আমার যে দিন ভেসে গেছে

সৌরাংশু

সকালটা আজকাল আর আমার কথা শোনে না... আকু পাঁকু কুয়াশার কম্বলে মুড়ে শুয়ে থাকে... কতদিন বলেছি ভোর ভোর উঠিস... শীত কাল এলেই চোখ খুলতে খুলতেই ৭টা বাজিয়ে দেয়... সকালটা আজকাল আর আমার কথা শোনে না।
আজ রোববার ছিল... আজ আমার জন্মদিন ছিল না তবু অনেকদিন পর ইচ্ছে হল খেজুরের রস খাবার... খেজুরের রসে বুঁদ হয়ে খেজুর গাছটা যেমন দুলে দুলে ভাসতে থাকে... অনেকদিন পর ইচ্ছা হল আমার ভেসে যাবার... খুঁজে পেতে সিডিটা বার করে শুনতে বসলাম... দেবব্রত বিশ্বাস গাইছেন “আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে...” আমার চোখের জল যে নদী নালা বেয়ে সমুদ্রে মিশে গেল... শুধু আমিই মিশলাম না। তেল আর জল কি মেশে? তার থেকে তো পুড়ে যাওয়া ভাল।
সকাল আটটায়, মেপেমেপে সুরমা দি এলে। সুরমা দি আমার দিদি নয়, সুরমা দি আমার মা তো নয়ই... তবু সুরমা দি আমার যত্ন করে। ছোট ছোট হোমিওপ্যাথির গ্লোবিউলের মত যত্ন... মেপে মেপে নেওয়া যত্ন... সাবধানে রাখি, হাওয়া লাগলে যদি গলে যায়?
আজ সকাল বেলায় পরোটা করতে বললাম... সুরমা দি বারণ করল না, কিন্তু জানি তাতে গাওয়া ঘি পড়বে না। হালকা সানফ্লাওয়ার অয়েলে হয়ত নেড়ে চেড়ে নেওয়া। আমার ভাল লাগে না... মা খুব ভাল পরোটা বানাত... পরোটা আর বেগুন ভাজা... খাস্তা করে ভাজা... সুরমা দি আমায় বেগুন ভাজা দেবে না। জলে সাঁতলানো তেলে সাঁতলান আলু ছেঁচকি... লঙ্কাও নেই হয়তো তাতে... সুরমা দি আমায় লঙ্কাও দেবে না... তেলে জলে মিশ খায় না যে?
দশটা বেজে গেল... এক গান শুনতে ভাল লাগে না। কতদিন ধরে একই গান শুনে আসছি। দাদা বলেছিল একটা নতুন সি ডি দিয়ে যাবে। দাদা সেই যে গেল আর তো এল না। কিশোর কুমার আমার ফেভারিট ছিল। একটা গান শুনতে খুব ইচ্ছে করছিল “আপকি আঁখো কুছ...”। গানটা নেই বোধহয়... গানটা গাইতে থাকলাম... মনে মনে... যে টুকু মনে ছিল... চোখে একটা কুড়ো এসে পড়ল... আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম... নদীর জল ফুরিয়ে গেলেও তেলে জলে মিশ খায় কি?
আমাকে বছর ছয়েক আগে কেউ বলেছিল তোমার চোখ দুটো অন্যরকম... চেয়ে থাকতে পারি না... ঘোর লাগে। তারপর ছ বছর কেটে গেল... আমার চোখে কুড়ো এসে পড়ল আর আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম। সম্পর্কগুলো চোখের পাতার মতো হালকা হয়... পলক ফেলার আগেই উড়ে চলে গেল ইচ্ছাগুলোকে নিয়ে...
