ওই পাখিটা পাখিমাত্র

রণজিৎ দাশ

আমরা নিখুঁত নই
( ' মুনস্ট্রাক ' ছায়াছবির একটি সংলাপ অবলম্বনে )

আমরা নিখুঁত নই । একটা ঘাসফড়িং নিখুঁত , একটা সন্ধ্যাতারা নিখুঁত, একটা বৃষ্টির ফোঁটা নিখুঁত । নিখুঁত একটা বসন্তের রাত । কিন্তু আমরা জন্ম থেকেই পঙ্গু , বেঢপ, মূর্খ এবং দিশাহারা । আমরা ধূর্ত , জালিয়াত , ভঙ্গুর, ভিখারি । আমরা জন্মাই শুধু ভুল স্বপ্নে ভুল কামে ভুল শহরে হেঁটে নিজেদের ধ্বংস করার জন্য, ভুল মানুষকে ভালোবেসে এবং আঘাত পেয়ে, বুক ভেঙে মরে যাওয়ার জন্য । শুধু, সবশেষে টের পাই, আমাদের ভুলগুলি কি মারাত্মক নিখুঁত !


ওই পাখিটা পাখিমাত্র

যে মুহূর্তে তুমি বুঝতে পারবে ওই পাখিটা দেবী নয় ,
ওটা একটা নগণ্য পাখি মাত্র , সেই মুহূর্তে তুমি
পক্ষী - নিপীড়ন থেকে চিরতরে মুক্ত ও স্বাধীন !

তোমার গলায় গান , ফুলেরা তোমার ইচ্ছাধীন !

যে বাগানের মধ্যে তুমি, মূর্খ তরুণের মতো,
একটা মোহিনী পাখির ছলনায়
ঢুকে পড়ে, তার ক্রীতদাস হয়েছিলে,
সেই বাগানের গেটে লেখা ছিল সুস্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি;
' প্রেমের ভিতরে সবরকম স্বাধীনতা নিষিদ্ধ ।'
তুমি আহাম্মক, তুমি পাখিটার চটকে অন্ধ, তুমি সেই
সতর্কবাণী লক্ষ করোনি । এমনকী সেই বাগানের
প্রতিটি চুম্বন - বেঞ্চির ক্ষয়া পাটাতনে
সাদা পক্ষী - বিষ্ঠা দিয়ে লেখা ছিল :
' প্রেমের ভিতরে সর্বপ্রকার নিপীড়ন আইনসিদ্ধ ।'
তুমি পাখির নখরায় অন্ধ, তুমি সেই
সতর্কবাণী পড়তে পারোনি । তাই সেই অহংকারী, সুন্দরী পাখির
ইমোশনাল অত্যাচারে, ঠোঁট আর নখরের আঘাতে আঘাতে
একটা থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো মরতে বসেছিলে ।

তবু তুমি বেঁচে গেলে, শেষমেশ, বাগানের ক্রুদ্ধ করুণায় ।
একদিন রাতে একটা হ্যান্ডসাম, নেশাগ্রস্ত চাঁদ
পাখিটাকে ফুসলে নিয়ে চলে গেল ভিন্ন বনে, ভিন্ন জ্যোৎস্নায় ।

তুমি মুক্তি পেলে দীর্ঘ পক্ষী নিপীড়ন থেকে, ভোর হল গাছের পাতায় ।

সুন্দরী পাখির সঙ্গে রাত্রির বাগানে আর কখনো যেয়ো না,
' ওই পাখিটা পাখিমাত্র ' - এই মন্ত্র কক্ষনো ভুলো না ।

চিঠি

যখন তুমি প্রবলভাবে আমার বক্ষলগ্ন এবং চুম্বনে উদ্যত, তখনও আমি, মনের গোপনে, তোমার আমার মধ্যে কিছুটা দূরত্ব ধরে রাখি । যাতে সেই মুহূর্তেও আমার মনের কোনে মনে হয় যেন আমি বহুদূর পাহাড়ি প্রবাসে, উড়ন্ত মেঘের মধ্যে একটা নিঃসঙ্গ পাথরে বসে কেবলই তোমার কথা ভাবছি । যাতে সেই মুহূর্তেও আমার মন সেই সুদূর প্রবাস থেকে তোমাকে লিখতে পারে চিঠি -- ' বাইরে তুমুল বৃষ্টি, আজ সারা রাত আমি স্বপ্নের ভিতরে শুধু তোমাকেই চাই !' আমার কাছে, এই বিরহীর মিলনাকাঙ্খাই হল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুখের অনুভূতি । এই অনুভূতিকে আমি এক মুহূর্তের জন্যও হারাতে চাই না ।

আমি তাই, সঙ্গমের মুহূর্তেও, তোমাকে চিঠি লিখতে চাই...


তোমার শরীরে ঢুকে

তোমার শরীরে ঢুকে দেখেছি, তোমার
আত্মার করুণা নেই, দয়া নেই, দীর্ঘশ্বাস নেই,
বিষণ্ণ সঙ্গম শেষে ভেবেছি, তাহলে
কোথায় প্রেম -- তোমার আমার ?

