লেনিন মূর্তির সশব্দ পতন অথচ তাঁর নীরব অবস্থান

পূর্ণেন্দু শেখর মিত্র




কামালভ পিছন থেকে বলল – আমরা ওদের জন্য আর নতুন করে ধাতু খরচ করতে রাজী নই।
আমরা তখন তাসখন্দ শহরেরর এক বৃত্তাকার বাগানে তৈমুর লঙ-এর মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে। ধাতু কুদে বিশালাকায় অশ্বারূঢ় তৈমুরের কালো মূর্ত্তি। নিখাদ ভাস্কর্য। শিল্পীর মুন্সীয়ানা গোটা শিল্প অবয়বে। এক চিলতে সুক্ষ্ম হাসির ছোঁওয়া মূর্তির ঠোটে। বিশ্বত্রাসের পেলব মূর্তি। মূর্তির বেদীতলে উৎকীর্ণ – Strength in justice। এদেশের শৌর্য্য- বীর্যের জাতীয় প্রতীক তৈমুর। আমাদের দেশে যতই নির্মম লুঠেরা ও নিষ্ঠুর দস্যু বলে কুখ্যাতি পান না কেন, এদেশে তিনি ন্যাশনাল হিরো।
শুনলাম এই বেদীর উপর এক সময় ‘কম্যুনিস্ট নেতা’ লেনিন বিরাজ করতেন। নব্বই দশকের গোড়ায় সোভিয়েত সংঘের থেকে গাঁটছড়া ভাঙার পর লেনিনের অবতরণ এবং তৈমুরের এই মঞ্চে অধিষ্ঠান।



সুতরাং কামালভের ‘ওরা’ হলো ওই লেনিন এবং তাঁর অনুগামীরা। মনে আছে কম্যুনিস্টদের পতনে বিশ্বজুড়ে সেই সময় দুন্দুভি বেজে উঠেছিল। ইউক্রেনের রাস্তায় উৎপাটিত লেনিন মূর্তির উপরে হাতুড়ির ঘায়ে আকাশে বাতাসে উল্লাস। মুক্তির উন্মাদনায় কোনও ব্যত্যয় ছিলনা। তাই রূশী প্রভাব ছিন্ন করে নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য উজবেকদের একজন পরাক্রান্ত আইকনের প্রয়োজন ছিল। এমন একজন যাঁকে একডাকে গোটা বিশ্ব চেনে জানে। খুঁজে পেতে হাতে এল তৈমুর। তৈমুরই সই।
কিন্তু আমি ভাবছি এই ঘোড়সওয়ার মূর্তিটির ‘জাস্টিস’ নিয়ে। দিল্লীর রাজপথে একদিনে আধলাখ নিরীহ মানুষ হত্যার নির্বিকার বীভৎসতা বা নির্বিচার লুণ্ঠন অপযশে ‘জাস্টিস’ কি হতে পারে? এবং সেই ‘ন্যায় বিচার’-এর মধ্যে লুকানো ‘মহান শক্তি’-র পরিচিতিই বা কি? তুলনায় লেনিনের ‘জাস্টিস’ কি ভাবে নকল আধুলি হয়ে গেল? আমি যখন এমতাবস্থায় বেজায় ধন্ধে কামালভ তখন প্রচ্ছন্ন গর্বে কথাটি শোনালো।
নেহাতই নিরীহ গোবেচারী মার্কা প্রাণী কামালভ। ভালোমানুষ টাইপ। একটি প্রাইমারী স্কুলের ইংরেজীর মাষ্টারমশাই। আগে চাকরি ছিল মাঝে মধ্যে স্টপগ্যাপে, এখন নিত্য। কম্যুনিস্টরা চলে যেতে বিশ্বায়ন ও উদার অর্থনিতীর দরজা খোলায়, বাজারের ধান্দায় য়ূরোপ-আমেরিকা এ দিকে মুখ ফেরাতেই এই পরিবর্তন। কাজে অকাজে ভ্রমনবিলাসীর স্রোত। ফলে ইংরেজীর কদর বেড়েছে। তাতে যে কামালভের বিবিবাচ্চা নিয়ে সংসার চালানো স্বচ্ছন্দ হয়ছে তা নয়, নুন আনতে এখনও পান্থা ফুরোয়। তাই ফাঁকে ফোকরে ছুটিতে ছাটাতে সে এই গাইডের কাজটি করে থাকে। মুখ ফোটেনা কিন্তু মনে মনে বোঝে রূশীরা চলে যেতে সাধারণ জনগনের দৈনন্দিন নিশ্চিন্ত জীবনযাপনে যে টাল খেয়েছে তা এখনও সামাল দেওয়া যায়নি।
