স্বরবর্গ

অভিষেক ঝা

খুব নরমেই নামে এসব সন্ধ্যা।খানিক দূরের জিভ বের করে নাগাড়ে লালা ঝরিয়েও এক চুরুক ঠাণ্ডা না পাওয়া কুকুরের দুপুর, বা, খানিক কাছের তিসির পিঠার পেটের ভাপ ছাড়া বিকেলের ফেলে যাওয়া খাতে যে তিশকিন রঙ লাগছে তা টের পায় এ বাড়ির পেছনের বাগানের এককোণে থাকা ধ্যারাশ লম্বা ওয়ালনাট গাছটার সবচেয়ে উপরে থেকে রোদতিক্ত হওয়া পাতাটা। ওয়ালনাট গাছটা এ বাগানের বাকিদের সাথে কি করে ইয়ারানা নেভায় তা ভাবলে খানিক গুড়ুম হতে হয় বটে । যৌনগন্ধী কাঁঠাল , কাঁচামিঠা , জাম, কুল, লখনা, খানিক দূরের পিতোনিয়া, কাগজি লেবু, খুব কাছের পেয়ারা, অতসী, ভোর বেলা সব ফুল চুরি হয়ে যাওয়া টগর, নিম, বৃহদাকার শিশু, বাতাবিলেবু, পেঁপে , সজনা, ল্যাটল্যাটে মাদার, এদের সঙ্গে ওয়ালনাটটাও কেমন করে যেন একসাথে আছে সেই কবে থেকে । তার সরলবর্গীয় ঘ্যাম আজকাল এই আলফাল দিয়ারার ক্রান্তীয়দের সাথে থাকতে থাকতে খানিক কমেও গেছে । নইলে দুই বার বন্যার জল জমল গোড়ায়, থাকল প্রায় মাস দুয়েক । তবু সে মরল না, যেন মরে গেলেও খুব একটা তাকে বা তার মৃত্যু নিয়ে মাথা ঘামাবে না এ বাগানের বাকিরা, তাই...। তার বিশ্বাস ওয়ালনাট গাছটার মাথায় চড়তে পারলে, তিনপাহাড় ছাড়িয়েও ছোটনাগপুরের অনেকটা দেখা যাবে। সামনে চিকচিকাবে জানোফা রঙা জল। গঙ্গা না ফুলহর, এতদূর থেকে আলাদা করা যাবে না । এতদূর থেকে সে যেমন আলাদা করতে পারে না তার আর আমার ভিতর। আমিও যেমন ঠিক ঠাওরাতে পারি না এতদূর থেকে কোনটা আমি আর কোনটা সে।
এসব লাল মেঝে আর কড়িবর্গাদের সংসারে লালাভ দুপুর এক জানলা বন্ধ আর পরতের পর পরত খুলতে থাকা ঘরের ভেতর সব ভিতর-ঘর নিয়ে আসে । ঘুলঘুলি দিয়ে যে টুকু সামাজিক আলো আসার বাধ্যতা রয়ে যায় সেখানে সামাজিকতার চলাফেরা অনেকক্ষণ পরপর উল্টোন মানুষের ছায়ার মত লাগে । আমি জানি খুব বেশি হলে একটা কুকুর জিভ বের করে জানলার বাইরে সারা দুপুর জুড়ে লালা ঝরিয়েছিল শুধু । সে ভয় পেতে থাকবে কখন তার খিল দেওয়া দরজায় টোকা দিয়ে ঘর ভেঙে বাড়ি ঢুকে পড়বে । তখন আমাকে হয় গল্প শুনতে হবে , বা গল্প শোনাতে হবে , বা গল্প করতে হবে । আমার ইচ্ছে করছে না এখন কোনটাই । “মাধব, বহুত মিনতি করি তঁই” এর পাশে যে কেউ কি করে যে লেখে “থাপড়ে সৌমীর গাল ভেঙে দিতে হয়”, কে জানে ? যেমন সে জানে না সেদিন নিয়ে তিনদিন ব্রেক্সপিপ্রাজোল খায়নি আমি, “বাবা, একটা ওয়ালনাট গাছ এনে দাও, এনে দাও” করে ঘ্যানঘ্যান করে ফল মিলেছে । আজ বিকেলে লাগাব রোদ পড়ে এলে । সে জানে এ বাড়ির যারা মরে যায় তারা এই ঘরে ছবি হয়ে থাকে । বই, খাতা, হলদে হ্যান্ডবুক, জমির দলিল, বাগানের পর্চা এদের সাথে এই ছবিগুলোও এ ঘরের স্থায়ী বাসিন্দা ... নিঃশ্বাসও নেয়। আমার বয়স আর তার বয়স এখন প্রায় পিঠোপিঠি। এ ভিতর-ঘরে আমার তাকে খুঁজতে আসার সময় সেই ভালো লাগা ঢিবঢিবটা পায়ের নখে বয়ে যায়, লাজু কামালকে দেখার জন্য যখন সে শুশুকের মত রোদ পিছলানো মাঠ আর বাগান কে বাগান লাফা করে ঢুকে পড়ত মোমিনটোলায় । আমার চোখ সে কোনওদিন দেখে নি, দেখলে জানত তার চোখে লাজু কামালের ছায়া পড়ে এখন, যখন সে “ সেই আদি যবে অসহায় নর নেত্র মেলি ভবে” এর পাশে “আমার সমস্ত কবিতার বই অনামিত্রকে দিয়ে গেলাম” দেখতে থাকে । আমি চারপাশে কোনও অনামিত্রকে চিনি না ।
রাত্রিই গল্প শোনা ও শোনানোর সময় সেই কবে থাকে। তাই গল্প হতে হলে একটি সুগভীর রাতের প্রয়োজন । আমি তার কাছে তার ছোটবেলার গল্প শুনতে চাইতাম সেইসব রাতে যেখানে সে নিজেকে আমার নামে ডাকত । আমি কাঁচামিঠা আমের দুপুরের গল্প শুনতাম।আমি লাজু কামালের গল্প বলতাম তাকে। সে বলত, “ আমাদের একটা ঘর ছিল যেখানে খালি মরে যাওয়া মানুষদের ছবি তারা যখন বেঁচেছিল তখনকার । খালি লুসিপিসির একমাত্র ছবিটা ছিল লুসিপিসির মৃতদেহের... আমি জন্মানোর আগেই লুসিপিসি মরে গিয়েছিল... আত্মহত্যা করেছিল সম্ভবত ... লুসিপিসির ছিল অনেক...”