‘দশ’র মূল্যবোধ

আহমদ সায়েম

উড়বার ডানা কেটে দিয়েই রাফি তার পাখিদের বড় করে। ‘কেটে দেয়’ এই অপবাধ রাফিরে দেয়া যায় কী না তা বুঝতেছি না। কারণ তারই ল্যাজ, নখ, ডানা সবই কাটা। কে কাটল তার এই অঙ্গ গুলো? প্রকৃতি, রক্তশিকল, না কী পরিবেশ থেকে ধারণ করা এই কাটা-কাটির চর্চা? ডানা হীন ভাবে কাউকে তো জন্ম দেয়া হয় না, কেউ একজন চিন্তায় মননে ডেলে দেয় ডানা হীন ভাবে উড়ার কায়দা। আর সেই ব্যাঘাত নিয়েই বড় হয় রাফি! বড় হয় তার পরিবেশ, প্রিয়জন, বড় করে তার পরিবারকে। এখন তার বাচ্চারাও এই প্রতিবন্ধকতায় বেড়ে উঠছে, তাদের আচরণে সমাজ বিষাক্ত হচ্ছে, বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে শহরের অলি-গলিতেও। ভাবনার যেন কোনো কুল হচ্ছে না, এমন মানুষও আছে পৃথিবীর বুকে!

বিয়ের দু একদিনের মধ্যেই প্রকৃতি থেকে মেসেজ দেয়া হয়েছিলো কিন্তু তা পড়তে বা পড়ে মর্ম উদ্ধার করতে সময় লেগে গেলো দশ বছর! কিছু বাটারফ্ল্যাই এর মেসেজে উড়ার স্বপ্ন দেখেছিলো শুভ্র কিন্তু ঘরে যে রঙের খেলা, তা এখনো ঠিকানায় পৌঁছে দেয়ার মতো হয় নি। শুভ্র কোনো কিছুরে সমস্যা না দেখে তার সৌন্দর্যটাই খোঁজার চেষ্টা করে। সমস্যা বলতে আসলে যে কিছুই নাই তা সে মন-প্রাণে বিশ্বাস করে। কিন্তু সে এমনই এক সমস্যা নিয়ে থাকে যা নিয়ে সহজ কোনো সামাজিকতাই যাওয়া যায় না। তাদের আচরণ অনেকটা অসুস্থার মধ্যেই পড়ে।

একটা শিল্পকে আরেকটা শিল্পের মধ্যে ডুকিয়ে দেয়া যায় না, অন্য মাধ্যমে কোনো ভাবেই এর সঠিম মূল্যায়ন বা মধুরতা প্রকাশ পায় না। এই সিমাবদ্ধতা টের পাচ্ছি এই গদ্য লিখতে গিয়ে কারণ একটা মানুষের আচরণ যে কতো ভয়ংকর হতে পারে তা লিখে যেনো প্রকাশই করা যাচ্ছে না। বাস্থবিক সমজকে ক্যামেরায় ধারণ করা আর লিখে প্রকাশ করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। বাস্থবতার পেইন যদি একটা দোসর বা ছাই রঙ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করি পাঠক কী তা পড়ে ‘উফ’ শব্দটা বলতে পারবে বা চোখের জলে ভিজে যাবে তার গাল, বুক? না কোনো ভাবেই তা সম্ভব নয়। পাঠকের উফ শব্দ আদায় করতে হলে লিখার শিল্পকেই ধারণ করতে হবে। প্রতিটা শিল্পই তার নিজস্বতায় অনন্য। আর তা করতে হবে বাস্থবতার পেইন ছাড়াই।

শুভ্র প্রকৃতির এই আচরণ বুঝে নিতে, মেনে নিতে বেশ সময় নিতে হয়েছে। শুভ্র তার রঙ মিলাতেই ব্যস্ত থাকে, তবু যেন সে তার রঙ তুলে নিতে ব্যর্থ হলো। নানান রঙের প্রজাপতিরা তাহলে কারে খুঁজে নেয়? কী মেসেজ বহন করে দুয়ারে দুয়ারে উড়ে বেড়ায় তারা?

