আমার সলিল , এবং শিবের গীত

ব্রতীন্দ্র ভট্টাচার্য


সলিল চৌধুরীর গানের সঙ্গে আমার পরিচয়, যদ্দূর মনে পড়ছে, ক্লাস টু কিংবা থ্রি নাগাদ। আমার সমবয়েসী বা জীবিত গুরুজনেরা মনে করতে পারবেন – তখন প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় লোডশেডিং ছিল বাঁধা। মানে প্রাক-শঙ্কর সেন যুগ চলছে তখন। লোডশেডিঙে ডুবে থাকা শহরে বড়োদের মুখে শুনতাম কটুক্তি – ‘জ্যোতিবাবু গেলেন’। যাই হোক, এর ফলে সন্ধ্যেবেলার পড়াশোনা খুব বেশীক্ষণ চালানো সম্ভব হত না। সেই স্বল্প পড়াশোনার অভ্যেস এখনও বরকরার!

সে সাতাত্তর-আটাত্তরের কথা। আমার জন্ম বাহাত্তরে। এই সময়টা ছিল বামপন্থী ভাবনার অনেক মানুষের কাছে একটা উদ্দীপনার সময়।

আমাদের বাড়িতে সকলেই একসঙ্গে থাকতাম। সকলে মানে – আমাদের পরিবারের সঙ্গে আমার চার জ্যাঠার পরিবার। আমাদের ঘরটার পাশে ছিল ছোটজ্যাঠা আর ছোটমার ঘর। আর সঙ্গে একটা ছোট ছাদ। ওদের ছেলেপুলে ছিলো না। ছোটমা আমাকে নিজের সন্তানের মতনই মনে করত। ছোটজ্যাঠার একপায়ে জোর ছিলো না। পোলিও হয়েছিল ছোট থাকতে। তবে বাকী চেহারাটা ছিল বাঘা। আর গায়ে জোর ছিল খুব। কন্ঠেও।

টিউশন সেরে বাড়ি ফিরতে রোজই রাত হত বাবার। মা ব্যস্ত থাকত রান্নাবান্নার কাজে। কোনোক্রমে ইতিহাস ভূগোল গিলে আর ‘ল্যাম্পো’-র ছ্যাঁকা খেয়ে পড়াশোনার শেষ আর মা-র ডাক এবং তৎপরবর্তী বকুনি শুনে খাওয়ার শুরু, এই দুইয়ের মধ্যেকার সময়টা সুতরাং সম্পূর্ণ আমাদের ছিল। তখন ছাদে বসে ছোটজ্যাঠার গান শুনতাম আর বেসুরো গলা মেলাতাম। ছোটজ্যাঠার কন্ঠ ছিল দেবব্রত ঘরানার। ওইরকম ভরাট, দরদী আর ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। চারদিকে কুপকুপে অন্ধকার। এতো অন্ধকার যে কুড়ি ফুটের রাস্তা পেরিয়ে সামনের চব্বিশ নম্বর বস্তিও ঠিকমতন ঠাহর হত না। এরই মধ্যে ছোটজ্যাঠা গাইত – ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না… এ বালুর চরে আশার তরণী তোমার যেন বেঁধো না।

আমার দাদু যখন মারা যায় বাবারা খুবই ছোট। আমার বড়োজ্যাঠা-জ্যেঠিমাই আমার বাবার কাছে বাবা-মায়ের মতন ছিল। অল্পবয়েসে বাবাকে হারিয়ে আমার জ্যাঠাদের খুব বেশী পড়াশোনা করা হয়ে ওঠে নি। বড়ো আর মেজজ্যাঠাকে সবকিছু ছেড়ে কাজে লেগে পড়তে হল সংসার প্রতিপালনের জন্যে, ফলে স্কুল পেরনোর আগেই পড়াশোনার ইতি টানতে বাধ্য হল তারা। আমাদের পরিবারে আমার বাবাই প্রথম গ্র্যাজুয়েট। বিরাট কোনো সুযোগ না পেলেও জ্যাঠাদের দৌলতে বাবা পড়াশোনাটা কোনোমতে চালিয়ে যেতে পেরেছিল।

