নীল পাখি

তুষ্টি ভট্টাচার্য

১)

অ্যাকোরিয়াম ভর্তি মাছ
আর ঘর ভরে গেছে মানুষে
শহর ভরে গেছে মানুষে
পাগলাগারদ ভরে গেছে
হাসপাতাল ভরে আছে
মানুষ আর মানুষে

তাদের চামড়া ঢেকে দিয়েছে মাংসকে
মাংস ঢাকা পড়েছে চামড়ায়
তবুও মাছ, মাছ…
তাদের পলকহীন চোখ
তাদের নিঃশ্বাস ভর্তি বুড়বুড়ি…
চামড়া ছাড়িয়ে নিয়েছে চামড়াকে
মাংসের ভেতর হাত খুঁজছে কিছু -
মন বা আত্মার কাছাকাছি কিছু
যা চামড়ার ভেতরে আছে, মাংসর ভেতরে আছে
মাছের ভেতরে আছে এক পুরুষ্টু বেড়াল

লোকটা মদ খাচ্ছে খুব
মেয়েটা ফুলদানী ছুড়ে দিল দেওয়ালে
মেঝেময় হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে একপাল বেড়ালের আত্মা

চারটে গোল্ডফিস জল থেকে লাফিয়ে পড়ল

মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে বেড়ালের মুখে গুঁজে দিল মাছভাজা

২)

মাছভাজা শেষ হয়েছে
কাঁটার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বেড়ালের আত্মা এক লাফে
আমার বিছানায় এসে বসল
ওর দুধ সাদা গায়ে আমি হাত বুলিয়ে দিলাম
নরম শরীর নিয়ে আমার কাছে ঘেঁসে এলো ও
আমার খুব দুঃখ হল
ও যে মরে গেছে ও এখনও জানেই না
ওকে বিদেয় জানাতে হবে, আমিও বুঝি নি
সারা রাত ওকে পাশে নিয়ে শুয়ে রইলাম
ভোরের আলো ফোটার আগে
এর আগে কোনদিন ওকে যা বলতে পারি নি মুখ ফুটে –
বললাম –
‘ভালোবাসি’ ...
ওই বেড়ালটা আসলে আমার বউ ছিল
মৃত্যুর আগে পর্যন্ত যা ও নিজেও জানত না

৩)

আমার ভেতরে এক নীল পাখিকে লুকিয়ে রাখি
ও বেরিয়ে আসতে চায় –
আমি কাউকে দেখাতে চাই না ওকে
আমি ওর গায়ে মদ ঢেলে দিই
ওর গলায় সিগারেটের ধোঁয়া ঠুঁসে দিই
মাতাল, বেশ্যা, দোকানী কেউ জানতেই পারে না ওর কথা

নীল পাখিটা তবুও বেরিয়ে আসতে চায়
আমি ওকে ধমকাই –
তুমি কি আমায় নষ্ট করে দেবে?
তুমি কি আমার সব কাজ পন্ড করে দেবে?
আমার সব জমির কারবার বন্ধ করে দেবে?
আমাকে অত বোকা পাও নি!


নীল পাখিটাকে আমি রাতে চুপি চুপি বের করি
বলি – এবার গান কর দেখি
ও গায়
গাইতে গাইতে ওর চোখ থেকে জল গড়িয়ে নেমে আসে
আমার চোখে
আমি সেই পুরুষ মানুষ, যে রাতের অন্ধকারে
নীল পাখির চোখ দিয়ে কাঁদি
আমি সেই পুরুষ মানুষ,
যে নিজের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে দেখে নি

৪)

ওই দূরের পাহাড়টা কেমন ভাবে হাসে, আমি জানি
ওর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে সমুদ্রের নীল
আর মাছগুলো কাঁদতে শুরু করে।
ওদের চোখের জল থেকেই সমুদ্রের নোনতা হয়ে যাওয়া -
ওই আকাশ, ওই বাতাস – ওরাও কাঁদছে
কান্নার সংক্রমণ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনছি
নীল পাখির থেকে সরিয়ে আনছি
ওকে উড়িয়ে দিতে চাই

ওই নদীর বুকে ওর লাশ ভাসিয়ে দেব একদিন
মাটির নীচে পুঁতে ফেলব ওকে
ওই বেড়ালটা যেমন মরে গেছে
আমি চাই এই নীল পাখিটাও মরে যাক

চামড়ার ভেতরে, মাংসর ভেতরে লুকিয়ে থাকা আত্মা
আমাকে খোঁচায়
তীব্র ঝাঁজালো অ্যামোনিয়া স্প্রে করে দিই ঘরে
আমার দম বন্ধ হয়ে আসে
গলা দিয়ে আত্মার ছায়া বমি হতে থাকে

কর্কশ স্বরের একগাল দাড়িওলা মুখের ছায়া পড়ে আয়নায়
ঠিক এই সময়ে আমি নিজেকে চিনতে পারি।

৫)
শুকনো অ্যাকোরিয়ামটা এখনও আছে ঘরে
ওর ভেতরে পুরনো জামাপ্যান্ট রেখে দিয়েছি
কয়েকপাটি চপ্পল আর টুথব্রাশও আছে
কয়েকটা ইঁদুর ওখানে থাকে
রাত হলে ওদের ধারালো দাঁত জামাপ্যান্ট কাটতে থাকে
আমি পাশ ফিরে শুয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ি

তেষ্টা পেলে ঘুম থেকে উঠে জলের শব্দ শুনি
ঘড়ির ভেতর থেকে টিকটিক করে জল পড়ার আওয়াজ শুনি
ড্রেসিং টেবিলে ছড়িয়ে থাকা জলটুকু মুছে ফেলতে চাই
এক পাটি জুতোর ক্ষয়ে যাওয়া হিল দেখে মনে হয়
ওই ইঁদুরগুলোকে এবার বিষ দেব একদিন
ঘরের মেঝেয় কাগজ কুটি কুটি করে কেটে ছড়িয়ে দিয়েছে ওরা
লন্ড্রির বিলগুলো হাওয়ায় উড়ছে শুকনো পাতার মত
ওগুলো আসলে আমার কবিতার খাতার পাতা
যেখানে আমি লিখতে চেয়েছিলাম এই জলেরই গল্প

সিগারেটের ধোঁয়া ছুঁড়ে মারি দেওয়ালে
যে দেওয়ালে আমার পিঠ ঠেকে গেছে এখন