মানভূমে মহাকবি

কুণাল বিশ্বাস

অপার শূন্যতা, হলুদ ; আকন্দ, বাবলা আর কাঁটাগুল্মের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাঝে আকাশমণি, সোনাঝুরি, পলাশের যৌথখামার। এক স্বঘোষিত নির্লিপ্ততা, অথবা আদিগন্ত মগ্নতার ফাঁকে উঁকি মারা আত্মঘাতী পঞ্চকোট পাহাড়ের চূড়া --- এই অনন্য ক্যালাইডোস্কোপ আদতে গল্প করতে চায় হাঁটু মুড়ে। অনিবার্য স্মৃতিসমেত মুখ খুলে দেয় কাশীপুর রাজবাড়ি।



ব্রিটিশ আমলের বৃহদায়তন মানভূম জেলার রক্ত ও গর্ভস্রাব মাখা একটা অংশ বর্তমান পুরুলিয়া জেলা। ১৮৩৩ সালে তৈরি মানভূম জেলার সদরশহর ১৮৩৮ অবদি ছিল মানবাজার। এর অব্যবহিত পরে পুরুলিয়া নামক ছোট্ট গ্রামটি আর ছোট থাকে না, হয়ে যায় খাস মানভূম জেলার সদরশহর।


১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুন মাত্র ৪৯ বছর ৫ মাস ৪ দিন বয়সে মারা যান বাংলাসাহিত্যের প্রথম এবং খুব সম্ভব একমাত্র মহাকাব্যের স্রষ্টা মাইকেল মধুসূদন। তার ঠিক আগের বছর, ১৮৭২ এর ফেব্রুয়ারিতে পুরুলিয়ার German Evangelical Lutherian Church এর এক সংবর্ধনায় আমন্ত্রিত হ'ন মাইকেল। কবির জীবনীকার গোলাম মুরশিদ 'আশার ছলনে ভুলি' গ্রন্থের ৩৩৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, "ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি সেখানে যান।" হাওড়া-পুরুলিয়া রেলপথ তখনও হয়নি। হাওড়া থেকে বরাকরে এসে পালকি করে পুরুলিয়া আসা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তৎকালীন ম্যাপে আসানসোল নামে কোনো শহরের অস্তিত্বও পাওয়া যায় না।



ঋণভারে প্রাণান্ত, সংসার-জীবনে ধ্বস্ত মাইকেলের কাছে মানভূম সফর ছিল সজোরে একবুক অক্সিজেন টেনে নেওয়ার মতো। এসেছিলেন পুরুলিয়া ফৌজদারি কোর্টে বাদীপক্ষের হয়ে মামলা লড়তে। কোর্ট থেকে তাঁকে খোল করতাল সহ ধর্মীয় সংগীত গাইতে গাইতে প্রসেশন করে আনা হয়। সুরেশচন্দ্র মৈত্র্যের 'মাইকেল মধুসূদন দত্ত --- জীবন ও সাহিত্য' গ্রন্থের ২১০ পাতায় চার্চের দু'জন অত্যুৎসাহী ব্যক্তির উল্লেখ আছে --- কাঙালীচরণ সিংহ এবং সুধাংশুমোহন চৌধুরী। মূলত এঁদের উদ্যোগেই সম্মানিত হ'ন মধুকবি। ধর্মান্তরিত হ'লেও ব্যক্তিজীবনে সেভাবে ধর্মাচরণ করতেন না মাইকেল। কোলকাতা, মাদ্রাজ, লন্ডন, ভার্সাই সহ একাধিক শহরে থাকাকালীন চার্চ ইত্যাদি প্রায় এড়িয়ে চলতেন। কোলকাতার (অথবা, কলিকাতার) উন্নাসিক মধ্যবিত্ত হেঁদুকূলপতিগণ তদ্দিনে তাঁকে তুচ্ছার্থজ্ঞান করতে শুরু করেছে। পুরুলিয়ার সংশ্লিষ্ট চার্চের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হওয়া তাই স্বাভাবিক। এমনকি, কাঙালীচরণের পুত্র কৃষ্ণদাসের ধর্মান্তরিতকরণ (Baptism) অনুষ্ঠানে ধর্মপিতার ভূমিকায় ছিলেন স্বয়ং মাইকেল। প্রথাগত ধর্মাচারে বিমুখ বেপরোয়া মাইকেল বাকি চার্চ সদস্যদের অনুরোধে ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করেছিলেন। খামখেয়ালী চরিত্রের সার্থকতর নমুনা আর কীই বা আছে! পুরুলিয়ার খ্রিষ্টমন্ডলীকে উদ্দেশ্য করে চার্চে বসেই লিখে দিলেন একটা গোটা সনেট ---


