আমরাও একদিন

মোসাব্বির আহে আলী


আমরাও একদিন


আমরাও একদিন খালের পাড়ে পাড়ে
বাক্স-প্যাটরা বগলে
রুদ্ধশ্বাস ছুটেছিলাম--ভাঙা চাঁদ ডুবছিল
মার্চের আকাশে

একদিন আমরাও গামছায় বেঁধেছিলাম লাল চিড়া-- সীমিত গুড়;
নাঙা শিশুর কোমরে
বাজছিল নিরাপত্তা ঘুঙুর--

সেদিন অগণিত বৃদ্ধের কুঁজো হাঁটছিল গোধূলির দিকে
শূন্য হাঁড়ির ভেতর ছিল ভুখা মানচিত্র
কাঁধে বাঁধা হয়েছিল অনিশ্চিত দেশ

আজ না হয় ওরা হেঁটে আসছে-- হেঁটে আসছে আমাদেরই মতো,
আমাদের স্মৃতির ভেতর।
একটি হিম ডিসেম্বরের দিকে
খালের পাড় দিয়ে
আজ ওরাও না হয় একটু আসুক



দৈব ও দূর্বাভ্রমণ ১৩

জলকচুর তরুণ লতিকায়
আটক শেওলার একটি নাতিদীর্ঘ বহর;
যেনবা একটা সগর্ব মিছিলে
লেগেছে অলস অতর্কিত টোকা
ফাঁকে ফাঁকে ক্বচিৎ -- নালাপাড় হতে
ঘাসের প্রক্ষিপ্ত দোলদোল প্রলোভনে
নিয়ে নিচ্ছে হালকা খুনসু্ঁটির সুখ

পাখির তিন চারটা লাগাতার
কিচিরমিচির করা সময়কাল শেষে
জলকচুর লতিকাটি শেওলাবহরকে
ছুটি দিলে
সামনের একটা গর্ভবতী মলিন পলিথিন
আলতো পাশ কাটিয়ে যায় --
নির্জন শাঁ শাঁ বাঁশঝাড়ের ঠান্ডা ছায়ার
আড়াল বেয়ে বেয়ে এগিয়ে যায়
শেওলার ধীর কাফেলাটি


জলের নামতা

গ্ল্যাসিয়ারে শুয়ে কবি পেঙ্গুইন
লিখছে বিষাদের স্ট্যানজা--
ভাঙছে চাঙর দূরে, সশব্দে।

সাদা পাতলা বরফে লেপ্টানো
তার প্রপিতামহের লাশ; অক্ষত
পাশে সিল মাছের শোক পড়ে আছে
স্থূল বিষাদের ঘোরে

কাঁদছে পোলারবিয়ার; খাবার নেই
অপচয়প্রায় লোমশ শরীর তার
চাইছে দৌড়; লোকালয় বরাবর --

তবে শোনো মানুষ--
মূলত তোমার কোন কবিতা নেই
থাকলেও তা কেবলই
জলে ভেসে যাবার

( দুনিয়ায় ফসিল ফুয়েল ফ্যাক্টরি আর একটিও না হোক)





দৈব ও দূর্বাভ্রমণ সিরিজ ৭

চন্দ্রকান্তা'র সাবিনা সলীলে মলিন তখন;
ধবধবে সাদা চিবুকে জেলের জাল লেপ্টে
যাওয়ায় আমি তখন অতি উৎসাহী এক ঈগল
ডিডি ন্যাশনাল খোঁজা বিষণ্ন মগ্ন পোকা।

ছনের ঘরের ভেতর বাকবাকুম ঠোঁটের
শাহিনা ভাবীর ঘোর; কচ্ছপসন্ধ্যাটে আজানে
বেকসুর খালাসে আছে অনুদ্ধারকৃত ফিসফাস-
খুব তাড়িয়ে নিতো আমায় দুমজাঙালের
খাড়ির দিকে;
আম্মা শুকনো পাতা গুজে দিতেন পাহালে
টগবগ আবাজে ভাতের ঘ্রাণ ছুটতো চতুর্মুখী
চাপিলা ভাজির পটপট মিউজিক
পেটের ভেতর নামাতো ক্ষুধার সাইরেন।

অথচ-- সামারে --মধ্যাপাড়ের ( মধুপাড়)
সতেরটি আমগাছে ঘুুঙ্গুর আসতো বাহারে--
ঘুড়িদের আত্মাহূতিতে
ফুটে ওঠতো সাটিন কাগজের উড়াল।

হেসে হেসে যত সান্ধ্য দৌড়ের হত অবসান
ততো আমার কান্নায় ভিজতো এ'শার আজান।


আম্মা

আম্মা ছিলেন হতাশ; মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো
ব্যর্থ, বিষন্ন ও ম্লান। ননদ ও ভাসুরের
কুটিল পুকুরে নিরীহ পুঁটি হিসেবে
গৌণ লেজ নাড়তেন তিনি
অথচ কুমিরের জন্য ছিল তার সমূহ সমীহ--
তিন হাত পথের উপর অংকিত ছিল
নোংরা ঝগড়া--আম্মার নম্রতা ও আনুগত্য
কেড়ে নিত নিষ্পেষণের সমস্ত মুদ্রা;
আম্মা কেঁদেছেন যুগব্যাপী ছ'টি সন্তান নিয়ে
বিকেলে, পুকুরের সিড়িতে, খড়ের বিছানায়।
পেতলের কুপির সলতে জানে কত
বিষাদের সন্ধ্যায় পুড়েছে কত কেরোসিন
তবুও আব্বা পনেরো দিন, মাস পরপর এসে মাসাধিক কাল গ্রামে থাকতেন।
আম্মা ঝগড়ার শুরু বললেই
আব্বা চাঁদ দেখতে পুকুরের ঢালে নেমে যেতেন
পুড়ে পুড়ে ধোঁয়া ওড়তো আম্মার বুক দিয়ে
আব্বা নিশ্চিন্তে গুনগুন করে গাইতেন--

তুমহারে নাজরো মেঁ হাম নে দেখা.....