তারের টুপি

মানিক সাহা

কাশফুল ফুটে আছে নদীর মাঝখানে, চড়ায়। তার পাশে জ্যোৎস্নার মতো কিছু নীল-সাদা ফুল জলে ভাসছে। এইসব ফুলের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা জলের পুরনো অভ্যাস। সেই জলে ডুবতে ডুবতে সে এসে থামলো নরম মাটিতে। মাটির উপর গুবগুব করছে জল। জলের উপর আকাশ এবং আকাশের উপর আমাদের ঘরবাড়ি। এইভাবে একটি গল্পের শুরু করবো ভেবেছিলাম। অথচ সে নরম মাটিতে পড়তেই গড়াতে শুরু করলো। গড়িয়ে গড়িয়ে সে এখন ঘোলাজল ভেদ করে পুনর্জন্মের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। তাকে ডেকে ডেকে সারা হলাম। অথচ তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

অতএব গল্পটি আর আমার হাতে থাকল না। গল্পের চরিত্ররা কাল্পনিক এবং জড় হলে তার উপর যা ইচ্ছে চাপিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু এই গল্পের চরিত্র হঠাৎ করে নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী চলতে শুরু করেছে। অতঃপর আমি তার পূর্বজন্মের কিছু কথা আপাতত বলে নিই।

সে আমার গল্পের চরিত্র। তার কোন নাম দিতে নেই। কারণ তার অস্তিত্ব নিয়েই বড় সন্দেহে আছি। সন্দেহ অনেক সময়ই আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে। এই যেমন কাল সন্ধ্যেবেলা - সারাদিনের বাঁধা রুটিনের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছি, সে অন্ধকার থেকে বেড়িয়ে এল। অন্ধকার ছিল ল্যাম্পপোস্টের ঠিক পাশে। একটা পেয়ারা গাছ তার পাতা দিয়ে আলো আটকে দিয়েছে। তার ঠিক নীচে গুবরে পোকার মতো আলোর কয়েকটা বৃত্ত।

যে বেড়িয়ে এল, তার মাথায় চিকন তার দিয়ে বানানো টুপি। তাতে কিছু পোকা লেগে ছিল। আলোর পোকা। হাত তুলে আমাকে দাঁড়াতে বলল। আমিও দাঁড়ালাম। সে এগিয়ে এল। আলো আঁধারিতে তার মুখ স্পষ্ট বোঝা গেল না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারলাম সে একটা মেয়ে। এবং তার শরীরের বাঁকগুলি ছিল অসাধারণ। সে এসে করমর্দন করে চলে গেল। "ভাল আছেন? খুব ভাল থাকুন।" এটুকু বলা ছাড়া আর কিছু বলল না। তার শরীর থেকে অদ্ভুত, অপার্থিব গন্ধ ভেসে আসছিল। আহ! এঁড়াতে পারছিলাম না।

তার এমন অস্বাভাবিক আচরণে দারুণ অবাক হয়েছিলাম। তারপর ভাবলাম কোন পাগল হবে হয়তো। ইদানীং শহরে পাগলের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ফলে ব্যাপারটিকে আর তেমন আমল দিলাম না। অথচ রাতে সেই একই রকম তারের টুপি পরা এক মেয়ে আমার স্বপ্নে এল। তার কথা একটু বলি। অবশ্য স্বপ্নের সব কথা বলতে হয় না। বললে, স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যায়। এমনটাই শুনেছি ছোটবেলায়। তাই ভূতের স্বপ্ন বা পরীর স্বপ্ন বা হাতিতে চরে সমুদ্র পেরোনোর স্বপ্ন - সবগুলোই চেপে রাখতাম স্বপ্নের ভেতর। আর চোখ বুজলেই তারা আবার চলে আসত। যেমন আসতো মেয়েরা। ভেজা চুলের মেয়েরা।


হুম! মেয়েরা বারবার আসে। বারবার চলে যায়। যখন আসে মনে হয় আতশবাজি। যখন চলে যায়, মনে হয়, একটা সুন্দর মৃতদেহ জলে ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। আসলে নদী প্রিয় বলেই আমার এই জলে ভেসে যাওয়ার দৃশ্য বার বার চোখে ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠার একরকম মজা আছে। সেবার, তখন আমি ষোল বা পনের বা তার একটু কম-বেশি।