ঘুমটা হয় না আজকাল... ঘুম বড় একটা আসে না এদিকে... সূর্য ওঠে নি কিন্তু কম্বলটা সরে গেলে চোখটা পরিষ্কার হয়ে যায়... আমিও আজকাল ঘুমের খোঁজে এদিক ওদিক তাকাই... চোখের ব্যায়াম হয় বটে কিন্তু চোখ দেখে না কিছুই...পলক পড়ে না তার।
দুপুরে একটু স্যুপ চার পিস পাঁউরুটি... একটানা বই পড়তে পড়তে চোখ লাল হয়ে যায়... জবা ফুলের মত... ফুল বড় ভালবাসতাম... সুরমা দিকে বলা যায় না, তাই এদিক ওদিক তাকাই... চোখের ব্যায়াম হয় বটে কিন্তু চোখ দেখে না কিছুই... ফুল আজকাল বড় দেখা যায় না।
একটু ঘুমোবার এক ঘেয়ে চেষ্টা করি... নোটিস আসে আজ আসব না পাঁচ বাড়ি কাজ সেরে মায়ের চোখ দেখাতে যেতে হবে। আমার চোখে ক্লান্তি আসে... ঘুম আসে না। আমার চোখে কান্না আসে... জল আসে না। বাথরুমের কলটা খারাপ হয়ে গিয়ে এক ঘেয়ে শব্দ করতে থাকে সুরে সুরে... টিপ টিপ টিপ। সুরমা দি বাথরুমে পুরনো নতুন কাপড়ে জলেরে দাগ মুছে যাচ্ছে হয়তো...
আগে আমি কবিতা লিখতাম বেশ... আগে আমি গান গাইতাম বেশ... আগে আমি নিজের সঙ্গে অনেক রকম খেলা খেলতাম... লুকোচুরি খেলতে দারুণ লাগতো... এখন আড়ালটা সরে গেছে... বিকেলটা ধীরে ধীরে দূর থেকে দূরে চলে যেতে থাকে... সুরমাদির যাবার সময় হতে এখনো ঘণ্টা দুয়েক বাকি থাকে।
আমার স্মৃতিতে এখনো খান কুড়ি পাতা অবশিষ্ট আছে... শুরুর দিকের পাতাগুলো মসৃণ... শেষে এসে কি রকম হলদেটে হয়ে আসে। আমার স্মৃতি বিভ্রম হয় নি... কিন্তু মন থেকে চাই স্মৃতিগুলো হারিয়ে যাক... আমায় নিয়ে হারিয়ে যাক। সব পাখী ঘরে ফেরে... সন্ধ্যায় ঠাণ্ডাটা জাঁকিয়ে বসে হাড় হিম করা স্বরের মতো। নুয়ে পড়ি সোজা রাখা যায় না নিজেকে... আজকাল সন্ধ্যাকে ভয়ও হয়... প্রদীপের উষ্ণতাই যে শীতল ব্যবহার করতে শুরু করেছে। সুরমা দি হয়তো ডিনারটা দিয়ে চলে যাবে আজ... আর একটু পরেই...
আটটার সময় আরেক বাটি স্যুপ আর হাতে গড়া রুটি নিয়ে আমি ছিঁড়তে থাকি... সুরমা দি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে যায়... চিন্তা কোরো না... সব ঠিক হয়ে যাবে। আমিও ভাবি কয়েকটা দিন... সব ঠিক হয়ে যাবে... ছেঁড়া রুটিগুলোকে জুড়ে জুড়ে জিগস পাজল সাজাতে থাকি আর ঘড়ির কাঁটায় সময় গুনতে থাকি এক দুই তিন চার... সব ঠিক হয়ে যাবে... সব।
রাত সাড়ে নটা... নাইট স্যুটটা পড়ে বেরিয়ে আসি ব্যালকনিতে... ঠাণ্ডাটা বেশ আরাম লাগতে থাকে... বাইরের দিকে তাকাই... কয়েকটা স্ট্রিটলাইট একে অপরের সঙ্গে কাটাকুটি করতে থাকে বাচ্চাছেলেদের মতো... ওদিকের বাড়ি থেকে গানটা ভেসে আসে... মেয়েলি গলায়...দূরে কোথায় দূরে দূরে... আর আমি ব্যালকনি দিয়ে দুহাত ছড়িয়ে এক বুক নিশ্বাস নিই... আহ... বুকটা ভরে যায়। তারপর ডানায় ভর দিয়ে উড়ে যাই বাড়ি বাড়ি সবার খবর নিতে... একটু হাঁফ লাগে... কিন্তু রোববার তো ফুরিয়ে যাচ্ছে... একটু জোরে পা চালাই... একটু জোরে ডানা ঝাপটাই... আহা একটুই তো ইচ্ছে... রোববার তো ফুরিয়ে যাচ্ছে... কাল থেকে আবার দিন গোনা শুরু হবে... আর তো মাত্র কটা দিন... তারপর তো সব ঠিক হয়ে যাবে... সব।।