আলো ক্রমে আসিতেছে?

তমাল রায়

নীচের কলিং বেল বাজলে পাখী ডাকে অনেক। সে কান খাড়া করে পাখীর ডাক শুনতে চাইল। না,তারাও চুপ। কত দিন,তারাও ডাকে না। ফোন বাজছে। এই শেষ রাতে ফোন? আর তো কারো দরকার নাই তাকে,আছে? বাজুক। তার আর প্রয়োজন নেই কিছুতেই। কিচ্ছুটি আর জরুরী নয়। আজ সানডে। আজতো...বেলুন গুলো ফোলাতে গিয়ে খানিক চুপ করে বসে রইল। আলো ফোটেনি এখনও। আলো কি ফুটবে?

ধর সেটা শীতের সকাল। আড়মোড়া ভাঙছে শহর। লেকের ধারে শুরু হয়ে গেছে প্রাত:ভ্রমণ। এফ এমে বিসমিল্লার সানাই। প্রথম ট্রেন গেছিল চলে,যখন অন্ধকার। আলো ফোটার পর এই প্রথম,মাছ বয়ে নিয়ে যাবার হাঁড়ি,পালং শাকের আঁটি,ঘুম চোখ কচলানো লাল চোখ,কিছু অস্পষ্টতা,আর কুয়াশায় ভেজা প্রভাতী সংবাদে আলো আসিতেছে। আলো আসিতেছে?

বারান্দার যে পাশে অমলদের ফ্ল্যাট উঠে গেছে,পনেরো তলা,ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে রাধাচূড়া। দু একটা হলুদ ফুল আসছে এবার। নাম না জানা কি একটা পাখী বসে সেখানে। অনেকক্ষণ ধরে ডেকেই চলেছে। প্রথমটা সে ভেবেছিল বুঝি,রাস্তার জমাদার হুইসল বাজাচ্ছে। তেমন কিছু নেই যে ফেলবে। ফাঁকা ফ্ল্যাট,একা মানুষ,কি আর তেমন খাওয়া দাওয়া। ফলে সে তাড়াহুড়োয় নেই। তবু বারান্দায়। একবার উঁকি মেরে দেখা। নিছক কৌতুহলেই,না কই জমাদার নয়। চোখ ঘুরতে ঘুরতে স্থির হল। এবার দেখা পেল পাখীটার। তাহলে ইনিই সেই জমাদার। বেশ তো! মুখে হাসি এলো। মিলালো ও।

হাসি,হাসিরা তাকে ছেড়ে গেছে প্রায় বছর তিন। তারপর থেকে রান্নার মাসী মানদার মত সেও গম্ভীর। সেই যখন আলো ছিল অনেক,সে ভালো ছিল কিনা জানে না,তবে বেঁচে থাকা এক জরুরী কাজ বলে সেও মনে করত। তারপর ঠিক কিসে কি হয়েছিল সে আজও বোঝেনি। আলো চলে গেল। সাথে কুর্চিও। আলো মানে আলোকপর্ণা,আর কুর্চি মানে সেই ছোট্টো ঝর্ণাটা। যার খিল খিল হাসিতে ভরে থাকত এই প্রায় সত্তর বছরের পুরনো বাড়িটা। সে তো তেমন কেউ ছিল না,যাতে দেশ,সমাজ,সভ্যতা তাকে আলাদা করে মনে রাখবে। সে জানত,ঝর্ণা যখন নদী হবে পূর্ণাঙ্গ,হয়ত তাকেও মনে পড়বে,যেভাবে তার মনে পড়ত অসুস্থ,চিররুগ্ন তার বাপ অনিন্দ্যসুন্দর কে। হাসিদের সেই শেষ এবাড়ী ছেড়ে যাওয়া,সেটা বোধ হয় বিজয়া দশমীই ছিল। বিসর্জন হয়ে গেল চিরকালীন সুখের। সুখ তেমন ছিল কিনা তার অবশ্য তেমন মনে পড়ে না। তবে আলো যখন মাছের মুড়ো চিবোত রাত এগারোটার ডাইনিং -এ বসে,একটু দুধ তো উথলোতই বুকের মাঝে। আর বুকের মধ্যে মাথা রেখে কুর্চি বলছে,আর একটা ভুতের গল্প বল না বাপি,বুকের মধ্যে লেগে থাকতো শিমুল তুলোর উষ্ণতা। যা কি করে যেন বাস্প থেকে জল। কি জানি কেন...আজ বুকের কাছটায় স্পর্শ করল সে আবার,না শিমুল কেন কাপাস তুলোও নেই।

