অপরাহ্নের অবভাস

সোমব্রত সরকার

তখন মাঝে মাঝে আমি হাঁটতে বেরোতাম। হাঁটাটা আমাকে শিখিয়েছেন সরোজ বন্দোপাধ্যায়। বলতেন, ভাটপাড়া হেঁটে ঘুরো। পুরনো গলি। ন্যায় ও শ্রুতিশাস্ত্রের গন্ধ। একদিন হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশায়ের বাড়ি। পুরনো শরিকি। দেওয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ছে। ওর ভেতরে বন্ধ ঘরের দরজা খুলতেই পায়রার ডানা লেগে আমার শরীরে শিহরন। কী ভীষণ পায়রাদের ডানার ঝটপটি। সরোজ বন্দোপাধ্যায় বললেন, তুমি ভয় পেলে? টি শার্টে তখনও আমার ফকফকে পালক লেগে। পালকটা হাতে তুলে জালনার দিকে চোখ আমার। ফ্রেম নেই। কপাট। বুনো লতার ঝোপ ভেঙে ঘরে ঢুকছে গোসাপ। আমি সরোজবাবুকে দেখালাম। তিনি বললেন, বুঝলে এটা বোধহয় শাস্ত্রী মশায়ের ঘর বলেই সম্ভব। বললাম, সোনার বেনে। বললেন, পড়েছ উপন্যাসটা। চর্যাপদ নিয়ে এমন উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে খুব একটা লেখা হয়নি। সমরেশের প্রিয় উপন্যাস ছিল সোনার বেনে। ও যখন গঙ্গা লিখছে। এভাবেই আমরা হাঁটতে বেরোতাম। ও দিকটা হালিশহরের ঘাট। আমরা ঘাট পেরিয়ে নিগমানন্দ আশ্রমের ভেতর চলে যেতাম। তখন চালা ঘর। চৈতন্যডোবাতে প্রেমানন্দ গোঁসাই থাকতেন। খুব ভালো কীর্তন গাইতেন। আমি আর সমরেশ ওঁর কীর্তনের খুব ভক্ত ছিলাম জানো তো। বললাম, সমরেশ বসুর স্ত্রী গৌরী দেবীও শুনেছি খুব ভালো গান গাইতেন। ওঁর কাছে মধ্যে মধ্যে গান শুনতে আসতেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সরোজ বন্দোপাধ্যায় অবাক হয়ে বললেন, তুমি এ কথা জানলে কী করে? আমি চুপ। উত্তর করলাম না আর। সরোজ বন্দোপাধ্যায় বলতে থাকলেন, শক্তি গৌরীর কাছে রবীন্দ্র সংগীত শুনতে আসত। ও যে দরাজ গলায় গাইতে পারত চোখের জলে লাগল জোয়ার, এটা শক্তির গৌরীর কাছ থেকেই পাওয়া। গৌরী গাইতেন। এ গান শুনতে শুনতে শক্তির চোখ জলে ভিজে উঠত। এর পর শক্তি কবিতা পড়ত। ওর হুঁশ থাকত না। একটার পর একটা কবিতা পড়ত শক্তি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত আটটা । আমি শক্তিকে এরপর উঠতে বলতাম। শক্তিকে নিয়ে নৈহাটি স্টেশন আসতাম। তার আগেই সে ভেগে যেত। আমি কিছু সময় দাঁড়াতাম ওর জন্যে। বুঝতাম শক্তি গলির ভেতরে বাংলার দোকানে গেছে। এই বলে সরোজ বন্দোপাধ্যায় হাসলেন। তাঁর হাসিতে বাঘনাপাড়া বৈষ্ণবীয় ভদ্রতা। সরোজ বন্দোপাধ্যায় এই সম্প্রদায়ের মানুষ। বৈষ্ণবীয় চিন্তা আচার পারিবারিক সূত্রে পেয়েছেন বটে। অথচ প্রবল যুক্তিবাদী। ভাব আর যুক্তির অদ্ভুত মিশেল ছিল ওঁর ব্যক্তিত্বে। একদিন হাঁটতে হাঁটতে সরোজ বন্দোপাধ্যায় এলেন রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরীর বনানী বাড়িতেই। আমি তখন ওখানেই থাকি। আমাকে দেখে সরোজ বন্দোপাধ্যায় মৃদু নম্রতা মিশিয়ে বললেন, ও তুমি তো এখন রমেনবাবুর শিষ্য। তা ভালো। কবিতা লিখতে গেলে ওঁর তদারকি দরকার। আসলে কী জানো তো সবেতেই গুরু দরকার। না হলে কিছুই হওয়ার নয়। রমেন্দ্রকুমার রসিকতা মিশিয়ে বললেন, আপনার গুরু তো বিষ্ণু দে। উনি না থাকলে তো আপনিও কবি হতেন। ওঁর শিষ্য হয়ে শেষমেশ হলেন কিনা কাঠখোট্টা গদ্যের লোক। সোমব্রত আপনার সাথে মিশে মিশেই ভয়ঙ্কর পণ্ডিত তৈরি হচ্ছে। আজকাল এসে শুধু ভারি ভারি কথা বলে। এরকম ভারি কথা বললে প্রেমিকা সরে পড়বে। সরোজবাবু এবার তাঁর সহজাত ভঙ্গিমায় বললেন, ওই জন্যই তো প্রেমের দীক্ষা নিতে আমি ওকে আপনার কাছে পাঠিয়েছি। আপনি ওর গুরু। এক অর্থে সরোজ বন্দোপাধ্যায় ঠিকই বলেছিলেন সেদিন। যা কিছু যতটুকু শিখেছি সেখানে রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরীর অবদান অনেকখানি। সরোজ বন্দোপাধ্যায়ের অবদানই কম কী? তিনি আমাকে হাতে ধরে গদ্য লেখা শিখিয়েছেন। এখন নৈহাটি থেকে ভাটপাড়ার পথ একা হাঁটতে হাঁটতে আমি ফেলে আসা সেই আশ্চর্য দিনকালের কথা ভাবি। আমার মতো ঈর্ষনীয় গুরুভাগ্য আমাদের প্রজন্মের অনেকেরই নেই।