পাষাণময় যে দেশ, সে দেশে পড়িলে
বীজকুল, শস্য তথা কখন কি ফলে?
কিন্তু কত মনানন্দ তুমি মোরে দিলে,
হে পুরুল্যে! দেখাইয়া ভকত-মন্ডলে!
শ্রীভ্রষ্ট সরস সম, হায়, তুমি ছিলে,
অজ্ঞান-তিমিরাচ্ছন্ন এ দূর জঙ্গলে ;
এবে রাশি রাশি পদ্ম ফোটে তব জলে,
পরিমল-ধনে ধনী করিয়া অনিলে!
প্রভুর কি অনুগ্রহ! দেখ ভাবি মনে,
(কত ভাগ্যবান্ তুমি কব তা কাহারে?)
রাজাসন দিলা তিনি ভূপতিত জনে!
উজলিলা মুখ তব বঙ্গের সংসারে ;
বাড়ুক সৌভাগ্য তব এ প্রার্থনা করি,
ভাসুক সভ্যতা-স্রোতে নিত্য তব তরি।


এভাবেই মধুসূদনের সনেটের মাধ্যমে 'পুরুলিয়া' শব্দটি বাংলা সাহিত্যে প্রথম ব্যবহৃত হল। স্বর-অসংগতিতে লৌকিক উচ্চারণ 'পুরুল্যা' মাইকেলের চতুর্দশপদী-তে অনায়াসে নাম নিল 'পুরুল্যে'। ১৮৭২ সালে 'জ্যোতিরিঙ্গন' পত্রিকার এপ্রিল সংখ্যায় সনেটটি মুদ্রিত হয়।

এর ঠিক আগের বছর মধুকবি ঢাকা গেছিলেন কোর্টের কাজে। সেখানকার কবিতাপ্রেমীদের আপ্যায়নে উৎফুল্ল মাইকেল 'ঢাকাবাসীদিগের অভিবাদনের উত্তরে' নামে একটা কবিতা লিখেছিলেন চটজলদি ---


নাহি পাই নাম তব বেদে কি পুরাণে
কিন্তু বঙ্গ অলঙ্কার তুমি যে তা জানি
পূর্ব্ব-বঙ্গে।...
সৌভাগ্য অর্পিলা মোরে (বিধির বিধানে)
তব করে, হে সুন্দরি।...
যুগে যুগে বসুন্ধরা সাধেন মাধবে
করিও না ঘৃণা মোরে, তুমি ভাগ্যবতী।


তবে পুরুলিয়ার মতো আর কোনো শহর বা জনপদকে কেন্দ্র করে মাইকেল টানা সাতটি কবিতা রচনা করেননি --- যার মধ্যে পাঁচটি সনেট এবং দু'টি সনেটকল্প কবিতা।

