এক ভিলেন আর তার বন্ধুত্ব

দ্বৈপায়ন মজুমদার

এক ভিলেন আর তার বন্ধুত্ব
দ্বৈপায়ন মজুমদার

ভুল সবাই মনে রাখে, আর পৃথিবী মনে রাখে জয়ীকে । জয়ীর জন্য তৈরি হয় বীরগাথা । রঙিন প্রলেপ চাপে কালের নিয়মে । পরাজিত হয় ধিক্কৃত । তার উপর হয়ে চলা অন্যায়, তার লড়াই চাপা থাকে, শ্যাওলা জমে তার আত্মমর্যাদায় । এ কথা গ্রামে সত্যি, শহরে সত্যি, রাজ্যে সত্যি, ভারতে সত্যি এমনকি মহাভারতেও সত্যি । পরাজিতের অন্যায় পায় সর্বোচ্চ ধিক্কার, আর জয়ীর অপরাধের জোটে যুক্তির সুরক্ষা ।
কোশিস সিনেমাটা মনে পড়ে ? সেই যে মূকবধির বাবা মা, তাদের বাচ্চাটা যখন কাঁদছে দেখার কেউ নেই । আহা, নিশ্চয় আপনার ল্যাক্রিমাল গ্ল্যন্ডে বেদম চাপ তৈরি হয়েছিল । হয়ত লালচে চোখটা মুছে নিয়ে বলেছিলেন ঈশ্বরের কি বিচার, আহারে, বাচ্চাটার কষ্ট শোনার কেউ নেই ।
অথবা ধরুন সেই ১৯৮২, পশ্চিম জার্মানি আর ফ্রান্সের বিখ্যাত (কুখ্যাত?) সেমিফাইনাল, ম্যাচটা হয়ত পশ্চিম জার্মানি জিতেছিল, কিন্তু লোকে মনে রেখেছে পশ্চিম জার্মানির গোলকিপার শুমাখারের সেই মারাত্মক ফাউল, রক্তাত্ত অবস্থায় মাঠ ছাড়তে হয় ফ্রান্সের প্র্যাটিক ব্যাট্টিস্টনকে । দুটো দাঁত পড়ে যায় প্যাট্রিকের, বুকের পাঁজরার হাড়ও ভেঙে যায় । অদ্ভুত ভাবে লাল কার্ড দেখানো তো দূরের কথা রেফারি ফাউলও দেননি সে দিন । ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত জিতে যায় পশ্চিম জার্মানি, তিন-এক গোলে এগিয়ে থেকেও হেরে যায় ফ্রান্স । কিন্তু দিনের শেষে শুমাখারকে ফুটবল প্রেমীরা মেনে নিতে পারেনি ।
কোথায় একটা হিন্দি সিনেমার গল্প, আর কোথায় ফুটবল বিশ্বকাপের সেমি ফাইনাল, বাইনাকুলার দিয়েও হয়ত কোন মিল খুঁজে পাচ্ছেন না । আচ্ছা এ সব বাদ দিন । ধরুন একটা বাচ্চা ছেলে, যার শিক্ষক, দাদু, বাড়ির বড়রা প্রায় সবাই সেকেন্ডক্লাস সিটিজেন ভাবছে তাকে, তখন তার মনের অবস্থা কি হতে পারে ? তার মনে হচ্ছে গুরু সেরা শিক্ষা তাকে না দিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দিচ্ছে, তখন তার মানসিক অবস্থা কি হবে ? যখন তাকে শিক্ষা অর্জনের জন্য অন্য গুরুর কাছে নাড়া বাঁধতে হয় তখন তার এই সমাজ, আত্মীয়দের উপর কি কোন উচ্চ ধারনা থাকা সম্ভব ?