মামার বাড়ি গ্রামে। বছরে এক-দু'বার সেখানে যেতাম। আমার ভাল লাগত মামার বাড়ির নদীতে স্নান করতে। একসাথে অনেকে স্নান করতে যেতাম। জলে ডুব দিয়ে চুপ করে বসে থাকতাম। গুব গুব শব্দ শুনতাম। চোখ খুলে দেখার চেষ্টা করতাম সামনের মেয়েটিকে। তার শরীর জলের নীচে কুয়াশার মতো মনে হত। তাকে ভেদ করতে চাইতাম। হাত বাড়িয়ে দেবার ইচ্ছেকে ভাসিয়ে দিতাম জলে। সে ভেসে ভেসে, ভেসে ভেসে মেয়েটির শরীরে লেপ্টে থাকা পোশাক স্পর্শ করতো।

দম ফুরিয়ে এলে দ্রুত জলের বাইরে মাথা তুলে আনতাম। আর চোখ খুললেই দেখতাম আমার সামনে মেয়েটি অবিকল সেই তারের টুপি পরে আছে। তাতে রঙ বেরঙের মাছ আর আলো জ্বলছে, আলো নিভছে। এটা অবশ্য কয়েক সেকেন্ড থাকত। তার পরেই টুপি উবে যেত আর আমি ডুবতে ডুবতে নরম মাটির উপর এসে পড়তাম। কেউ গান গাইলে যেমন বাতাস নাড়িয়ে দেওয়া তরঙ্গ খেলা করে; ডুবতে থাকলেও তেমনি। আমি গানে আচ্ছন্ন হয়ে ডুবে যাই। গানের তরল যে অংশটি থেকে সুর তৈরি হয় তাকে ঢক ঢক করে গিলে নিই।

মাঝে মাঝে, যখন কিছু করার থাকে না, আমি আমার মাথার ভেতর থেকে নিজস্ব নদীটি বের করে আনি। তার হাজার রকম কথা। হাজার রকম আবদার। তার পার ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে তার গভীরে ডুবে যাই বুঝতেই পারি না। তখন আবার সেই মেয়েটি এসে আমার গালে আঙুল ছুঁয়ে দেয়। বড় কোমল স্পর্শ! পাখির ছানার মতো তার আঙুল। মনে মনে ভেবেছি, একদিন তাকে জড়িয়ে ধরবো। সেই যে ভাবলাম। ব্যস! তারপর থেকে সে আমার গালে আর আঙুল ছোঁয়ায়না। কেবল হাসে এবং দূর থেকে ইশারা করে চলে যায়।

চলে যাওয়া ও ফিরে আসা এক ধরনের বৃত্ত। তার স্পর্শক হয়ে আমার নদীটি, একান্ত অনুগত নদীটি, নিরবধি বয়ে যায়। তারের টুপি পরা মেয়েটি নদী পার ধরে হাঁটে। আমি তার হাত ধরে উড়ে যেতে থাকি। সে আমার অস্তিত্বে গাঢ় বাদামী রঙের মেঘ গায়ে মেখে আসা-যাওয়া করে। কিছু পাখি উড়ে আসে। তাদের ডানায় শিশিরের মতো শব্দেরা লেগে থাকে। ডানা ঝাপটালে সেই শব্দেরা উড়ে আসে আমাদের দিকে। আমার জীবনে যদি সত্য বলে কিছু থাকে, তবে তা এটাই।

অথচ প্রতিনিয়ত মিথ্যে ও বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে আমি হেঁটে চলেছি। আমার গল্পের ভেতর কোন নদী, কোন পাখি, কোন মেঘ - কোন কিছুই জায়গা পাচ্ছে না। সে আসছে। তার মাথায় তারের সুদৃশ্য টুপি। তাতে রঙ বেরঙের আলো জ্বলছে; আলো নিভছে। ক্রমশ আলো আঁধারিতে ভিজতে ভিজতে আমি গল্পের ভেতর ডুবে যাচ্ছি। আর সে গল্পের বাইরে বেড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেছে।

