রিসার্চ স্কলার মেয়েটিকে

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

রিসার্চ স্কলার মেয়েটিকে
তুমি রাষ্ট্রপুঞ্জ জানো , এঙ্গেলস জানো , চমস্কিকে চুমু খেয়ে
দাঁড়িয়ে থাকা চিনের প্রাচীর থেকে ভেঙ্গে পড়া বার্লিন ওয়াল পর্যন্ত
আনাগোনা করতে করতে তুমি চেখে নাও রিয়েলপলিটিক
'প্রলেতারিয়াত' শব্দের আগে কী বসাতে হয়, তাও তুমি জেনে গ্যাছো কবেই….

শুধু , ভালবাসা জানোনা বলে এই দ্যাখো -
লুম্পেন হয়ে গেছে ফাল্গুন মাস ।

কমলিনীর সঙ্গে
কমলিনীর সঙ্গে শেষ দেখা কর্নফিল্ড রোডে
মাথার ওপর মেঘের কার্তুজ, হাওয়ায় তখন থমকে থাকা ঢেউ
কী যেন একটা বলতে গিয়ে
আমরা হোর্ডিং-এর ওপর ঝুলে থাকা
ছেঁড়া ঘুড়ির দিকে
তাকিয়ে ফেলছিলাম বারবার
সেই না-হওয়া কথা , ফাঁকা ট্রামে চড়ে
বারো বছর ধরে
বৃষ্টি-মরশুম পেরিয়ে চলেছে এখনো...

মাতাল সমীরণে
কলকাতায় বসন্ত মানে
ডানদিকের ফুটপাথে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ
বাঁদিকের ফুটপাথে একটা রাধাচূড়া গাছ
আর মাঝখানে হোর্ডিংয়ের আড়ালে একটা নাইন এম.এম. পিস্তল -
রিসার্চার মেয়েটির এই একাডেমিক ডিসকোর্সে মুগ্ধ হয়ে
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম -
"কফি..?"
মেয়েটির চোখে সমুদ্র জন্ম নেবার বদলে ফুটে উঠলো - 'ডেড সি '
পিস্তল লুকিয়ে রেখে এই যৌনগন্ধী ফাল্গুনে
সেই মৃত সমুদ্রে কিছুকাল সাঁতরে গেলাম দুজনে
কয়েকটা রাত আর কিছু কিছু দিন
আমাদের এ ভাবেই মুখোশ পরতে ইচ্ছে হয়
মুখোশ পরে , সার্কাসে যেতে ভালো লাগে...
আমরা জানি,মুখোশ বা সার্কাস বড়দের জন্যে নয়
তাই বসন্তের এই মাতাল সমীরণে
আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে
পিস্তল লুকিয়ে, মুখোশ পরে হাততালি দিতে দিতে
আমরা ছোট হতে থাকি ক্রমশ ...

গড়পঞ্চকোট
এই বর্ষায় , গড়পঞ্চকোটের সবুজ পাহাড় থেকে
হাত নাড়ছো তুমি
আর শাল, তমাল, সোনাঝুরি, পলাশের বনে
বেজে উঠছে মেঘের মাউথ-অর্গ্যান

যেন কত যুগ আগের এক অলীক ভ্রমণ-কাহিনী
আজ আবার হাইওয়ে পেরিয়ে ছুটে চলেছে জল-জঙ্গলের দেশে ...
উড়ছে ওড়না , তোমার ভেজা চুল থেকে ঝরে পড়ছে মুক্তবিন্দু
জলে ধুয়ে যাচ্ছে সমস্ত অনর্থক মেক-আপ
এক আশ্চর্য , নিরাভরণ শ্রাবন এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমাকে

ছাতার পর ছাতা, যানজট, ডুবে যাওয়া এলগিন রোড
নিস্তব্ধ রাস্তায় প্রাচীন ল্যাম্প-পোস্টের ম্রিয়মান আলো পেরিয়ে
আমি পৌঁছে যাচ্ছি পাহাড়ের ওপর সেই ভাঙ্গা মন্দিরের কাছে
যার দরজায় লেখা আছে ভুলে যাওয়া গান ...

মাথার ওপর নেমে আসা ঘন, কালো ত্রিপল -
তার নীচে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছো তুমি
ভেজা বনপথ থেকে আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি
না-পাঠানো চিঠি, হাওয়ার মাইলফলকে
আমাদের মুছে যাওয়া নাম লিখে ফেলছি আবার।

যাতায়াত
কোন বর্ষায় শেষ একসঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম
মনে পড়েনা আর
হুডখোলা কোনো জিপ এখনো অপেক্ষা করে
হাইওয়ে পেরিয়ে আমাদের সবুজে নিয়ে যাবে বলে ....

