যে আছো অন্তরে

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

এক :
স্বস্তির অভাব প্রথমে তুমি খেয়াল করো না। তারপর অস্বস্তি হয়। অস্বস্তি তোমার চেতনাকে বিক্ষিপ্ত করে। অস্বস্তি লেগেই থাকে টানা, ধারাবাহিক। তুমি লাগাতার বিক্ষিপ্ত হও। তুমি নিজের সত্তার থেকে ছিটকে যেতে থাকো। তুমি নিজের থেকে আলাদা হয়ে যাও। তুমি অন্য কেউ হয়ে যাও। অস্বস্তির কারণটি তার প্রবলতা নিয়ে তোমার চেতনায় ছেয়ে যেতে থাকে। তুমি রিজেক্ট করো। আবারো আসে। তুমি আবার রিজেক্ট করো। আবার, আবার, বারবার আসে। তুমি রিজেক্ট করো, বারবার করো, আবারো রিজেক্ট করো...

কারণটিকে রিজেক্ট করাই তোমার অভ্যাস হয়ে যায়, তারপর ধ্যানজ্ঞান হয়ে যায়। কারণটি আছে কি নেই, তোমার রিজেক্ট করার ডিফেন্স মেকানিজম কাজ করতে থাকে।

এভাবে রিজেক্ট করাটাই তোমার সর্বক্ষণের কাজ হয়ে যায়, অস্বস্তির কারণটিই তোমার চেতনায় ঈশ্বর হয়ে জুড়ে বসে।

দুই:

যে কোনও মুক্তিই স্বস্তি দেয়। জেনে নাও, স্বস্তির থেকে আদরনীয় কিছু নেই, শান্তি না, সুখও না। জয় তো না-ই।

তিন:

একটি ব্লোয়ার প্রবলভাবে আমায় হাওয়া দিয়ে চলেছে। আরাম লাগছিলো, কিন্তু খানিক ধাক্কাও। জানালাটা খোলা থাকলেই ভালো হতো... ব্লোয়ারটা চলছে। চলছে। আমি যেন কি ভাবছিলাম? পথের শেষ কোথায়। এমন বিষয়, রবীন্দ্রনাথ এত খাজা ট্রিটমেন্ট করলেন? সন্মুখে ঘন আঁধার। পার আছে গো কোন দেশে। উফ... উল্টোদিকে একটা দরজা থাকতো, জানালার উল্টোদিকের দেওয়ালে, জানালাটা খোলা থাকতো, হাওয়া এদিক থেকে ওদিক করতো... চলছে। জঘন্যভাবে চলছেই। বন্ধ ঘর। প্রচন্ড হাওয়া। আরাম নয়, আশ্রয় নয়, আক্রমণ। কি যেন ভাবছিলাম? বুঝি তৃষ্ণার শেষ নেই নেই, মনে ভয় লাগে সেই... চিরুনি, আমার চুল উড়ছে, এত এত বেশি চিরুনি কে চেয়েছে, আমার দাড়ি উড়ছে, সুড়সুড়ি লাগছিল, এখন লাগছে না। অক্টোপাসের মতো হাওয়া, অনেক অনেক বেশি শুঁড়। মুখে চোখে কপালে নাকে কানে নিজেরই চুলদাড়ি আর সুড়সুড়িতে নেই, বিরক্তিও পেরিয়ে পেরিয়ে মনে হচ্ছে মাথাটা কেটে ফেললেও যেন ভালো হত। সামনের দিকটা আক্রমণে ভেসে যাচ্ছে। চামড়া পুড়িয়ে দেওয়া হলে কেমন কষ্ট হয়? চেঁছে চেঁছে যেন তুলে নেওয়া হচ্ছে চামড়া। র‍্যাঁদা দিয়ে ঘষে ঘষে তুলছে। হাত বাঁধা? পা বাঁধা? বোধহয়। একটুখানি সরানো যায় শরীর, নড়ানো যায়, এখন কোনাচে ঘেঁষে পাশের দিক। বিচ্ছিরি জঘন্য যাচ্ছেতাই ব্লোয়ার, চলছেই চলছেই... কেন চলছে এটা? এটা কি কোনো পাঙখাপুলারের অতৃপ্ত আত্মা? ওরে আমি হাওয়া চাইনা ওরে ব্লোয়ার, কোনো পাঙখাপুলারের পেটে লাথি মেরে আমি মেরে ফেলিনি গতজন্মে রে, তোর হাওয়া বন্ধ কর। কি যেন... হালভাঙা পালছেঁড়া ব্যথা... ধুসশালা জাহান্নামে যাক পৃথিবীর সমস্ত হাওয়াকল, ব্লোয়ার, পাখা। ধ্বংস হয়ে যাক বিদ্যুৎ। ব্লোয়ারটা থেমে যাক। আমি একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচি।

যদি এটা দু:স্বপ্নদৃশ্য না হয়, তবে আমি জানালা আর দরজাগুলো সব খুলে দেবো। তারপর ভাববো, রবি আসলে ঠিক কি খুঁজছিলো গানটায়? শব্দপ্রয়োগ ভুলভাল, ফ্র‍্যাঙ্কলি। খটখটে। ঋষির মতো বাক্য এই গানে, বিজ্ঞানীর মতো, চাষীর মতো। কবির মতো নয়। বাক্যগুলি দপদপ করছে না। অর্থ বুঝি না এমন পূজামন্ত্রের মতো লাগছে। কেন এমন হচ্ছে। অথচ ওই গানটায়? এসো আমার ঘরে। শব্দের জগদ্দল ভার নেই, সোনায় মোড়া চাকচিক্য নেই। 'বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে'... এর মধ্যে এক অতলস্পর্শী অপার মহাসাগর আছে ---