চলিতে থাকো, প্রশ্নহীন অপরাজিতার মতো

গৌতম চৌধুরী

কে দিবে সূত্র? মাকড়সা বাবাজীবন খতম করতেছে নিজেকে
আলো-চিকচিকে অভ্রের মায়ায় তুমি যাহা দেখিয়া মুগ্ধ হইলে
তাহা তো বীতংস মাত্র, ফাঁদ
প্রাণধারণের সামান্য আয়োজন
অনেক ঝটরপটর-কাহিনি লুকায়ে আছে ওই চারুলতার গড়নে
সুন্দরের গর্ভে থাকে আর্তনাদ
মরণকামড় আর পরিত্রাহি চিৎকারের ন্যানো-ডেসিবেল
এত সংকলন করিবে কে? থমকাইবে কোথায়?
খিলান ও স্তম্ভের, মিনার ও দেহলির, প্রতিটি কারুকার্য-করা টালির পিছনে
যে- চুলকানি- হাঁচি- কাশি- অর্ধাশন চাপা পড়িয়া আছে
তাহার প্রতিটি রেণুর হিসাব রাখিতে গেলে
উপাসনালয়ের পরিক্রমা শেষ হইবে না
সময় কই?
সময় আছে
কিন্তু প্রতিটি সময় ভিন্ন
প্রতিটি কীটের, জীবাশ্ম ও ধাতুভস্মের, গ্রহ ও জ্যোতিষ্কের
সময় ভিন্ন
আলাহিদা
তুমি কোন্‌ প্রান্তে খাড়ায়ে আছ, কোন্‌ বিলম্বিত একতালের আলাপে
আর কোনখানে বাজতেছে ঝালা
চূড়ান্ত মুহূর্তের সমীপে সুর উছলিয়া পড়তেছে আয়ুর সপাট আয়োজনে
ওই যে জ্বলিয়া উঠিল আলো
বিস্ফোরণের নিনাদে অন্ধ হইয়া গেল পরিধি
শ্বাস ছিঁড়িয়া গিয়া নামিল সান্নাটা
সময় ছিল, এখন আর নাই
সেইখানে, সেই সংগীতসভায়, এখন আর নাই
আর তোমার? তোমার তো দিনই আর ফুরায় না
ব্যাকুল বাদল সাঁঝের দিকে তাকায়ে বসিয়া থাকিলেও, ফুরায় না

...


সে আসিবে
এইরূপ কোনও প্রতিশ্রুতি কোথাও ছিল না
বাতাসের সোঁদা বাস, ছত্রাকদের শরীর হইতে গড়ায়ে পড়া চিকন-হালকা আলো
উড়ন্ত পাতায় তৈয়ার হওয়া ঘূর্ণিকা
এইসব সামান্যের বশে, বালকটি ঘুরন্ত চাকার পিছনে ছুটিতে ছুটিতে
সহসা টের পাইল বুঝি সেই কথা
পাইয়া, হাতে-ধরা আঁকশিটি জাদুকাঠির মতো
আবারও ঠেকাইল ছুটন্ত চাকার গায়ে
যে-বিদ্যুত ঝলকাইল তাহা চোখে দেখিবার নয়
শুধু চাকা টের পাইল তাহা, টের পাইল, হয়তো সে আসিবে
এই অনিশ্চয়তার ভিতর দিয়া তাহার যাত্রা
গোঁত্তা খাইয়া চিৎপটাং হইয়া পড়া, টুটিয়া ফুটিয়া ভাঙিয়া ঝরিয়া পড়া
পুরাদস্তুর গায়েব হইয়া যাওয়া
যে-কোনও কিছুই ভবিতব্য হইতে পারে তাহার, মানে চাকাটির
বা, সেই সম্ভাবনাটির, যাহা আলতো পা রাখিয়াছিল
এই ভবতরঙ্গে
ছপ ছপ করিয়া একটু আওয়াজ উঠিয়াছিল কি?
উঠিলেও কেহ শুনে নাই
বৃষ্টির দিনের আলস্যের ভিতর দিয়া ধীর পায়ে চলিয়া গিয়াছিল সে
সকল কিংবদন্তী যেভাবে যায়, ধূসর এক প্রান্তরের দিকে
আরও ধূসর হইয়া ফিরিয়া আসিবে বলিয়া
যাহাকে কেহ চিনিতে পারিবে না, কারণ কেহ চিনিতও না তাহাকে
বাঁশঝাড়ের ভিতরকার জোনাকির স্তূপের ভিতর দিয়া
একটি ছায়া নড়িয়া উঠিল কি
না, একটি শৃগাল লেজ তুলিয়া পলাইল মানুষের গন্ধ পাইয়া?
অন্ধকারে ধক ধক করিয়া উঠিল তাহার চক্ষু
যেন, ছড়ায়ে পড়িল সামান্য একটু কল্পনা
সে আসিবে

