একটি নিয়েণ্ডারথাল জাতীয় প্রেমের ও হোমসেপিয়েন্স জাতীয় ত্যাগের গল্প

বহতা অংশুমালী

সিমির একটা কুকুর ছিল, লিপি। যদিও "লিপির একটা কুকুর ছিল সিমি" বললে বেশী মানাতো । কিন্তু নামগুলো না ওরকমটাই ছিল। সিমির একটা দুঃখ ছিল । তেমন তেমন দুঃখ নয়। এই যেমন দুঃখ অনাথ আশ্রমের কাছের রাস্তাটায় পলাশ ফুলের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটু একটু করে রোজ বুকে কামড়ায়, তেমনটা। ষোলোটা বছর ধরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সিমি , কিন্তু একজন হোমোসেপিয়েন্স সন্তানও এখনো সেই নিঃশ্বাসকে দ্রুত করে দেয় নি একবারও। তাহলে কি সিমিকে দেখতে খারাপ ? তা কেন? বেশ ভাষা ভাষা চোখ। ধনুকের মত ভুঁরু। আর অভিমানে বেঁকে ওঠা ঠোঁট। তাহলে মুশকিলটা কি? মুশকিল এই যে, সিমি হোমোসেপিয়েন্স আর নিয়েণ্ডারথাল শব্দগুলোকে খুব সিরিয়াসলি আঁকড়ে ধরেছে কিনা। কানে দুল পরা, বাইক চালানো যতগুলো ছেলে আকুলিয়ে ব্যাকুলিয়ে সিমিকে কিসব বলতে আসে, সিমি স্টেপ কাটা সাপের মতো চুলে ঘেরা মুখটাকে কেমন যেন মেডুসার মতো বানিয়ে ফেলে তাদের বরফ করে দেয় । বেশী বেশী পিছু নিলে লিপির চেন আলগা করে সিমি লিপিকে বলে, "ওই বেটা নিয়েণ্ডারথালটাকে ধর !" লিপিও মজা পেয়ে ধেয়ে যায়! এর পরে আর কোনজন প্রাণে ধরে সিমির ধারে কাছে আসে? বসন্ত দিনের শেষে হায়, সারমেয় দাঁত কে বা চায়?

লিপির এই এক মুশকিল । সে জাতে ককার স্প্যানিয়েল । আর সে যে সাত বছরের ভরা যুবতী তা তার মালকিন বোঝে না। লিপি মালকিনের মতো অত পেডিগ্রির ধার ধারে না । সিমি যখন পার্কের পাঁচিলে বসে বসে কিসব ছাইপাঁশ কবিতার বই পড়ে, কতগুলো রাস্তার বীর কুকুর সিমির কটাক্ষ অগ্রাহ্য করেও যে লিপির পিছু নেয়! নাসারন্ধ্র ফুলিয়ে ফুলিয়ে তারা আসে। সিমি কি একবারও হায় লিপিকে একটু চেন আলগা করে? বছরে দুবার একটা বাড়িতে একটা ভয়াবহ এলসেশিয়ানের কাছে এবং একটা বদমেজাজী স্প্যানিয়েলের কাছে লিপিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । তা লিপি তাদেরকে একেবারে পাত্তা দেয় নি। কেনই বা দেবে ? পলাশ ফুলের রাস্তায়, বিকেল বেলা ওরকম সব করুণ প্রোলাতারিয়েত চোখ থাকতে, এক একটা ধুমসো ধর্ষক মার্কা কুকুরের বীজ বহন করতে কোন সুন্দরী কুমারীর ভালো লাগে? ওদের কি একটা ইয়ে বলে ইয়ে আছে ? পরের বার নাকি একজন বুলডগের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে । নাহ, লিপি ঠিক করেছে যে সে যোগিন হয়ে যাবে । একা একাই কাটাবে বর্ষা এবং বসন্ত কাল । আর সিযোফ্রেনিক বুড়ি কুকুরদের মতো নিজের না হওয়া সন্তানের জন্যে মাটি খুঁড়বে পার্কে। তবু অমন "দুষ্ট স্পার্ম" কে সে নিজের ডিম্বাশয়ে স্থান দেবে না। (জনৈকা বিখ্যাত লেখিকার ভাব ও ভাষা ধার করেছে লিপি। লেখিকা সিমির খুব প্রিয়। লিপি কি সিমির বইগুলোও পড়েছে? সিমি মাঝে মাঝে জোরে জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়ে অবশ্য। লিপি সেগুলো বসে শোনে নিশ্চই।)
