পানিরঙ

ম্যারিনা নাসরীন

তাবৎ আকাশ যেন রোদের সাথে গলে গলে পড়ছে। পানির শেষ সীমা বলতে কিছু নেই। দূরেকাছে যতদূর চোখ যায় চলন্ত মানুষ, ভেলা, ডিঙ্গি। বানভাসি মানুষের দল। ঝিলপাড় বাজারে আজ ত্রাণ বিতরণ হবে। এ খবর জল পেরিয়ে পৌঁছে গেছে সবখানে। পানি-কাদায় লগি ঠেকিয়ে ঠেলে ঠেলে ভেলাটা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে সফুরা। ওপারের ডাঙ্গা এখনো দৃষ্টির নাগালে আসেনি। এদিকে বেলা ঢলে পড়ল বলে ।ভেলার গতি আর একটু বাড়িয়ে দেয় সফুরা। পানিতে ঝুঁকে নিজের মুখ দেখছিল আলী। নীল হলদে আকাশের বুকে মিশে ওর ঝাপসা প্রতিচ্ছবি ঘোলা পানিতে তির তির করে কাঁপছে । কিন্তু ভেলার গতি বাড়াতে ওর মুখচ্ছবি অজস্র খন্ডে ভেঙ্গে মিলিয়ে যায়। ভেসে থাকা ক্ষুদে ক্ষুদে ফেদি মাছ সটকে পড়ে দ্রুত। খুব বিরক্ত হয় সে মায়ের উপর। এ মা এত্ত জোরে ঠেলিস ক্যান?
সামনে কত মানুষ যাতিছে দেখিছিস? পাছে গেলি আমরা রিলিফ পাবানে?
কি রিলিফ দেবে ওরা? মাগো, বিস্কুট কলাম সব আমারে দিবি।
কি দেবে কিডা জানে? আগে যাইয়ে দেহিতো।
আব্বা আসলি তিনজনে আরও বেশী পাতাম তাই না?
সিডা তোর আব্বা জানে । থামেক, বকবক করিসনে।
কি রিলিফ দেবে সফুরা জানে না। চাল, ডাল, আলু, চিড়া, মুড়ি যা দেবে তাই লাভ। দীর্ঘক্ষণ বাঁশের লগি আঁকড়ে থাকায় দুহাতের তালুতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছে। একটু থামে ও। হাত দিয়ে সুর্য আড়াল করে দূরে তাকায়। এতক্ষণে ঝিলপাড় বাজার আবছা দেখা যাচ্ছে। এতদূর থেকে বাড়ি ঘর গাছপালা আলাদা করা যায় না। এমন মনে হচ্ছে যেন কেউ আনাড়ি হাতে আকাশের কিনারে কয়েক পোঁচ মাটি লেপে দিয়েছে। উঁচু নিচু অসমান সীমানা।
কেমন করে যে সবকিছু বদলে যায়! এই শানবিলে একসময় বর্ষা ছাড়া পানি দেখা যেত না। এখন বারো মাস পানিতে ডুবে থাকে। বর্ষাকালে অথৈ দরিয়া। বানের পানি বেড়ে আশে পাশের কয়েক গাঁয়ের ঘর দহলিজে ঢুকে পড়ে অনায়াসে। গত দুবছর একটু শুকনোই ছিল। এবার বানের খুব বাড়াবাড়ি। কোন বাড়ি শুকনো নেই। কারো ঘরে কোমর পানি কারো বাড়ির চালাটুকু শুধু ভেসে আছে। পানি নামার নামই করছে না। ঘর দোর ছেড়ে গাঁয়ের মানুষ কেউ গিয়েছে শ্রীপুর প্রাইমারী স্কুলে, কেউ তাবু করে পাকা রাস্তায়। সেখানেও পানি ছুঁই ছুঁই। কতদূর আর তারা যাবে? হাঁস মুরগি গরু ছাগল পানির দরে বেঁচে দিয়েছে। এই সুযোগে নৌকা বেয়ে দূর দূরের শুকনো গাঁয়ের মানুষ আসে লাভ কুড়োতে। নৌকা ভরে পানিতে নিমজ্জিত মানুষের গ্রেহস্থালির আসবাব,ছাগল মুরগি নাম মাত্র দামে কিনে নিয়ে যায়। কারো বাড়ি পোড়ে, আর কেউ আসে সেই আগুনে আলুপোড়া খেতে। সফুরার ঘর দিয়ে স্রোত যাচ্ছে তবু ঘর ছেড়ে