...


এই ঊষামুহূর্তের রাগিনীকে স্পর্শ করিবার মতো বেদনা কি ছিল তাহার ডানায়
সম্মুখে একটি সমগ্র দিনের মহাভার
নানান নিষ্পত্তি ও অনিষ্পত্তির আড়ালহীন কথকতা
সামান্য মিড় ও মূর্ছনার পর ঝকঝকে ইস্পাতের মতো আলো আসিয়া
গ্রহণ করিবে তাহাকে
তাহাও বিদায় লইবে একসময়
খননের স্তরে স্তরে আবার লাগিবে রঙরসিয়ার আঁচড় ও পোঁচ
ছায়াময় বাদামের দিকে তাকায়ে কোমল হইয়া আসিবে আবার নদীতীরের মন
কখন হারাইবে সেই নৌকা
মিশিয়া যাইবে তিমিরের গভীর অভ্যুত্থানে
তখন শুধুই উল্কাপতনের আলো, আর নক্ষত্রদের অলীক বার্তা, দূরত্বের
এত কিছু কি কল্পনার ভিতর ধরিতে পারিল ওই উড়াল
অস্ফুট আলোর মজ্জায় যাহা মেলিয়া দিল তাহার ডানা
জানা হইয়াও যাহা অজানা, সেই অফুর দিনপঞ্জীর দিকে?
সকল পথকেই শূন্যতা স্পর্শ করিয়া আছে
তাই সব পথই এত পূর্বাভাসহীন, সকল যাত্রাই মায়াময়

...


নাট্যের উত্থান-পতনের মায়ায়
খচিত হইয়া আছে তারাদল-শোভিত এই মঞ্চ
নিচে শূন্য ঝলমল করতেছে
কোথা হইতে তাহাতে খানিক শোঁ শোঁ বাতাস বহিয়া গেল
দুদ্দাড় করিয়া ভাঙিয়া পড়িল খাবার দোকানের ঠেকনা-দেওয়া কানাত
আচানক বৃষ্টির ভিতর দিয়া দৌড় লাগাইল শালপাতা শুঁকিতে-থাকা কুকুর
এইবার খানিক ধোঁয়া ছড়ায়া দেওয়া হইল দৃশ্যান্তরের জন্য
রঙিন আলোয় ভরা সেই ধোঁয়ার বৃত্তে তালে ও মুদ্রায় ঘুরিতে ঘুরিতে
নাচিয়ের দল বুঝাইতে লাগিল কোনও শাশ্বত আনন্দের কথা
তবু সবার চক্ষু ভিজিয়া উঠিল বাষ্পে
বাঘের শিশুরাও অনাথ হইয়া পড়তেছে মানুষের হাতে
অমন একটি শাবক এখন বর্তমান কোম্পানির হেফাজতে
উহাকে দিয়া কিছু বলানোর ইচ্ছা ছিল প্রযোজকের
কিন্তু উহার বুলি ফুটে নাই
বদলে ভিডিও-সম্মেলনে বার্তা দিলেন রাষ্ট্রপ্রধান
আমরা কাহারও ক্ষতি চাহি না
কিন্তু আমরা ঘুমায়েও থাকিতে পারি না
তাই বোমা বাঁধতেছি, উহা শান্তিপূর্ণ
এখন সব নাটকে অল্পবিস্তর সার্কাসও লাগে
তাই একজনের ঘাড়ের উপর পাঁচজন খাড়ায়ে নিশান উড়ায়ে দিল ঊর্ধ্বে
আর বিদূষক আসিয়া সেই নিশান হইতে বাহির করিল খেলনা কামান
তাহার পর কামানকে বাক্সে পুরিয়া বাক্স হইতে বাহির করিল এক সুন্দরী রমণী
দর্শকের ভিতর লাফায়ে পড়িয়া সেই মহিলা জনে জনে শুধাইতে লাগিল
ঘটনা কোথা হইতে শুরু হইয়াছিল, আপনার মনে আছে?
কোথা হইতে? কোথা হইতে?