পরিবারের অভাব তো ছিলই। তবে ছোটজ্যাঠার কমজোরী পায়ের জন্যেও, পরে বড়ো হয়ে মেজজ্যাঠার কাছে শুনেছি, ঠাকুমা বেশী বকাবকি করত না। মানে একটু প্রশ্রয় দিত আর কি। ফলে স্কুলের গণ্ডী কোনওভাবে পার করে তার লেখাপড়াও আর এগোয় নি।

ছোটজ্যাঠা কোনো এক কারখানায় কাজ করত। আমি জানি না কোথায় ছিল সেই কারখানা। আর সাইড বিজনেস ছিলো যজমানি আর খাতার। বৈঠকখানা বাজার বা ওরকম কোথা থেকে জ্যাঠা মাসে একবার একটা বিশাল খাতার বস্তা নিয়ে আসত। সেই প্রকান্ড বস্তা কাঁধে ফেলে ওই কমজোরী পায়েও আমাদের লোহার পাকানো সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসত ঠিকই। পুজো করে এলে ভালো সন্দেশ থাকলে যেমন ডাক পেতাম, জ্যাঠা খাতা আনলেও আমাদের ডাকত। বঙ্গলিপি খাতার সঙ্গে সেটাই আমার প্রথম পরিচয়। পাতলা সাদা মলাটের ওপরে কালো অক্ষরে ধ্যাবড়া ছাপা, আর তার সঙ্গে নতুন কাগজের গন্ধ। ওই পৃথিবীটাই আমাদের কাছে তখন স্বপ্নের দেশ।

তখন সলিল চৌধুরীর নাম আমি জানতাম না। তবু জ্যাঠা তখন গাইত – আহা বুক ভেঙ্গে ভেঙ্গে… পথে ঢেলে শোনিতকণা… কত যুগ ধরে ধরে করেছে তারা সূর্যরচনা… তখন ছোটজ্যাঠাকে দেখে মনে হত যেন মহাভারতের কোন বীর।

সঙ্গে সঙ্গে দাদা সুরে আর আমি বেসুরে কন্ঠ ছাড়তাম – আহ্বান, শোনো আহ্বান আসে মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে… গলা মিলিয়ে চিৎকার করে গাইতাম –

মানব না এ বন্ধনে
মানব না এ শৃঙ্খলে
মুক্ত মানুষের স্বাধীনতা অধিকার
খর্ব করে যারা ঘৃণ্য কৌশলে…
…অন্ন দেয় নাকো বুভুক্ষু জনতায়
কন্ঠ রোধ করে লাঠি রাইফেলে…
মানব না এ বন্ধনে…

ওই সময়ের কথা বলতে এখনও এমনই কিছু গানের কথা মনে পড়ে। আমাদের নানান মতে নানান দলে দলাদলি… বিচারপতি, তোমার বিচার করবে যারা… বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান… ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে… হেই সামালো ধান হো…

ক্ষুদিরামের রক্তবীজে প্রাণ পেয়েছে, প্রাণ পেয়েছে এই জনতা… কি অদ্ভুত ভাবে জ্যাঠা গাইত! বা – আজ হরতাল, আজ চাকা বন্ধ! জান কবুল আর মান কবুল! ‘গুরু গুরু গুরু গুরু ডম্বরু পিনাকী’ কি জিনিস তখন তা বুঝিনি, তবে হরতাল আর চাকা বন্ধের মানে জ্যাঠা বুঝিয়ে দিয়েছিল তখন।

হঠাৎ একদিন শুনলাম জ্যাঠার চাকরি গেছে। লক-আউট শব্দটার সঙ্গেও সেটাই আমার প্রথম পরিচিতি। সেই লক-আউট পরে উঠে যায়। কিন্তু ইউনিয়নে সক্রিয় থাকার অপরাধে এবং পঙ্গুত্বের কারণে জ্যাঠা কাজটা আর পায় নি। তার পর থেকে জ্যাঠা অনেক বদলে যায়। অমন খিটখিটে বদমেজাজী লোককে আর গান গাইতে বলতাম না। শেষদিকে জ্যাঠা দেখা হলেই কাঁদত। খুবই অস্বস্তি হত। পারতপক্ষে কাছে ঘেঁষতাম না।