এতটা পড়ে মনে হতে পারে আমি বোধহয় কোন আষাঢ়ে গপ্প শোনাতে এসেছি । না স্যার, আমি এতক্ষণ ধরে যে অগোছালো ঘটনাগুলো বলে চলেছি সেগুলোর মধ্যে একটা ডেফিনিট কানেকশন আছে, অবশ্যই আছে । আসলে এই রকম ঘটনাগুলো যার সঙ্গে ঘটেছে সে মহকাব্যের এক অতি ধিক্কৃত ভিলেন । গব্বর, শাকাল মানে হিন্দি সিনেমার তাবড় ভিলেনদেরও এর মত ঐতিহাসিক লজ্জা আর অপমানের ‘কম্বি প্যাক’ জোটেনি ।
অথচ হতেই পারত বিপরীত, খালি ভাগ্য যে লোকটার সঙ্গে ছিল না কখনও । এমনকি স্বয়ং ভগবানের সামনে একে পরাস্ত করতে যে পথটি বাছা হল তা অলিম্পিকের নিয়মে ‘অ্যাবসলিউট আনফেয়ার’ ।
আচ্ছা শুরু করা যাক, অনেক হেঁয়ালি হল । থ্রোব্যাক কুরুক্ষেত্র । রক্ত, মাংস মাখা মাঠ । বিশ্বাসঘাতকতা, ছলনায় উপচে ওঠা নিষ্প্রাণ শরীরের গোডাউন । আর অপেক্ষায় এক উপেক্ষিত রাজপুত্র । তার সেনানায়করা সবাই প্রায় শেষ, তার সখা নিয়েছে চির বিদায় । পরাজয় তার দরজায় আর কড়া নাড়ছে না, প্রায় ঘরে ঢুকে পড়েছে । এমন সময় তার সম্বল কি ? তার শিক্ষা, শুধুই শিক্ষা । যা তাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জন করতে হয়েছে ।
ফ্ল্যাশব্যাক হস্তিনাপুর, এক অন্ধ বাবা আর চোখ বাঁধা মায়ের ঘরে অসংখ্য বাচ্চা । চিকিৎসার জ্ঞান থাকার কোন দরকার নেই, এমনিতেই আমাদের জানা আছে, অসংখ্য ভাই বোন হলে অপুষ্টি, দুর্বলতার সম্ভবনা অনেক বেশি । বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে তাই দায়িত্ব বর্তাল এতগুলো দুর্বল ভাই বোনের, এদিকে বাবা মার সরাসরি যত্ন থেকে বঞ্চিত । হয়ত যে মুহূর্তে এক শিশু চায় মায়ের কোল, বাবার হাত ধরে নতুনকে চেনা তখন তার যত্ন নিত বেতনভুক কিছু কর্মচারী । আর কিছু সিনিয়র, যাদের স্নেহের কোসেন্টে হয়ত তলানিটুকু বরাদ্দ তার জন্য । এই অবস্থায় আর পাঁচটা বাচ্চা কি ভাবতে পারে, কি করতে পারে । সাধারণত এরা হারিয়ে যায়, জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মত, অ্যামিবার মত দিন কাটিয়ে দেয়, অসহায় আত্মসমর্পন করে ভবিষ্যতের কাছে । এদের মধ্যে থাকে ভাগ্যের উপর ঘৃণা, চারদিকের প্রিভিলেজড লোকগুলোর উপর চরম হিংসা । আর কখনও কখনও খুব কম সময় এরা বেছে নেয় লড়াই এর রাস্তা, সে রাস্তা ম্যাস্টিক দেওয়া ঝকঝকে রাজপথ নয় । বরং বড় কঠিন সে পথ ।
তাই করেছিল সে, তার অস্ত্রশিক্ষাকে সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যেত কি করেনি । রাজবংশের গুরুর প্রিয় ছাত্র সে ছিল না । সব সময় তার মনে হয়েছে গুরুর স্নেহ যেন তার প্রতিপক্ষদের উপর একটু বেশি, নিয়ম মাফিক শিক্ষায় সে বড়জোর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ গদাধর হত, কিন্তু সে তো অন্তত একবার জিততে চায়, জন্ম থেকে পাওয়া সব অপমান, অবহেলাকে ছুড়ে ফেলতে চায় । তাই সে ছুটেছিল, দূর গ্রামের ওই ছেলেটার মত, চাকরির জন্য যে ছেলেটা দাঁত কামড়ে দূরের শহরে আসে কোচিং নিতে । হ্যাঁ অবশেষে গুরু সে পেয়েছিল, গুরু বলরাম সেরাটা দিয়ে শিক্ষা দিয়েছিলেন এই ভাগ্যহত রাজপুত্রকে ।
