আগুন: এক অব্যয় বর্ণমালা

পায়েলী ধর

(১) "আঁকি তার আনন্দ প্রতিমা..."(বোধজনিত)

এসব শব্দছক আসলে নেহাতি আলোর অভ্যেস। লেপটে থাকা পিছুডাক যেমন প্রতি অর্থে অন্ধকার।একা থাকার কৌশল হাতবন্দী করার প্রাকমূহুর্তে গোষ্ঠীময় জীবন উপহাসে জানায়,সব একা মানুষেরা আদপে এক একজন ব্যষ্টিগত জীব।কিছুটা স্মৃতি বিতাড়িত। কিছুটা বিভ্রমে সার্থক। ছুটির অজুহাতে সব ইস্তেহার ডানা পেলে বাক্সবন্দী কিছু উড়োমেঘ তাড়নায় আবেগ সাজায়। আমি দৃশ্য ভাঙি। রুইতন- হরতন- ইস্কাবন - এবং বনের অধিকতর গভীরে; গুল্ম আর কাঁটাঝোপে লক্ষ্মীর ঝাঁপি লুকোই। স্বপাপবিদ্ধ স্রোতের গায়ে ক্ষত। উপশমে বিষ বুলিয়ে দেয় ফেরিওয়ালার যাদুমলম। দেখি, মস্ত এক সংসার কাঁধে আমি আর জোকার সমান্তরালে হেঁটে যাচ্ছি আলোর মঞ্চে।
ম্যাজিক...ম্যাজিক... ভোগাস... ভোগাস....
ছুমন্তরে পাল্টে যাচ্ছে বাসনকোসন, বেডশিট, তলপেটের আকার, জিনগত সিন্ড্রোম।
হঠাৎ পর্দা এসে শূন্য নামিয়ে রাখে দর্শকাসনে। দেখি, মোহ মোহ তন্দ্রা কেমন ন্যুব্জ হয় অবাক সূর্যাস্তের পায়ে। যে পথগুলো এযাবৎ আলো চিনতে চেয়ে দিকভ্রষ্টের মতো একা, তার কিয়দংশে আমারও দাবীদাওয়া প্রহসনে উপমা আঁকে...

(১৩/৩/২০১৬)


(২) "অবাক ভোরে প্রস্ফুটিত ফুল..." ( পরাগজনিত)

সেতুর পর সেতু এসে একটা সমঝোতা ঝুলিয়ে দিল শহরে। তাসঘর ফেরতা সবুজ বন্ধুরা গলিপথে সাজিয়েছে সম্ভাবনার হাজারো পৃষ্ঠা। কোনোটাই ঠিক বিস্ফোরক নয়। কোনোটাই দ্বি-অর্থে নয় প্রকট। স্রেফ সালতামামির ফিরিস্তিতে গুঁজে রাখা অসফল ইতিহাস।
আগুনরঙা উর্দি গায়ে আমাদের সৈন্য সাজার মহড়া ক্রমশ উপভোগ্য হলে, কোটিতম জিঘাংসার নিচে সমাহিত হল পরার্থবাদ। কারা সব উলুক ঝুলুক নোলা দিয়ে চেটে ফেলেছে গনগনে এক একটা মাথা। আহা, পিন্দরের পলাশ ঘাঁটি স্তবকের পর স্তবক বিচ্ছেদ লেখে।অর্থাৎ ষোলোআনাই ফেরেববাজি। কে কার চোখ কাড়লো? কে কার বুক? আর কতটা গভীর থেকে গভীর হতে হতে চিড় বরাবর উঠে এলো শোকপ্রস্তাব?ঈশ্বর হব বলেই কাদা ছুঁড়ে শব্দকে বিদ্রুপের ভাষা শেখাই।
দহন আমার প্রেমিক পুরুষ। ওর যাবতীয় রোগ আদরে ঢাকা ফলিডলের উষ্ণতায়। প্রেমদিবসে আড়াই হাত জমির ভেট পাঠাবে ঠিক। এমন বাস্তুহারা সংসারে ঘুমিয়ে ওঠার আচ্ছাদন থাকে না কোনও। আঙুলের ডগা কাৎ হয়ে তুলে আনছে বিষ্ঠা আর পচনগত প্রবাদ। এখন বরং, সন্দেহের আলজিভে তুলে দিই স্বাদছাড়া নেতাজি কেবিন। আমাদের অপেক্ষমাণ পাহাড়ি ঢালান এতোদিনে অবৈধতার গন্ধ ভুলে গেছে নিশ্চিত...
(৯/৬/১০১৬)