রাস্তায় রাস্তায় এত মেয়েরা! এত ছেলেরা! অনেকের মাথায় তারের টুপি। তাতে আলো। আমার সেই শৈশব থেকে তারা আমার পেছন পেছন ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ টের পাচ্ছে না। মাঝে মাঝে আমিও পাই না। চোখের পলক ফেলা আর খোলার মুহূর্তটুকু বড় রহস্যময়। আমরা খেয়াল করি না। সেই সামান্য মুহূর্তে কিছু কিছু মানুষের মাথায় তারের টুপি দেখা যায়। যন্ত্রণার মধ্যেও তারা বেশ স্বপ্ন দেখাতে পারে। কোন মানে হয় না সে সব স্বপ্নের। কেবল টিকে থাকার জন্য হালকা একটা চমক ছড়িয়ে দেয়। গল্পকারের জন্য বিরাট আশির্বাদ এই সব টুপি-পরা মাথাগুলি।

কিছু কিছু লেখকের মাথায় এই টুপি দেখেছি। পলক ফেলা ও তোলার ঠিক সন্ধিক্ষণে। তাদের মানুষ বলে মনে করতে পারি না। তারা হেঁটে যায়। উড়ে যায়। উড়তে উড়তে স্নিগ্ধ একটি আকাশ বানিয়ে রাখে। প্রতিনিয়ত গল্প লিখছে কেউ। আমাদের অস্তিত্ব ভেজানো সেই গল্প। তাতে জাঁকজমক, হইহুল্লোর, কান্নাকাটি, জন্ম ও হত্যাদৃশ্য সবকিছুই কেমন সাজানো-গোছানো। যে গল্পকার এই গল্প লিখছেন প্রকৃত অর্থে তিনিও তারের টুপি পরা মানুষ মাত্র। তিনিই কেবল চরিত্র নির্মান করতে পারেন। তার চরিত্ররা নিজেদের স্বাধীন ভেবে চলতে থাকলেও তাদের নিয়ন্ত্রক একজন অগোচরে গল্প লিখে চলেন।

আমি শব্দ ও দৃশ্যের জাল রচনা করি। তাতে আটকে যাই নিজেই। এবং আমার শরীর থেকে অন্য কেউ বেড়িয়ে এসে জল ছিটিয়ে দেয় বৃষ্টির মতো। আর সে এই জলে ডুবতে ডুবতে নিজেও একটি গল্প লেখার পরিকল্পনা করতে থাকে। এইভাবে আমরা সকলেই কোন না কোন গল্পের চরিত্র হয়ে উঠি।

সে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার পিঠের দিকে একজোড়া ডানা থাকার কথা ছিল। কিন্তু নেই। সে ফিরে যাচ্ছে। আমার বারংবার ডাক অগ্রাহ্য করে। অনেকটা যাবার পর সে আমাকে ইশারায় ডাক দিল। যেন- ভ্রুপল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে...! আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার দিকে চলতে শুরু করি। আমার পেছনে পড়ে থাকে আমার যাবতীয় সৃষ্টি ও সঞ্চয়। কোন এক মোহময় টান আমাকে আমার শেকড় থেকে উৎপাটিত করে।

মেয়েটির শরীর ঘিরে হলুদ রঙের আলো। আমি তাকে স্পর্শ করি। আলো ফিঁকে হতে থাকে। আমি তার ঠোঁটে ঠোঁট রাখি। তার মাথায় পরা তারের টুপিটি ধিরে ধিরে অদৃশ্য হতে থাকে। রহস্য মিলিয়ে যেতে থাকে।

তাকে অনাবৃত করি। সে এবার ক্লান্তিকর শরীরে পরিণত হয়। তার রহস্য ও কান্তি হারিয়ে যেতে থাকে। আমরা একে অপরের দেহে মিশে যেতে থাকি। ক্রমশ আমার শরীরটি হালকা হতে হতে বাতাসে পরিণত হয়। আমার সত্ত্বা হারিয়ে যায়। আমি প্রাণপণে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। যতই চেষ্টা করি ততই আরো গভীরে ডুবে যাই আরো গভীরে। তারপর নরম মাটির উপর পড়ে আমি গড়িয়ে যেতে থাকি....!