আমাদের গাড়ী হু হু করে ছুটেছে খুজন্দের দিকে। কামালভ কোনও চায়খানায় থামতে চায়না। সীমান্ত পারাপারের চক্কর বেশ জটিল, সময় সাপেক্ষ। তাই সময় নষ্ট করার ইচ্ছে নেই। আমি জানি আমাদের পৌছে দিয়ে কামালভ ফিরে যাবে তাসখন্দ, তারপরেই সে ছুটবে তার গ্রামের বাড়ীর দিকে। বাসে করে গেলেও পাক্কা দু’ঘন্টা। আমাদের পাল্লায় পরে বৌ আর ছানার মুখদর্শন হয়নি দু’দিন। তারপর আছে গৃহ জটিলতা। সোভিয়েত কালে জমিজমা নিয়ে মাথা ঘামাবার বালাই ছিলনা। প্রায় সবই ছিল সরকারের খিদমতে। নব্বইয়ের আগে উজবেকিস্তানে চাষবাস-পশুপালনের ষাট ভাগ ছিল রাষ্ট্রের হাতে, পয়ত্রিশ ভাগ সমবায় (Collective Firming), আর বাকী পাঁচ ভাগ গৃহপালিত পশুপালন। কিন্তু এখন ছবি ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে। সাবেক উজবেক সংস্কার ফিরে আসছে। বাপ-পিতামহের জমিতে এখন ব্যাক্তিগত মালিকানায় চাষ আবাদ। আগে উদবৃত্ত ফসল যেত সরকারী খামারে। এখন দালালবাহিত হয়ে বাজারে। যে ভাবে প্রাক কম্যুনিস্ট কালের পুরানো নিয়মকানুন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, তাতে বাবার মন পাওয়া জরুরী। বাবার বিরাগভাজন হয়ে পরিবার সমেত বিবাগী হতে চায়না কামালভ। একা বউ-য়ের পক্ষে এ আশঙ্কার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সময় পেলেই বৃদ্ধ বাবার মন পেতে তার সামনে গিয়ে বসে থাকতে হয় কামালভকে। তারপরে স্কুল থেকে ছুটি নিলেও, মাঝে মধ্যে কড়া নেড়ে জানানটুকু না দিলে নড়বড়ে ইংরেজী শিক্ষকের চাকরীটি ফৌত হয়ে যেতে পারে।
তখন চলছে রমজান মাস কিছু দিন পরেই এ দেশের সব চেয়ে বড় উৎসব ইদ। উজবেকিস্তানের শতকরা চুরানব্বই জন মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং শিক্ষায় শতকরা আটানব্বই। কামালভকে রোজা রাখার কথা বলতেই তার বুঝতে বেশ সময় লাগল। তারপর মনে করে বলল – খুব ছোটবেলায় বাপ-ঠাকুর্দাকে এমন একটি সংস্কার মানতে দেখেছিল, তাও গোটা মাস নয়, দিন কয়েক। সমাজ জীবনে ‘কম্যুনিষ্ট’ শিক্ষার প্রভাব ধর্মকে এখনও যে বেশ গুরুত্বহীন রেখেছে তা বোঝা গেল।