(৩) " কোথাও পর পর নব্য অনুভব তাসের ঘর..." ( প্রভেদজনিত)

ব্রহ্ম- কল্প- দ্রুম এই ছিল পরাবাস্তব।নাবালক হাত তাতে লিখেছে বিদ্বেষ আর ব্যক্তিজীবন। আমি গার্হস্থ্য অর্থে শ্মশান বুঝি। একটা নিশ্ছিদ্র বিশ্বাসময়তা। ভবঘুরের ফেরিনৌকা তাতে নোঙর করে মধ্যরাতে। বিজ্ঞাপন খোঁড়া শহর, জ্যামজট, ফেরিওয়ালার সংসার, বোকা আসবাব,,ফ্লাইওভারের বগল ঘেঁষা ঠোঁটপালিশের মেয়ে; সবটাই বাড়ন্ত উচ্ছ্বাস। কোথাও তেমন কোনও যাদুদন্ড দেখিনা। অথচ, আমাকে রোজ ম্যাজিক রিয়ালিজম চেনাতে আসে লাল চোখের ব্রহ্মচারী। ওর ঘরদুয়োরে উপোসের বাস। চালে আর চুলোয় বড্ড বেশি ঠোকাঠুকি।
চব্য- চোষ্য-লেহ্য- পেয় সবটুকুর অঙ্গীকারে বুক রাখি ওর করতলে। রজস্বলার যাবতীয় দিকচিহ্ন উলটে ফেলে পালটে ফেলে, বিরতি প্রসঙ্গে আটকে গেল আমাদের যৌথ বসত। স্নানঘর তখনও বেওয়ারিশ ভ্রুণের ভাসমানতায় ভাস্বর। মিছরিরঙা আঠালো পরমায়ু কেমন রক্ত থেকে, মাংস থেকে, শরীর থেকে, গড়ন থেকে আদল ভাঙতে ভাঙতে গড়িয়ে পড়ছে পূতীগন্ধময় সুড়ঙ্গে। বেকুব ফেরিঘাট থেকে কোনও অর্বাচীন এখনও প্রতিশোধের কবিতায় লিখছে - ঈশ্বর ক্ষণস্থায়ী অথবা ভঙ্গুর...
( ৮/৮/২০১৬)


(৪) "এখানে সদগতি মৃত্যু বিষয়ক প্রবন্ধের..." ( নির্বাসনজনিত)

ভাঙন শব্দরহিত। একটা বিশ্বাসহন্ত্রী ঘুণপোকা। পুরনো জখম খুঁড়ে উসকে দেওয়া ভুলেল পূর্বরাগ। যার পরবর্তী বেশ কিছু অধ্যায় হয়তো আমাকেই তঞ্চক বলে জানবে। কালোজামা, ঘুম শহরে ফুটন্ত অক্ষর, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড আর হল্লাবাজি উপেক্ষা করলে; বাকি সবটুকুই রঙমিলান্তির খেলা। যদিও, যুক্তাক্ষরের মতো এতোদিন এ-ওর কাঁধে নিশ্বাস বুনেছে তরুণ সেল্ফিগুলো। চায়ের কাপে তুফান রেখে আকাশবাণীর রেকর্ডরুমে মাটির কবিতা পড়েছে সন্ধে নাগাদ। তোফা তোফা বলে চেঁচিয়ে উঠেছে সারমেয় সংলাপ।
এরপর প্রয়োজনহীন ছবি বদল। দেখি, বাদ্যিগুলোর ভুঁড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে ব্যক্তিগত থুতু- কাদা- চোর- সম্রাট- পাশাখোড়- যত্নের তৎসম সম্পর্ক- শব...
হাসমিচক থেকে তিস্তার দূরত্বে যতটুকু বেঁচে থাকে শহর তার সবটুকুতেই ভবিষ্যতের কবিতা রাখা হল। ঠিক তখনই কড় গুনে গুনে প্রমাদ ছড়ালো কোনও কোনও মুসাফির। মুখবন্ধের রাজত্বে একেশ্বরবাদী হনুমান সাজে ওরা। টোকাটুকির ভাষা আর নিজস্বী গুলে বিবসনা দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়মুখ। কারা সব আগুন হবে বলে স্ব- আহুতিতে পিছলে গেছে বেমক্কাই। সিগনালের ওপর তখনও ঝুলছে শ্রুতিব্যঞ্জক- শ্রীহীন কবিতাগুচ্ছ। আমাদের দহন থেকেই তো জন্মাবার কথা ছিল ওদের। যদিও,আজকাল ডাকনামে আত্মদ্রোহী আমরাই...
(১৩/৯/২০১৬)