তুমি নইলে পাতাল ভুবনেশ্বর

তন্ময় ধর



সে পথে দৃশ্যলোকে যেন অজন্তার শিল্পীর তুলি নয়নের সৌভাগ্য এঁকে চলেছে। হিমেল হাওয়া মাখা পাখির ডাকে যেন নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেতারে দরবারী কানারা বাজছে। দীর্ঘ পথ। চির-গাছের ছায়া আর মেঘের কণাদের আতিথেয়তা মাখতে মাখতে মনে হয় এ পথের দৈর্ঘ্য আরো বাড়ুক। পথের এক একটা বাঁক ঘুরলেই ঘন নীল আকাশপটে ভেসে ওঠে পবিত্রতম সাদা বরফে মাখা শৃঙ্গরাশি। সেই বরফ-মাখা আলোর ফিসফাস শুনতে শুনতে ভুলেই যাওয়া যায় নিজের সমস্ত দুঃখদারিদ্র্য। এখানেই পথের পাশে মুক্তেশ্বরে বসে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন কিছু ঐশ্বরিক কবিতা। পৌরাণিক কাহিনিতে এখানেই দেবাসুরের যুদ্ধের অস্ত্রচিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে পথের পাশে। মহাকালের জপের মালায় না-থাকা এক সময়ের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। অনেক পেছনে বহু নীচে পড়ে থাকা মানুষের সংসারের কোলাহল আর উত্তাপ থেকে বহূদুরে এক অলোকসামান্য পথে। কাঠগোদাম বা হলদোয়ানি থেকে যারা গঙ্গোলিহাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন, তাদের জন্য তিনটি বিকল্প পথ আছে। রামগড়-মুক্তেশ্বর হয়ে একটি রাস্তা, ধানাচুলি-নাটাডল হয়ে একটি রাস্তা, ভীমতাল-আলমোড়া-বেরিনাগ হয়ে একটি রাস্তা। প্রতিটি পথই অতুলনীয় সৌন্দর্য্যে ভরা। পাহাড়ী ফুল- ফল- অরণ্য- ঝর্ণা- বরফের ছোঁয়ার পাশাপাশি প্রস্তরযুগীয় গুহাচিত্রও চোখে পড়ে যেতে পারে, তেমনভাবে চোখ মেলে রাখলে। স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যমাখা পাখিদের কলকাকলির পাশ দিয়ে ছুটে গেল ত্রস্ত সোনার হরিণের দল। এমন অপার্থিব পথে একটাই ত্রুটি, পথের খাবারে বড্ড তেলমশলা, রন্ধনপ্রণালীর দুর্বলতায় স্বাদও তেমন ভাল নয়। ছোটখাট জলখাবারে সমস্যা নেই- পকৌড়া, পরোটা, বরফি-সিঙ্গোরি ইত্যাদি বেশ স্বাদু এবং লোভনীয়। তবে ঠিকঠাক রেস্তোরাঁ-দোকান খুঁজে নিতে হবে। পথের এমন অংশও আছে যেখানে টানা ৩০ কিলোমিটার গাড়ি ছুটলেও কোন দোকানের দেখা মিলবে না।
ছাড়ুন তো খাবারের কথা। পথের খাবার ডেকার্স লেনে- চৌরঙ্গী রোডে- গড়িয়াহাটে- হংকং মার্কেটে-সিটি সেন্টারে আপনি ঢের খেয়েছেন। সুতরাং লোহা খেয়ে লোহা হজম করা পেটে গামছা বেঁধে আপনি এগিয়ে চলুন। পৌঁছে গেছেন আপনি গাঙ্গোলিহাট। শীতের হাওয়া-মাখা পাহাড়ের ছোট ছোট গ্রামে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে উঠছে। বড় শান্ত শহর এই গাঙ্গোলিহাট। সে কোন এক অতীতে আমাদের বঙ্গভূমির জনৈক গাঙ্গুলিমশায় কোন এক হাটের কালীমাতাকে তুলে এনে এখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই থেকে শহরের নাম গাঙ্গোলিহাট। শহরের কেন্দ্রেই সেই ‘হাটকালি’মাতার মন্দির। আবার কেউ বলেন, সরযূ ও রামগঙ্গা এই দুই গঙ্গা হিমালয়ের গলায় এখানে মালার (স্থানীয় ভাষায় ‘আওয়ালি’) মতো শোভা পাচ্ছে বলে, এ স্থানের নাম ‘গাঙ্গোলি’( গাঙ্গ+ আওয়ালি)। সে নাম যেভাবেই আসুক, এই শহরের আশেপাশে অতুলনীয় কয়েকটি গুহামন্দির রয়েছে- শৈলেশ্বর, মুক্তেশ্বর, ভোলেশ্বর এবং পাতালভুবনেশ্বর। সর্বশেষ মন্দিরটি অবশ্য দর্শনীয়। হিমালয়ে এত ঐশ্বর্য্যময় গুহা আর দু’টি নেই। প্রকৃতির ভূ-রাসায়নিক ক্রিয়ার এক চূড়ান্ত আর্ট গ্যালারি এই গুহা। অষ্টম শতাব্দীতে শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য এই গুহা পুনরাবিষ্কার করেন।
শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে চির-গাছের ছায়ায় ঢাকা অপরূপ এক পথের ধারে শান্ত এই গুহামন্দির। সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১৩৫০ মিটার উচ্চতা। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, কী অত্যাশ্চর্য্য সম্পদ লুকিয়ে রয়েছে এই ভূমিগর্ভে। সকালে সাড়ে সাতটায় আপনি পৌঁছে গিয়েছেন। গুহার দ্বার তখন বন্ধ। পাশে নোটিশ বোর্ডে লেখা রয়েছে- সকাল আটটায় খুলবে। শীতকালে দরজা খোলা হয় আরো পরে, সকাল ন’টায়। বিকেল পাঁচটা অবধি খোলা থাকে এই মন্দিরদ্বার। প্রবেশমূল্য ৪০ টাকা, গাইডের দক্ষিণা সমেত। পূজা দিতে চাইলে নিজের দায়িত্বে ফুল-ফল-ধূপ-দীপ নিয়ে যেতে হবে এবং নিজ ক্ষমতায় পুজো দিতে হবে। সাহায্য করার জন্যে কোন পান্ডা-পুরোহিত-সন্ন্য সী এখানে মিলবে না।
কখন আটটা বাজবে?- গুহাদ্বারের সামনের বেঞ্চে আপনি যখন অপেক্ষা করবেন, তখন পৌরাণিক কথকতার রেকর্ড অবিরাম বেজে চলবে আপনার পাশে। এই পৃথিবীর সংসার কত অনিত্য, জীবনের পথে আমাদের যাত্রা কত ক্ষণস্থায়ী- তা একের পর এক কাহিনির মধ্যে দিয়ে ব্যাখ্যা করা হবে মধুর সঙ্গীত-বাদ্য সহযোগে।
সেসব শুনে আপনার অস্তিত্বের ভেতরে যখন গুঞ্জন উঠতে আরম্ভ করেছে- ‘কস্ত্বং কোহহং কুতঃ আয়াতঃ/কা মে জননী কো মে তাতঃ/ইতি পরিভাবয় সর্বমসারং/ বিশ্বং ত্যক্ত্বা স্বপ্নবিকারম’ ঠিক তখনই খুলে যাবে গুহার দরজা। স্থানীয় গাইড এসে উপস্থিত হয়েছেন। টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে সংকীর্ণ গুহাপথে পা রাখতে হবে। ওপরে-নীচে-ডাইনে-বামে শুধুই পাথর। শিকল ধরে ধরে কোনক্রমে ঘষটে ঘষটে পিছলে পিছলে সুড়ঙ্গের ভেতর নামা। প্রায় মাতৃগর্ভের প্রসবনালীর ভেতর দিয়ে দ্বিতীয়বার ভূমিষ্ঠ হওয়ার মতো। পেছন থেকে এক পরমাসুন্দরী দিব্য স্ত্রীমূর্তি আপনার ঘাড়ে প্রায় পা রাখছেন। ‘ম্যাডাম, প্লিজ একটু দেখে পা রাখুন, আমি মোহমুদ্গর শুনে গুহায় ঢুকেছি, গীতগোবিন্দম শুনে নয় যে ‘দেহি পদপল্লবম উদারম’ বলে সামাল দেব...’। ‘স্যরি, স্যরি’ বলে’ বগলের গন্ধে-ঘামে ভেজা ওড়নাটা তিনি আপনার নাকে সামনে ঝুলিয়ে দিলেন। এরপর কি বলবেন আপনি? ‘হে শেষনাগ, আমারে তুমি অশেষ কোরো না, আমারে তোমার পেটের মধ্যে টেনে নাও’। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী শেষনাগের পেটই হল এই পাতাল ভুবনেশ্বর গুহা। সেই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে প্রায় চল্লিশ ধাপ সিঁড়ি (নামেই সিঁড়ি, আসলে ভয়ংকর এবড়োখেবড়ো পাথরখন্ড) নেমে খানিকটা খোলামেলা জায়গা। খোলামেলা মানে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায়। ভূমিতল থেকে প্রায় ৩০ মিটার নীচে। তার চারপাশে আলো-অন্ধকারে নানা রহস্যময় হাতছানি। ‘ইসস, আপনার লাগে নি তো?’ সেই দিব্য স্ত্রীমূর্তি আপনার ঘাড়ের কাছে দিব্য নিঃশ্বাস ফেললেন। আপনি চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, তাঁর আনন শ্বেতবর্ণ, নেত্র কৃষ্ণবর্ণ, অধরপল্লব আরক্তিম ও করতলদ্বয় তাম্রাভ। ভুবনমোহিনী আপন মহিমায় দ্যাবাপৃথিবী ও সৃষ্টির মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন। তাঁর পদভারে এই রসাতলের গুহা প্রকম্পিত হচ্ছে। ‘ইয়ে...মানে... ওরকম তো হয়েই থাকে...’ আপনি ছিটকে সরে এসে গাইডের পাশে দাঁড়িয়ে জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞের কাহিনি শুনতে লাগলেন।