তবে ধর্ম যে এ দেশের সাম্প্রতিক রাজনিতীর আসরে একেবারেই উঁকি দেয়নি তা নয়। গর্বাচভ শাসনের অন্তিমলগ্নে তা বেশ প্রকাশ্যে ভেসে উঠেছিল। হিসেব করে দেখলে সে সময় কামালভ আঠার বছরের যুবক। ওর বেশ মনে থাকার কথা। ১৯৮৮ সালে রাশিয়ান অর্থডক্স চার্চ্চের হাজার বছর পূর্তি উৎসবকে সোভিয়েত রাশিয়ান ফেডারেশন বেশ গুরুত্ব দেয়। সভিয়েত সংবাদ মাধ্যম, রাশিয়ান চার্চ্চ এবং রাশিয়ান সংস্কৃতির পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের গুনগান শুরু করে এবং রাশিয়ার ইতিহাসে এই চার্চ্চের ভূমিকার কথা ফলাও করে তুলে ধরে। তাইই শধু নয় অর্থডক্স চার্চ্চের নয়জন নবীন সেইন্টের মহিমা প্রচার করে। এই সময় তুল্যমূল্য আলোচনায় ইসলামকে যখন গৌন রূপে আকাঁ হচ্ছে তখন ইসলাম ধর্মের ভাল ও মন্দ দিক নিয়ে নিরপেক্ষ ভাবে স্বচ্ছ আলোচনা শুরু করার দাবী ওঠে। সেই থেকে ধর্ম নিয়ে প্রকাশ্যে কথাবলা শুরু।
উজবেকিস্তানে প্রাসাশনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় মানুষ টের পেয়েছিল কি ভাবে তারা তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুল্লিতে এসে পড়েছে। ১৯৯০ এর জুনে ক্যাস্পিয়ন সাগরের পাশে বন্দর শহর অস্ত্রাখানে ইসলামিক রেনেঁশাস পার্টি (IRP) জন্ম নেয়। এদের প্রাথমিক দাবী ছিল প্রেসিডেন্ট গর্বাচভ রাশিয়ান অর্থডক্স চার্চ্চকে ধর্মাচরনে যে স্বাধীনতা এবং ছাড় দিয়েছিলেন তা যেন সমভাবে মুসলমান সমাজকেও দেওয়া হয়, তাহলে মুসলমানেরাও কোরানের আদর্শ ও বিধি অনুযায়ী জীবনধারন করতে পারবে। সোভিয়েত সরকার আগের বছর পাঁচ কোটি তিরিশ লক্ষ মুসলিম সোভিয়েত নাগরিকের মধ্যে মাত্র তেরশো জনকে হজ তীর্থ করতে অনুমতি দিয়েছিল, এই সংগঠন সেই সংখ্যা ১৯৯০ সালে বাড়াবার দাবীতে একটি ডেমনস্ট্রেশন দেয়। উজবেকিস্তানে IRP ঠাঁই পায় ফরজানা উপত্যকায়। তারা এবং তাদের সহযোগীরা এরপর নানা ফতোয়া জারি করে - ভোদকাপ্রেমী উজবেকদের মদ খাওয়া নিষিদ্ধ, বোরখা পরা বাধ্যতামূলক এবং মসজিদের বিচার শুরু করার। মাদ্রাসা খুলবার এবং রাষ্ট্রকে কম্যুনিস্টদের হাত থেকে ছাড়িয়ে ইসলামিক রাষ্ট্র করার পরিকল্পনা করে। ফলে ২০০৪ সালে মার্চ্চ মাসে তাসখন্দের এক পুলিশ ফাঁড়ির সামনে বম্ব বিস্ফোরণ, যাতে ছয়জন পুলিশ অফিসার মারা যায়। কামালভ এ সব জানে নিশ্চয় কিন্তু রোজা জানেনা। কারণ কি? কামালভ কি প্রাক্টিসিং মুসলিম নয়? নাকি ধর্মীয় সন্ত্রাস এখনও সূদুর বিচ্ছিন্ন ঘটনা? অথবা জনগনের জীবনযাপন থেকে কয়েক দশকের কম্যুনিস্ট প্রভাব মুছে ফেলতে পারেনি মৌলবাদীরা?