...


সাদা মেঘের বিরাট একখানি টুকরা
তাহার ভিতর ছবি আঁকিয়া যেতেছে চিত্রী
বাম কোণে খানিক আঁকিয়া সে আসতেছে মাঝ-বরাবর
তাহার পর আনুভূমিক অঞ্চলটিতে কিছু সংকেতলিপির আঁচড় দিতেছে
ভাবা গিয়াছিল ডান দিকের কাজে ব্যস্ত থাকিবার সময়
বাম দিকের মেঘ কিছু গলিয়া যাইবে
কিন্তু মেঘ আজ প্রকৃত ধার্মিক
সে এক বিরাট পটভূমির মতো সিধা খাড়া হইয়া আছে
বা হয়তো আরাম করিয়া শুইয়াই আছে সে
তাহার ভঙ্গী অবশ্য বড় একটা বিচার্য নয়
চিত্রী ঘুরিয়া ঘুরিয়া তুলি টানতেছে, বুরুশ চালাতেছে
পটের সামান্য ভগ্নাংশই ভরাট হতেছে তাহাতে
চিত্রীর ভ্রূক্ষেপ নাই, মেঘেরও নাই
এইদিকে ঋতুবদলের সময় হইয়া আসিল
এই বার্তা লইয়া দৌড় দিল এক কিশোর শশক
পথে পড়িল ধানের ক্ষেত, তাহাতে রৌদ্রছায়া
তাহার ভিতর লুকোচুরির খেলা
খেলিতে গিয়া হারায়ে গেল সে
বিকাল রাঙা হইয়া উঠিলেও সে যখন ফিরিল না
তাহার মা কাঁদিতে লাগিলেন
কয়েকজন কাহিনিকার শলাহ করিতে লাগিলেন –
ইহার পর কী করা যায়
দুম করিয়া সূর্য ডুবিয়া গেল, হিম বাড়িতে লাগিল
গাছের ডালে দড়ির দোলনা লাগাইল চিত্রী
তাহার পর মেঘের খণ্ডটিকে কম্বলের মতো মুড়ি দিয়া
ঘুমায়ে পড়িল দোলনায়
সূর্য উঠিবার আগে আবার শুরু করিতে হইবে কাজ

...


দায়বোধ শুধু মত্ততার প্রতি
হাসিও না। সুন্দর ইস্তিরি-করা পাট পাট কুর্তা পরিয়া তো অনেক দৌড়াইলে
রঙিন ঘাগরা দুলাইলে ঢের, সতর্ক চলায়
ভাবিয়াছ, কিছুটা উপর হইতে কেমন দেখিতে লাগে?
বেদিশা কিছু কীট, পুঞ্জ পুঞ্জ কীট, এদিক যেতেছে ওদিক যেতেছে
কী রগুড়ে তাহাদের ছন্দ, কী কাঠপুতলির মতো তাহাদের ভঙ্গি
কীটেদের কাঠপুতলি কিছু
একটি অন্ধকার রাষ্ট্র ছাড়া তাহারা আর কিছুই প্রতিষ্ঠা করিতে পারে না
আকাশের দিকে তাকায়েছে নাকি কখনও ভুলিয়াও?
যদি আচমকা ধরা পড়িয়া যায় তাহাদের ক্ষুদ্রতা
যদি কোনও দূর নক্ষত্রের মন্ত্রণা আসিয়া ব্যাকুল করে তাহাদের
সেই পাগলামি কে সহ্য করিবে
অত বড় সর্বনাশ কি ঘটিতে দেওয়া যায়
বন্ধ করো, চোখ বন্ধ করো
প্রয়োজনে ফেট্টি দিয়া বাঁধো
আর চলিতে থাকো চমৎকার স্থাপত্যের দিকে
কক্ষের পর কক্ষ জুড়িয়া বানানো বিস্তীর্ণ শবাগারের দিকে
চলিতে থাকো প্রশ্নহীন অপরাজিতার মতো
প্রশ্ন গিলিয়া গিলিয়া যে ব্যথায় নীল হইয়া গিয়াছে