এরপর গণেশের মাথা কাটা যাওয়ার কাহিনি, সমুদ্রমন্থনের কাহিনি, পবননন্দনের পাতাল অভিযানের কাহিনি- ভূ-রাসায়নিক স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাকটাইটের মধ্যে মিশে থাকা পৌরাণিক কল্পনার ভিতর দিয়ে চলতে চলতে আবার আপনার চোখ পড়ে গিয়েছে সর্ববিরাজমানার চোখে। ‘সত্যিই আপনার লাগে নি তো?’ আবার এগিয়ে এলেন তিনি। হায় স্ট্যালাকটাইট! হায় স্ট্যালাগমাইট! হায় ক্ষুদ্র মানুষের জীবন! ইনি যেভাবে আপনাকে চেপে ধরেছেন, তাতে তো ‘ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম’ বলে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সমেত এঁর চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া আপনার গতি নেই।
কিন্তু হঠাৎ আপনার চোখে পড়ল কালভৈরবের ওলটানো জিভের বিপরীতে এক রহস্যময় রাস্তা চলে গিয়েছে মথুরার দিকে। ব্যস, আপনি জাস্ট অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন। কত যুগ-যুগান্ত ধরে চুনাপাথরের গুহায় জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে বালি, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হওয়া এক অপার ঐশ্বর্য্যের ভেতর দিয়ে আপনি চলতে লাগলেন। জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে আজো। খানিকক্ষণ হাত পেতে থাকলে হাতেও খনিজ স্তর জমে যাবে। জীবন থেকে জীবনে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, জন্ম থেকে পুনর্জন্মে জল চুঁইয়ে পড়ছে। ভূতাত্ত্বিক সময়সারণীতে প্রিক্যাম্ব্রিয়ান-ক্ াম্ব্রিয়ান যুগের সন্ধিক্ষণে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৫৪ কোটি বছর আগে গঙ্গোলিহাটের এই পার্বত্যশিরার জন্ম। জলে পা ভিজিয়ে, ঠান্ডা পাথর ছুঁয়ে ছুঁয়ে, সেই শেকল ধরে আবার সেই জন্মযন্ত্রণা নিয়ে গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন আপনি।
সূর্যবংশীয় রাজা ঋতুপর্ণ এই গুহা আবিষ্কার করেন। বিদর্ভরাজ নলকে হিমালয়ে আত্মগোপনে সহায়তা করতে এসে ঋতুপর্ণ শেষনাগের দেখা পান। শেষনাগই রাজাকে গুহায় এনে এর অপার ঐশ্বর্য্য দেখান। কিন্তু সে সংবাদ বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছায় নি। গুহা ঢাকা পড়ে রইল বিস্মৃতির অন্ধকারেই। ঐতিহাসিক যুগে শঙ্করাচার্য্য এই গুহা আবিষ্কার করেন সে তো আগেই বলেছি। পাতালগুহার বাইরে দাঁড়িয়ে আপনি আকাশপাতাল ভাবছেন, মহাভারতের যুগে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর নাকি বন্ধ হয়ে গিয়েছে এই গুহার ‘রণদ্বার’, রামায়ণের রাবণবধের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছে গুহার ‘পাপদ্বার’। এখন শুধু খোলা রয়েছে ‘ধর্মদ্বার’ এবং ‘মোক্ষদ্বার’। কি এই পাপ? আর্য রামচন্দ্রের কৃষিসভ্যতার সাথে রাবণের সুবর্ণলঙ্কার শিল্পসভ্যতার সংঘাতে কি পাপ ফুটে উঠেছিল? নাকি পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্য আর্যগরিমার সাথে মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড়ীয় সংঘাত? সংস্কৃত ‘পা’ ধাতু থেকে ‘পাপ’ শব্দটির উৎপত্তি, অর্থ- রক্ষা করা যায় না যা থেকে। কি থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না? ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না। ঠিক তখনই ‘এক্সকিউজ মি। সত্যিই আপনার ব্যথা লাগে নি তো?’ কার যেন জন্মান্তরের দীর্ঘশ্বাস ফুঁপিয়ে উঠল পাশের পাইনবনের আলো-ছায়ায়। আপনি অনুভব করলেন, জোর খিদে পেয়েছে।