কামালভের মত মধ্যবিত্ত উজবেকি মাসান্তে যদি আড়াই লাখ সুম (পাঁচ হাজার টাকার মত) রোজগার করতে পারে তাহলে তাদের মোটামুটি মোটা ভাত কাপড়ের সংস্থান হয়ে যায়। কামালভ আর তার গিন্নী গোটা মাস প্রানান্তকর ছুটোছুটি করে। কামালভ স্কুলে পড়ায়, গাইডগিরি করে আর তার গিন্নী হাসপাতালে ফুরনের আয়া বা দরজির এসিস্টেন্ট, তাতে মেরেকেটে দু’জনে প্রতিমাসে মোট দু লাখ সুমের কাছাকাছি পৌছতে পারে।
কম্যুনিস্ট কাল থেকে ৭ থেকে ১৬ বছরের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা আবশ্যিক এবং অবৈতনিক। বইখাতাপত্র কেনারও কোনও বালাই নেই, খরচ সরকার জোগাবে। তাই কামালভের সবেধন নিলিমনি একমাত্র ছানার পেছনে পড়াশনার ব্যয় শূণ্য। যদিও স্কুল ‘ড্রপ আঊট’ ইদানীং দেখা দিচ্ছে, যা সোভিয়েত কালে একেবারেই ছিলনা। অন্যদিকে হীনবল ইনকাম ট্যাক্স এখন শনৈঃ শনৈঃ গলার ফাঁস, কম করে এগার পার্সেন্ট। কামালভের ডাইনে আনতে বায়ে কুলোয়না। তাই বাকি পঞ্চাশ হাজার সুমের খামতি মেটাতে কামালভের পিতৃ ভজনা।
আমরা উজবেক-তাজিক এক গ্রাম্য বর্ডারে এসে পৌছাতে, কামালভ আমাদের বর্ডারের ওপাশে চালান করে দিয়েই উর্ধশ্বাসে ছুটল গ্রামের বাড়ির দিকে। গ্রামের বাড়ীতে তখন ওৎ পেতে বসে আছে আরও তিন ভাই। পিতার জমিতে তুলো চাষে কিম্বা গৃহপালিত পশুকূলের দেখাশোনা সময়ে সময়ে না করলে কামালভের ভয় – বাবা গত হলে তার কপালে ঢু ঢু।
ওপারে এসে আমরা পড়লাম খুরশীদের হাতে। তরুন বয়স, সবে উনিশ কি কুড়ি। কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ‘আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক’ নিয়ে পড়াশুনো করছে। এখন ইদের ছুটি তাই এই গাইডের কাজে। সির দরিয়ার পার ধরে খুজন্দ শহরে যখন ঢুকি ঢুকি তখন লেনিনের মাথা দেখা গেল। নদীর পারে লেনিন দাঁড়িয়ে। বিশাল মূর্তি। শহরের যে কোনও প্রান্ত থেকে তিনি দৃশ্যমান। আপাতত মাথা উঁচু থাকলেও এই শহরে আগেই নাম খুইয়েছেন মানও যায় যায়। সোভিয়েত কালে শহরের নাম তাঁর নামেই ছিল ‘লেনিনাবাদ’ এখন তা সাবেক খুজন্দ। আর এই মূর্তিও সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে প্রশাসন। বহুদিন আগেই তা ঘটত কিন্তু শহরের মানুষদের প্রতিবাদে এখনও তা করা যায়নি। তাদের মতে তাজিক জাতির জন্য অনেক কিছু করেছেন লেনিন, তাই তিনি এখানেই থাকুন। কয়দিন এই প্রতিবাদ ধোপে টেঁকে খুরশীদের তাতে ঘোরতর সন্দেহ। কারন তাঁর মত অল্পবয়েসীরা চায় যথাযথ মর্যাদায় সরে যান লেনিন। দূরে জনারণ্যের বাইরে। কথা আছে লেনিনের জায়গায় থিতু হবেন ইসমাইল সোমনি। তিনিও ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছেন। তৈমুরের মত ইতিহাস নিন্দিত না হলেও তাঁর থেকেও প্রাচীন। দশম শতাব্দির গোড়ায় তিনি ছিলেন বুখারার আমির। এখন ‘স্বাধীন’ তাজিকিস্থানে জনকতুল্য।
