসুটি , আড়ি কাল যাব বাড়ি....

সোনাদা ( ফরোর ছোড়দা ) আমার দিদিমাকে 'বুড়িয়া' বলতো ।ফরোরা আমাদের পরমাত্মীয় ছিল ! মর্নিং স্কুলের সময় সারা দুপুর সোনাদা রামায়ন মহাভারত , আমি সুভাষ বলছি কত্তো বই সবাইকে পাঠ করে শোনাতো । নীহারদা ছিল জাত শিল্পী । কেউ শেখায়নি কিন্তু সারাদুপুর কী সুন্দর যে ছবি আঁকতো !

একবার মে দিবস । সাহেব বাংলোতে বাঁশের উঁচু মঞ্চে খোলা মাঠে সন্ধ্যায় নাটক হচ্ছিল । আমাদের বুনি ( তুলিকা সাউ) সমান দাপটে বড়দের সাথে নাটক করছিল । নীহারদার বানানো ছ' ফুটের লেলিনের ছবি টাঙানো ছিল পেছন পর্দায় ! একজন বিহারী ভদ্রলোক অনেক্ষণ লক্ষ্য করে শেষে থাকতে না পেরে পাশের ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করেছিল, 'আরে ইয়ার , সব আদমী স্টেজ পে চঢ় রহা হ্যায় উতর রহা হ্যায় । পিছেওয়ালা আদমী সির্ফ খড়া হ্যায় কিঁউ ?' ভদ্রলোকটি ছবিটিকে মানুষ ভেবেছিল !

এই জামতলা ঘরের খোলাছাদ বাথরুমেই আমার প্রথম কবিতা জন্ম নিয়েছিল !