দুনিয়াটা তো ঘুরছে , নাকি ? তবু মনে হয়
সবকিছু থেমে আছে আফ্রিকার উন্নয়নের মত
অথবা স্কিন লিফ্ট করিয়ে যেমন প্রায়-যুবতী থেকে গেছেন
ম্যাডাম রহস্যময়ী রায় ....

শূন্যতা বুঝিনা তেমন আর , অসুবিধে হলে সিগারেট ধরিয়ে ফেলি শুধু
এই শ্রাবন চলে গেলে , হয়ত আর ভেজা হবেনা কখনো
সারাদিন মেঘলা , অদ্ভুত যাতায়াতে নির্বাক হয়ে থাকে শহর

সন্ধে নামলে, বহুদূর হ্যালোজেনে আজও দেখি ভেসে ওঠে আমাদের হাসি
ভেসে ওঠে ইস্ট সিংভূম...
উড়ালপুলের ধারে অপেক্ষারতা রংচঙে রাত্রিরমনী -
তাকে দেখে , যৌনতা নিভে গিয়ে আচমকা দুঃখবোধ জাগে...


খুন
অর্কিডের বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি বুঝিনি
কোনোদিন এইভাবে খুন হয়ে যাবো
আমাকে খুন করেছিল যারা
তাদের মুখ আমি এখনো ভুলিনি
ঘরে ছড়িয়ে থাকা নিজের টুকরোগুলো কুড়িয়ে দেখেছি -
কিছুতেই জোড়া লাগছেনা ....
সদর স্ট্রিটের লুকোনো বাঁক থেকে
নজর রেখেছি গির্জার ওপরে
ভেবেছি, যারা খুন করেছিল আমায়
কনফেশন বক্সের ভেতরে
একদিন খুলে ফেলবে টুপি ও মুখোশ
আর অন্তত একবার স্বীকার করে নেবে -
আলোর বিনিময়ে অন্ধকার ছুঁড়ে দেওয়া অপরাধ ছিল....
খুন হতে হতেও আমি বিশ্বাস করিনি
আমি খুন হয়ে যাচ্ছি তাদেরই হাতে
যাদের কান্না ধারণ করতো আমার চোখ
যাদের হ্যামক-এ নিজেকে দুলতে ছেড়ে দিয়ে
আমি ভালোবাসার অন্তহীন গান গেয়েছিলাম।


পয়লা মার্চ
চলভাষ হারিয়ে ফেলেছে মা
তাই আর ফোন করেনা কখনো ....
চৈত্রের দুপুরে, কালবৈশাখীর বিকেলে
নিস্তব্ধ পাড়ায় , ঝোড়ো হাওয়ায় দুলে ওঠা গাছেদের ইশারায়
ডিসেম্বরের হাল্কা রোদে
ঘুরে চলবে চাকা
তবু, চলভাষ হারিয়ে ফেলেছে বলে
আর ফোন করতে পারবেনা মা
যখন সন্ধে নামবে শহরের মাথায়
আর বর্ষায় আটকে পড়ে অনিশ্চিত হয়ে উঠবে বাড়ি ফেরা
তখন কোনো ফোন আসবেনা, উদ্বেগ ভাসবেনা
মুঠোফোন হারিয়ে ফেলেছে বলে
মা জানতেই পারবেনা
কী ভাবে পার্ক সার্কাস ফ্লাইওভারের নীল স্রোতে মিশে যাচ্ছি আমি
আর নিভে যাওয়া ল্যাম্প-পোস্ট কী ভাবে
কথা বলতে চাইছে অর্ধনির্মিত বহুতলের সঙ্গে
আমিও মাকে ডায়াল করতে গিয়ে বুঝি
নেটওয়ার্ক নেই, সিগন্যাল নেই, কোথাও কিচ্ছু নেই -
এমন একটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি
আর দেখতে পাই
মেঘের কার্পেটে ভেসে যেতে যেতে হাত নেড়ে উঠছে মা

চিরদৃশ্যমানতার ভেতরে দাঁড়িয়ে একদিন এ ভাবেই
মুছে যায় মুঠোফোন-ব্যবহার , আর জেগে ওঠে গ্রহ-যোগাযোগ ।