কিন্তু লেনিন মূর্তির গায়ে ভাড়া বাঁধা কেন? লেনিন অপসারনের প্রস্তুতি কিনা জানতে চাইলে খুরশীদ বলল- ‘ঠিক উলটো। ‘রিপেয়ার মেইন্টেনান্স’ চলছে। সময়ের সাথে সংস্কার জরুরী। আগের যা কিছু সবই তো আমরা সংস্কার করে নিয়েছি। যা ভালো তা রেখেছি আর যা মন্দ তা ফেলে দিয়েছি। শিশুপাঠ্য থেকে শুরু করে সবেতেই আগে থাকতো রুশী বন্দনা এখন তা পাবেন না। তবে লেনিন রয়েছেন। তাঁর জীবনী আমাদের স্কুল পাঠ্য।‘
রাতে খাওয়া দাওয়া স্থানীয় এক অধ্যাপকের সন্মানে খুজন্দের এক রেস্তোরায়। ভোজন পর্ব শেষে রেস্তোরার সামনে আমার অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন। জটলার বাইরে পথের উপর দাঁড়িয়ে আছি একা। মধ্যরাত্রি নিঝুম রাস্তা। মহালয়ার দেরী নেই। একফালি ক্ষীন চাঁদ আকাশে। হঠাৎই মাটি ফুড়ে এক মাঝবয়েসী রমনী, তাঁর দুহাত পিছনে দাড়িঁয়ে এক তন্বী। প্রায় কানে কানে সরাসরি ফিস ফিস - তন্বীর সাথে রাত্রিবাসের প্রস্তাব। আমি বিমূঢ় বিষ্ময়ে হতবাক। ঘোর কাটতে অধ্যাপক যা বললেন - বিশ্ববাজারের বর্জ্য নেমেছে তাজিকিস্তানে।
কিন্তু রূদাবের দেখা পেলাম খোরগের মিঊজিয়ামে।



মিউজিয়ামের কিউরেটর একজন মাথায় স্কার্ফ তাজিকি পোষাক পরিহিতা প্রৌঢ়া মহিলা। মৃদুভাষিনী, এমনই মৃদু যে তাঁর ভাষ্য ও ভাষা উদ্ধারে আমরা তো দূরস্থান, আমাদের সঙ্গী মামাজোনভকেও কান পাততে হয়। অবস্থা যখন দূরাবস্তা, সেই সময়ে এক সুন্দরী তন্বী অনর্গল ইংরাজী নিয়ে উপস্থিত হলেন। কিউরেটরের কন্যা, চিনের উইঘুর অঞ্চলের শহর কাসগরের এক স্কুলে ইংরাজী পড়ান। চিনের সাথে তাঁর দেশের ‘মৈত্রী চুক্তি’ (Friendship and Co-operation Treaty) -র কল্যানে কাজ পেয়েছে, নাম রুদাবে। রুদাবের এখন ছুটি, মিউজিয়াম সংলগ্ন কোয়ার্টার থেকে মাতৃউদ্ধারে ছুটে এসেছে। আমাদের মিউজিয়াম দর্শন মসৃন হলো।
কথায় কথায় রুদাবে জানালো সোভিয়েত কাল তার স্মরণ নেই। নেহাৎ শিশু সেই সময়। সে স্বাধীনতার পক্ষে একশোভাগ হলেও রাশিয়ানদের প্রতি তত অকরুন নয়। সোভিয়েত সরকার সাধারন মানুষদের জন্য অনেক কাজ করে গেছে। রূদাবের কথায় অবশ্য সায় দেয়নি মামাজোনভ। মামজোনভ বেশ জাঁক করে জানিয়েছিল তাঁর জন্ম সোভিয়েত কালে। কিন্তু বড় হয়েছে স্বাধীন তাজিকিস্তানে। সে রুশী-টুসিদের শাসন চায়না। সে চায় খোলা বাজারের ব্যাবসা। টাকা জমিয়ে সে দুসানবেতে কম্প্যুটার পার্টসের দোকান খুলবে। স্বপ্ন দেখে দুসানবে কম্পুটার বাজারের বাদশা হবে সে। ‘পরমুখাপেক্ষী’ জীবন তাঁর একেবারে পছন্দ নয়। এব্যাপারে মামাজোনভের সাথে রূদাবের পার্থক্য হলো - তাজিকিস্থানের ইতিহাসে সোভিয়েত কালের ইতিহাস মর্য্যাদার সাথে স্মরণ করা হোক সে শুধু তাই চায়। তা ছাড়া রূদাবের মনে মৌলবাদের ক্রমশ উত্থানের ভয়। সরকারের আতাঁত ও গড়িমসিতে তাঁর সন্দেহ। মহিলাদের পোষাক পরিচ্ছদের প্রতি মৌলবাদীর ফতোয়া, নারী শিক্ষার প্রতি কট্টরপন্থীদের অনীহা প্রকাশ রুদাবেকে একজন নারী হিসেবে শঙ্কিত করে তুলছে। মুখে স্পষ্ট করে না বললেও তাঁর আশঙ্কা - সোভিয়েত কালে মহিলাদের যে স্বাধীনতা ছিল এই স্বাধীন দেশে ততোটাই বজায় থাকবে তো? রুদাবে তা জানেনা। সেই মিউজিয়ামে লেনিনের কোনও ছবি ছিলনা।



