শিরোনামহীন

জুননু রাইন

১০.
তোমার অন্ধকার এসে যে পাড়ায় আলো ফেলে, আমি তার জোছনার ছায়ায় লুকোনো থাকি। আলো আমার ভাল লাগে না। শহর দেখতে চাইলে- চোখে নাগরিক ধুলো জমে, জমে অপরিশোধিত শ্রমের ঘাম, সবুজের আর্তনাদ আর পোড়া মাটির অসহায় গন্ধ। বন্দরের চিলের উড়ালগুলো তোমায় মেলে ধরে! বন্দর খালি হলে ভরে ওঠে কার জিজ্ঞাসা?
যতবার দেখতে চাই, বুঝতে যাই, ততোবেশি উজ্জ্বল হয় অষ্পষ্টতা।

তোমার প্রথম হাতঘড়ির পুরনো সেই বেল্টটি এখন সাত সমুদ্র বুকে নিয়ে আমার মতো তলানিতে তলিয়ে আছে; তবু আছে- এই জেনে আমার লুকোনো পাড়ায় চাঁদ ওঠো?
আর তোমার আলোয় ঝলসে গেলে তুমি শুধু তার শব্দ নাও!

১১.
এই বর্ষার প্রচ্ছন্নতায় তোমার মৃত্যুর ছাঁট এসে পড়ে
আর আমার ভুলে বিস্ময়ের ফুলগুলো বকুলেই ঝরে
আশ্চর্য হাঁটা, আমারও তেমনই তোমাকে দেখা-
কেবল বিকেলেই দেখা হয়, সুর্যাস্তে দেখা যায়
এভাবে অনেকগুলো বিকেলের পড়ন্ত ফল জমেছে
জমে জমে তোমার উপমায় আরও বড় হয় ঘর।

১২.
তোমার মৃত্যু আসে, একান্ত চুড়ায়, পাহাড়ের ওপরে-
যেখানে আগুন জ্বালো; পৃথিবী বেঁচে থাকে ফুলে-ফলে
সেখানে তোমার কবিতায় আমার গল্প লেখা আছে
যেখানে সাপেরা নিরবতা খেয়ে খেয়ে বাঁচে
সেখানে তোমার ঘুমগুলো রাখা আছে।

১৩.
শরীরে রাত জাগা লেগে আছে
এখন আজানের আগ মুহুর্ত
তোমাকে ভাবতে যাই, আলো-অন্ধকারে
চোখ কয়েক কদম এগিয়ে এসেছে
আমি তার ছায়ার পিছনে পড়ে আছি
নিশ্চুপ শান্ত পুকুরের মৃত্যুতে ভরে ওঠা!

এই প্লাবনে অনেক জল আছে-
চোখ আমাকে কাঁদতে দেয় না
চোখ অনেক সময় নেয়, অনেক দূর যায়!

তারপর হলুদপাতা পুকুরে ঝরে
আমার ঢেউ ভাঙে, সামান্য কম্পনে
রাজনৈতিক পৃথিবী জেগে ওঠে-
অরাজনৈতিক সহিংসতায়।

১৪.
ভেবেছিলাম একদিন কোনো এক রাস্তার চায়ের দোকানে
তোমার পাশে বসব, আমাদের একপাশে বসবে নিরবতা
অন্যপাশে সবুজ-প্রকৃতি, তোমার চোখ দু'টোতে নদী থাকবে
ভালবাসার জল থাকবে, ঢেউ থাকবে-
আমি জোয়ার-ভাটায় তোমাকে ডানে বায়ে টানবো
কিন্তু তুমি তখনও আমার পাশেই থাকবে
পায়ের বুড়ো আঙুলের নখে মাটি খোঁচাবে,
সামনের শূণ্য পথের দিকে তাকিয়ে আরও বহু দূরে
তোমাকে রেখে দিয়ে আমার পাশেই বসে থাকবে।

এমন কথা ছিল না যে, তুমি শুধু বৃষ্টিভেজা ঘাসের গন্ধই হবে, অথবা
ভালবাসার প্রথম সাক্ষাতের অস্ফুট কম্পনের লাল ফুল।

১৫.
নদী তো ডোবে না, পানিতে হাত রেখে দেখো-
ভেঁজে না সে চোখের জলেও।
শুধু ফোঁটায় ফোঁটায় দীর্ঘ হয় শহরের ইতিহাস
মানুষের বিশ্বাসের ইমারত ভেঙ্গে পড়ে
আজানে তোমার ধ্বনি, মন্দির-গীর্জায়
তোমাকে হারিয়ে খোঁজার সুর প্যাগোডায়।

১৬.
আমাদের বাগান ঘেরা বাড়িটির পশ্চিম দিকে
সন্ধ্যা যতদূর একা একা হেঁটে যেতে পারে
দূরের আধমরা নদীতে রাত্রিটার শুয়ে পড়া শেষে
এখানে-ওখানে তোমার মৃত্যুতে ভেসে ওঠা দেশে
আমি খুব একা, একা বন, একা সবুজের ঢেউ।