...


মিছামিছি কে কতদূর চলিতে পারে?
তবু সেইভাবেই চলতেছে পশুশাবকের দল
চলিতে চলিতে কেহ ঢুঁসাঢুঁসি করতেছে
কেহ থমকায়ে পড়তেছে একটি সবুজ পাতার লালসায়
কেহ বা আলস্যে মন্থর হইয়া পড়তেছে কেবলই
তবুও সকলেই চলতেছে
তাহাদের কাহার দুগ্ধ দোহন করা হইবে
কাহারা কখন সঙ্গম করিবে
কাহাকে কতল করা হইবে কখন
কিছুই তাহারা জানে না
তবুও তাহারা চলে, মিছামিছি, বিলকুল উদ্দেশ্যবিহীন
তাহাদের মালিক হাসিতে হাসিতে বলিল –
উহারা কী জানিবে?
যাহা জানিবার, সব জানি আমি
সেই সর্বজ্ঞতার উপর যখন সহসা একদিন হুড়মুড় করিয়া পাথর ভাঙিয়া পড়ে
দম ফেলিবারও সময় পায় না সে
শুধু ফড়িং উড়িয়া যায় নলখাগড়ার এক ডাঁটি হইতে আরেক ডাঁটিতে
শুধু একটি বউ কথা কও ডাকিয়া উঠে পাতার আড়াল হইতে
মেঘের উপর দিয়া ঘোড়া ছুটায়ে সূর্য ঘরে ফিরে
সে বেচারাও মিছামিছিই ঘুরিয়া বেড়াইতেছে
পৃথিবীর মানুষকে আলো আর তাপ দিবার জন্যই কি
তাহার এত পেরেশানি নাকি!
সে মরতেছে তাহার নিজের জ্বালায়
এই জ্বলনটুকু সত্য
সেই জ্বলনকেই প্রণাম করে মুগ্ধ মানুষের দল
মুগ্ধ, না কি ভীত?
একটি নিশ্চিত অন্ধকার দিনের দিকে যাইতে যাইতে
ভয় পায় সে
পশুরা মূর্খ, তাই অকুতোভয়, তাহারা প্রণাম করে না কাহাকেও

...


গণিত এক শুশ্রূষা, তাহা সত্য
বেদনা কোনও ব্যাধি নয়, তবু সে অপার
ব্যাখ্যা সামান্য সান্ত্বনা, মানেহীন, অন্ধ অভ্যাস
প্রলাপ, এই সব আপ্তবাক্যের বাহিরে, জীবনের অপূর্ব উদ্ভাস
তাহার পল্লবতার জন্য ক্রিয়াপদ
তাহার উন্মার্গতার জন্য বিশেষণ
স্তব্ধতাই তবু নিয়তি, তাহা অব্যয়
তাহা সূত্রহীন
তাই প্রশ্ন
আর প্রশ্নের অপমৃত্যুর ভিতর ফুটিয়া উঠা ঘন নীল নক্ষত্রমণ্ডল
শ্বাসরুদ্ধ হাহাকারের ভিতর ফুটিয়া উঠা পুঞ্জ পুঞ্জ অপরাজিতা
চলিতে থাকো