বেগমজান

প্রান্ত পলাশ



আমরা দুজন শোবো— আমাদের থেকে দূরে আমরা দুজন, বেগমজান, তোমার ঘুমের ভেতর মাটি খুঁড়ে বসছে কাঁটাতার। কোথা সে আজাদী, কোথা সে ভূমির ভেতর ব্রাহ্মণ-মোল্লার চলাচল? ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিয়ে দিল্লি-করাচি, তুমি শুয়ে আছ আগুনকুঠিতে। রোদ হাসছে, ইট হাসছে, আরও হাসছে বারুদসকাল। আর আমি, একটু দূরের নদী, বয়ে যাচ্ছি জলকাঁটাভার। উনুনে রাঁধছি মাংস, আজ ভোজ একসাথে হবে। কিন্তু বেগমজান, কুঠি থেকে দূরে কারা যে টাঙায় তাঁবু, কাদের আঙুলে ফোটে দেশভাগফুল— উঠোনে আবার এসো, দেখো, আমার লাগানো চারা— মাচাঙে ধরেছে শিম

হুঁকো থেকে ধোঁয়া টেনে টেনে, বেগমজান, একবার ডাকো— সেলিম, সেলিম...



ফের দেখা হবে, বেগমজান, একদিন অনুজ্জ্বল নখের মত ভোরে। আমরা দেখেছি দেশ ভ’রে গেছে অসংখ্য ইতরে। তোমার হুঁকোর বাঁশি ফুৎকারে ছেড়েছে যে ধোঁয়া, সেখানে লুকিয়ে আছে দেশহীন আগুনের রোয়া। কত দূর জল আনতে যাব? কুঠির সামনে কাঁটাতার। এত যে পিপাসা আমাদের, কে নেবে সেই জলভার? মাঝরাতে খুব হেসে উঠি। ভাবি, একদিন উপড়ে ফেলে সব নিয়ে নেব জাগতিক ছুটি। কিন্তু মৃত্যু এইখানে, আমাদের সঙ্গে ব’সে খায়। এ দেহ সামান্য ছুঁয়ে তারা ভেবে বসে আমার জামাই! ছাদ থেকে চলো গিয়ে দেখি হিংসার রূঢ় রোশনাই— নতুন ভারতে কারা আসে, কারা পাকিস্তানে চলে যায়। আমাদের কাঁধের বন্দুক কার দিকে ক’রে যাব তাক?

রাজনীতি এমনই বিদ্বেষ— ফাক ইউ, ফাক অল, ফাক!



আবার নেশার মত রাত গিলি হে বেগমজান। রাজার পেয়াদা এসে ব’লে গেছে ছেড়ে দিতে স্থান। কিন্তু এ কুঠি ছেড়ে কোথা যাব ভাই? আমাদের দেহ বেচে আমরা তো দেহখানি খাই। নতুন কিছু কি পাব, নতুন কোথায়? মদ-মাংস লোভাতুর, কাঁটাতার নাই? এখনও ঝড়ের মুখে ডালে পা দুলিয়ে বসেছে যে পাখি, হাতের তালুর সন্দেহে তারে আমি কী ক’রে যে রাখি! ওই ছোট্ট মেয়েটিকে তবে তুলে দেবে রাজার বাহুতে? ঘুমাতে পারি না পারি না, বড্ড ক্লান্ত শুতে শুতে! যোনিছেঁড়া ফরমান শুনে কার রক্ত হয়ে আসে হিম?

যদিও বন্দুক এক কাঁধে, একা লাখো তোমার সেলিম!