ডোম সিরিজ

গিরীশ গৈরিক

ডোম সিরিজ ১

আমার স্মৃতির ভেতর নদীর স্রোতে তোমার ভেসে যাওয়া
এ যেন আমি ডোম বংশের বেহুলা তুমি লখিন্দর।
আমার কামের ভেলায় তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছি-
যেখানে কবিতার অনুরাগে মৃতদেহ প্রাণ ফিরে পায়।
এই ইতিহাস আমি লিখে রাখি কবিতায়
সেই কবিতায় তোমার স্মৃতির স্পর্শে-
আমার কলমের কালি রক্ত হয়ে যায়।

আমার নিভৃত প্রার্থনায় তোমার এই রহস্যাবৃত জন্ম ও মৃত্যু
কেন যেন আমাকে মহাপ্রকৃতির কাছে নত করে দেয়।
হে অগ্নিপ্রভ জীবন জিজ্ঞাসা তুমি আমাকে বল : প্রাণ যদি দেহের ভেতরে বাঁচে
তবে কেমন করে দেহের বাহিরে প্রাণ বেঁচে রয়।

তাই আমার এই বালকোচিত মনোবেদনা- থেকে থেকে মৃন্ময়ী হয়ে
বেহুলা ও লখিন্দরের ভাসানযাত্রায় অভিনিত হয়, অভিনিত হতে হয়।


ডোম সিরিজ ২

সে এলো- চুপিসারে, আঁধারে যেভাবে আসে শিশির
শরীরে তার সন্ধ্যা মেখে- সূর্য ডুবালে হৃদয়ের গভীরে
তাই পৃথিবীতে আজ নবান্নের অন্ধকার কিংবা মৃত আলোর কিচিরমিচির।
মৃত কিংবা জীবিত আলোর আইলে দাঁড়িয়ে রইলেন একজন কবি
তিনি মৃতদেহের অন্ধকার কেটে আলোর ফুল ফোটান পৃথিবীর টবে
সেই শব ফুলের গন্ধে ভরে ওঠে মানুষের জন্মান্ধ মন-নয়ন।

তবুও আমি ও তুমি মৃত মানুষ হয়ে- মাটির গভীরে মাটি হয়ে বাঁচি
আবার স্মৃতিসন্ধ্যায় ডোম হয়ে শিশিরের জলে ভিজে বলি :
‘হে অন্ধ পৃথিবীর মানুষ তোমরা জানো কী-
ডোমেরা কেন মৃত মানুষের চোখের জল মুছে, মৃত হয়ে কাঁদে?
কিংবা বাসি ফুলের মতো মৃত্যু ঘনিয়ে এলে-
আবার জীবিত হয় তোমাদের মৃতদেহের অন্ধকারে।’

এসব জীবিত ও মৃত শবের উপখ্যান লিখে রাখেন এক ডোমকবি
যার মাথার ভেতর সহস্র জোনাকি আলো জ্বালে অথবা ফুল হয়ে ফোটে।


ডোম সিরিজ ৩

সকল রং এক সরল রেখায় এসে সাদা হয়ে যায়
এসব কথা লাশের কাফনে- বাতাসের রঙে লেখা আছে।
বাতাস রঙের লেখা পাঠ করতে পারে এক ডোম
অথচ সে বলতে পারে না, মানুষ কেন মরে গেলে সাদা হয়ে যায়।
যদিও তার পূর্ব পুরুষ মৃত মানুষের হাতের রেখা দেখে প্রথম ভেবেছিলেন
পৃথিবীর একটি মানচিত্র দরকার
সেই থেকে পৃথিবীর মানচিত্র হলো হাতের রেখার মতো।

তোমার ও আমার রক্তের ভেতর এসব ইতিহাস লেখা আছে
তাই মানুষ মারা গেলে মৃতদেহ সাদা হয়ে যায়,
রজনীগন্ধার পাপড়ির মতো সাদা ও সুগন্ধ ছড়ায় আমাদের মৃতদেহ থেকে।
যদিও এসব গন্ধ জীবিত মানুষের খুবই অসহ্য
তাই জীবিতরা মৃতদের ভাসায় অগ্নিস্নানে কিংবা পুতে রাখে কবরে।

ডোম সিরিজ ৪

শান্ত জলের ভেতর পাখির ছায়া যেভাবে উড়ে যায়
আমিও এমনি করে একদিন জলের ভেতর পানি হয়ে উড়ে যাব।
কিংবা দাস প্রভুদের খোঁয়াড় ভেঙে পাখি হয়ে উড়ব অবিরল রৌদ্রছয়ায়
সেদিন আমার সম্মুখে হলুদ কাশফুল অথবা সবুজ বিড়াল থই থই নাচবে।

তারপর অনেক দিন কেটে যাবে স্বপ্নের ভেতর-
প্যান্টি পড়ে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকবে সোনালি সকাল
ডানা ভাঙা রোদের পিঠে চড়ে আসবে তুমি
তখন আমার হাততালি অসুখ আবার দেখা দিবে।
সেই হাততালির শব্দে মৃতরা আসবে-মৃত্যুর শবযাত্রায়
শবযাত্রাটি শ্মশান থেকে কবর থেকে ধাবিত হবে সংসদের দিকে।

অবশেষে একদিন আমার মৃতদেহ সেই শান্ত জলে- পাখির ছায়া হয়ে ভাসবে।