যায়নি। উপরের চাল আছে। আট জোড়া ইটের উপর দুটো চৌকি তুলে দিয়েছে। দুই চৌকিতে অর্ধেক সংসার বাকী অর্ধেক আলীর বাপের সাথে শ্রীপুর প্রাইমারী স্কুলে। সফুরাকে নিয়ে যাবার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু সে রাজী হয়নি। হোক অভাবের, তবুও বিন্দু বিন্দু করে গড়ে তোলা সংসার। প্রতিটা জিনিসের উপর জীবন সমান মায়া। ওর মত গোঁ ধরে আমিরন বেওয়া, রাশেদা চাচী এমন অনেকেই রয়ে গেছে।
দূরের সারি সারি ভোলা গাছ দেখে সফুরা আন্দাজ করে, কপোতাক্ষ থেকে একটা চওড়া খাল বেরিয়ে এসেছিল এদিকটায়। কারিগর পাড়ার মধ্য দিয়ে নেহালপুর হয়ে শানবিলের বুক বরাবর ঝিলপাড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এখন দরিয়ার মাঝে সেই খাল কোথায় হারিয়ে গিয়েছে । নিশানা পর্যন্ত নেই। ফ্রক পরা বয়সে সফুরা পাড়ার রমিজা আর সোনাভানের সাথে খালে আসতো মাছ ধরতে। ছোট ছোট গর্তে রাজ্যের কুচো চিংড়ি। কিভাবে যেন ওরা মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে যেত। হাত দেবার আগেই ঝটপট ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইত । বালিকা হাত গুলিও কম চালাক নয়। কুচো চিংড়ি দিয়ে কোরোচ ভর্তি করে তবে ঘরে ফেরা। ভাটার টানে খালের পানির স্রোত যখন সুতোনলি সাপের মত তখন ছিল মাছ ধরার আসল মজা। রোদের তাপ বাড়ার সাথে সাথে লুকিয়ে থাকা বাইন,গুঁতে দুপাশের থকথকে কাদার উপর ভেসে উঠত। গুঁতে মাছের কাঁটা কানে বিঁধিয়ে ওরা কতদিন কানের দুল বানিয়েছে! সফুরা দূরের পানির দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় দুকানে গুঁতের দুল ছটফট করছে আর সেই সাথে তিন কিশোরী হেসে গড়িয়ে পড়ছে। ওর মুখ দিয়ে ফিক করে হাসি বেরিয়ে আসে। আলী অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকায়। এই মা হাসিস ক্যান?
কিছুনা বাজান, এমনে হাসি।
আচমকা হাসি মুখ মলিন হয়ে আসে সফুরার। তিন কিশোরীর মধ্যে এখন শুধু সফুরাই বেঁচে আছে। পাঁচ নম্বর বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে গেল বছর সোনাভান মরল। রমিজা গলায় ফাঁস লাগিয়েছে আরও দুবছর আগে। কেন ফাঁস লাগালো সফুরা তার খোঁজ পায়নি। ছিল হয়ত মনের গহীনে কোন কষ্ট। স্বামীর আরও দুই বৌ ছিল চার বাচ্চা। ঠিকমত খাবার নেই, কাপড় নেই । তবে অনেকে বলে ওর স্বামী ওকে মেরে ঘরের আড়ার সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল। এই নিয়ে রমিজার বাপ একাব্বর চাচা গাঁয়ে দরবার ডেকেছিল। তার একটাই কথা,মাইয়ে যদি আমার গলায় ফাঁস দেবে তালি পা মাটিত ঠেকে থাকপে কেন? দরবারের কেউ একাব্বর চাচার প্রশ্নের জবাব দেয়নি তার পক্ষে দরবারের কেউ কথাও বলেনি।