প্রথম মানভূম সফর শেষে কোলকাতা ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পরেই পঞ্চকোটরাজ নীলমণি সিংদেও-র (১৮২৩-১৮৯৮) আহ্বানে মাইকেল আরেকবার পুরুলিয়া আসেন। এবার সাময়িক কোর্টের কাজ বা সংবর্ধনা উপলক্ষ্যে নয়, পঞ্চকোট রাজসভায় স্থায়ী রাজকর্মচারী হিসেবে। নীলমনি সিংদেও একজন মামুলি করলুদ্ধ শাসক ছিলেন না। তিনি বাংলাদেশের এক বিরল আঞ্চলিক রাজা যিনি সিপাহী বিদ্রোহে আঞ্চলিক স্তরে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বন্দী (১৮৫৭-১৮৫৯) হয়েছিলেন। তাঁর সাথে সাঁওতাল প্রজাদের অতিরিক্ত সখ্যের কারণেই মানভূমে সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রভাব সীমিত ছিল। সংগীতে অসামান্য দখল ছিল নীলমণির। রবীন্দ্রনাথের সংগীত-গুরু যদুভট্ট দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন পঞ্চকোট রাজসভায়। নীলমণি তাঁকে 'তানরাজ' উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। অজস্র লোকগানের মধ্যে ভাদুগানের আয়োজন মহারাজ নীলমণির শ্রেষ্ঠ কাজ। তিনি চাইতেন, ভাদ্র মাসে কৃষিকাজের মরসুম শেষে প্রতিটি বাড়ির মেয়েরা সাংগীতিক অনুষ্ঠানে মেতে উঠুক। মানভূমে প্রচলিত প্রবাদ আছে --- "কথা বললেই গান, চলতে গেলেই নাচ..."(সেনগে জুজুম, কাজিগো দুরুম)। নীলমণির মেয়ে চন্দ্রকুমারীও কবি ; ঝুমুর গান লিখতেন। মানভূম সিংভূমের বিস্তৃত এলাকায় এই চন্দ্রকুমারীই 'ভাদুরাণি' হিসেবে পুজো পেয়ে আসছেন। স্বভাবতই, বোহেমিয়ান মাইকেলের ভালো লেগে যায় মহারাজ নীলমণি এবং তাঁর পরিবারের সংস্কৃতি, প্রগতিশীলতা।


১৮৭১-৭২ সালে J.D. Beglar নামে এক প্রত্নতাত্ত্বিক পূর্বভারতের সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের খোঁজ করতে করতে পঞ্চকোট এসে পৌঁছান। রাজধানীটির ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রাচীন মন্দির, রাজপ্রাসাদ, পরিখা, তোরণ, বাজার সহ অনেক কিছুর কথা নথিভুক্ত করেন যা 'PANCHET' শিরোনামের প্রবন্ধে ছাপা হয় 'A Tour Through Bengal Provinces' নামক গ্রন্থে। শেক্সপিয়ার, পেত্রার্কের কাব্যরীতির প্রভাব থাকলেও নিজগুণে মৌলিক মধুসূদনের ইতিহাস-আশ্রিত আরেকটি সনেটে এর অনুষঙ্গ আছে ---


কাটিলা মহেন্দ্র মর্ত্ত্যে বজ্র প্রহরণে
পর্ব্বতকুলের পাখা ; কিন্তু হীনগতি
সেজন্য নহ হে তুমি, জানি আমি মনে,
পঞ্চকোট! রয়েছ যে, --- লঙ্কায় যেমতি
কুম্ভকর্ণ, --- রক্ষ, নর, বানরের রণে ---
শূন্যপ্রাণ, শূন্যবল, তবু ভীমাকৃতি, ---
রয়েছ যে পড়ে হেথা, অন্য সে কারণে।
কোথায় সে রাজলক্ষী, যাঁর স্বর্ণ-জ্যোতি
উজ্জ্বলিত মুখ তব? যথা অস্তাচলে
দিনান্তে ভানুর কান্তি! তেয়াগি তোমায়
গিয়াছেন দূরে দেবী, তেঁই হে! এ স্থলে,
মনোদুঃখে মৌন ভাব তোমার ; কে পারে
বুঝিতে, কি শোকানল ও হৃদয়ে জ্বলে?
মনিহারা ফনী তুমি রয়েছ আঁধারে।


নীলমণি সিংদেওর এস্টেটের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার মাইকেলের কাশীপুর ত্যাগ একেবারেই আকস্মিক। জনৈক শারদাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাথে মামলা চলছিল নীলমণির। মধুসূদনের সুপারিশে বিখ্যাত ব্যারিস্টার আর.টি.অ্যালেনকে মামলা লড়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। শারদাপ্রসাদের পক্ষে ছিলেন সেইসময়কার দুঁদে উকিল শ্রীনাথ দাস। ১৮৭২ সালের ২ সেপ্টেম্বর মামলাটি কোলকাতা হাইকোর্টে খারিজ হয়ে যায়। জেলা আদালতের রায়ই হাইকোর্ট বহাল রাখে। রাজাকে ৬% সুদ সহ সমস্ত টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বৈষয়িক ক্ষতি গৌণ, আসল ছিল নীলমণির প্রেস্টিজ ইস্যু। পূর্বাপর সম্পর্ক, নৈকট্য সব ভুলে রাজা ভয়ানক ক্ষেপে ওঠেন মাইকেলের উপর। যাচ্ছেতাই ভাবে অপমানিত হতে হয় মাইকেলকে। এমনকি তাঁর প্রাণসংশয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয় রাজার কুচক্রী পারিষদবর্গের মন্ত্রনায়। মাইকেল দু'মাসের বকেয়া মাইনে, ১৬০০ টাকা না নিয়েই রাজার এক জ্ঞাতিভাইয়ের সাহায্যে বরাকর রোড অবদি পৌঁছান। সেখানে থেকে কোলকাতা।


