ক্যান্সার রুগীর আত্মীয়রা

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

আজ সারাদিন

আজ সারাদিন তোকে খ্যাপাব
তোর ডাকনাম কেন টুম্পা
কেন ফুলটুসি, বা মিমি নয়
আজ সারাদিন শুধু ঘুম পাক

আজ সারাদিন শুধু পেচ্ছাপ
শুঁকে মরে পড়ে থাকা খলিফা
দেখে এগাছে ওগাছে কেচ্ছা
খোঁটে কাকেদের সাথে পড়শি

আজ সারাদিন শুধু মারপিট
তুম বেওয়াফা, তুম পর হো
পারদে মাপা যায় সব, কাটাদাগ
আজ সারাদিন শুধু জ্বর হোক

আজ সারাদিন শুধু লিপ্সা
যারা স্বমেহনে থাকে, হিংসে,
ভাবি কোন বুকে আগে টিপছাপ
আর কোনদিকে আগে বিচ্ছেদ

আজ সারাদিন শুধু প্রতিশোধ
যেন বিতে হুয়ে দিন সুভেন্যের
আমি উপড়ে ফেলব তুলসী
তুই ফিরে এসো চাকা ওভেনে

আজ সারাদিন মনে পাপ নেই
আর ব্যবধানে বাড়ে সন্তান
তুই পরিচিতা, মেরে আপনে
এর বেশী কিছু আজ থাক না!

আজ সারাদিন দালি, পিকাসো
দেখি গলে গলে পড়া অক্ষর
তবু সামলাব ঘর ঘরোয়ালি
আজ সারাদিন শুধু যক্ষ

আজ তুই আমি আর সারাদিন
খোলা ছাদে খোলা চাঁদোয়ায়
তোর শীৎকারে আমি সাড়া দিই
আজ তুই আমি, আজ সারাদিন ...


ক্যান্সার রুগীর আত্মীয়রা

পাশের ঘরে ঘুমন্ত মানুষের মতো জীবন
থমকে আছে।
একটা মেয়ে বাঁশী কিনবে বলে রথের মেলা থেকে
ফেরেনি।
একদল জিপসি ভূত তাদের রঙিন
প্রেতগর্ব নিয়ে
এই সীমান্ত থেকে ওই সীমান্তে
বেশ তো স্বচ্ছন্দ।
ঘরে এক বিরাট পোকা ঢুকে সমস্ত
আলো নিভিয়ে দিতে বাধ্য করে আমায়,
লেখা হয় না।

একটা পর্দা আরেকটা পর্দার থেকে ছিটকে সরে গেলে
জানলা বড় হয়ে আসে আমার ঘরের।
দেখি, অদ্ভুত ছোট এক মানুষ
ক্রমাগত বৃষ্টির ভেতর বাতিল প্লাস্টিক খুঁজতে খুঁজতে
হঠাৎ আমার দিকে তাকান।
একটা কাটা গুঁড়ি তার যাবতীয় না বলা
বাড়াতে না পেরে
হারাকিরির অপেক্ষায় বসে থাকে।
সেই বিরাট পোকাটা বাকী রাতটুকু
এসব কিছুই লিখতে বারণ করে আমায়।

বুকের ধকপকানি শুনব বলে বড় বেশী
নিকটে এলে
এক নারী আমায় রেপিস্ট বলে সজোরে হেসেছে।
চাঁদ থেকে হলুদ আলো – ক্রমশ পীততাপ
এক নিরাপদ জ্বরে
আমার সারা গায়ে মায়াবী যন্ত্রণা।
যে তোমায় কিছুই বলেনি এতকাল
সে হঠাৎ সবকিছু বলবে বলে আসতেই
আমি কানে বিষ ঢেলে বলেছি যাও।

সকালের দিকে পোকাটার শান্ত শরীর দেখে হেসেছি
জানি, ও উঠে বসবে আবার
আমি অফিসফেরত একজন মিস্ত্রি ডেকে বলব
ভায়া, যাওয়া আসার মাঝের বড় দরজাটা, দ্যাখো তো
ঠিকমতো বন্ধ করতে পারো কিনা ...


উট

একটা ঠাণ্ডা অন্ধকার ঘরে
তোমার সঙ্গে কয়েকটা পোকাও
নড়েচড়ে ওঠে।

সিলিং থেকে খসে পড়ে একটা মরা বাদুড়
তোমার বিছানায়।

একটা অজানা সাপ শুয়ে থাকে খাটের তলায় –
পায়া বেয়ে আজ তোমার পুরুষাঙ্গের বড় কাছাকাছি।
তোমার মতো সেও জানেনা, তার
নিজস্ব বিষ, কতটুকু।

দেয়ালগুলোকে বিশ্বাস করতে পারছনা –
হাসপাতালের মতো সাদা একটা ঘরে
একটা ছবি বারবার হেলে যাচ্ছে –
ছবিটায় খাদ থেকে খসে পড়ছে একটা গাড়ি,
গাড়ি থেকে দুটো হাত, আর হাত থেকে খসতে খসতে
দুটো আঙ্গুল ক্রমশ তোমার গলার দিকে
আসতে দেখছ তুমি, ভোরের স্বপ্নে।

একটু বেশী রাতে, এক মদ্যপ
রোজ তোমার দরজায় লাথি মারতে মারতে
কাঁদছে – একদিন তুমি আর খিল খুঁজে পাচ্ছনা
শুতে যাওয়ার সময়।

এক ফর্সা, দীর্ঘাঙ্গী রুমালে ডুবিয়ে
এক সাদা বিস্বাদ তরল
তোমায় খাইয়ে দিচ্ছে
তুমি জানো, এ ওষুধে তোমার অসুখ সহজে সারবে না,
তবু।

ঘুমের ঘোরে তোমার হাতে লেগে
পড়ে যাচ্ছে একটা কালো সিরাপের শিশি –
মরা বেড়ালছানা ভেবে তোমার নতুন কেনা জুতোজোড়া
টুকরো ক’রে ফেরত দিচ্ছে পড়শির কুকুর –
তোমার দেহমন কাচ মাড়িয়ে মাড়িয়ে
আজ স্বচ্ছ।

একটা কাঁটাগাছ মুখের একদিক ছিঁড়ে দিয়ে গেছে
অন্যদিকটা বাঁচাতে কতকাল জানলা খোলোনি তুমি।

কতকাল মরা ভুসি, নরকঙ্কাল, আর গর্ভনিরোধক
ঝাঁটিয়ে বারান্দায় জড়ো করেছ, ওখানে
হাঁটা যায়না আর।

আজ যদি চুল শুকোতে গিয়ে
মরুভূমি ভেবে তোমাকেই জড়িয়ে ধরে
পাশের বাড়ির আবছা মেয়েটি,
ভেবেছ, ওইটুকু জলে কতদিন চলবে দুজনের?