মেট্রো - স্টেশনের যুবতী

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

ভুল - ১

-- ভুল করে ? ইয়ার্কি মারছেন ? অফিসটাইমে মটকা গরম করাবেন না - নেহাৎ মহিলা ...
-- অন্যসময়ে ভুলটা কোর ... যখন অফিস ভীড় থাকবেনা ... যত্ত ঝামেলাবাজ !

কার যে মাথা , কেযে গরম করে ! রাজেশ মরা-ডালের মতো হাতটা টেনে প্ল্যাটফর্ম ধরে হুড়হুড় করে ছুটছে মেডেল পাওয়া দৌড়বাজ না বুনোমোষ ! মেয়েটা চেঁচাচ্ছে – কাকের ছানার গলা ।
ওলটাতে পালটাতে রাজেশ - আঃ হাওয়া – বাতাস – আলো – গর্ভের অন্ধকার থেকে বাইরে ।

- কে বলেছিল আপনাকে ? নচ্ছার দাদাগিরি করে ঘরের খেয়ে বনের মোষ ... ?
- সাকার্স করেন ? ... ইত্যাদি ইত্যাদির গুঁড়োলঙ্কা ।

আরিব্বাস , চোপা মেয়েটার ! রাজেশ কপাল মুছছে , গলার ঘাম মুছছে । যুবতী বলে কথা ,
পাতিকাক হলেও।
-- আরে মামনি থুড়ি দিদি মানে সিস্টার - কাজটা ভুল করতে যাচ্ছিলেন । বয়েস জানিনা ... খামকা গালাগালি গিলে ... আপনি তো চলে যেতেন অবশ্য , গায়ে লাগতনা ... আমারও অমনি একটা বাসনা ছিল
-- বেশি ফ্যাচফ্যাচ করবেন না । কেটে পড়ুন রাস্তা ছেড়ে ! আমি চ্যাঁচালেই পাবলিক ক্যালাবে ...
দেখবেন ?
-- আপনার খিদে পেয়েছে ? আমার পেয়েছে । চলুন খাইগে ।
-- ওঃ দয়াবান্‌ ! পকেটে আছে কি ? বিস্‌কুট ?

ভুল - ২

কলারের ঘাড় - নোংরা উৎকট ঘেমোগন্ধ টেরিলিন শার্ট , প্যান্টের মুহুরি আর হাফসোল চপ্পলে
কাদা । মেয়েটা মুখ কুঁচকে পাশেপাশে । সেও দেখিয়ে দেখিয়ে পকেট থেকে দলামতো রুমাল নাকে । কী সেন্ট মেখেছ মামনি – ভির্মি খাবে লোকে - ফিনাইল না ক্লোরোফর্ম ! পাশেই পেটফোলা ভ্যাট্‌ , নাকচাপার ব্যাখ্যা লাগলনা ।

-- বহুৎ ছড়িয়েছিলেন সিস্টার । বাংলা চ্যানেলে সব বাদ দিয়ে সন্দে সাতটায় আসর বসাত – মেট্রোয় কেন বারবার যুবতী মরে ? তাও আবার অফিস টাইমে ! ফুঃ । ওই টি - আর-পি নাকী বলে ... হাই!
-- আপনিও কি অফিসযাত্রী ? কামাই হল?
-- নাঃ , আপত্তি আছে ? চলুন খাই ।

তেল চুপচুপে ধোসা । দু’খানা স্টিলের থালা ঠকাস্‌ করে ঠুকে দিয়ে গেল , পুঁচকে বাটিতে সাম্বার ,
আর জলীয় সাদা চাটনি।
-- খান, খেয়ে নিন ।
-- ধন্যবাদ ।
--ধুত্তোর নিকুচি ... বলেন দেখি মরতে গেছিলেন কেন ?
-- বললাম তো , ভুল করে ।

ভুল - ৩

-- তেত্তিরিশ প্লাস ... সবে , আজ ... ।
--প্লাস ? ঐরে , ওটা মুশকিল , প্লাসটা ।
-- মুশকিল আবার কি ? বিয়ে করবেন নাকি ? বুড়োভাম !
-- এর’ম বললাম কখন ? কথায় কথায় মুখ খারাপ করেন কেন ? বদভ্যেস খুব !

ফুঁ দিয়ে সর সরিয়ে ঘন চায়ে সাবধানে সুড়ুৎ সুড়ুৎ । ‘ সঙ্গীতা দাস ’ নাম বলেছে । ঝিরকুটে , ধ্বসা - লাগা ধানরঙ । নীলহলুদ সিন্থেটিক চুড়িদার । নখে ক্যাঁটক্যাঁটে সবুজ । মুরগীর পায়ের মতো পাতাদুটো সবুজ ঘাসে। দেখার মতো কিছু নেই বলে , ওটাই মন দিয়ে দেখছে রাজেশ । মাশআল্লাহ্‌ ।
-- এতো সেজেগুজে মরতে যাচ্ছিলেন ? বিয়ে হয়েছে ?

