সম্প্রসারিত এপিটাফ

বিশ্বদীপ দে

একটা ছবি আঁকছেন সুকুমার রায়।
চমৎকার বিকেল। সামনে নদীর স্নিগ্ধতা। সূর্য আর নেই, কিন্তু তার রঙে ভরে আছে আকাশ। চিরচেনা অথচ কী মায়াময় এক দৃশ্য! সোনালি রঙের বিকেলে রং-তুলির ভেতর মগ্ন হয়ে আছেন অসুস্থ সুকুমার। জানেন, সময় আর বেশি নেই। কিন্তু সময়ের আগেই যেন তিনি সেই মুহূর্তকে প্রত্যক্ষ করছেন সামনের দৃশ্য থেকে। আর তাকে সযত্নে তুলে রাখছেন ক্যানভাসে।
নির্জন তীর। নদীতে ভেসে যাওয়া একলা পাল তোলা নৌকো। আকাশময় ছড়িয়ে আছে কী এক চাপা বিষণ্ণতার রং। এমন ছবি ‘আবোলতাবোল’-এর ছবিগুলোর পাশে এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। অকালপ্রয়াত জীবনের এপিটাফ হয়ে রয়ে গেছে সেই অসামান্য পঙ্‌ক্তি--- ‘ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর,/ গানের পালা সাঙ্গ মোর’। ‘আবোলতাবোল’-এর শেষ কবিতার শেষ দুই লাইনের মর্মস্পর্শী আবেদনের পাশে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে চলে যাওয়ার সামান্য ক’দিন আগে মৃত্যুমুখী সুকুমারের তুলির ডগায় উঠে আসা এক ফুরিয়ে যাওয়া বিকেলের জলছবি। অথচ ‘ঘুমের ঘোর’-এর এক নিদারুণ ছোঁয়াচ ‘সূর্যাস্তের গঙ্গা’ নামের এই ছবির ভেতর অন্তর্লীন হয়ে রয়ে গেছে। কোথাও উচ্চকিত কিছু নেই, যেন তুলিটা সরিয়ে রেখে মৃদুগতিতে এইবার সূর্যাস্তের দিকে হেঁটে চলে যাবেন শিল্পী, চিরকালের জন্য।
এই সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ে সূর্যোদয়ের কথাও। পল এল্যুয়ার লিখেছিলেন, ‘যখন তার মৃত্যু হল সে ভাবল তার জন্ম হচ্ছে।/ কারণ সূর্য উঠছিল।’ অরুণ মিত্রের অনুবাদে এই দুটি লাইন উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে যেন ভোরের শিরশিরে হাওয়াকে সরিয়ে দিয়ে স্বপ্নের মধ্যে জেগে ওঠে আরও শীতল, মৃত্যুহিম এক দীর্ঘশ্বাস। আমরা এসে দাঁড়াই ধড়মড় করে ঘুম ভেঙে উঠে বসা সুফিয়ার পাশে। প্রচণ্ড পেটের ব্যথায় কাতর স্বামী সাদাত হাসান মান্টো ডেকে তুলেছেন তাঁকে। রক্তবমি হচ্ছে খুব। চারপাশে জড়ো হয়েছে বাড়ির অন্যরা। ডাক্তার এলেন। ইনজেকশন দিলেন। কিন্তু ক্রমশ অবনতি হতে লাগল। আর উপায় নেই। হাসপাতালেই যেতে হবে এবার। কিন্তু মানুষটা নাছোড়। তিনি জানেন, লাভ নেই। বাকি সময়টুকু তাই বাড়িতেই থাকতে চান তিনি। আত্মজনদের চোখে জল। মান্টো ক্লান্ত স্বরে ধমক দেন, ‘খবরদার, কাঁদবে না কেউ।’
সুফিয়া খবর দিলেন অ্যাম্বুলেন্সে। বোন ইকবাল বেগম কোরান বের করে পাঠ করতে লাগলেন নীরবে। মান্টোর তখন শীত করছে। তিনি লেপ চাইলেন। আর চাইলেন সামান্য হুইস্কি। হ্যাঁ, মদ। যা তাঁকে শেষ করে দিল, কুড়ে কুড়ে খেয়ে নিল আস্ত জীবনটা। তবু কোটের পকেটে থাকা সাড়ে তিন টাকা দিয়ে আবারও মদই আনাতে চান তিনি। আরেকবার সোনালি তরলের মধ্যে দিয়ে নিজের মতো করে জীবনকে চেখে দেখতে চান। সামান্য পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়ার সময়ই তিনি চলে যাবেন অনেক অনেক দূরে, যেখানে একাই যেতে হয়। ১৯৫৫ সালের সেই দিনের অনেক আগেই তিনি লিখে রেখেছিলেন নিজের এপিটাফ। কেউ অটোগ্রাফ চাইলে তিনি লিখে দিতেন, ‘এখানে মাটির তলায় শুয়ে আছে সেই গল্পকার, যে ভাবছে সে না খোদা, কে বড় গল্পকার।’ জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে অ্যাম্বুলেন্সে যেতে যেতেও কি তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন!