রাজার বিরাগভাজন হওয়ার আরেকটি কারণও বহুল প্রচারিত। শিউলীবাড়ি গ্রামের এক নাপিত একাধিক রাজসদস্যের পরামর্শে নীলমণির কাছে মাইকেলের ব্যাপারে মুহুর্মুহু মিথ্যে অভিযোগ করতেন। রাজার গায়ে নাকি উৎকট গন্ধ, তাই মধুসূদন রাজার কাছে আসলেই মুখে রুমাল চাপা দেন --- এরকম উস্কানিমূলক রটনায় স্বভাবতই রেগে ছিলেন নীলমণি। মাইকেল মদ্যপ অবস্থায় সভায় আসতেন বলে মদের গন্ধ ঢাকতে মুখে রুমাল চাপা দিতেন --- এই ছিল আসল ঘটনা। কাশীপুরের আপাত-নির্বিঘ্ন পরিবেশ ছেড়ে মাইকেল আদৌ কোলকাতা ফিরতে চাইছিলেন না। পারিপার্শ্বিক জটিল আবর্ত তাঁকে বাধ্য করে কাশীপুর ছাড়তে। রাজা প্যারীমোহন মিত্র লিখেছেন ---

"He found it intolerable and quite at the mercy of the Raja's barber and other menials, a whispered hint from whom was enough to mar the fortunes even of his high Officials."

নীলমণি সিংদেও কিছুদিন পরে কোলকাতায় মাইকেলের ঠিকানায় যোগাযোগ করে প্রাপ্য ১৬০০ টাকা নিয়ে যেতে বলেন। মাইকেলের ব্যক্তিগত সহকারী কৈলাশচন্দ্র বসু কাশীপুরে এসে মাইকেলের হয়ে সেই টাকা নিয়ে যান।


কাশীপুর, পঞ্চকোট কবির মর্মে ঢুকে গেছিল। না হলে এই লেখা অসম্ভব ---


কহিলা বাগ্দেবী দাসে (জননী যেমতি
অবোধ শিশুরে দীক্ষা দেন (প্রেমাদরে),
"বিবিধ আসছিল পুণ্য তোর জন্মান্তরে,
তেঁই দেখা দিলাম তোরে আজি হৈমবতী
যেরূপে করেন বাস চির রাজ-ঘরে
পঞ্চকোট ; --- পঞ্চকোট --- ওই গিরিপতি।



মাইকেলের জীবন নিয়ে সামান্য কথা বলা মানেই যেচে এক প্যারানইয়াতে ঝাঁপ দেওয়া। আদ্যন্ত বোহেমিয়ানিজম, আনসেন্সর্ড জীবনযাপন --- দোষগুন সবকিছু মিলে ভীষণ জীবন্ত মাইকেল প্রচলিত অর্থে সৌম্যশুদ্ধ, স্থির নয় মোটেই। অথচ, মানভূম পর্বে মহাকবি যেন সত্যিই অবসন্ন, স্নায়ু-সমাহিত এক কবিতাবিদ। অবিকল ডানাভাঙা পাখির উপমা, যার পাঁজর অটুট।


পঞ্চকোটের চূড়ায় কল্পিত অপরাহ্নে হয়তো এখনও সূর্যাস্ত হয় মাইকেলের শব্দ ছুঁয়ে, অমিত্রাক্ষর ছন্দে !


ঋণঃ

(১)'আশার ছলনে ভুলি' --- গোলাম মুরশিদ

(২)'মাইকেল মধুসূদন দত্ত --- জীবন ও সাহিত্য' --- সুরেশচন্দ্র মৈত্র্য

(৩)যোগীন্দ্রনাথ বসু রচিত কবির প্রথম জীবনীগ্রন্থ

(৪)'মানভূমে মাইকেল' --- দিলীপ কুমার গোস্বামী

(৫)'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' --- শিবনাথ শাস্ত্রী