পরবর্তী কবিতা // রক্ত

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

দূর শূণ্যের দিকে হাত বাড়িয়েছ রক্ত আমার, আত্মায় বলিরেখা পড়েনি কখনো, ছিন্নভিন্ন অন্ধকারে মিশে গেছে প্রতীতি, অবিনশ্বর বিষ সম্পর্কের, আর খোলা হাওয়া, দিকচিহ্নহীন প্রেমের শপথগুলি একা একা অভিমানে ভেসে গেছে। কোথায় তাকে নিয়ে গেলে হে স্মৃতিপট, মিশরের নীলবর্ণ নদে, নিয়ে গেলে গোধূলি আলোর পুস্পবৃন্তে, পল্লবে, হতাহত যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত রথীর ভগ্ন রথচক্রে , এই দেখো আমি উষ্ণীষ খুলে রেখেছি তোমার পদতলে, বসেছি আজানু একাকী । কতবার, কত হিম মৃত্যু, কত আবিল প্রেমের সওয়ার করেছ অনায়াসে
কত ইতিহাসের
সোনালী, খয়েরি, ব্যাকুল দিনেরাতে,
লালসা, রিরংসার ধারাপাতে
ভেসে গেছে নিবিড় রহস্যময় হৃদয় আমার !

দূর শূণ্যের দিকে, মহাপৃথিবীর মাটিময় হাত বাড়িয়েছি কতবার, হিসেব রাখোনি তুমি, হে রক্ত, হে আনত অবিরল তরল! হে লোহিত, শোণিত হে আমার, ধমনীতে পরিশুদ্ধ হলে তুমি, শিরায় কলুষ - কল্মষ, আগুনের কামনার পান্থপাদপ হল একাকী অনিমিখ নয়ন! তোমার দাবিও কত! কত জ্যোৎস্নাময় পেলব মুখচ্ছবি, কত মৃদু রহস্যের পূর্বরাগ ! কত সুশীতল ভালোবাসা, কত ছন্দ, কত পুস্পসুরভির বাসরশয্যা, অনচ্ছ অনুরাগ! সুগন্ধের সুরভি বাগান কতশত হাত ধরে পার করে দিলে, হে সপ্রাণ, হে বারিধারা, হে কবোষ্ণ আগুন! বলোনি সন্মুখে পথ বন্ধ যখন, বন্দরের নাবিকের সংসার ভাসিয়েছ যেন ধাবমান অশ্বমেধ ঘোড়া , প্রেম থেকে প্রেমান্তরে, নিবিড় আলোকরেখাগুলি কেমন করে জন্মে জন্মান্তরে প্রাানকণিকার আকুল মৃত্যু হয়ে নিয়ে গেলে তুমি । কি নিবিড় বিশ্বাস তোমার! কি গহন অনায়াস গতি! তুমি কেড়ে নিয়ে চলে গেলে মায়ার সন্তান, দুহাতে ভরে দিলে অপাপবিদ্ধ মুখের মুখর সারি, শিশুর কলস্বর, অজর নারীপ্রতিমার রূপ ! কত মন্থনঋতু দিলে অনায়াসে, কত বসন্তনিবাস! তাও কই? নিশ্চল কেড়ে নিলে স্থিতি ! অমোঘ যৌবনে প্রান্ত জীবনরেখা
লহমায় মুছে গেল কত বস্তুরীতি..

কেড়ে নিলে যাবত অর্জন, বল্মীকের স্তুপের মতো, এক জীবনের যাবতীয় সঞ্চয়, সব স্নেহ, সব ক্ষীরধারা, সব স্তনদুগ্ধ, সব মাতৃকামূর্তি ! বিনিময়ে এক ঋদ্ধ যন্ত্রণা দিলে, প্রেমজ সুষমা দিলে,
দিলে ব্যাকুল হৃদস্পন্দনে অশ্বগতি!
কি ছিল তোমার একার তবে?
কাকে তুমি দিয়ে এলে যাবত প্রতীতি!

তোমার কি স্থির ঠিকানা ছিল, হে লোহিত, মৃত্যু স্পর্শ কি করে তোমায়! সুদূর শূণ্যের হিমবিন্দু, বিষাদ, অবলোকিতেশ্বরের আকাশ প্রাসাদ কতবার, কতজন্মে তুমি দেখো, কত অবহেলা, কত বসন্তনিবাসে, কত হোলিখেলা তুমি রঙে, সঙ্গীতে মূর্ছনায় ভরিয়েছ বলো! কত প্লাবনের পরে, কত ইতিহাসে, কত বিশীর্ণ কান্নার অবকাশে অকস্মাত খেলা ছেড়ে চলে গেছ তুমি, একাকী উদাসীন! কতবার, বলো কত শতবার তুমি অকুলে ভাসিয়েছ খেয়া, সব পিছুটান ছেড়ে সঙ্গীবিহীন আঁধারে ! মুচড়ে উঠেছে বুক, ছিন্নভিন্ন আবেগের হতাশ্বাস, কত সমীপবর্তী প্রিয়মুখ, কত অবারিত দ্বার খোলা রেখে এক জন্ম থেকে অন্য জন্মে নিয়ে গেছ তুমি লোহিত তরল! নৈমিষারণ্যের তুমি ব্যাধ, তুমিই দীপ্ত হয়ে মরজীবনের অট্টহাস্যে অবাধ
অনায়াসে, কত অনায়াসে
সঁপেছ তীব্র বিষ, সুতীব্র মৃত্যুর ছোবল !

বেলা শেষ হল এবার তবে। হে রক্ত, হে আমার কবোষ্ণ জীবন, তোমার বহতা গতি ক্রমশ মন্দ হবে! আর উষ্ণতা থেমেছিল জেনে, রুদ্ধ বসন্তের হাত নির্লিপ্ত মননে । জন্ম থেকে জন্মান্তরে তোমারই আবীর ললাটে মেখেছি বারেবারে তিলকের মতো, এইবারে হিমঋতু নেমে এল, ঝরা পাতাদের স্তুপে আদিগন্ত স্মৃতিকথা , তোমার একক খেলা সেইমতো! এই ঋতু মন্দবায়, হে শোণিত, হে আমার বহমান আত্মার সঙ্গীত, সুদূর শূণ্যের ডাকে জানি তোমার ক্লিষ্ট শ্রবণ বধির , বাতাসে বিদায়ের শঙ্খধ্বনি, গ্লানি
মিশে আছে ধীর চেতনার গভীরে
যাত্রা এই শুরু হল বিষন্ন বোধের। এইবারে খেলা ছেড়ে যেতে হবে জানি ...
সঞ্চয়ে নিয়েছি কিছু অভিমান
অশ্রুজল, নিভৃত পারাণী

পাশার দান পড়ে গেল এক বেদনাক্ষতময় মুখে, রাজতিলকের নিবিড় সুখের
কালবেলা অবসান ।
হিমঋতু নেমে এলে নিহত লোহিতকণিকারা খরসান ।

নিয়ে যাও বিদায়ের বেলা, তোমার নিয়ন্ত্রণমুক্ত
গোধূলি একেলা
তোমাকেই সঁপে যাব আগামীর হাতে
সুদূর শূণ্যের দিকে চেয়ে , বাকি পথ
একা থেকো প্রিয় রক্ত,
আরণ্যক অন্ধ অঙ্গীকারে
তিরোহিত হিম ক্রান্তিবেলা

সেই তবে হোক
জন্ম থেকে জননান্তর পথে
রক্তের আদিম তমসার
গভীর গভীরতর শোক ।।