মৃত্যুভয় বা মৃত্যুচেতনা মানুষের মজ্জাগত। স্বজনবিয়োগের মুহূর্তে বা ফাঁকা রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা সাদা, অপাপবিদ্ধ খইয়ের উড়ে বেড়ানো দেখেও মৃত্যুচিন্তা চেপে বসতে পারে। কিন্তু যিনি লেখক, সাদা পাতায় অক্ষরের ভেতরে যিনি অনর্গল নির্মাণ করে যাচ্ছেন মৃত্যু-জন্ম-যৌনতা-প্রত িহিংসা-ক্ষমতার বহুস্তরীয় সব আখ্যান তিনি তো আরও গভীরে নামবেন। নিজের মৃত্যুকে ভেদ করেও তিনি দেখতে পাবেন অনেক অনেক দূর অবধি।
নিজেকে কবরের ভেতর শুয়ে থাকতে দেখেছিলেন মান্টো। আর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ হেঁটে গেছিলেন নিজেরই শবযাত্রায়। মৃত্যুর চুয়াল্লিশ বছর আগে। ১৯৭০ সাল। তিনি তখন বার্সেলোনায়। স্বপ্নের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে মার্কেজ পৌঁছে গেলেন কবরখানায়। পরনে শোকের পোশাক। সঙ্গী মৃত বন্ধুরা। এতদিন বাদে সবার সঙ্গে দেখা। কী অপূর্ব এক পুনর্মিলন! আস্তে আস্তে সময় গড়াল। এবার যাওয়ার পালা। মার্কেজও যেতে চাইলেন। কিন্তু তা তো হবার নয়। এক বন্ধু এসে তাঁকে জানিয়ে দিল, আর কিছুতেই ফেরা যাবে না। এবার থেকে তাঁকে একাই থাকতে হবে। একেবারে একা।
স্বপ্নে দেখা এই দৃশ্যটি নিয়ে মার্কেজ কোনও গল্প লেখেননি। কিন্তু তাঁর শেষ উপন্যাস ‘এন আগাস্তো নোস ভামোস’ (দেখা হবে আগস্টে), যা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি তার প্রথম পরিচ্ছেদে যেন সেই স্বপ্ন এক অন্য রূপে ফিরে আসে। সেখানে দেখা মেলে এক মধ্যবয়সিনী নারীর, যিনি গত আঠাশ বছর ধরে তাঁর মায়ের প্রতিটি মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে আসেন মায়ের কবরের কাছে। রেখে যান গ্লাদিয়োলো ফুলের গুচ্ছ। আর রেখে যান সেই বছরের সমস্ত প্রশ্ন, যার উত্তর তিনি পাননি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস মৃত্যুর পরেও মা আছেন। একা, এই নিঃসঙ্গ নির্জন কবরখানায়। এবং তাঁর সব প্রশ্নের উত্তরই তিনি দেবেন। দেবেন সেইদিন, যেদিন তা পাওয়ার আশা থাকবে সবচেয়ে কম। এই মৃতা মা, তাঁকে মার্কেজ যেন রচনা করেছেন বহু দশক আগে দেখা সেই স্বপ্নের আবহে। যেখানে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া শেষে ফিরে যাওয়া যায় না। প্রিয়জনেরা ফুলের গুচ্ছ নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে আর ফেরা যায় না। থাকতে হয় একেবারে একা।
মার্কেজের স্বপ্নে দেখা শবযাত্রার অনুষঙ্গ আমাদের নিয়ে যায় ১৯৫০-এর ১৫ সেপ্টেম্বর। মৃত্যু এসে পৌঁছোতে তখনও দেড় মাস। তার আগেই নিজের মৃতদেহের মুখোমুখি হলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়! অরণ্যবেষ্টিত পাহাড় ধারাগিরিতে। দ্বিতীয়ার চাঁদ তখন আকাশে। শাল, পিয়াল, আমলকি গাছের ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্নার গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। রাত বেশ অনেকটা গড়িয়েছে। বিভূতিভূষণের বাড়ি ফেরায় মন নেই। সঙ্গের মানুষদের ডাক অগ্রাহ্য করে কী এক অদম্য ঝোঁকে আরও ওপরের দিকে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তখনই