রজনী সেন রোডে সকাল গুলো আর সন্ধ্যের তেমন কোনো ফারাক সে বোঝেনি কখনোই। একটু দূরে থাকতেন সেই ১৯১১র শিল্ড জয়ী দলের হাবুল বাবু। আর ওপারে উস্তাদ আলাউদ্দিন নাকি এসে কিছুদিন ছিলেন। এছাড়া এপাড়ায় টোডি, মেহতা, অগ্রবালরা সাথে দু একটা দাশগুপ্ত, সেনগুপ্ত, মিত্তির। তারা ছিল নিতান্তই অবাঞ্ছিত। প্যারাম্বুলেটর থেকে মহাপ্রস্থানের পথের কাঁচের গাড়ি,এ পাড়ায় জন্ম এবং মৃত্যু সবই নি:শব্দে...ব্যাংকে কি যেন দরকার ছিল সেরে বাড়ি ফিরেছিল প্রায় দুটো। আজ আর খিদে নেই। অনেকদিনই নেই। বাঁচার জন্য খাওয়া। খাওয়ার জন্য তো বাঁচা নয়। বাসন গুলো সাজিয়ে রাখলো ঠিক ঠাক। বেড়াল ঢুকেছিল,ফেলে দিয়ে গেছিল একটু আগেই। কেন যে এ বাড়িতে এখনও বেড়াল ঢোকে কে জানে, লোভের কোনো সামগ্রী তো আর নেই এখানে। মানদা মাসীর এই এক দোষ কিছুতেই সঠিক জিনিশটা সঠিক জায়গায় রাখবে না। জলের ঢাকা খুলে গেছে। বন্ধ করল। দরজায় ছিটকিনি দিল। আবার খুললো,জানলা বন্ধ করা হয়নি। ধুলো ঢোকে যদি। এবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করল,তাও কি আসে? কেউ দরজায় খিল দিয়ে এলো। রাধাচূড়া নিশ্চিত আগের মতই। যেমন দুপুরের আলো মেখেছিল,সেভাবেই। বিছানার চাদরটা গুটিয়ে গেছিল। সেটা টান টান করে দিলো। বালিশগুলো কে পাশা পাশি সাজানোর সময়,সে ঘ্রাণ নিলো একবার। তিন বছর আগের কিছু গন্ধ কি তখনো লেগে আছে? কিছু আলগা ধূলো,প্রাসঙ্গিক নাকে এসে ঢুকলো। আজ ওদের আসার কথা ছিলো। এর আগেও ছিলো,যেমন ছিল এর আগের সতেরোটা সানডেতেও। আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, বাবাকে মাসে দুবার দেখাতে হবে কুর্চিকে। কুর্চির জন্য কেনা বেলুন গুলোর হাওয়া কমে এসেছে। যেমন হয় আর কি। ক্যাডবেরির সংখ্যা বেড়েছে। ড্রয়িং খাতা,কালার পেন্সিল,আর পাঁচ পাঁচটা বার্বি ডল ও তার বাপির মতই অপেক্ষা করতে করতে…
দুপুর এখন বিকেলের দিকে। আলো বদলে যায়,এ সময়। কেমন মন খারাপের আলো মেখে পড়ে থাকে বারান্দাটা। এখানেই কুর্চি খেলত। রেলিং গুলো মুখ ভেংচাচ্ছে তার দিকে তাকিয়ে। সে তেমন কেউ কখনোই ছিল না। সে জানত সে কথা। এ সময়ে জ্বলে ওঠে আলো,বাইরের।ঘরের? ঘর কথাটা মনে হতেই তার বুকটা চিন চিন করে উঠলো। জল তেষ্টা পেল। খেল না। নীচের কলিং বেল বাজলে পাখী ডাকে অনেক। সে কান খাড়া করে পাখীর ডাক শুনতে চাইল। না,তারাও চুপ। কত দিন,তারাও ডাকে না। ফোন বাজছে। বাজুক। তার আর প্রয়োজন নেই কিছুতেই। কিচ্ছুটি আর জরুরী নয়। ট্যাবলেটগুলো বার করে রাখলো টেবিলের ওপর। জল ভরা গ্লাসে কি একটা পোকা পড়েছে,পড়ুক। বাইরে সন্ধ্যে নামছে,ভেতরে আঁধার। আজ আর আলো জ্বালার দরকার নেই। দরকার গুলো কমে আসে ক্রমশ। বেলুন গুলো আঁকড়ে ধরে সে শুলো।
আর কিছু পর ওই বেলুন ধরেই সে ওপরে উঠবে। অনেক ওপরে। যেখান থেকে কুর্চিকে দেখা যায়। আলো ক্রমে আসিতেছে?