এর কিছু পরে ছোটমামার কাছে দুটো বই দেখলাম। একটা সলিলের গানের সংকলন আর একটা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের। আমার মামাবাড়ি গানের বাড়ি ছিল না। তবে পড়াশোনার ব্যাপারটা খুবই ছিল। শুনেছি, আমার প্রমাতামহ না কি মুকডোবার বিষ্ণুদাস ঠাকুরের বংশের। এই বিষ্ণুদাসের বোন শচীদেবীর পুত্র দেশে অনেক নাম করেছিলেন। এম এ, পি এইচ ডি, বেদান্তশাস্ত্রী অমরেশ্বর ঠাকুর, অর্থাৎ আমার প্রমাতামহ, ছিলেন সংস্কৃত ও পালীর পণ্ডিত, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালীন কেওকেটা! ১৯৭৯-তে তিনি চোখ বুঁজলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি ঘোষণা হয়েছিল বলে শুনেছিলাম।

যাই হোক, অনেক গানের কথা না-বুঝে আবোলতাবোল কথা বসিয়ে যা গাইতাম এতোদিন, সেই কথার মুখোমুখি হলাম প্রথমবার। বয়েস তখন বছর দশ। সলিল আরও একটু ধরা দিলেন আমায়। তখন একটু একটু করে ‘একা-একা’ মামাবাড়ি গিয়ে থাকা শুরু করেছি। ছোটমামাই তখন আমার সবথেকে বড়ো শিক্ষক আর বন্ধু। তারই কাছে কথায় কথায় জানতে পারলাম তেভাগা আন্দোলনের কথা। এগুলো যে ‘অমর চিত্র কথা’-য় পড়া রাজনীতির থেকে একটু আলাদা ধরণের ব্যাপারস্যাপার, সেই ধারণাও সম্ভবতঃ তখন থেকেই হতে শুরু করল।

আরও একজন সলিল চৌধুরীর সুরেও তখন আমরা মাতোয়ারা। এই সলিল আমাদের গানের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিলেন। ভাষার দিক দিয়ে খুব বেশী আধুনিক হতে না পারলেও সেই সলিল শোনালেন অপূর্ব সুর। মহীনের খবর রাখতাম না মোটেই। এ বাদে চলতি গান কানে যা আসত, তার চেয়ে সলিল ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা।

‘গৌরীশৃঙ্গ তুলেছে শির’-এর সলিল আর ‘নিশিদিন নিশিদিন বাজে চরণের বীণ’-এর সলিল যে একই মানুষ সেটা কেমন যেন মনে হত না তখন! গান শুনি, ভালোও লাগে, কিন্তু অন্যরকম লাগে। ‘আলোর পথযাত্রী’ গানের ছবি ছ’বছর বয়েসেও দেখতে পেতাম – অনেক মানুষ – পুরুষ ও মহিলা – তারা যেন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে চলেছে এই গান গাইতে গাইতে। সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে তারা (কি পাগলের ভাবনা!)। আর একটা গান শুনে মনে হত মেঘলা আকাশ, আর উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বিশাল একটা চাকার ওপর। কিন্তু এই সলিল এমন ছবি দেখান না। তিনি বরং ভালোবাসেন ছোটাতে, খেলা করতে। আমার সঙ্গে বসে কথা বলেন না আর। তবু এক-একটা দুর্দান্ত আলপনা যেন এই সব গান। গানের সুরে-সঙ্গতে-আগতে-মধ্যত ে এক-একটা রত্নের ঝলকে চোখ ঝলসে যায়।

কিন্তু হায়, আলপনা তবু art নহে! ‘মোরে কাছেতে ডাকে, আসিতে জানে না’! আমি তো মেজর-মাইনরের লোক না! আমার কাজ চোখের ভাবার কাজ! আমার কাছে তাই এখনও আগের সলিলই আমার সলিল।

সলিলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হল ১৯৯০-তে। ‘তারপর যেতে যেতে যেতে এক নদীর সঙ্গে দেখা’ – শুনে কষ্ট পেলাম খুব। এরপর আরও পাঁচ বছর তিনি আমাদের সঙ্গে আমাদের শহরেই থাকবেন। কিন্তু আমি আর তাঁর খোঁজ রাখব না।