বাটালি পাহাড়ের দিনসব

ভাগ্যধন বড়ুয়া

এক।

তুমি হলে আমার ভূ-পৃষ্টের মাটি ; যে মাটি হোক না কেন - পলি,এটেল, বালি কিংবা পাহাড়ের লাল মাটি কারণ মাটিই ভরসা যেখানে সবাই আশ্রয় পায় বা আশ্রয় নেয়। পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় একটা বহু দাগযুক্ত হলুদ পাতা ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে মাটিতে পড়ে চুপ মেরে নিজের অবলম্বন খোঁজে নিল অথচ তার যৌবনকালে সবুজের তরঙ্গে সূর্যের সাথে লুকোচুরি খেলতো তাও তলদেশের মাটির রস পান করে, এভাবেই মাটির মায়ায় মাটির মানুষ মেঠোপথ ধরে হেঁটে হেঁটে খুঁজে পায় মনের আরাধ্য নির্ভরতা যেখানে পুষ্পমায়া,পাখির কলতান, লজ্জ্বাবতী শরম আর কচুপাতায় বৃষ্টি ধরে রাখার প্রবল মহাকর্ষ টান। আরও একটু এগোলে পথে জোড়া শালিক এর কথোপকথন, ঘুঘুর ডাক, অজানা পাখির তবলার বোল জবা লালে ঢেউ তোলে যেখানে কম্পিত হয় তোমার ঠোঁট আর আমার কামনা।
পথেই রয়ে যায় কথা -যে পথ মাটির ; পাশাপাশি বসে থাকার দু'টুকরো কাগজ যা বৃষ্টিজলে লেপ্টে আছে সিঁড়ির প্রান্তে, ইউক্যালিপটাস বাকল বদলে কিছুটা ফর্সা হয়েছে,বটতলে পরজীবী গুল্মের সবুজ সমাবেশ, সেগুনের ঢাল ঘষার খুটখুট শব্দ...

মাটির ওপর পথ, পথে পথে মাটি, মাটিতে ঘাঁটি গড়ে আশ্রয়ে আছি; কাটাবো সবুজাভ কাল তোমার আশ্রমে...
১২/০৯/২০১৭ ; ৮ টা

দুই।

গতকালের ঝরা পাতা সরে গেছে পথের পাশে;যে টগর দাঁড়িয়ে ছিল প্রহরী হয়ে তাও নেই আজ ; তবে বৃষ্টিতে বৃক্ষ ভেজার সাক্ষ্য দেয় পাতায় বহন করা জলবিন্দুর বিম্বে। দু'গোত্রের দুই বৃক্ষ এমনভাবে লতা-মূলে জড়িয়ে মিথোজীবিতা মানছে দেখেই বাতাসে নড়া সবুজাভ পত্র হই আর মিলনের সূত্র খুঁজি পরম মমতায়। এসব ভাবনায় হয়তো বৃক্ষও জাগে আর পুলকিত হয়ে কিছু বৃষ্টির ফোঁটা উপহার পাঠায় প্রতীক্ষারত লজ্জ্বাবতীর কায়ায়।
বহুরঙা প্রজাপতি আমাকে বেষ্টনী করে ঘুরছে, কিছু একটা বলতে চাইছে অথচ বুঝা অসাধ্য কিন্তু ওদের পাখার বিচ্ছুরিত সৌন্দর্যে আমি তোমার জামার
বাটিকে আনমনা সাধক। বারবার পথের পাশে জমা জলে নিজের মুখটা দেখে নিই ; অবয়বে অনায়াসে হাজির হও তুমি আর তোমার মুচকি হাসির দিগন্ত আলো করা পরিবৃত্ত।

নির্জনে মনে সহসা হাজির হয় আশা-আকাঙ্ক্ষার আল্পনা আর কল্পনা জুড়ে আমাদের উড়ন্ত বেলার গুনগুন করা স্ব-সৃষ্ট স্বরলিপি...
১৩/০৯/২০১৭; ৯:৩০

তিন।

মাটি ক্ষয়ে গেলেও বয়সী বৃক্ষ শিকড় জালকে আকড়ে ধরে নিজস্ব বসতি; পাতা নড়ে, শাখায় বসে পাখি গান ধরে,ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ছায়ায় বসে পৃথিবীর মায়া বাড়ায় --সবই উপভোগ করতে প্রবল আগ্রহ পথের মোড়ের পরিচিত বৃক্ষটির;পাশে পাহাড়ের উপত্যকায় মৃদু বৃষ্টিতে যে কুয়াশা তা মাকড়সার জালের মতো দোলছে আর আমি নীরবে প্রত্যক্ষ করি কুয়াশা ও সবুজের মাখামাখি; তখন মনে হয় অরণ্যে জড়াজড়ি গাছের মধ্যবর্তী শূন্যস্থান বরাবর দাঁড়িয়ে থাকো তুমি ও আকাশ ; তাই সমর্পিত থাকি প্রকৃতিতে...

