গেরস্থালি সিরিজ ...

দেবারতি ঘোষ দস্তিদার

বিছানা
সমস্তটুকু ওমের ভেতর কিছু বিছনা পাতা আছে। চকোরের ছায়া দিয়ে ঘেরা নিবিড় এক জোছনাদুয়ারী – আমাদের পা টিপে টিপে পায়ে পা রাখতে হয়। পাছে, নষ্ট হয় অলঙ্করন। একটা সময়ে পালক ছাড়াতে ছাড়াতে বাধ্যতামূলক কিছু বায়ুথলি ছাড়া আর সেভাবে কিছু শিহরণ থাকে না। বাধ্য হয়ে গোপন একটা ওড়ার আয়োজন করতে হয়। আর ওরা যাতে সঙ্গম ভেবে না বসে, তাই, গুটিগয়েক ঘর বাহিরের পর একটা রোয়াক পেতে রাখি, জিরুব ব’লে, শুকনো খটখটে, ভিখিরির জিভের মতো নির্জলা। রাস্তা দিয়ে নির্বীজকরণের বিজ্ঞাপন। নিষ্ঠুর চন্দ্রাতপ। প্লাস্টিকের চাঁদ, তারাও খসতে খসতে এর ওর গায়ে এসে পড়ে। আদমের প্রথম লজ্জা ভেবে পরে নাও তুমি, আমি ইভের মতো আরেকটু এগিয়ে মাতৃতান্ত্রিক যা কিছু ভাবতে পারি, ভেবে নিই।

একসময় স্বপ্নটা ভেঙ্গে যায় আমাদের। তুমি দূরত্বের অভ্যেস থেকে বলবে, অফিস বেরলাম, তুমি, ঠিক আছ? আমি, বিছনা গোছাতে গোছাতে বলব, আছি তো, দেখছ না?

বারান্দা
এতবার ক’রে ডাকলাম, ঘুরে তাকালে না? ভালো লাগে না চলে যাওয়া খই শিকারীদের ভিড়ে পেছনে পেছনে বিলাপ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া তোমার এই আরোহণ। পাশ থেকে একটা ঘেয়ো কুকুর তোমায় দুতিনবার শুঁকল। এত দূর থেকেও ভয়ে আড়ষ্ট আমি। অথচ ...। আসলে প্রতিটি সত্যবাদীরই শেষমেশ পালানোর জন্য ব্যক্তিগত সারমেয়র প্রয়োজন হয়, যা নিজস্ব মুখগুলো চলে যেতে দেখলে আটকাতে বাধা দেয়। পরতে পরতে বুঝিয়ে দেয় – অমুক তোমার পরাজয়, ভুলে থাকো, তমুক তোমার ভুলভ্রান্তি, ফেলে আসো। মনে পড়ে, দক্ষিন দিকের বারান্দায় বসে চুল খুব ছোট ক’রে কাটা আমাকে? নগ্নিকা হলে সমাজ কী বলবে, তাই, কিছু দিতে হয়েছে গায়ে, তাও, আঁচলবিহীন। যাতে হাওয়ারা দুএকপশলা ঘুরেফিরে ওড়ানোর মতো পেলবতা না পেয়ে শেষমেশ ফিরে যায়। পড়শি বউটাকে হিড়হিড় ক’রে টেনে নিয়ে যাওয়া স্বামীটি কিম্বা কালকেই দুধবিস্কুট দেওয়া বেড়ালছানার আজ হঠাৎ বমোনেচ্ছা অথবা উত্তরদিকের শাটার দেওয়া জানলায় দু জোড়া আবছা হাত – বারান্দায় বসে আমি এইসব তারাদের কাঁপতে দেখি। শাড়ী নেমে গিয়ে রাস্তায় ঠেকে, গুটিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পাইনা। তবে, একটা বেলার পর বারান্দাগুলোকে গুটিয়ে আনতে হবে। গ্রিলগুলো ছোট করতে করতে মিজারিং টেপের মতো হাতের মুঠোয় উঠে আসবে। ছাদ ঠেকে যাবে মেঝেয়। আমি দক্ষিনখোলা জানলা থেকে ছুঁড়ে দেব সেই একফালি বারান্দা।

