আমিই সেই শরতকন্যা

নুরেন দূর্দানী

সদ্যই প্লেন উড়ে গেলো। তোমার কাছে এবেলায় কিছু সময় হবে নিশ্চয়ই। রাতের স্কাইলাইনে বেশ কিছু সময় ধরে তাকিয়ে দেখছিলাম লাল-সবুজ-হলুদ আলো। ওয়ান্স বিটের তালে তালে আলোকে তখন জ্বলন্ত ঘাসফুল লাগে। তুমিও বুঝি আমার মতো প্লেন দেখো ঐ আকাশে? আচ্ছা, তোমার রং কি? আমার রং নদী। তুমি শিখেছো রাগ ভৈরবী? আমার শেখা নেই। তবে আমি জানি পালকের Gramineae গোত্র। হিম মেঘের ভেলায় ভেসে সাদাপেজা তুলোয় আনমনে বিষপাত্র খুঁজেছে গাঢ় নীলদেহ। এতোকাল পরও পরলৌকিক অদৃষ্টতা থেমে নেই। সুদীর্ঘ বারো’শতক পেরিয়ে কুশগুচ্ছ পরিণত হলো মানুষ্যরূপক দাহ্য। অথচ পত্র পাতার পালকে তীক্ষ্ম ধার। এবার আমার চোখে এঁকে নেই সুরমা রঙ্গা মেঘ। তোমাকে দেখাবো দেবলোক আলোয় ইক্ষ্বাকু রানীর একমাত্র বিশ্বাস, তার কুশকুমারের স্বীকৃতি। এসো জলরাশির আয়নায়। ব্যর্থ প্রেমের চাইতেও তো অধিক অনলে পুড়ে ইচ্ছে মৃত্যুর হৃদয়। ঐ দেখো কুশারাজার রাজ্যে প্রভাবতী বধূর আগমণ। লগ্ন শর্তের শিকলে রূপসীর ব্যাকুলতা, গুপ্ত আঁধারের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। তারপরও তো মুখোমুখি চাহনির বসন্তের জোয়ার আসে। কুশরাজার লুকোচুরির পতন। পদ্ম পাতায় দৃষ্টি মেলতেই মূচ্ছিত প্রভাবতী, ঐ যে ছায়ায় বেরিয়ে পড়ে রাজার কদাকার জ্বর। এক বুক ভাঙ্গনের সুর বাজে। দৃষ্টিতে রংও কখনো বড্ড বেশি সত্য হয়ে দাঁড়ায়। মদ্ররাজ্যে ফিরে যায় রূপবতী বধূ। সুবর্ণদিন ফুরিয়ে রতি অভিসারের নেশায় সাতরাজা নকশা ছকে। রাহুর দশায় যুদ্ধনৃত্যে কুশরাজাও থেমে নেই। সূর্য নক্ষত্রের চিত্রায় যমপরাস্ত করে প্রত্যয়ী রাজা। মুহূর্তে আঁধারে জন্মগত জ্বরের রং ফুরিয়ে যায়। চন্দ্ররাশির নিমফুলে যুবকের শাপমোচন। কুশীনগরে ফের বধূ বরণ প্রভাবতী উৎসব। ঘুমপাড়ানিয়া গানের কৃষ্ণ প্রতিপদ গল্পের ভেতর তুমি জেগে থাকো। আমার চোখে চেয়ে দেখো নদীর ধারে শুভ্র কাশের ঝাড়। হাত বাড়িও না তারচে বরং আকাশের স্তরে স্তরে নেমে আসো। এসো আমারই জন্মলগ্নে আশ্বিন দক্ষিণায়ণে।
সে দিন ছিলো সোমবার। শরতের ভোর ফুরোয়নি তখনো। সুখ তারার স্পর্শ রয়ে গেছে, আধখানি চাঁদ আকাশে ভেসে আছে। পাখির কিচিরমিচির গান.. রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়চ্ছে রক্তিম আভা পেরিয়ে পুরো পৃথিবীতে। ঠিক সেই লগ্নে জন্ম, এই শরতকন্যার! আমার সুরমা রঙ্গা চোখের চাহনি দেখেছো নিশ্চয়ই। সেই আঁখি পল্লবের চাঁদ খুব পছন্দ। জ্যোৎস্না কিংবা পূর্ণিমা, আকাশে চাঁদ উঠলেই দেখার জন্য অস্থিরতা। তাই বায়না করে বসা চন্দ্রোদয়ের আলাপনে। সত্যিটা হলো বায়না বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। ঢের জানা তরঙ্গ ধ্বনিতে কুৎসিত বচন শব্দ। ঐ যে বলে বসে 'এতো শখ'! চৌকাঠের সীমাবদ্ধতায় বন্দি যে শরতকন্যা। তারপরও এই শহরের জানালা কিংবা ব্যালকনি দিয়ে বৃথা চেষ্টা, যদি দেখা পায় চন্দ্রলক্ষ্মীর। আমি তো দেখতে চাই শুধু সেই রূপ সৌন্দর্য। এই জীবনে এসেছে চাঁদনী রাত ক্ষনিক সময়ের সুতোয়। এসো তবে প্রদীপ তারার জাদুতে। রোহিনী নক্ষত্রে গভীরে শরতকন্যার আরও এক গোপন পরিচয় আছে। চাঁদের দেশে বাড়ি বলেই নিজেকে চাঁদের দেশের কন্যা বলে চৌকাঠ পেরুবার সাহস দেখায় না। বরং মনকৌটে ক্ষুদ্র বায়না-ইচ্ছে গুলো বন্দি করে ভেজা চুলের বায়নায় খোলাচুল এলিয়ে শহুরে রিক্সায় হাওয়া খায়। যখন ভেসে যায় এই পৃথিবী হুমাহুতির চাঁদোয়া স্রোতে, তেওরা তালে রবি বাবুর গান গাই গুনগুনিয়ে;
‘’আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে
যাব না গো যাব না যে, রইনু পড়ে ঘরের মাঝে
এই নিরালায় রব আপন কোণে..’’