বুলুনকুলের প্রাইমারি স্কুলের দিদিমনি ছিলেন আরও অকপট। বুলুনকুল পামির মালভূমির মাঝে হ্রদের পারে এক ছোট্ট গ্রাম। মেরেকেটে হাজারখানেক মানুষ বাস করেন হয়তো এই গ্রামে। সেখানে একটি প্রাইমারি স্কুল আছে। সেপ্টেম্বরের সকালে স্কুল চলছে। কৌতূহলবশতঃ উকি দিতে দেখি মাঝবয়েসী দিদিমনি গোটা দশেক শিশুকে পড়াচ্ছেন। বেঞ্চ, ব্লাকবোর্ড, খেলনা, দেওয়ালে আটকানো ছোটদের আঁকা রঙীন ছবি সবই আছে। যেমন দেখা যায় আমাদের নার্সারী স্কুলে। দিদিমনির নাম দিলওয়ারা। সেই দিলওয়ারা দিদিমনি ফুটিফাটা ইংরেজীতে জানালেন তাজিকিস্তানে স্কুল ত্রিস্তরে। প্রাইমারী, মিডল আর জেনারেল সেকেন্ডারী। এখানে স্কুলটি প্রাইমারী। সাত থেকে এগারো বছরের শিশুদের জন্য। এই ধূ ধূ মালভূমিতে পড়া শেষ করে তারা যাবে খোরগে। সোভিয়েত কালে রাষ্ট্রই বেছে বুছে ছাত্রদের নিয়ে যেত খোরগে। এখন তা নেই বাবা-মায়েরাই নিজের খরচে পাঠান তবে পড়াশোনার খরচ লাগেনা। সোভিয়েত কালেও লাগতনা। লেখাপড়াটা তেমন পাল্টায়নি একই রকম আছে শুধু ইতিহাসে আর তেমন রুশীরা নেই। অবশ্য লেনিন আছেন, তেরেস্কোভা, গ্যাগারিনও আছেন।
- ভালোই তো ‘স্বাধীন’ দেশের ‘স্বাধীন’ মানুষ আপনারা।
দিদিমনি একগাল হেসে বললেন – তা ঠিক। তবে ১৯২৬-এ এদেশের শিক্ষিতের হার ছিল চার পার্সেন্ট। এখন শিক্ষিতের হার আটানব্বই। এই রকম প্রত্যন্ত জায়গাগুলিতে সোভিয়েত সরকার যখন স্কুল করতে যায়, তখন তা সহ্য হয়নি মৌলবাদীদের, অনেক স্কুল জ্বালিয়ে দেয়। অনেক শিক্ষককে মেরেও ফেলে। তবু সরকার স্কুল করে। মানুষ লেখাপড়া শেখে। বিশেষ করে মেয়েরা। শাসন চলে গেলেও কি এতদিনের নিয়মকানুন- মতবাদ- বিশ্বাস চলে যাবে? রাষ্ট্রের ব্যাবস্থাপনার ভাল মন্দে মিশে আছে সোভিয়েত কাল, ‘রাব’ করলেও তা যাবেনা।‘
আমার ভ্রমন পথে লেনিন দাঁড়িয়ে ছিলেন মাঝ পামিরে মুরগাব শহরের মাঝখানে, কিরঘিজস্তানের ওশ শহরের প্রশাসনিক বিল্ডিং কিম্বা খুরশিদের পড়াশোনার শহর বিশকেকে প্রেসিডেন্টের দপ্তরের সামনে। প্রাক্তন সোভিয়েত দেশ গুলিতে এমন আনাচে কানাচে লেনিন রয়েছেন, শুধু ইতিহাস অধ্যাপকের কামরায় আবক্ষ মূর্তি হয়ে কিম্বা তাসখন্দের ভবঘুরের গেঞ্জিতেই নয় তাদের জীবনযাপনে, তাদের বিশ্বাসে।
মনে আছে আফগানিস্তানের উত্তরে হয়রতন শহরে আমুদরিয়া নদীর মাঝি মাহমুদ গভীর প্রত্যয়ে আমায় ভরোসা দিয়েছিল - মাজার-এ-শরিফ হয়ে কাবুল চারশো কিমি রাস্তা পাঁচ ঘণ্টায় পৌছে যাবেন। কম্যুনিস্টদের বানানো রাস্তা তো কোথাও কোনও হোচঁট পাবেননা।
বিশ্বজোরা হোচট মুক্তির সন্ধান কি দিয়েছিল মাহমুদ? অজান্তেই।
-------