অন্যদিকে চেয়ে মাথা নাড়ছে , কাঁদে নাকি ! কেস্‌ খেয়ে যাবে - যদি সত্যি বিয়ে করতে ঝুলে পড়ে ?
হে ভগা ! রাজেশের মাথায় গড়ের মাঠ , কষের দাঁতে পোকা । সাঁট করে মুখ ঘোরায় , সিঁদুর নেই ।
-- এর ’ ম হেগো - মুখ করে রেখেছেন কেন ? আসলে দেখতেও তো - ! তা হঠাৎ খাওয়ালেন কেন ?
-- আপনার মুখে মাছি ... ব – স – ছে ! থাকেন কোথায় ? খাওয়ালাম ... ভাবলাম জীবনের একটা আনন্দের ইস্পেশাল দিনে – তা না , গালাগাল -
-- সরি , খারাপ কিছু বলছি নাকি ?
--আপনি থাকতেন , ইয়ে , থাকেন কোথায় ?
--ঐ থাকি কুদঘাটের কাছে । কলোনি - বেড়ার ঘর , টালি , টাইমের জল । খেঁকুড়ে মাবাবা । আপনি ?
-- কেষ্টপুর । আপনিও কম খেঁকুড়ে নাকি ?
-- মুখ সামলে - !

ভুল – ৪

সবোবরে ওয়াকিং সেরে লোকজন হড়বড়িয়ে ফিরেছে পঞ্চাশ - ষাটলাখি ফ্ল্যাটে । সন্ধ্যের পরে পার্কের দখলদারি আন্‌দুনিয়ার । অবশ্য পাখপাখালি জেগে থাকে , চেঁচায় । দু’একজন ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে চলে গেল ।
-- ওঠা যাক , জা ’ গা ভালনা ।
-- আরে বসুন , আমাদের কেউ ধরবেনা ।
-- হুঁ । আপনার কাছে পয়সা ...
-- আপনার ঘর তো কাছে , বাসভাড়া হয়ে যাবে ।

পাশাপাশি অন্ধকার । রাজেশ ছাঁটাই হয়ে গেছে মাসদেড়েক । ইলা জানে কিনা , সে জানেনা । হঠাৎ বলে ,
-- আপনি কি ইস্‌কুলের দিদিমনি ?
--হ্যাঁ , শারীরশিক্ষা ... প্যারাটিচার , আটবছর ধরে – পার্মেন্ট না । কেন?
--কিছু না । জানেন... বলব ? জানেন, আজ দিনটা আমার... থাক। মরতে এলেন কেন খোলসা হলনা !
-- কে জানে , জানিনা । শুনুন , আমাকে এখন একবারটি হ্যাপিবারডে বলবেন ?

আরে – একীরে ! রাজেশ ঊণপঞ্চাশ , আজকেই । মরার ইচ্ছেটা একটু ফিকে বাষ্পবাষ্প ছিল , নাহলে বিন্দাস একটা মেট্রো - সহমরণের নিউজ কাল সক্কাল সক্কাল ! রাজেশ ফ্যাকফ্যাক হাসতে থাকে । ঠিক পাশের বেঞ্চে চুমু খাওয়া – খাওয়ি , ‘ অসভ্য অসভ্য ’ সিনেমার সিন । রাজেশ উঠে প্যাণ্টের পেছন ঝাড়ে ।

ভুল – ৫

-- মরাটা হলনা যখন , জন্মদিনটাই থাক । হ্যাপি বার্থডে ... জানেন আমি বি - কম , পার্টটু দিতে পারিনি অবশ্য।
-- আপনার কি বলার আছে বললেন ?
-- ঐযে , যেটা আজকে আপনার ... আমারও ! হে – হে –হে –হে ।
-- মানে জন্মদিন ? ও – মা ! গ্যাঁজা দিচ্ছেন নাকি ? মস্কা মেরে লাভ নেই । আমার লাভার ভেগেছে
তো কী ! আমি উচ্চমাধ্যমিক , চাকুরিজীবি ... একদিন না একদিন হব্বেই । তবে জানেন , মা-টার বড় মুখ খারাপ , একনাম্বারের কুচুটে ... ডাইনি । মরুকগে – আপনাকেও হ্যাপি বারডে !
-- চলুন কিছু একটা কিনে দি ’ - কী বলে প্রেজেন্ট ... শস্তার মধ্যে , বলুন। আমার বৌটা আবার আপনার মতো ফসসা না ! নখপালিশ নেবেন ... লাল ?

ভুল - ৬

আপাতত তারা আলাদা আলাদা বাসে। পনেরটাকার শিশিটা ঘুরিয়ে দেখছে সঙ্গীতা , রক্তের রঙে তরল। পার্সে মোবাইল অজ্ঞান , ওটা চালু করল । আজকে মিথ্যেটা না বললেও হত। অর্থব বুড়ির গু-মুত ধুয়ে ধুয়ে হাতে হাজা , আয়ার কাজ আর পোষায়না ! মেলা খ্যানখ্যান করে , তার মাও তাই ... একই ।

আসার আগে ইলা গান গেয়ে গেয়ে আয়নায় দাঁড়িয়ে মেরুন গা - দেখান সিন্থেটিক
শাড়ি ঘোরাচ্ছিল ... ক্যাচ করকে ক্যাচ করকে ক্যাচ করকে এ্যাটাচ্‌ কিয়ারে ! গোলখোঁপা , গোলমুখ , শরীরে গোলগোল উঁচুনিচু । কোথায় যায় রাজেশ জিজ্ঞেস করেনা – তাও বলে , নাকি দর্জির দোকানে টুকটাক কাজ । আগে চাইত , আজকাল আর লিপিস্টিক নখপালিশ কেনার পয়সাও চায়না।

ভুলভাল বেঁচে থাকাও এক-আধবার আনন্দ দিয়ে ফেলে।