এও তো পরম পাওয়া। চঞ্চলার মনের ভেতর গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা জবা। নিজেকে সহস্র ইচ্ছের মৃত্যুর ভেতর বাঁচিয়ে রাখে শরতকন্যা। রাঙ্গা চরণে ধূলিপথ স্থির বসে থাকে। এইতো সেইবার প্রজাপতির আলনায় আলতা পেয়েই টুকটুকে লাল বৃত্তরেখায় পায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলাম। আজকাল লালের প্রতি কি সু-তীব্র আগ্রহ জেগেছে। তুমি কি জানো সেই সাদা জবা ফুলের লাল হয়ে ওঠার গল্প? তবে শোন, দিগন্ত পেরুলে দেখবে রূপকথার শরীরে এক এক করে সাদা জবা ফুটছে রোজ, তুমি ছুঁয়ে দিলেই লালচে জবায় রূপান্তর হবে ক্রমশ। এই পৃথিবীর মৃত্যুরূপ মোহমুগ্ধ রঙের গোপন নাম লাল, অথচ ফিনিক্স পাখির পেখম খসে পড়ার গল্প শুনে বোকা মানুষ-মানুষী বলে বসে ভালোবাসা। আমার চোখের সুরমা রঙ্গা মেঘ ফুরিয়ে আসছে। তবে গল্প তুলে রাখলাম পাহাড় দেশের ঘুমকুমারের, যে সূর্যদেবতাকে আমার জন্যই দিনের আলোয় জ্যোৎস্না বানিয়ে দিয়েছে। চেয়ে দেখো সুখতারা হাসছে। আবছা জলের স্বপ্নে নীল হচ্ছে আকাশ। শরতকন্যার জন্মদিন আসন্ন। কার্তিক শুরুর তিন সিঁড়ি আগেই পা ফেলবে চর্তুর্থী তিথিতে, তখন দেখবে আশ্বিন কেমন করে অজানা দেশে নদী আঁকছে। সেই দিনটির কথা কাউকে বলো না যেনো। ঘুমাই আমিই...