স্বপ্ন ও স্ন্যাপশট

অস্মিতা রায়


আদ্রা, পুরুলিয়াঃ...

স্বপ্ন আমাকে পিছনের দিকে টানে।আমি যত এগোতে যাই স্বপ্ন আমাকে টেনে নিয়ে যায় পিছনের দিকে।কখনও কখনও আবার আবার সামনেও টানে। একেবারে সামনে। যা একেবারে হয়ে ওঠেনি তার কাছে। খাদের কিনারে।স্বপ্ন আমাকে দিয়ে নানা কথা বলিয়ে নেয়,দেখিয়ে নেয় নানা অচেনা।চেনা মানুষের পথ ধরে অচেনার রাস্তায় নিয়ে যায়।আর আমি নির্বাক তাঁর পিছু পিছু চলি।
স্বপ্ন যতদূর নিয়ে গেলে চেনা রাস্তাঘাট হারিয়ে ফেলা যায় তারও অনেক পরে পৌঁছে গেছি সেদিন।শুরুতে যেমন হয় অন্ধকার থাকে চারপাশ।গলি দিয়ে ট্রেন যায়।কি যায় সেই ট্রেনে?সেই যেবার ফিরছিলাম উত্তর থেকে পানবরজের পাশ দিয়ে..যখন কুয়াশামাখা ভোরে ট্রেন দাঁড়ালো, ট্রেন থেকে নেমে এলো চায়ে গরম,নেমে এলো সারারাতের মনকেমন।এসে দাঁড়ালো গলসি আর পারাজের মাঝে এক কালচে নীল হয়ে আসা এক বিষণ্ণ ভোরের সামনে।এইভাবে ট্রেন চলে আর দাঁড়ায়।একে একে নেমে যায় সব্জির পসরা ও প্রথম কলমিগন্ধ...তারপর সবুজ পতাকা নাড়তে নাড়তে চারটের ট্রেন।আমি স্বপ্নের থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকি ওভারব্রিজের নিচে।স্বপ্ন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সেইসব পোলের আলোর নীচে,যেখানে শুয়ে ছিল আমাদের প্রথম সংসার।
ইদানীং আমি জেগে জেগেও স্বপ্ন দেখি।ডিপার্টমেন্টের তালা বন্ধ করতে করতে আমি আর সৈকত নানান গল্প করি।হঠাৎ আমার সব বলা বন্ধ করে দেয় স্বপ্ন।অথবা স্ন্যাপশট।সেই সাদা টাইলসের ঘর পার করে আলো-আঁধারির তালা চাবি লাফ দিয়ে যায় আমার চোখে।সৈকতের কথা আমার কান পার হয়ে কখন যে নেমে চলে যায় টের পাইনা।ফিরে আসি স্বপ্ন আমায় অন্য স্বপ্নে টানার আগেই।আবার যেমন গাড়ী চালাতে চালাতে মনে পড়ে যায় মনসা মেলার ভিড় আর আমাদের বৃষ্টিছুট। অথবা বিশাল ছাদের ভাঙ্গা কার্নিশ,ভাঙ্গা টবের পাশ বেয়ে নামা জলের দাগ...সামনের বাইকওয়ালা ভয়ার্ত চোখে জরিপ করতে করতে পার হলে
সামলে নিই আবারও।
রাত গাঢ় হলে গড়বেতার সব্জির পসরা নামানো মাসি মনে পড়ে।তারপর স্বপ্ন টেনে আনলে দেখি আমরা কোথায় চলেছি,কোথায় চলেছি এবং কোথায় চলেছি... সঙ্গে অনির্বান আরও দুই কে কে।দেখা যায় না।ট্রেন একজায়গায় দাঁড়াবার পর আমরা নেমে পড়ি।সঙ্গের কেউ বলে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের ভিতর দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি পৌঁছবো।কোথায় পৌঁছবো বলছে না কেউই।মরা সুড়ঙ্গ পার করলে আবার না দেখা কিন্তু স্বপ্নে বহুবার দেখা এক স্টেশন দেখি।তার এক প্ল্যাটফর্মে লোকজন এবং লোকজন।আমরা লাইনে নেমে পড়লে অন্য ট্রেনের লেজ ধরতে পারি।কিন্তু জানা যায় এ ট্রেন যাবে না।কোথায় যাবে না জানিনা।নেমে পড়ি জনশুন্য প্লাটফর্মে।একা একা শুয়ে থাকা বেঞ্চের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঢাল বেয়ে নেমে আসি।কাঁচা রাস্তার পাশে অজস্র মহুয়া ফল।গুঁড়ো গুঁড়ো ছড়িয়ে গেছে পতাকা ওড়া চালা বাড়িটির পায়ের তলা থেকে গড়ান অব্দি।তারপর শত খুঁজে এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।ল্যান্ডিং পার করলে দেখি ওপরে ওঠার রাস্তা আটকে রাখা বাঁশ আর সাইকেলের টায়ারে।পাশ কেটে উঠে পড়ি।স্টেশনের বদলে এসে পড়ি এক টানা বারান্দায়।নীল নীল গ্রিলে পর্দা ওড়ে।কচি একটি ছেলে একটি দরজা গ্রিল বেয়ে উঠে গেছে ওপরে।সাদা দেওয়ালে সে বড় বড় চোখ আঁকে।তার মা বলে ‘দিদি নেই,দিদি নেই।’ ছেলেটি হাহা হাসে আর বলে ‘ওই দেখো আমি দেখছি চোখ বেয়ে জল,আর জল বেয়ে দিদি।এবার দিদি নেমে আসবে গ্রিল বেয়ে।’ আমি স্বপ্নে দাঁড়িয়ে পড়ি স্থানু।এপাশে ওপাশে চাইলে পর্দারা ওড়ে আর হলুদ টেবিল গোলাপি সূঁচের কাজ করা টেবিলক্লথের ওপর লুচি আলুর তরকারীর ধোঁয়া ওড়ে।কাঁপন শুরু হওয়ার আগেই ট্রেনের কথা মনে পড়ে যায়।তাই কোনমতে এবং কিভাবে যেন প্ল্যাটফর্মে পৌছই।ট্রেন ছাড়েনি আশ্বাসে এগোতেই ট্রেন পতাকা নেড়ে বেরিয়ে গেলো।আমরা দেখলাম।তারপর কলোনির মাঠে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অথবা ফ্লাওয়ার শো দেখতে গেলে স্বপ্নেও স্ন্যাপশট আসে।আসে সাইকেল হাতে লম্বা বিনুনি একটি মেয়ের কত প্রশ্ন।আসে মুদির দোকানের আটা ডাল পার করে এক বুক জল।আমরা এগিয়ে যাওয়ার আগেই স্ন্যাপশট উড়ে যায় ও সাদা জামার ছেলেটি ছয় মারে।