সফুরার বুক ফেড়ে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস বিলের কোথাও হারিয়ে যায়।
রোদের আগুনে শরীর চিড়বিড় করছে। ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে পানির স্রোত অবিরল গড়িয়ে যাচ্ছে। বিলের বুকে ভেসে যাওয়া মানুষ দেখে সফুরা। ওদের মুখের সাথে কিশোরী বেলায় দেখা মুখ গুলো মেলানোর চেষ্টা করে। কোন মিল খুঁজে পায় না। এই মানুষ গুলোর সুখ ছিল শানবিল। যেন দিগন্ত জোড়া ধান ভরা গোলা। কি বিশাল আর অফুরান বিস্তার ছিল ধানক্ষেতের। এই মাথা থেকে পুবদিকে ওমাথা পর্যন্ত দৃষ্টি চালান করলে মাঝ পথেই কোথায় হারিয়ে যেত সে দৃষ্টি। নেহালপুরের উঁচু বাঁধ থেকে পশ্চিম দিকের ওপারের শেখ পাড়ার ঘর বাড়ি গাছাগাছালি ভাল দেখা যেত না।
সফুরা চারদিকের পানির উপস্থিতি ভুলে বারবার কৈশোরে ফিরে যাচ্ছিল। মনশ্চক্ষে ও দুরন্ত চুলে হাওয়া লাগিয়ে ধানী জমির আলে আলে উড়ে বেড়াচ্ছিল। সেখানে আমন বোরো মৌসুমে মাঠ জুড়ে ধান ফুলের বুনো ঘ্রাণ। কদিন বাদেই গর্ভ ফুটে বেরিয়ে আসে থোকা থোকা ধান ফল। শানবিল তখন সবুজ শাড়ীর বেনে বৌ। সবুজে খুব বেশীদিন যায়না তার। বয়স বাড়ে। সবুজ জমিনে সোনালি রঙ ধরে। সোনাফলের ভারে ঝুঁকে পড়ে মা গাছগুলো। হেমন্তের শেষে ধান কাটার সময় ঝুড়ি নিয়ে সফুরাদের দল বেরিয়ে পড়ত ধান কুড়োতে। জমিনে পড়ে থাকা ছড়া ছড়া ধান ছিল সোনার গয়না। খালই ভরে নিয়ে সেসব গয়না উঠানে ছড়িয়ে দিতে দিতে মাকে আবদার করে বলত, মাগো এই ধান শুকোয়ে আমাগেরে পাকান পিঠে বানায়ে দিবি। মা বকুনি দিতে গিয়েও হেসে ফেলে, তোর বাপে পিঠের জন্যি খিরকুনি ধানের আবাদ করিছে না? তোর এই কুড়নো ধান লাগবি?
ধান শূন্য মাঠের সারি সারি নাড়া বিছানো বুকে একসময় শীত বুড়ি চলে আসত হিম পায়ে। শানবিলের রঙ বদলে তখন সোনালী থেকে ধূসরে। আরও কয়েকদিন বাদে কুয়াশার আলওয়ানে জড়ানো ধবল বুড়ি। ভোরের শিশিরবিন্দু নতুন সুর্যে চমকে চমকে একসময় শুকিয়ে যেত। মিঠে রোদের দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সুর্য পশ্চিমে ঢলে যখন লাজ রাঙা তখন বালক বালিকাদের খেলার আসর জমে উঠত শুকনো খটখটে মাঠে। কানা মাছির অত্যাচারে নাড়া গুলো সারি ভেঙে একাকার। সাঁঝ নামলে খেজুর বাকলে শপরা গেঁথে মশাল ঘুরানোর খেলা। আকাশ জুড়ে ফুটকি ফুটকি আগুনের ফুলকিতে তারাবাজির আনন্দ দিক্বিদিক ছড়িয়ে পড়ত। সেসব দিন ছিল আসলে রঙ বদলের দিন। আর এখন মানুষ গুলোর জীবনে শুধু একটাই রঙ, পানি রঙ।