আর কি ছিলনা এই রাজপুত্রের । ছিল সামাজিক প্রথা ভাঙার এক বুক সাহস, জাতপাত, উচ্চবর্ন নিম্নবর্নে ডুবে থাকা সমাজে নিয়ে এসেছিল এক বুক বন্ধুত্ব । যে সময় শুধুমাত্র জন্ম পরিচয়ে কাউকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়, বিয়ের স্বয়ম্বরে ‘সূতপুত্র’ বলে কাউকে সরিয়ে দেওয়া হয়, সেই সময় বন্ধুত্বের আলিঙ্গনে বেঁধেছিল সে, তুলে দিয়েছিল রাজত্ব । আজকের ‘ফ্রেন্ডশিপ ডে’ তে যখন সোশাল মিডিয়াতে পোস্টের ফ্লাস ফ্লাড হয় তখন সে খুব সহজেই আইকন হতে পারে । আসলে এ কথা ঠিক, রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচ তার আয়ত্তে হয়ত ছিল না, বিশ্বাস ছিল পুরুষকারে ।
কিন্তু এত সব পেরিয়ে আজ সে উপস্থিত যুদ্ধের চরম দিনে । পরাজয় তার দরজায় কড়া নাড়ছে । কিন্তু এই বস্তুকে সে ঘৃণা করে, প্রমাণের সুযোগ সে ছাড়বে কেন । শুধু যুদ্ধই তো না, এর বাইরেও অনেক কিছু আছে প্রমান করার । যুদ্ধের এতগুলো দিন ভীষ্ম, দ্রোণ প্রায় সব মহারথী তাকে ছেড়ে চলে গেছে, আসলে যুদ্ধ করলেও মহারথীদের হৃদয় ছিল প্রতিপক্ষ শিবিরে । কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী যাকে সে কোন ছোটবেলা থেকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চরম ঘৃণা করেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে তার ভাইরা মৃত, বুক চিরে রক্তের পাশবিক উল্লাস সে দেখেছে ।
আজ অন্তত একবার সে জিততে চায়, নেই কোন দেবতার আশ্বাস, সাথে শুধু জনক জননীর দির্ঘশ্বাস আর আশীর্বাদ । আর অবশ্যই অস্ত্র শিক্ষা, যার জন্য সে রাজ বংশের গুরু ছাড়াও নিয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানো ‘অ্যাড অন ট্রেনিং’ । সেই গুরু বলরামকেও সে প্রমান দেবে সেই শ্রেষ্ঠ, প্রতিপক্ষ অনেক পিছিয়ে ।
অবশেষে শুরু হল যুদ্ধ । এমন লড়াই ইতিহাসে কি আর কখনও হয়েছে বা হবে । এ তো আর মাইক টাইসন আর হোলিফিল্ডের অ্যাড্রিনালিন ঝরানো লড়াই না, এ সংগ্রাম জীবন মৃত্যুর, এ লড়াই আত্মমর্যাদার । তা লড়াই হয়েছিল একটা, গদা শিক্ষার দুই শ্রেষ্ঠ মানুষের লড়াই এক তরফা হয়নি, গায়ের জোর যার হাতির থেকেও বেশি বলে সুখ্যাতি, যার হাতে বধ প্রায় পুরো কৌরব বংশ সেও পেরে ওঠেনি এই রাজপুত্রকে কাবু করতে, আর এরপরের ঘটনাগুলো প্রায় সবারই জানা, ঈশ্বরের সামনে যুদ্ধের সব নিয়মকে ছুড়ে ফেলে কোমরের নিচে আঘাতে ধরাশায়ী আজন্ম ভাগ্যহত বীর । হ্যাঁ, এটা ঠিক অন্যায় সে করেছে, বস্ত্র হরণ তার সীমাহীন আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ । কিন্তু যুদ্ধের ‘বেসিক রুল’ না মেনে পুরো কুরুক্ষেত্রে যা হয়েছে সেটা পেয়ে গেছে ‘ন্যায় যুদ্ধে’র ট্যাগ লাইন । এমনকি গুরু বলরামও সেদিন মেনে নিতে পারেননি এই নিয়ম বহির্ভূত আক্রমণ ।