রাফি- ইসলামিক, ইসলামিক কায়দা কানুন সে মেনে চলে। তার চৌদ্দপুরুষের কেউ ইসলামিক জ্ঞানের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা বইপত্রের দারস্ত হয়নি তবু সে-ইসলামিক। রাস্তা-ঘাটে যে সকল ইসলাম ঘুরে বেড়ায়, মানুষ ধরে-ধরে রগ কাটে, জবাই করে, বোমা মেরে উডিয়ে দেয় সমাজ সংসার সেই সব ইসলাম তার খুব পছন্দের। তার চিন্তায় বড় করে ফেলেছে প্রায় পঞ্চাশটির মতো শিশু। ইসলামিক ট্যাগ দেখলেই মানুষজন বেস সমীহ করে এবং এগিয়ে আসে, সেই সুবাদে ধংশ হয়ে যাচ্ছে ইয়াং জেনারেশনের অনেকেই। আর রাফিরা বগল বাজিয়ে বলতেছে আমরা দুনিয়াতেই বেহেস্ত নামিয়ে ফেলব ইনশাআল্লাহ। তারা কথা বলার আগে অস্ত্র হাতে নেয়, শরীর থেকে অঙ্গ আলাদা করার পরে আলাপ শুরু করে। ‘আলাপ’ তো বলা হয় দুই পক্ষের সমান কথা-বার্তাকে। কিন্তু তাদের আলাপ একটু আলাদা, যা বলা হবে তাই দলিলে লিখা হবে, আর এটাই তাদের আলাপ। বিচার বা মজলিসে ডাকা হলে তারা ধরে নেয় কেউ একজন নামিয়ে দিয়েছে অঙ্গ, অঙ্গ নামানো ছাড়া অন্য কোনো চিন্তাই তাদের মাথায় আসে না। ঝগড়া-ঝাটি তাদের কাছে কোনো মূল্যায়ন নেই। তারা মেয়ে মানুষ মানে সঙ্গম করা বা মিলিত হওয়াকে বুঝে, তাদের কথা হচ্ছে মেয়েদের সাথে আবার আলাপ কীসের! ওদের সাথে আলাপ করার কিছু নেই। তাদেরকে উপযুক্ত সম্মান দেয়া হচ্ছে বিছানায় মিলিত হওয়া। রাফিদের ইসলাম- যা ধরবে তার রক্ত দেখে শেষ টানবে। এতে করে কার কী গেলো তা না ভাবলে ও চলবে। এগিয়ে যাও, শেষ করে যাও। ‘দশ’ হচ্ছে তাদের একটা মূল্যবোধের সংখ্যা। প্রতি দশের পর একবার দেখে নেয় তাদের বাচ্চারা কে কতোটা এগিয়ে গেলো।

শুভ্র হচ্ছে রাফিদের সমাজে ভিন্ন এক গ্রহ, শুভ্র’র চিন্তা ভিন্ন হওয়ায় রাফির সমাজে তার কোনো স্থান নেই। শুভ্র কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারে না তাদের এই রক্ত-রক্ত খেলা, অথচ এই রক্তের বন্ধনেই আটকে আছে শুভ্র আর রাফির সৌন্দর্য। কারণ শুভ্র বিয়ে করেছে রাফির বোনকে, তাদেরর সংসারে জুড়ে বিচরণ করছে দুইটি শিশু।

বেচে থাকা বা নিজেকে ফিরে দেখার জন্য নীরবতাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র। শরীরের একটা স্থানের জন্য ঔষধ নেয়া যায় কিন্তু সারাটা শরীর যখন নষ্ট হয়ে যায়, কী করার থাকে! নীরবতাই তার শ্রেষ্ঠ ঔষধ।