খাক, ঘেয়ো কুকুরগুলো কামড়ে ছিঁড়ে খাক। একঘর কাজ পড়ে আছে। উঠি।

ঘড়ি
ডায়ালটুকু পরিষ্কার। তবু, কাঁটা দুটো নেই। বা থাকলেও আগে পিছে কোথাও একটা। আমি দেখতে পাচ্ছিনা। বা, গলে গলে খসে গেছে আচমকা ভয় পেয়ে যাওয়া দেওয়ালি পোকাশিকারীর দেহাংশের মতো। একে সুররিয়াল ভেবো না। স্মৃতির স্থায়িত্ব নিয়ে আমি কোনোকালেই সেরকম আশাবাদী ছিলাম না। একেকদিন মাঝরাতে যখন শ্বাপদের সঙ্গমের চেয়েও বেশি কাঁদায় অনর্থক টিক টিক ..., আমি প্রতিটা দশ ঘরকে এক একটা ব্যক্তিগত কাউন্টডাউন হিসেবে ভেবে নিই। তারপর এক ছুঁলেই যখন দেখি দিব্যি নড়াচড়া করছে শরীর, তখন আবার একটা দশ ঘর। খেলাটার আরেকটা মজা হল, মাঝে জল খাওয়ার একটা বিরতি নেওয়া যায়। মাঝের সেকেন্ডগুলো থার্ড বেল পড়ে যাওয়ার পর কিছু বাড়তি সময়, মিলিয়ে যায়। এক একটা সময়ে কাঁটার মতো হয়ে যাই। তিনটে বাজতে যখন মিনিট পনেরোর আয়োজন বাকি, কয়েকমুহূর্তের জন্য ভেবেছিলাম চিত হয়ে শুয়েই কেটে যাবে জীবন। পারি না। সোয়া তিনটের দিকে গুটিয়ে জড়সড় হয়ে যাই। হাত পা মিলিয়ে যেন একটাই শরীর। গলার দিকে হাত যায়। চাপ লাগে। বাকি তিনটে ঘণ্টা আর কিছুই মনে নেই।

শুধু নিটোল কিছু কৌণিক মাপজোখে কখনো বিছনা, কখনো তার চেয়েও ঠাণ্ডা মেঝেয় বিভিন্ন কসরত চলেছিল মানুষটার। ৬ টার দিকে মনে হয় ঝুলে পড়েছিল। ঘড়িতে একটা লম্বা দাগ, দুটো কাঁটা মিলে তৈরি করেছিল। দেহের সমান্তরালে।


চৌকাঠ
চৌকাঠকে খুব নির্বান্ধব এক মানুষের মতো লাগে। যার সামনের দিকে একটা দরজা থাকে, ভেজানো। অবশ্য খোলা থাকলেও বা কি, ভেতরে ঢোকার ইচ্ছেতে একটা অনাদুরে খিল লাগানো। আর বাইরেটাও যাব যাব করেও শেষমেশ আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তাই দরজার গোড়াতেই পান সাজিয়ে বসে। বয়স হচ্ছে বলে যাকে আর ঘরের কাজে লাগানো যায় না। আবার দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে গেলেও থামিয়ে দেয় পড়শির চোখ। শুধু মাঝে একটা উপত্যকা করে জানান দেওয়া, লোকটা আছে। জানান দেওয়া বাইরের জল কখনো ঘরে ঢুকতে নেই। জানান দেওয়া ক্লাইম্যাক্সে হুমড়ি খেয়ে পড়া ‘বনফুল’ উত্তমবাবু, চৌকাঠই তখন আগুন। চৌকাঠই ঈশ্বর। এসব গল্প সবসময়ের জন্য, তাও ঠিক না। কখনো নির্বান্ধব সেই মানুষটি টো টো ঘোরেন অবয়বহীন পাড়া, একটাও অপ্রত্যাশিত হাত না আসা নিষিদ্ধ জেনানা। এবং তখনই বৃষ্টি আসে। দরজার নীচে একফালি কাপড় গুঁজে জল আটকাতে হয়। অতিথিকে আগ বাড়িয়ে বলে দিতে হয় না, ‘সাবধানে’। পিঁপড়ের দল বাধার অভ্যাসে অবশ্য নিয়মমাফিক বারকয়েক থমকে যেতে পারে, অপেক্ষা করতে পারে, কখন পাশে বসা মানুষটা একটা একটা করে পড়ে পাওয়া এঁটোকাঁটা ছুঁড়ে দেবে, আর ক্রেমলিনের সেনাছাউনি থেকে প্রতিরোধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে লাল সেনারা। একটা সময় পর, মানুষটাকে ফিরে আসতে হয়। তারপর যখন দেখে, বসার মতো কোনো উচ্চতাই সেভাবে আর খুঁজে পায় না ইন্টিরিয়র ডেকোরেটরের মসৃণতায়, কলিংবেলে হাত রাখে। আর বিজ্ঞাপনের সেই বাড়ির মেয়েটাকে মারধোর করা হতভম্ব লোকটা তড়িঘড়ি এসে দরজা খোলে।

বন্ধুহীন সেই মানুষটি একহাতে রিস্টওয়াচ পড়েও বেমক্কা জিজ্ঞেস করে বসে – ‘কটা বাজে?’