যুদ্ধের এই ঘটনাগুলো হয়ত অনেকেরই জানা । তাই মনে হতে পারে এ মহাভারত কেন শোনাচ্ছি । আসলে শব্দগুচ্ছের খেলা শেষ হবে অন্য কথা বলে । কারণ রক্তাত্ত বীর মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন জিতে গিয়েছিল, চোখের আড়ালে থেকে গেছে সে জয় । আসলে এরপরের গল্পটা শুধু বন্ধুত্বের । আজ তো বছরের সব কটা দিনেই কিছু না কিছু ‘ডে’ লেগে থাকে । তেমনই মহা ধুম ‘ফ্রেন্ডশিপ ডে’ । আমাদের কলেজ জীবনে শোনা পরশপাথরের ‘বন্ধু’ আজও লুকিয়ে থেকে বলে যায় বন্ধুত্বের জানা-অজানা ব্যাকরণ । আর বন্ধুত্বের একটা মাইলস্টোন এই লোকটা । সেই সমাজ ব্যবস্থায় যখন কেউ অস্ত্র শিক্ষায় বঞ্চিত হয় শুধু মাত্র জন্ম সূত্রে রাজ রক্ত না থাকার জন্য, কোন আদিবাসী কিশোরকে আঙুল কাটতে হয় গুরুদক্ষিণার নামে (এমন গুরু যার কাছে অস্ত্র শিক্ষার সরাসরি সুযোগই তার আসেনি), সেই সময় সময় জাতিভেদের শিকল টপকে বুকে টেনে নিয়েছিল ‘সূতপুত্র’কে । আর সেই ধনুর্ধর নিজের জীবন দিয়েছে, কিন্তু বন্ধুর ভালবাসাকে উপেক্ষা করেনি । অনেকে বলতে পারেন এ অঙ্গরাজের উদারতা । এতে ওই লোকটার বন্ধুত্বের কি প্রমান হয় । হয় স্যার হয়, বন্ধুত্বের গল্প যে এখানেই শেষ নয় । গল্পটা এখানেই শেষ হলে বন্ধুত্বের রাজপথে লোকটা হয়ে থাকত ‘জাস্ট অ্যানাদার পার্সন’ ।
রক্তাত্ত বীর তখন জীবনের শেষ কিছু অক্সিজেন টানছে । নিয়মের তোয়াক্কা না করে, ‘ন্যায় যুদ্ধে’ সে নিয়মহীনতার শিকার হতে হয়েছে । আর এখানেই বন্ধুত্বের আর এক গল্প । শুধু অঙ্গরাজ নয়, আর এক বন্ধুও ছিল তার । হয়ত আর এক উপেক্ষিত ব্যক্তি । সে তার গুরুপুত্র অশ্বথামা । যার নামের ছলনায় বিখ্যাত ‘ইতি গজ’ উপাখ্যান দিয়ে তৈরি হয় গুরু দ্রোণ হত্যা । সে ছুটে এসেছিল বন্ধুর কাছে । খুব সহজেই একটু আপস করে গুরুপুত্র হবার সৌজন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে প্রাণ বাঁচানোর একটা চেষ্টা করতে পারত । কিন্তু না, সে এসেছিল বন্ধুত্বের টানে । নিয়মকে কারাগারে পাঠিয়ে তার বন্ধুকে ফেলে রাখা হয়েছে রণাঙ্গনে, মেনে নেয়নি সে । প্রতিজ্ঞা করেছিল বন্ধুর কাছে এসে, শেষ চেষ্টা করবে পাণ্ডব বংশ শেষ করার । আর তারপর কি হয়েছিল সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় । সে সফল নাকি কুরুক্ষেত্র অসংখ্য অন্যায়ের তালিকায় যোগ হয়েছিল ঘুমন্ত অতগুলো মানুষকে নির্মম হত্যা, সে বিষয়টা তোলা থাক ।
কিন্তু কুরুক্ষেত্রে সব হারানো রক্তাক্ত রাজপুত্র যোদ্ধা দুর্যোধন জীবনের শেষ কিছু সময়ে জিতে গিয়েছিল বন্ধুত্বের রাজপথে, আসলে অশ্বথামা হোক বা কর্ণ বন্ধুত্বটা সে করেছিল, সব শিকল টপকে এক নিপাট বন্ধুত্ব ।