বরাঙ্গনা

সুমিত দে

বরাঙ্গনা

বর্ণিনী
দেহশোক কোরো না
আমার শরীর আমার কথা শোনে না বর্ণিনী

আমি তো চেয়েছিলাম তোমায় একদিন পাহাড়ে নেবো
একদিন সমুদ্রে
ধুধু টাঁড়ের মাঝে পলাশের নিচে শীতলপাটি পাতবো একদিন
চেয়েছিলাম
ধানের গন্ধ মাখা হেমন্তের বাতাস বইলে
তোমাকে নদীতীরে স্নান দেবো, রূপটান

অক্লেশে আঁকতে পারি তোমায়
ভাবতে পারি নগ্ন তুমি হেঁটে যাচ্ছো
মরুভূ থেকে মরীচিকার দিকে
দুহাতে মায়া ছড়াতে ছড়াতে
আর মৃগদল জল খুঁজে পেয়ে লুটিয়ে পড়ছে পায়ে
আমি উপচ্ছায়ায় আঙুল দিয়ে বুুুনে দিতে পারি
দ্বিতীয়ার চাঁদ, উপত্যকায় বকের পাঁতি
উড়ন্ত, নাভি পাশে শ্যামলিমা, নবদূর্বা, কলমীর পুকুর
বর্ণিনী

অথচ আমি তোমার শরীরে বড় গোলাপগন্ধ পাই
বর্ণিনী আমি যে গোলাপগন্ধ পাই তোমার শরীরে
আর অমনি
আমার শরীর জুড়ে নেমে আসে ঘুম
বেহাগের মতো গাঢ়
তবু মালকোশের মত স্বপ্নময় ঘুম
আর ঘুমিয়ে থাকি আমি,
শুক্তিতে নির্ভার, একা,
যন্ত্রণার বালি রূপমুক্তো দিয়ে ঢেকে

বর্ণিনী, আমি না ভুলে গেছি সব!

আমাকে দুগ্ধ দাও, তারপর আঙুলে
আঙুল ধরে শিখিয়ে দাও হাঁটা
আমার জিভে জিভ দিয়ে বাক চারিয়ে দাও আরন্ধ্র
বৃষ্টি হয়ে ফিরিয়ে আনো বনাঞ্চল
পাইনের ঋজুতা, সরলতা,

দেহশোক কোরো না বর্ণিনী
আমার শরীর আমার কথা শোনে না
বারবার মরে জন্মায় কোন পিপাসায়
ইদানীং বনোমুগ্ধ পুটুসপিয়াসী কিশোর সে
আর তোমার শরীরে
আমি বড় গোলাপগন্ধ পাই বর্ণিনী


সুবর্ণরেখা

চাঁদ থেকে বালিতে ঝরে পড়ে জ্যোৎস্নাকুচি
আমি তার নাম দিই সন্তান
তুমি তাকে বীজরূপে অমনই ধারণ করো গর্ভে
আগামীর জন্য শ্বাসমূলে জমা রেখে আসি কিছু শ্বাস
দুজনের

দুলে দুলে ওঠা শূন্যগর্ভ নৌকো,
মৃত ঝিনুকের আলপথ, জোয়ারে ঢেকে যাওয়া ঘাস
এদের প্রতিবেশী করে গ্রাম বানিয়েছি
ওখানে ছুটিতে যাবো না
ওখানে যাবো না অবসরে...
বিনোদনে নয়
আমাদের ঘরকন্না জমা রাখা আছে ওখানে

আমাকে আগন্তুক করো, নতুন চেনো আবার
হলুদ বালির দিগন্ত পেরিয়ে
আমি হেঁটে আসবো তোমার দিকে
তুমি নৌকো শিখিয়ে দেবে আমায়,
সমুুুদ্রশালিখের বলে দেওয়া পথে দাঁড় টেনে
দুটো ক্ষুন্নিবৃত্তি হবে আমাদের

যেহেতু সে নির্জনে কোনো পাঠশালা নেই ছাউনি দেওয়া
আমাদের সন্তানের নাম রাখবো সাদাবালি
নাম রাখবো জ্যোৎস্নাকুচি
সমস্ত রমণের শেষে ঝাউয়ের বাতাস মেখে
ভেসে যাবো আমরা
এতবড় সমুদ্রে আমরা দুটি প্রাণীর
ঠাঁই জুটে যাবে ঠিক, দেখো....

নিজের সঙ্গে কথোপকথন
নিজের সঙ্গে কথোপকথন বন্ধ হবার জোগাড় হয়েছে
এবার আবার একলা করো নির্বিকল্প আত্মসখা
দরজা জানলা দেওয়াল তুলে ভিতরদিকে ঘুলঘুলি থাক
আয়নাজুড়ে উঠুক ফুটে তোমার আমার বাক্-ঝরোখা

বড্ড মানুষ, আমিই শুধু নিষ্পক্ষ চিলের মতো
ছোট্ট একটা গণ্ডি কেটে পাক খেয়ে যাই আকাশস্মৃতি
ফুলের গন্ধে মধুর বাতাস আমার ভীষণ শ্বাসভারি হয়
ছেঁড়া ডানায় রোদ পড়ে না
ছোঁয় না তরাস, ক্রোধ বা প্রীতি

একলা করো একলা করো একক করো ঈশ্বর আমার
বুকের মধ্যে ফল্গু ছিল, খুঁড়তে হবে খোঁজার জন্যে
নখর বাড়ুক বন্যপ্রাণে দৃষ্টি আবার তীব্রতা পাক
আত্মশিকার আত্মশিকড় শেখাও আবার নিষাদজন্মে


ডাক দিও প্রিয় স্টেশন

ডাক দিও প্রিয় স্টেশন
তোমাকে ছুঁয়ে নেমে আসা বাতাসে কমলা ঘ্রাণ
বুকে ভরে নিয়ে খেলার মাঠে নেমে পড়ি
ঠেলাঠেলি, সপসপে চাবুক, পায়ে পেরেক চিহ্ন
মুখের বিস্বাদ লোহা তখন কুয়াশার গন্ধে অস্থির
আজকের দৌড়েও হেরে যেতে আমার আর
বাধা থাকে না কোনো তাহলে

ডাক দাও চিরচেনা স্টেশন
তোমার প্রতিটি বেলার ভাইবোন ছায়াগুলো
দোকানে দোকানে চা আর বিস্কুটের বয়াম
রাতে বাড়ি ফেরার পথে পিঠে হাত রেখে
এগিয়ে দেয় আমাকে তোমার গড়িয়ে পড়া ঢাল
আমি ভাইফোঁটা নিই তোমার সিগন্যালপোস্টের কাছে

ডাক দিও অচেনা স্টেশন
লাল মোরামে কৃষ্ণচূড়া, ভাঙা বেঞ্চ, মিয়োনো কুকুর
অজ্ঞাতপরিচয় ঘোমটা আর চাপাকল নিয়ে
এক্সপ্রেসের অহংকারী জানলায়
চকিতে ছুঁড়ে দিও ডাক; সহসা তীব্রনাদে
থেমে যাক পৃথিবীর গতি;
ডাক দিও অচেনা স্টেশন
ঘোমটার আড়াল থেকে তোমায় হঠাৎ হঠাৎই
বড় দেখতে ইচ্ছে করে আমার