পাহাড়ী লতার বৃক্ষ জড়ানোর দৃশ্য খুউব সুন্দর, গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতে পরস্পরে ছাড়ে না ; ভাবনাটা নিজের জন্য মেলাতেই তুমি হাজির আর বেষ্টন করে থাকো সমস্ত অস্তিত্বে...
১৪/০৯/২০১৭;৯ টা

চার।

নাগরিক পথ পেরিয়ে ইচ্ছে দূরত্ব অতিক্রম করলেই অরণ্য; প্রতিদিন প্রবেশ করি আর বিচরণশেষে ফেরত আসি নিজস্ব ডেরায়। মাঝখানের মুহূর্ত আলোমাখা। সূর্যালোকে হলুদ পাতারা কেন উজ্জ্বল দেখায় জিজ্ঞেস করতেই এক বয়সী পর্যটক সাদা চুলে হাত বুলিয়ে বললো বাতি নেভার আগে জ্বলে বেশ ; শেষবেলার রঙটাই মনে থাকে অনেকের!

অরণ্যবাসে আকাশ দেখার ছলে তোমাকে দেখি; সবুজ রঙে সবুজাভ করি আর দূর্বাঘাসের শীর্ষে জমা বিন্দুজলে রঙধনু গড়ি যা দেখেছি বৃষ্টিস্নাত কর্ণফুলীর বালুচরে...

অরণ্যে নির্গমন পথ বেশি তাই পথ হারানোর ভয়! কম্পাস আশপাশ না চিনলে কোন দিকে যাত্রাপথ হবে না জেনে ঝুঁকি নেয় অনেকেই ; কেউ ফিরে কেউ হারিয়ে যায়...

কস্তুরীনাভীর খোঁজে শিকারির মতো আমিও তোমার পিছু পিছু অতি সাবধানে হাঁটি যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট না হই।
না ফেলি চোখের পলক, না বলে দিই ফেরার ডাকে...
১৫/০৯/২০১৭; রাত ১২

পাঁচ।

অরণ্যে পাখির বিচিত্র ডাকে যে মোহনীয় সংগীত শোনা যায় তাতে চেতনাস্তরের রূপান্তর ঘটে ; ভেসে থাকি তুলো হয়ে বায়ুর মাচাং এ...

কে উপেক্ষা করে কার আহ্বান? পুষ্প পতঙ্গকে, পাতা প্রজাপতিকে পাঁজর সাজিয়ে দেয় খানিকক্ষণ জিরোতে ; এভাবেই পরিচয়, লগনে মিলিয়ে নেয় সনাক্তকরণ অনুভব...

অরণ্যে যারা হন্য হয়েও খোঁজে পায় না বাঁচার অবলম্বন তাদের বটবৃক্ষের ছায়ায় ক'টাদিন আশ্রয় নেয়ার কথা বলেছেন বনবিভাগের প্রবীণ কর্মচারী যার বয়স বেড়েছে বৃক্ষশিকড়ে...

অরণ্যলতার বৃক্ষ প্যাচানোর সতেজ দৃশ্য বিবৃত করে আকাঙ্ক্ষিত আলিঙ্গন আর পরস্পরে জড়িয়ে থাকার চিরায়ত প্রশান্তি...
১৬/০৯/২০১৭; সকাল ১১ টা

ছয়।

বৃষ্টির ফোঁটারা পড়ে পথের পাশে জমে থাকা জলে আর লাফ দিয়ে ছিটায় চারিধারে ; যতোক্ষণ বৃষ্টি ততোক্ষণ এ খেলা চলমান । অরণ্যে বৃষ্টিজাত শব্দের মতো অন্যান্য শব্দেরও প্রাবল্য বাড়ে তাই পাখির গান-পাতা ঝরার শব্দ-বন মোরগের ডাক কর্ণকুহরে বাজতেই থাকে। সবকিছু ছাপিয়ে প্রিয়নাম প্রতিধ্বনি হতে থাকে উপত্যকার সবুজাভ ঢালে...

অরণ্যে গেলে স্বাধীনতার মানে বুঝা যায় ; পতঙ্গ-পাখি-পিঁপড়ে সবাই মুক্ত ; ওড়াউড়ি -দৌড়াদৌড়ি ইচ্ছেমতো। শুধু আমরাই অরণ্যে বহন করে নিয়ে যাই হলুদ রঙের দৈনিক হিসাব ও ব্যর্থ সময়ের দলিল দস্তাবেজ!

মুগ্ধকর শব্দে সবাই স্বস্তিবোধ করে যেমন ভালোবাসি তোমায় খুউব শুনলেই একটা লালজবা ভোর -গোলাপ ঘ্রাণের দুপুর- সপ্তরঙা সন্ধ্যা আর বুকশাদা জ্যোৎস্নারাত হাজির চোখের সামনে...

তোমার কালো তিলের গভীরতায় হারিকেন আলো আর আমি পাঠ করি প্রিয় অধ্যায় সারারাত ধরে...
১৭/০৯/২০১৭; ১০ টা