চোখে পড়ল খাটিয়ায় শুইয়ে রাখা আপাদমস্তক নতুন কাপড়ে ঢাকা এক মৃতদেহ কে যেন শুইয়ে রেখে গেছে এখানে! চারপাশ নির্জন। সঙ্গীরা অনেকটা নীচে। একা বিভূতিভূষণ আর সেই মৃতদেহ। আচমকাই চারপাশের নৈঃশব্দ্য ভেঙে পড়ল বিভূতিভূষণের আর্তনাদে। সঙ্গীরা শশব্যস্ত হয়ে ছুটে এলেন ওপরে। দেখলেন দুহাতে মুখ ঢেকে বসে আছেন বিভূতিভূষণ। তাঁর সারা শরীরে খেলে বেড়াচ্ছে এক কম্পন। পরে সঙ্গীদের নিয়ে নীচে নামতে নামতে তিনি জানালেন, মৃতের মুখের চাদর সরিয়ে তিনি কী দেখেছেন। দেখেছেন, ওই মৃত মুখ তাঁরই! কোনও স্বপ্ন নয়, রক্তমাংসে গড়া তাঁরই মুখ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিভূতিভূষণ বললেন, ‘আমাকে বোধহয় চলে যেতে হবে শিগগির।’ সঙ্গের বন্ধুরা ধমক দিল। ওসব ইলিউশন। চোখের ভুল। বিভূতিভূষণের মুখে খেলে যায় বিষণ্ণ হাসি। নির্জন জ্যোৎস্নার ভেতর হাঁটতে হাঁটতে তিনি বন্ধুদের জানিয়ে দেন, স্ত্রী কল্যাণী যেন ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারেন এ ঘটনা। আস্তে আস্তে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি।
এরপর ভোররাতে স্ত্রী কল্যাণী টের পান বিভূতিভূষণের ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন বাইরে বেরোনোর দরজা। ‘কী ব্যাপার, এত সকালে কোথায় যাচ্ছ?’ স্ত্রীর প্রশ্ন শুনে বিভূতিভূষণ জানালেন, ‘আর সময় নেই। কাজল শেষ করতে হবে।’ বিস্মিত হলেন কল্যাণী, ‘সময় নেই মানে?’ ম্লান হেসে নিরুত্তর বিভূতিভূষণ কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে চলে গেলেন।
আত্মহননের সময় চোরা বিষণ্ণতার স্রোত চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে পড়তে থাকে সমস্ত মজ্জায়। যেন এক ডালপালাহীন ন্যাড়া গাছের মতো নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে নির্জন প্রান্তরের মুখোমুখি দাঁড়ানো। বস অ্যান্ড কোং-এর স্পোর্ট হান্টিং শটগানের জোড়া নল যখন মাথায় ঠেকাচ্ছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তখন তিনি কী ভাবছিলেন আমাদের জানা নেই। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই স্থির সরোবরের মন নিয়ে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয় সেই মুহূর্তে। মনের ভেতর তখন বইছে উথালপাতাল হাওয়া।
একজন স্রষ্টা নিজেই নিজের মৃত্যুকে ডেকে আনার সময়েও নিশ্চয়ই প্রত্যক্ষ করেন মৃত্যুর ধূসর প্রদেশ। কিন্তু সেই দর্শন ভিন্ন। মৃত্যুর ধীর, নিশ্চিত পদক্ষেপ শুনতে পেয়ে যন্ত্রণাদীর্ণ মান্টো যখন শেষবার ঠোঁটে ছোঁয়াতে চান মদ বা সুকুমার শেষ বিকেলের আকাশের পাঁজরে খুঁজে পান আগামীর অমোঘ নির্দেশ বা খাতা-কলম নিয়ে বসেন বিভূতিভূষণ তার সঙ্গে ওই দর্শনের কোনও মিল নেই।
একশো বছরের নীরবতা নিয়ে যখন নিজের শবযাত্রায় হাঁটেন মার্কেজ, তখন সেই পথে তিনি আমাদেরও শামিল করে নেন। আমরা দেখি, এক যতিচিহ্নের দিকে আমাদের সকলের নির্জন হেঁটে যাওয়া। ওজোর আপত্তি কিছুই যখন টিকবে না, তখন মনের ভেতর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই লাইনই আমাদের প্রার্থনা হয়ে উঠুক।
মৃত্যুর পরেও যেন হেঁটে যেতে পারি।