মা দ্যাখ আইসে গিছি। নিজের ভাবনায় তন্ময় হয়ে ছিল সফুরা। আলীর চিৎকারে সচকিত হয়। সামনেই ঝিলপাড় বাজার। বিশাল লম্বা লাইনে মানুষ গিজগিজ করছে। কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে। অনেকের পরনের কাপড় ভেজা। হয়ত সাঁতরে বিল পার হয়েছে। ওদের সাথে আসা বাচ্চাগুলোর বেশীরভাগ হাড় জিড়জিড়ে। শুকনো মুখ বুঝা যায় অভুক্ত। ভেলা ঘাটে লগিতে বেঁধে রেখে নামে সফুরা। হাতে আলীর হাত।
ইউনিয়ন পরিষদের সামনে তিনটে লাইন পায়ে চলা পথের মতে এঁকেবেঁকে বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছে। কিছু লোকের হাতে সড়কি। তারা নিশ্চয় রিলিফের লোক। মানুষের লাইন ঠিক রাখছে। তৃতীয় লাইনের শেষে গিয়ে সফুরার জায়গা হয়। এরপরেও মানুষের পেছনে মানুষ যোগ হতে থাকে, লাইনের দৈর্ঘ্য বাড়ে। আলিকে সামনে দিয়ে নিজে মাটিতে উবু হয়ে বসে পড়ে সফুরা। অল্প বয়সী একজন ছেলে ওর নাম লিখে নেয়। গ্রামের নাম, বয়স, স্বামীর নাম জানতে চায়। সফুরা বয়স বলতে পারে না। স্বামীর নাম মুখে আনাও পাপ! আলীকে ধাক্কা দেয়, বাপের নাম কইস না কেনে? আলী বলে বাবার নাম, ফজর শেখ। ছেলেটি সফুরার হাতে একটি স্লিপ দেয়। স্লিপে কি লেখা রয়েছে সফুরা জানেনা। কিন্তু বুঝতে পারে এই স্লিপে সে একটা প্যাকেট পাবে।
ঝাঁ ঝাঁ রোদের মধ্যে সময় গড়ায়। ঘণ্টার হিসেবে কত হোল মানুষগুলো বুঝতে পারে না তবে পূব থেকে বেলা গড়িয়ে পশ্চিমের বেশকিছুটা অতিক্রম করেছে। আশেপাশের বাচ্চা গুলোর মত আলী ঘ্যান ঘ্যান করে, মা ক্ষিধে নাগিছে বিস্কুট কিনে দে।
সফুরার পেটে রাত থেকে দানা নেই। আলীর কথায় সে অকারণ রেগে যায়,
টেহা কিডা দেবে তোর বাপ? চুপ কইরে থাক। খালি খাই খাই। আলী চুপ করে না।
সেই বেয়ানে দুটো বিস্কুট খাইছি । আমার ক্ষিধে নাগে না?
এবার সফুরা কিছু বলে না আলীকে আর একটু কাছে টেনে এনে বসায় । আলী চোখ মোছে । সেটা মায়ের আদরের জন্য নাকি পেটের ক্ষুধার তাড়নায় বুঝা মুস্কিল। হঠাৎ জমায়েতে চাঞ্চল্য দেখা যায়। সফুরা সামনে তাকায়। ভ্যানে লাল সবুজ নীল রঙের পলিথিন ব্যাগ । চেয়ারম্যান মোজাম আলী মাইকে কিছু বলছে। ভাইসব, আমাকে আপনারা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন । আমি আপনাদের কাউকে অভুক্ত রাখব না, প্রত্যেকে সমান ত্রাণ পাবেন। আমাদের সরকার একজন মানুষকেও অভাবে থাকতে দেবে না। সফুরা সবকথা বুঝতে পারে না। অন্যদের মত ওর চোখও ভ্যানের দিকে। বক্তব্য শেষ হয়। ত্রাণবিতরণ শুরু হয়েছে। একেকজন এগিয়ে যাচ্ছে আর চেয়ারম্যান সাহেব হাসিমুখে তার হাতে একটা ব্যাগ তুলে দিচ্ছে। চারপাশের অনেক মানুষ মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তুলছে । মোজাম আলি সেদিকে তাকিয়ে হাসি বিস্তৃত করছেন। সফুরা উদ্বিগ্ন হয়ে ভ্যানের দিকে দেখে। বুকের মধ্যে ঢিবঢিব করে। ওর পর্যন্ত আসতে আসতে সব প্যাকেট শেষ হয়ে যাবে না তো?