পর্দা
বিষাদ অনেকটা পর্দার মতো। সচরাচর নীল। পড়শির হিংসুটে সবুজ চোখ দিয়ে যাকে কালচে দেখায়। তাই, বেশীরভাগ বিষাদই বাইরে থেকে ঘটনাবিহীন, কালো, বিমূর্ত। বেশীরভাগ বিষাদেরই ভেতরে একটা শরীরী রাত থাকে। যাদের ভেতর এখনও শরীর আছে-একমাত্র, যাদের ভেতর শরীর আছে অথচ সেটাই সবটুকু নয়, এবং যাদের ভেতর শরীর অনায়াসেই থাকার কথা ছিল – এদের সবার হয়ে বিষাদ আড়াল নির্মাণ করে। কখনো খুব বেশী বয়সী হলে পড়শির আনকোরা মনখারাপির দিকে অপাঙ্গে তাকায়, দুয়েককলি পরিহাসের পর জানলার আয়তেই বাস করে অহল্যাজীবন। আবার কখনো নিয়মমাফিক লেপামোছা পরিপাটি আয়োজন, বিষাদ যেন মনে ক’রে ক’রে জানলার রঙ বদলানো নাথবতী। খুব ঝড়ে বিষাদ হিংস্র উড়ে বেড়ায় – অবশ্য ওড়াটা ততটাই যতটা জানলার শাসন উড়তে দেয়। খুব বৃষ্টিদিনে বিষাদ গেরস্থের সামান্য ভুলে ভিজে একহারা, দ্বিতীয় রৌদ্রবাসের আগে অব্দি যার শাপমোচন হয় না। ঈষৎ ফিকে হলেও বিষাদ বরাবরি গ্রীষ্মকালীন, প্রয়োজনীয়, যদিও ঈষৎ ফিকে হওয়ার ভয়ে পরে নেয় শার্সির সতর্কতা – ওপারে দুপুরের হাতখানেক দূরত্বে যেরকম সাবধানী কপোতী – কার্নিশে – অগোচরে ভীমপলাশীর কাঁপন অথবা গন্ধগোকুল। শীতের রাত্রে জড়সড় তাপমোচন, সকালে তীব্র বিছানাবিলাসে ছুটির বেলা – বিষাদের ভরপুর আয়োজন।

ঋতু বদলায়, ঘর বদলায় এবং শরীরও। তবু, বিষাদ, প্রকারান্তরে, সেই পর্দার মতোই। সচরাচর নীল।


ছাদ
না পাওয়া একটা ফুটফুটে আকাশের নীচে যেন শুয়ে থাকে ছাদ, প্রতীক্ষায়। ভোরের ছিটেফোঁটা হিমে যেন তার মেঝে ভিজে থাকে। প্রথম রোদের মতো নুয়ে পড়ুক লাগোয়া মুচকুন্দ ডালের আরাম – বিছানায়। শরিকি ভাগবাঁটোয়ারার পর যা কিছু বেঁচেবর্তে থাকে, সমান্তরালে, সেখানেই যেন টাঙ্গানো থাকে নাইলনের দড়ি – দিনের শেষে উপাংশু জপের মতো অন্তর্বাসিনী দুঃখদের, জনান্তিকে, যেন মেলে আসতে পারি। প্রগাঢ় পিতামহীরা ডাল শুকোতে শুকোতে যেন এখানেই মরে যান। চুল থেকে স্নানফেরত সমস্ত জলের মুক্তো ঝরাতে ঝরাতে, দেখো, যেন একসমুদ্র অনুঢ়া জীবন পার না ক’রে ফেলে ধীবররমনীর মতো, আমাদের দিদিরা। পুরাতন কোন মরে যাওয়া কাকের রেখে যাওয়া ওম দেখে শিউরে উঠতে উঠতে যেন বড় হয় আমাদের সন্ততিরা। বেওয়ারিশ কিছু না কিছু ঠিকই আটকে যাবে ছাদের আশ্রয়ে – দুঅক্ষর হলে তার নাম রেখো ঘুড়ি, চার অক্ষর হলে সংসার। পায়রাদের উত্তাপে রোদের চেয়েও যেন নিরাপদে থাকে কার্নিশ। প্যানোরামায় সমস্ত পড়শি ছাদের বাইরেও, খুব দূরে, যেন দেখা যায় এক তিরতিরে নদী। সন্ধের বাতাস যেন ঈশ্বরের মতো ছুঁয়ে যায় ভক্তের শরীর। রাতে একলা কেউ হেঁটে গেলে পাশ থেকে যেন অন্য কেউ জানতে চায় – অত ঝুঁকো না, দুমুঠো বেড়েছি, গোটা দিন কিছুই তো খাওনি।

একেকদিন ছাদকে এভাবে ভাবতে বেশ লাগে। আবার একেকদিন বৃষ্টি হয়। ঝাপসা। জানলা, দেওয়া থাকে। তখন কোথায় ছাদ।