বাইপোলার ডিসঅর্ডার

জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী

— কেমন আছ?
— আমি একটুও ভালো নেই। জীবন বলতে শুধু দীর্ঘশ্বাসের ক্ষমতা, প্রেম বলতে শুধু অস্থিচর্মমেদ, আদর্শ বলতে শুধুই অহেতুক যুদ্ধ। তুমি?
— আমি? আমি খুব ভালো আছি, জানো! এখন একটা সূর্যমুখী ফুলে মোড়া সবুজ উপত্যকায় বাস করি। এখানে সূর্য খুব নরম মনের, আমায় অত্যন্ত স্নেহ করে, আলো দেয় কিন্তু ঝলসায় না। দুটো পাইন গাছের মাঝে আমার ছোট্ট বাসা, ঠিক দশ হাত পেছন দিয়ে একটা বেণিবাঁধা কিশোরীর মতো শান্তশিষ্ট নদী বয়ে যাচ্ছে মৃদুমন্দে। রাতের নিবিড় চাঁদ প্রেমিকার অভাব টের পেতেই দেয় না।
— আর আমি মানুষের করোটি দিয়ে ঢাকা, পশুর অসহায় আর্তনাদে অভিশপ্ত একটা উপত্যকায় আছি। এখানে মাথার ওপর সূর্যদেব নেই, ধর্ম আছে পরিবর্তে; যা আলোর বদলে আগুন দেয় শুধু। শ্বাপদসংকুল এক অরণ্যে আমার বাস, যাকে এরা ‘নগর’ বলে; আমার বাড়ির ঠিক দশ হাত সামনের চওড়া সড়ক দিয়ে ধীর লয়ে বয়ে যায় অসহায়ের আঠালো রক্ত। এখানে চুম্বন অর্থে বিষ, বিশ্বাস অর্থে কাতানের ভোঁতা ধার।
— কিন্তু, তুমি তো খুব সুখে ছিলে আমার সাথে। মনে পড়ে, আকাশগঙ্গার তারা গুনে, ভোরের ভেজা শিউলি কুড়িয়ে, আর বালিয়াড়িতে খেলার ছলে লড়াই করে আমাদের দিনগুলো কেটে যেত নিষ্পাপ?
— হ্যাঁ ভাই, জুঁই ফুলের সুবাসের মতো ক্ষীণভাবে ভেসে আসে তোমার স্মৃতি কখনো। তারপর একদিন তুমি গেলে, নারী এলো জীবনে; সাথে এলো লালসা, ঘৃণা, দ্বেষ। এদেশে প্রেমের শাস্তি কুম্ভীপাক, বিশ্বাসের শাস্তি রৌরব, উদারতার শাস্তি অন্ধকূপ। ওঃ সে যে কী কষ্টের!
— একটু কষ্ট সয়েই নাও না! কষ্ট পেলে আমায় ভেবো; দেখবে কোনো অলীক হাত এসে তোমার ক্ষতে বেদনাহারী নির্যাস বুলিয়ে দেবে, সমস্ত গ্লানি শরীর থেকে সরিয়ে নেবে পোশাকবদলের মতো করে। জানো তো, যখন শীতে পাতাঝরার শব্দ শুনি, বাসি ফুলের গন্ধ পাই সন্ধ্যেবেলায়, রাজপথে বিড়ালের থ্যাতলানো মাথা দেখি, টোকো দুধের স্বাদ আর বয়সের স্পর্শ পাই কখনো; তখনও মনে হয় যে বেঁচেই তো আছি।
— আর আমি যখন নবজাতকের প্রথম কান্না শুনি, অসময়ে বৃষ্টি হলে সোঁদা মাটির ঘ্রাণ ভরে নিই ফুসফুসে, লালচোখো কোকিল দেখি বসন্তের কোনো বৃক্ষে, অমৃতের আস্বাদ করি কিম্বা প্রেয়সীর ছোঁয়া পাই; তখনও কেন জানি মনে পড়ে যে একদিন ঠিক চলে যেতে হবে।
— মনখারাপ কোরো না। মনে রেখো, তুমি আর আমি অভিন্ন, একমেবাদ্বিতীয়ম ব্রহ্ম। তুমি আছো তাই এতো সুখ আমার।
— হ্যাঁ, তুমি আছো বলেই জগতের সমস্ত দুঃখে কেবল আমারই অগ্রাধিকার। তবে এই আশাতেই বেঁচে আছি যে একদিন তুমি ফিরে আসবে আমার কাছে, আমার বুকে। নিজের জন্য, আমার জন্যও, সুখে থেকো প্রিয় মন। এই মস্তিষ্ক শুধু তোমারই প্রতীক্ষা করবে, চিরটাকাল ধরে!