প্রেম তো যৌনতা নয় -- প্রেম মানে অঙ্গীকার, দুর্জয় সংসার--
প্রেম মানে পঙ্গু, দুঃখী, ব্যর্থ মানুষের জন্য মুক্ত গৃহদ্বার ।
না হলে কীসের প্রেম -- তোমার আমার ?

তুমিও নিশ্চিতভাবে
আমাকে দেহের মধ্যে গুঁজে নিয়ে দেখছো, আমার
আত্মার করুণা নেই, দয়া নেই, দীর্ঘশ্বাস নেই,
বিষণ্ণ সঙ্গম শেষে ভেবেছো, তাহলে
কী করে পাতবে তুমি এমন সংকীর্ণ, কূট পুরুষের সাথে
স্বার্থপর, নারকী সংসার ?

এরই মধ্যে খাপে খাপ শঙ্খ-লাগা সাপ --
তোমার আমার দুটো ক্ষুদ্র মন দ্বিগুণ দুর্ভেদ্য ক্ষুদ্রতায়
খিল গুঁজে আটকেছে জগৎ নিখিল--
ভিতরে টু - রুম ফ্ল্যাট--বই, বুদ্ধ, ছবি, স্কচ, ধ্রুপদী সঙ্গীত;
দুর্গের চেয়েও শক্ত, আগ্রাসী পেন্টাগন !

আমাদের দেখামাত্র ক্রুদ্ধ মেঘে বজ্রধ্বনি বাজে,
আমাদের দেখামাত্র ভয় পায় পশু-পাখি, আর
আমাদের দেখামাত্র
প্রবল ঘৃণায় কাঁপে বনস্থলী, সমুদ্র, পাহাড় ।


মৃতের গোসলকারী
( চট্টগ্রামের একটি গ্রামীণ মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রাচীন লোকাচার অবলম্বনে )

মৃত মানুষের দেহ খুব যত্নে গোসল করাই--
ঘুমন্ত শিশুর মতো সদ্যমৃত মানুষটির দুনিয়াদারির
প্রগাঢ় খোয়াব যেন ভাঙে না কিছুতে--
সেরকম ধাত্রী হাতে, গোর - খাদকের মতো পেশাদারি হাতে
মৃত মানুষের দেহ সকল আচার মেনে গোসল করাই--
( জ্যান্তকে আদর করা খুব সোজা, মৃতকে আদর করা কি কঠিন, ভাই ! )

পাতিলে শুদ্ধ পানি ঈষৎ গরম করি
ধানের সোনালি খড় জ্বেলে,
এবং সে জলে কিছু জিন পরিদের গাছ কুলের সুগোল পাতা
নীরবে ভাসাই ।
তারপর জমায়েত ভিড়ের উদ্দেশে
বজ্রকন্ঠ হাঁক দিই, ' ভাই বেরাদর যত সব দূর হটো ! '
এবার একান্তে আমি
কাঠের তক্তায় সেই মৃতদেহ শুইয়ে, তাকে
চাটাইয়ের বেড়া দিয়ে ঘিরে,
মৃতের কানের কাছে মুখ নিয়ে তিনবার বলি,
' সাকিনা বিবির ছেলে হুমায়ুন, শুনতে পাচ্ছো আমার কথা কি ? '
মৃতদেহ মাথা নাড়ে, যেন বা সে বলতে চায়,
' হ্যাঁ, আমিই হুমায়ুন, কিন্তু তুমি কে ? '
আমি তাকে বলি, ' ভাই, সকালে আমার নাম হরি,
কিন্তু সন্ধ্যায় হোসেন--
আমাদের দুজনের একই দিদি--
নাটোরের বনলতা সেন । '

তারপর তাকে বলি, ' বেহেশতে যাওয়ার পথে
তিনখানা প্রশ্ন হবে, শোনো।
যদি তারা প্রশ্ন করে, ' তোমার প্রিয় ফুল কী ? '
বলবে তুমি, ' সূর্যমুখী ফুল । '
যদি তারা প্রশ্ন করে, ' তোমার প্রিয় পথ কী ? '
বলবে তুমি, ' পাঠশালার পথ '।
যদি তারা প্রশ্ন করে, ' তোমার প্রিয় বন্ধু কে ? '
বলবে তুমি, ' লালন গোঁসাই । '

এসব গোপন কথা মৃতরে শিখিয়ে আমি,
পাতিলের জল ঢেলে,
গ্রামীণ গভীর অন্ধ কুসংস্কারে, নিরাশ্রয় লন্ঠন জ্বেলে,
ঈষৎ বাউরা আমি, সামুদ্রিক চট্টগ্রামে,
গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে,
মৃত মানুষের দেহ খুব যত্ন করে গোসল করাই--

এই কাজ করি শুধু, আমার জীবনে
আর কোনো জলজ্যান্ত কুশলতা নাই ।


গান

প্রতিটি মানুষ তার
নিজস্ব গানের মধ্যে বেঁচে থাকে--
মাথা-নাড়া পাগলের মতো ।

সে গান শুনতে চাও ?
শুধু তার বুকে কান পাতো ।


-----------@----------