সমুদ্র ও পাথর

কুমার চক্রবর্তী

সমুদ্র ও পাথর

এখানে এসেই শেষ হয়ে যায় স্মৃতি:
শুধু সমুদ্র ডুবে আছে আরেক সমুদ্রে
শুধু সময় গড়িয়ে যায় আরেক সময়ে

পাথরগুলো ঘুমিয়ে থাকে গভীরে
আমি টের পাই জন্মমুহূর্তের তাপমাত্রা
শুধু সে এক নদী সমুদ্রের ছবি নিয়ে ঘুমিয়ে যেতে চায় বার বার

সেইসব নদীর স্মৃতি মনে পড়ে যারা বিস্মৃত হয়েছিল সময়ের গহ্বরে
সেইসব সমুদ্রের কথা মনে পড়ে যারা দিগন্তে লুকিয়ে রেখেছিল গুপ্তধন
সেই সব বৃক্ষের কথা মনে পড়ে যারা আকাশে উড়িয়েছিল অদৃশ্য জীবন

কোথায় আরম্ভ?
সমুদ্রের ওপর ভাসছে স্বর্গের ব্যাকরণ
বেলাভূমি খুলে দেয় সুগন্ধের পয়োধর কুঞ্জনিশি

সে শুরু করে সে-ই আরম্ভবিন্দুতে:
যেখানে নদীরা ঘুম যায়
যেখানে পাথরেরা গান গেয়ে ওঠে



শরৎভাবনা

প্রতিচ্ছবি জড়ো করে না কোনো কিছু, তবু
নাগরিক দিবস প্রতিভাবান যখন বস্তুত শরৎ
উদ্ভাসিত করে লীলা: সুদূরতর কাশবন আর দীর্ঘ
জলের ভাবনা!

গত বছর মেঘ দিয়ে টেরাকোটা সাজিয়েছিল আকাশ
গেল বর্ষায় বৃষ্টি দিয়ে টেরাকোটা সাজিয়েছিল বাংলা
এখন প্রকৃতপক্ষে নভোনীল জুড়ে সুরের অন্ত্যমিল,
কাজল টিপের মতো ভ্রমর পুষ্পবৃত্তে ভ্রমণশীল এবং
এখানেই আদোনিসের বাগান, এখানেই সুবজের চান্ট;

শরৎ মদালস, আর তার চেম্বার মিউজিক:
যখন নদীরা ঘুম যায়
যখন অ্যাপেলো আর অরফিয়ুস একযোগে গেয়ে ওঠে সময়ের বালাদ।


কাব্য ইতিবৃত্তহীন

নানাজাতীয় অভিঘাতে অনুশীলনময় এই দুপুর।
পাখিতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব আর মুদ্রাতত্ত্বে মনস্তত্ত্বময় এই যাথার্থ্য বেদনাধারা।
বকফুল, শুভেচ্ছাময় মেঘ ও মহাকাশের রৌদ্রখেলা আজ
সূর্যবাসরীয় বিষয়বস্তু হয়ে আছে।
সত্যিকারের মনোহীনতা থেকে দূরে এই মেঘ উড়িয়ে নেয়
চুল ও চাঞ্চল্যের নন্দন।

বারে বারে তবু ফিরে আসি। অন্তরিন ধারায় চিন্তাশ্রয়ী
কিছু পাখিজীবনের জলবায়ু অনুধাবন করি। সম্পর্করহিত
দোদুল্যমানতায় কাব্য লিখি রীতিনির্ভর—ইতিবৃত্তহ ীন;
মধ্যাহ্ন অববাহিকাসূত্র আজ ভরে রইল
অন্যমনস্ক প্রাণিসংঘের বাংলা ভাবনায়।

ছন্দভাগ্যে আমরা আজ আবিষ্কার করি শালিখের স্বরলিপি
উপজীব্যমাত্র স্মরণীয় তবু মুগ্ধত্বের স্থিতাবস্থা, দূরে
মনোপ্রবণতার অন্তরালে নমনীয় রূপসী
ধর্মশীল কাউবয় চড়ুইয়েরা কল্পনাপ্রতিভার পক্ষে চেয়ে নেয়
সমসাময়িকতা; ছন্দভাগ্যে কথাবার্তা চলে, বলে সামাজিক মাতৃমুগ্ধতায়:
‘জটিল হয়ে ওঠা এই চিঠিপত্রগুলো আজ
ভুল নির্দেশের মতো অতিরিক্ত আবর্তসঙ্কুল হয়ে ওঠে।’

প্ররোচনাজাত বিস্তৃত আদরে রৌদ্রসখা
অভিপ্রায়ে মাঠে নেচে ওঠে। বৃত্ত অকুস্থল, কীভাবে চিহ্নিত হবে
এই মায়ামুকুরের রৌদ্রকাল!

মেঘ সেতো জলের ঘনিষ্ঠ, শ্যামকাব্যধর্মে ফড়িঙের
মেধার বিকার; লীলা আজ পরিপ্রেক্ষিতের থেকে বাস্তবতা
তদ্ভিন্ন করেছে। পটভূমি কতদূর জাতিতত্ত্বহীন এই উদ্ভাবনা
মিলেমিশে পূর্বাপর নৃত্যরত প্রাণিকূলে, পরিণামহীনতার
বাংলাভাষা রচনা করেছে।

আত্মজীবনী
পাহাড়ের সানুদেশে বেড়ে ওঠা আমাদের জীবন মায়ামমতার চাষ করে; আর
বিকেল হলে মেঘেদের ঘর-সংসার হতে কুহকি আলো এসে অন্তর্দেশ তরল করে দেয়।
মাঝেমাঝে রাত বেশি হলে পাহাড়গুলো মাটি ছেড়ে কোথায় যেন উড়ে চলে যায়, তার স্থলে
জমা হতে থাকে চাঁদের থাল-থাল সোনারুপা। আমরা তখন যূথবদ্ধভাবে
বের হয়ে পড়ি: ঘুরে বেড়াই, হাওয়াই গান করি, আর ভাঙা আকাশের
টুকরো কুড়োই। কখনো জোছনাগুলো বুকে ভরে নিজেদের চেহারা গোপন করে ফেলি।

প্রভু আমাদের ছবি তুলতে বারণ করেন, তার তো নিষেধ তাই, তবু
স্বাধীনতা স্বাধীনতা বলে মানচিত্র ভরতি ছবি আমরা ছড়িয়ে দিই জলের নিকটে প্রতিবিম্বে।

আমাদের এই স্বয়ংপ্রভ কাজে তার আপত্তি ঘোরতর। তিনি আমাদের শাস্তি দিতে পেনাল কোড
প্রবর্তন করেন এবং নক্ষত্রদের জুরি করে আদালতি কাজকারবার শুরু করে দেন।
আমরা বিশ্বস্ত নভোদাস, একবার প্রান্তদেশে আপরাধ করি তো অন্যবার
আলোকবর্ষে বেকসুর খালাস পেয়ে যাই।
শুধু এই দাদামেঘ আমাদের শীতল ছায়া দিয়ে সমর্পণ করে রাখে রাতদিন।
তবু দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামির মতো, আমরা একটি মেঘের পরজন্ম দেখে
ভাববাদী হয়ে উঠি বারবার।