সিমির আবার একটা আংটি আছে, আর্চিজ থেকে কেনা । তাতে ঘন নীল সমুদ্রের রঙ্গের একখানা ক্রিস্টালের ঠাণ্ডা হার্ট ধুকপুক করে। অঙ্ক করতে করতে, আর পিট সিগারের গান শুনতে শুনতে সিমি আংটিটায় মাঝে মাঝে চুমু খায়। লিপি দেখে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না । মালকিন অতি ছেলেমানুষ । কোন বীরপুরুষ কস্মিনকালে ওরকম একটা আংটি পরবে? হ্যাঁ? সিমি নাকি ঠিক করে রেখেছে যে, একটা মনের মতো হোমোসেপিয়েন্স পেলে, যে কিনা কবিতাও বোঝে, আবার অংকও বোঝে, আর যে কিনা পলাশ ফুলের কাছাকাছি বসে একটুক হাত ধরতে পারলেই সন্তুষ্ট হয়, ততোধিক বর্বরতায় লিপ্ত হয় না, এমন একজন দুষ্প্রাপ্য হোমোসেপিয়েন্স খুঁজে পেলে, সিমি তাকে ওই আংটিখানা পরিয়ে দেবে। মরণ! লিপি দেখে আর হাঁচে। কুকুরদের হাঁচি মানেই হাসি! সিমির ঠাকুমা বলে ওঠেন , "জীব জীব" । লিপি আড়চোখে দেখে, আর আঁচ করার চেষ্টা করে, সিমি ঠিক কেমনটি চায়।
এরইমধ্যে একদিন সিমির পড়ে গিয়ে জোরদার পা ভাঙল । একটা ডানা ভাঙ্গা চড়াই পাখি গাছের ডালে আটকে ছিল। সিমি তাকে বাঁচাতে গিয়ে পেয়ারা গাছের মগডালে চড়তে গিয়ে, এক্কেবারে ধপাস। সিমি খুব কাঁদলো। লিপি আরো কাঁদলো। এখন চড়াই পাখির আর সিমির একসঙ্গে চিকিৎসা চলছে। কিন্তু লিপিকে কে এবারে কে হাঁটতে নিয়ে যায়? পাশের বাড়ির পুপুল একটা বুলডগ পুষেছে। পুপুল ক্লাসের ফার্স্টবয়। হোমো সেপিয়েন্স বটে, তবে সিমির ওকে কেমন যেন ফিউচারিস্টিক বলে মনে হয়। গান টান শোনে না। খালি গাঁগাঁ করে পড়ে। মানে পাতে দেবার মতোন নয় । তার উপরে পুপুল মুখে ট্যালকম পাউডারও মাখে মাঝেমাঝে। সে যা হোক, এই পুপুলকেই খবর দিলেন সিমির বাবা। পুপুল লিপি এবং বোতামকে (বোতাম পুপুলের বুলডগের ফিউচারিস্টিক নাম), হাঁটতে নিয়ে যাবে । পুপুলদের একটা ম্যাথসক্লাব আছে। ম্যাথস্ক্লাবের ক্যাবলা ক্যাবলা কৈবল্যলোভী সদস্যরা পার্কে বিকেলে একসঙ্গে বসে, ঘাসের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কিসব জানি ভাবে আর কিসব জানি বলে। মাঝে মাঝে একটু ক্রিকেট খেলে বটে। ফুটবল একেবারে খেলে না ।
সিমি সারাদিন বোর হয়। বিকেল বেলা গভীর দুঃখের সঙ্গে লিপি তাকে ছেড়ে হাঁটতে যায়। তবে আশার কথা এই যে, সিমির পা আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাচ্ছে। আর দুদিন বাদে দুই বান্ধবী আবার একসাথে। কিইই মজা! এমন সময় একদিন বৈকালে! পুপুলের সাথে বেরোবার পরে হঠাৎ লিপিকে কি করে জেন আর খুঁজেই পাওয়া গেল না। খোঁজ খোঁজ খোঁজ ! সিমি চড়ুই পাখিকে উড়িয়ে দিয়ে, গিল্ট ফিলিং এ গোলাপী হয়ে গিয়ে ফোঁপায় আর এধার ওধার ফোন করে। পুপুল খুব লজ্জায় মাথা নাড়ছে । লিপির চেন আলগা ছিল । পুপুল একটু অঙ্ক টঙ্ক আলোচনা করছিল, আর বোতাম হিসু করছিল ।এরি মধ্যে কখন লিপি বেপাত্তা।
পরদিন লিপি বাড়ি ফিরলো সন্ধের মুখে । সঙ্গে একজন একহারা লম্বা ছেলে আর একটি দোআঁশলা কুকুর । লিপি অপরাধীর মতো মুখ লুকিয়েছে। লিপিকে নিয়ে আসা ছেলেটি আইএসাইতে সংখ্যাতত্ত্ব পড়ে। নাম সোমক। সে সিমির বাবার সঙ্গে কথা বলছে। সিমির চোখ লাল। তবে কপালের উপরটা কেন জানি দপদপ করছে। সিমি একদৃষ্টে। সিমি মগ্ন! সিমি লিপিকে বকতে ভুলে গেছে। লিপি কোনফাঁকে কালকে সোমকের কুকুরটির পেছু পেছু । ওরা প্রেম করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল সোমকের কাছে। কিন্তু রাত হয়ে গেছিল সেদিন। তাইইই দেরি। আজ খুঁজতে খুঁজতে বাড়ি চিনে আসা। সিমির চোখের পাতা তিরতির করে ওঠে। সোমক যাবার পরে সে লিপিকে এক চড় মারতে গিয়ে সজোরে চুমু খায়। লিপি হেঁচে ওঠে। সিমির ঠাকুমা বলে ওঠেন , "জীব জীব" । তিনি কি আর জানেন যে, কুকুরদের হাঁচি মানেই হাসি?