বাপু আমাগেরে একটা দ্যাও, বাবা আমার ঘরে বুড়া মাও তার জন্যি কিছু দ্যাও। অনেকে একসাথে এগিয়ে যেতে চায়। চুপ! এইরাম কইরলে কিন্তুক রিলিফ বন্ধ কইরে দেবানে। চারপাশে শোরগোল চেঁচামেচি লাঠি হাতের মানুষ গুলোর হুমকি ধামকির মধ্যে শরিফার বুকে গুড়গুড় শব্দ ওঠে । আজ কিছু না পেলে কদিনের উপোষ দিতে হবে ঠিক নেই। হাতে আছে আঠার টাকা । পাতলা এক প্যাকেট বিস্কুটের দাম পাঁচ টাকা। প্রায় চার ঘণ্টা বসে থাকার পর পনের মিনিটের মধ্যেই সব প্যাকেট শেষ। অর্দ্ধেকের বেশী মানুষের হাত খালি। আমাগের রিলিফ কই? আমরা কি খাব?মানুষ গুলো শোরগোল করে ওঠে। কয়েকজনের পিঠে দড়াম করে লাঠি বসিয়ে দেয় লাঠি হাতের লোকগুলো। জায়গা খালি কর, জায়গা খালি কর রিলিফ দেওয়া শেষ। মানুষ গুলো আর কথা বলার সাহস পায় না। কিন্তু কেউ জায়গা ছেড়ে যায় না। সফুরা উদাসীন ভাবে বসে থাকে আলীর হাত ধরে। আলীর পেটটা পাঁজরের ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। কিন্তু ও কাঁদছে না। সফুরা আলীর হাত ধরে দোকানে যায়। ভাবে দুখানা বিস্কিট কিনে আলীকে দেবে। দোকানের সামনে আলীর মত কয়েকজন শিশুকে ঘিরে জটলা চলছে। সবার হাতে ত্রাণের ব্যাগ। ওদেরকে নিয়ে কিছু যুবক হট্টগোল করছে মোবাইলে ছবি তুলছে। একজন এসে আলীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। ওর হাতে একটা প্যাকেট দেয়। ওরা বাচ্চাগুলোর চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে,বসে ছবি তোলে। দু আঙ্গুল উঁচু করে। ওরা দু আঙ্গুল আকাশের দিকে উচিয়ে কেন ছবি তুলছে সফুরা বুঝতে পারে না। ছবি তুলতে তুলতে ওরা অনেক কথা বলে যার কোনটিই সফুরা বুঝতে পারে না। ওই মন্টু লাইভ কর, লাইভ কর। দেখিস অন্তত হাজার খানেক ভিউ হইব। ভিডিও কর। আরে সব মোবাইলে ছবি তোলা লাগবো না। সামসু এদিকে আইসা পড়। পরে শেয়ার ইট দিয়া নিয়া নিস। রাব্বি তুই পেজে ছবিগুলা দিয়া দিবি। এডিট কইরা দিস কইলাম। আর সবাইরে মেনশন কইরা দিবি।
ভেলায় বসে আলী প্যাকেট খুলে দেখছিল। সেদিকে তাকিয়ে সফুরার মুখে হাসি ফোটে। যাক, অন্তত একটা প্যাকেট পাওয়া গেল।
বাজান কি আছেরে থইলিতে । বিস্কুট গুলোন বাইর কইরে খা। ক্ষিদেয় দেহ ছাবালের প্যাট কেম্বায় পইড়ে রইছে।
মায়ের দিকে তাকায় আলী। চোখে মুখে তীব্র বিস্ময়,
কিচ্ছু নাই গো মা হুদাই কাগজ।
সাদা রঙের ব্যাগ থেকে আলী একটার পর একটা কাগজ বের করতে থাকে । হরেক রঙের কাগজ। লাল নীল সবুজ, হলুদ...।
আলি কাগজ গুলো উড়িয়ে দেয়। সেগুলো ধীরে ধীরে পানির বুকে ফিরে আসে। ভেলার পাশাপাশি ওরাও ভাসতে থাকে। আলি মায়ের কিনে দেওয়া নাবিস্কো বিস্কিট খাচ্ছে। ওর মুখের চারপাশে বিস্কিটের গুড়ো। ছেলের দিকে তাকিয়ে সফুরা হাসে, পানি কতটা নাইমা গেছে দেখিছিস বাজান?
আলী মুখ ভর্তি বিস্কুট নিয়ে চোখ বড় করে মায়ের দিকে তাকায়। সফুরার আচমকাই মনে হল, ছেলেটার চোখের হাসিতে এত রঙ!