আবার বছর কুড়ি পরে...

অর্ঘ্য বন্দোপাধ্যায়


কি যেন একটা ভাবছিলাম। কিছু কথা, কিছু নষ্ট সময়ের গদ্য ছিঁড়ে নিচ্ছে মনোযোগ। লিখতে লিখতে ভাবছি বা ভাবতে ভাবতে লিখছি... কিন্তু চিন্তা সূত্র পড়ে আছে সেই যমুনার তীরে। যেখানে কলসি কাঁখে রাধা জল আসবে ভরতে। আর যেখানে অনেক অনেক তেষ্টা নিয়ে কৃষ্ণ করবে কালক্ষেপ...
-তোর মন আজ কেমন?
রাধার ফোনের স্ক্রিনে কৃষ্ণ ভাসিয়ে দেয় একটা মেসেজ। রাধা উত্তর করে
-ভাল রে
-আমার কথা ভাবছিলিস?
- না রে একটা কাজ করছিলাম
-আমার কথা মনে পড়ে না রে তাই না?
-হ্যাঁ পড়ে
-কখন?
-যখন হাতের সব কাজ শেষ হয়ে যায়, যখন সত্যি আর কিছু মনে পড়বার অথবা পড়াবার থাকে না তখন। মানে তোর কথা তো মনে হয়ই...প্রায়ই হয়...মাঝে মাঝেই...
কৃষ্ণ ভাবে এ কেমন রাধা। চিনতে কি তারই ভুল হয়েছে। এ তো তার রাধা নয়। যে কেবল তার কথা ভেবেই কাটিয়ে দেবে সারাদিন, সারারাত...নাওয়া খাওয়া ভুলে...এর তো দেখছি সবশেষে তার কথা একটু খানির জন্য মনে পড়ে...তাও যখন রাধার মাল্টিস্টোরিড এপার্টমেন্টের জানালায় দূর সূর্যাস্তের মেলোড্রামা কিছুক্ষণের জন্য এসে পড়ে থাকে তখন। তখন তো এমনিই মন একটু ‘লাগি লগন’ টাইপ হয়ে যায় আর মনের গিলিগিলি আয়নাটা বেড়িয়ে পড়ে আর তাতে আবছা করে কৃষ্ণের মুখটাও দেখা যায়।
-মুখটাও?
রাধা প্রতিবাদ করে।
-এ মিস্টার...আমার কিন্তু অন্য কারুর সঙ্গে কোনো লটঘট নেই হ্যাঁ? তোকেই তো পাওয়াই যায় না। কিছু সময়ের জন্য পাই চেঁচে পুঁছে তুলে নি। আর সেই দিয়ে সারাদিন কাটাতে হয় বুঝলি?
- সারাদিন? মানে তুই সারাদিন ভাবিস আমার কথা?
- হ্যাঁ ভাবিই তো...কাজের ফাঁকে...
-আজ কি ভাবলি?
- ওই তোর লিপ কিসটা ভাবছিলাম
-লিপ কিস?
-হ্যাঁ কাল যেটা বললি চ্যাটে। আমাকে লিপ কিস করবি। কিভাবে করবি সেটাই ভাবতে চেষ্টা করছিলাম।
- না আমি তোকে লিপ কিস করব না।
-তবে?
- আমি তোকে ডিপ কিস করব
-যাহ! একদম না।
-কেন?
-আমার মন সায় দেবে না।
-কেন? বাকিটা কি তোর বরের জন্য রিজার্ভড?
- তোকে বলব কেন?
-বাল
-এই গালি দিবি না বলে দিচ্ছি কিন্তু
-তা দেব না তো কি করব?
সন্ধ্যে পড়ে আসে। দুজনের চ্যাট বেশীরভাগ দিনের মত এক বিষণ্ণতার দিকে ঝুকে পড়ে আস্তে আস্তে। তারপর চ্যাটের প্রশ্ন উত্তর অনিয়মিত হতে হতে এক সময় কৃষ্ণ সেন্ড মেসেজের লম্বা আনসিন লিস্ট দেখতে দেখতে বোর হয়ে ‘বাই’ বলে বেরিয়ে আসে। তার প্রিয় রাধু হয়ত কোনো কাজে আটকে গেছে। আর ভাল লাগে না তার। অফিসে কৃষ্ণেরও অনেক কাজ থাকে আজকাল। রাত হয়। অপ্রসন্ন মন একটা সিগারেট ধরাতে চায়। তখুনি মনে পড়ে তার সিগারেট সে ছেড়ে দিয়েছে। ইনফ্যাক্ট রাধাকে প্রমিস করেছে আর খাবে না। বিরক্ত লাগে। কিন্তু লক্ষণ রেখা অমান্য করতে পারে না। ইচ্ছেও করে না। যদি কোনদিন, কোনো একদিন, একটা গোটা দিন রাধা তার কথা ভাবে......শুধু তার...আর একটা ডীপ কিস যদি...এরম যদি একটা মিরাক্যাল হয়...তবু কৃষ্ণ কাজে মন দিতে পারে না কিন্তু তার মিরাক্যাল সংক্রান্ত এই আশাবাদ, এই ইতিবাচক মনোভাব তাকে জোর করে গুঁজে দ্যায় কাজের ভেতর...তখন, হ্যাঁ তখনই সাইলেন্ট মোডে রাখা ফোনে আসে রাধার রিপ্লাই
-বাই
কিন্তু কৃষ্ণের হুঁশ নেই আর সেদিকে। সে নিজেকে কাজের থেকে আলাদা করতে পারে না। তার মেসেজ বক্সে একা ‘বাই’ শব্দটাকে সিন হবার জন্য আজ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এদিকে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ অফিসের জানলায় এসে চুপটি করে দেখতে পায় জানালার কাঁচে কৃষ্ণের একটা প্রতিচ্ছায়া পড়ে আছে। সেখানে এক যুবক এক ছলাৎ নদীর পাড়ে একটা হিজল গাছের নিচে বসে ঘন ঘন ঘড়ি দেখে। পেছনে গাছের গুঁড়িতে হেলান দেওয়া তার সাইকেল। আর অপেক্ষা। অপেক্ষা সেই মেয়েটির জন্য। যে আসবে সেই নদীর পড়েই। যুবক বসে আছে তাকে এক মুহূর্ত দেখবে বলে। তার হাত কিছু সময়ের জন্য ছোঁবে বলে। আর তাকে নিয়ে দেখবে রূপকথার স্বপ্ন। রাজা রানী আর সুখী রাজত্বের গল্প। যুবকের ব্যাগে টিউশনির পয়সা বাঁচিয়ে কিনে আনা ভ্যালেন্টাইন ডের গিফট। কিন্তু সেই যুবক তখনও জানে না যে যার জন্য তার এই অন্তহীন অপেক্ষা, যার কাছে সে বাঁধা রেখে বসে আছে বাকি জীবন, আগামী কুড়ি বাইশ বছর যুবকটি তাকে, সেই মেয়েটিকে শুধু আমাদের গল্পে কেন তার পৃথিবীর কোথাওই আর খুঁজে পাবে না...