সিমি আজকাল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পার্কে আসছে । সোমক সঙ্গে আছে বলে সিমির মা বাবার চিন্তা কম । সোমক কবিতা তেমন ভালোবাসতো না কিন্তু লিপির মুখে শুনতে শুনতে তার এসব কথা এতো ভালো লাগে কেন? সোমকের কুকুর বুশেল যদিও আজকাল খুবই মনমরা । লিপি তাকে কেন জানি না সেদিনের পর থেকে আর পাত্তাই দিচ্ছে না। লেজ পাকিয়ে চোখ মটকে সিমির অন্যপাশটায় উদাস ভাবে হেঁটে চলে লিপি। বুশেলএর সমস্ত প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য ক'রে।
এমন করে কতগুলো দিন গড়িয়ে যে রাত হলো! শেষমেশ যেদিন প্রথম সোমক সিমির হাত ধরলো, সেদিন সিমি গুজবাম্পস এর মধ্যে দিয়ে জিগেস করলো, "আচ্ছা সোম, লিপিও তোমার বুশেল কে ভালোবাসছেনা কেন? ওরা তাহলে সেদিন ইলোপ করেছিল কেন বলো তো? বলতে পারো" সোমক তখন উত্তর দেবার অবস্থা একেবারেই ছিল না। শুধু লিপি, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, "মালকিন, তোমার জন্যে গো!" । সিমি শুনতে পায় নি।
এমন করে কতগুলো রাত গড়িয়ে যে দিন হলো! তারপরে যেদিন সোমক প্রথম পার্কের পাশের একলা গলিটায় সিমির ঠোঁট সেলাই করে দিচ্ছিল, লিপি উদাস মতো তাকিয়েছিল। সিমি আগে বুঝতেই পারে নি, এমন বর্বরতা এতটাও মানুষের ভালো লাগে! সে শুধু নিজেকে আস্তে আস্তে খুলে দিচ্ছিলো, আস্তে আস্তে সেলাই হতে থাকবে বলে। সোমক সেদিন হঠাৎ সিমির কানে ফিসফিস করে বললো, "লিপির বোধহয় ঐ ওইটিকে ভালো লাগে। যখনই ঐ সাদাকালো কুকুরটা কাছাকাছি আসে, লিপির চেনে খুব টান পড়ে। ভেবে দেখেছো কি? Statistically significant percentage এ টানটা পড়ে। আমি শিওর" । সিমি শকড। তবু সিমি চোখ আলতো বন্ধ করে লিপির চেনটা ছেড়ে দিয়েছে । ওরা এখন একটু একটু নিয়েণ্ডারথাল হতে চায় হয়তো। যখন বিকেলের ঘোরসওয়ার ডাইনির বাড়ির পিছনে সন্ধের লাল আকাশে মিলিয়ে যায়, তখন শুনশান দেখে পাঁচিলের নীচে ঘাসের ঝোপের দিকটায়। তাই! লিপি, সাদাকালোর কাছে আজ দৌড়চ্ছে। দৌড়চ্ছে দৌড়চ্ছে দৌড়চ্ছে। দৌড়তে দৌড়তে ঘেউ ঘেউ করছে কেন যে? বোঝ না কি? লিপি বলছে - "দাদাবাবু, দাদাবাবু, ধন্যবাদ ঘেউ ঘেউবাদ!"