দৃশ্যের মরশুম

পিয়ালী বসু


এই মুহূর্তে আমি দমদমে । সি-অফ করার কথা দিয়েও শেষ পর্যন্ত সে কথা রাখো নি তুমি , ( নাকি রাখতে পারো নি ? ) স্পর্শ বলে তো আদতে কিছু নেই , তাই শেষবারের দেখায় তোমার হাত ছোঁয়ার ছবিটিও ভীষণভাবে অবাস্তব মনে হয় ।
.
প্রচলিত অভ্যাসবশত গত মাসেই দাবী করেছিলে কফিশপে একটা সেলফি তুলে রাখতে চাও আমার সাথে , আমি চলে যাবার পর , আমরা যেন একক 'আমি' বা 'তুমি' না হই । তোমার সে শখ আমি পালন করেছিলাম সাউথ সিটিতে , মনে পড়ে ?
.
আমার মেধা অস্বস্তিতে ফেলতো তোমায় , তাই আমাদের মধ্যেকার মায়াবী খড়কুটোটুকু বাঁচিয়ে রেখে দু- বছর সম্পর্কটাকে টেনেছিলাম আমিই । একে অপরের সচরাচর হতে চাওয়া বা না চাওয়া ... সবটুকুই আগলে রেখে চলেছিলাম আমি ।
.
আজীবন পাশে থাকতে চাওয়া সঙ্গী চেয়েছিলাম আমি , অথচ দেখো মুহূর্তের অসংযোগ পেরিয়ে , আমি কিন্তু আজও স্পষ্ট চোখেই জীবন ' দেখি ।
.
এয়ারপোর্ট বেশ ফাঁকা এখন । শেষ কলওভার হয়ে গেছে । আমি কলকাতা ছাড়ছি । তোমায় ছাড়ছি । দশকের অবসেশন ঝেড়ে ফেলে অবশেষে আমি গোলার্ধ পেরোচ্ছি ।
.
এ শহর এখন অভ্যাসমতো সন্ধে সাজিয়ে বসে যখন তখন । সময়টা নভেম্বর , তাই আলোহীন খসখসে আকাশে শূন্যতার শেষটুকু মাপা যায়না । মেঘ মুছতে গেলেও দু পোঁচ কালি লেগে থাকে হাতের তালুতে , রুম হিটারের ভেপার অদ্ভুত এক ভিস্যুয়াল ডেকোরেশন দেয় তাকে ।
.
তোমার ফোন এখন প্রায় আসেই না , এখানে আসার পর কথার ভগ্নাংশটুকু, আমার স্টাডি কর্নারের বুকশেলফে জমা করে রেখে দিয়েছি । ' কি হবে ? থাক তারা নিজেদের মতো অণ্বয় খুঁজে নিয়ে । '
.
চোখটা এখন বেশ সহিষ্ণু হয়ে গেছে । তাই চলে আসার আগের কয়েকদিনে তোমার অজুহাত বা অভিসন্ধির ছবিগুলিও আমার সাথে নিয়েই বসি প্রতি সন্ধেতে । বিছিয়ে দিই তাদের , চেতনার চারপাশে । অন্ধকার পুষে রাখি না আজকাল আর । জীবন আসলে বড্ড ছোট , তাই একাকীত্বের নিরবচ্ছিন্ন বসতির নীচে চাপ চাপ শূন্যতার স্নায়ু , ভীষণ চেনা এক মোলায়েম দৃশ্য তৈরি করে ।
.
ব্যস্ততা নির্ভর এই পশ্চিমী দেশে , অপ্রয়োজনীয় কথাদের কোন জায়গা নেই , চেনা মুখের নিশ্চিত বৃত্ত তৈরি হয় , এ শহরে প্রয়োজন বুঝে , তাই দিন শেষ হলে , শৈশবের গন্ধ গায়ে মেখে মায়ের হাতে ভাত খাওয়া হয়না আর , বরং সময় ও দূরত্বের অনুপাত মেপে জীবন ' মায়ের কাজটি সারে ।
.
বয়স বাড়ছে । স্বাভাবিক ভাবেই প্রেমের সহজতাও একটা ধারণামাত্র ' হয়েই থেকে যাচ্ছে । মাঝে মাঝে খুব পরিচিত চোখে চেনা নীড়ের অনুষঙ্গ খুঁজে পেলেও হালকা রিফ্লেক্সের ভেতর প্রেম' টা গেঁথে বসছে না সেভাবে ।
.
একটা অদ্ভুত ধাতব গন্ধ নাকে আসছে । ফেলে আসা ছায়ারা এখন বিষণ্ণ জিভের ভিতর স্থায়ীভাবে বসবাস করে ... " The secret of life is living, but the problem of life is to live." অতর্কিতে সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে জেতার মজাটাই থাকে না , তাই খসে পড়া ত্বকের ভেতর জায়গা করে নেওয়া মেলাঙ্কলিকাতেও ইদানীং অভ্যস্ত হয়ে গেছি ।
.
একটা লেখা শুরু করেছি । এযাবৎকাল ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের শিরা উপশিরা নিংড়ে নেওয়ার পর ভাবনার যে দুধ স্তরটুকু পড়ে থাকে , এই পড়ন্ত জীবনের অনুভাষ , আঙুলের খাঁজে তাকে ক্ষণকাল আটকে রেখে , কবিতার মোটিফে তাকে পেশ করে ... যেমন আমিও করছি ।
.
সময় ভাঙছে , সাথে দৃশ্য এবং কিছু চেনা ঠিকানাও । এই ভাঙার মরশুমে আমি কিন্তু স্থির থাকি যথাসম্ভব , স্পর্শগত দূরত্ব সম্পর্কের আবহাওয়ার যে চিরাচরিত ছবিটি ব্যক্ত করে , স্মরণ শূন্যতার সেই ছবিটিকেই ভুল ' প্রমাণ করে দিই আমি , ... Strangely it’s not an isolation of choice, it's an acute form of mental aloneness
.
ফেলে আসা স্মৃতির পাড় ঘেঁসে , ঈষৎ নম্র পদক্ষেপে আমিও হাঁটতে থাকি ... সেই গল্পের সন্ধানে , যে গল্পের সূচনা হয়েছিলো তোমার আর আমার প্রেমের ভিসুয়াল আউটলাইন মেপে ... অবাধ আদুরে আস্কারায় ।