একটি তীর্থ-পূর্ণ ভ্রমণের আড়ালে কাশ্মীর প্রসঙ্গ

শিবু মণ্ডল



বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে একটাই কথা মনে হয় যে কোন পক্ষ নেওয়া আমার সাজে না। চারিদিকে যখন মানুষের পরিচয় হয়ে ওঠে তার শ্রেণী, ধর্ম, জাতি, দল ইত্যাদি ইত্যাদি বিভাজনের মাত্রা দিয়ে, তখন না হয় একটু একলা হয়ে ভাবলাম । ভাবতে ভাবতে প্রায় দু’টা বছর পিছনে চলে যাই । গত ২০১৫ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিকে গিয়েছিলাম অমরনাথ যাত্রায়। সেইসাথে কাশ্মীরের কিছুটা অংশ ভ্রমণ ও করে নিই । এর আগে কখনও জম্মু-কাশ্মীর যাইনি। একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে কাশ্মীরের ভৌগলিক সীমারেখাকে ভারত হিসেবেই জানতাম আর কাশ্মীরিদের কাশ্মীরি হিসেবেই । এখনও তাই জানি আর এটাও মনে-প্রাণে বুঝেছি যে কাশ্মীরিরাও ভারতীয় নাগরিক আমার আপনার সবার মত । কাশ্মীর যাবার আগে আমার মনের মধ্যে কাশ্মীর ও কাশ্মীরিদের সম্পর্কে যে সন্দেহ, ভীতি ইত্যাদি জাগিয়ে রাখা হয়েছিল সেই সন্দেহ, ভীতিই প্রধান অন্তরায় ছিল তাদেরকে আমার সহনাগরিক ভাবার ক্ষেত্রে । তবে কাশ্মীর ঘুরে আসার পর সেই অন্তরায় দূরে সরে গেছে ।
অমরনাথ গিয়েছিলাম পহেল্‌গাঁও হয়ে দু’দিনের হাঁটা পথে । পহেল্‌গাঁও অমরনাথ যাত্রার বেস্‌ক্যাম্প । লিড্ডার নদীর ধারে রূপকথার মত সাজানো এই উপত্যকার অনেকটা জায়গা জুড়ে যাত্রীদের জন্য তাঁবু বিছানো বিভিন্ন রঙের। সেগুলো অবশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে নয়, কাঁটা তারের ঘেরা আর সিআরপিএফ জওয়ানদের ২৪ ঘন্টা নিশ্ছিদ্র প্রহরায় আবদ্ধ। তার ভেতরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের তরফ থেকে লঙ্গরখানার ব্যবস্থা - এই ব্যবস্থা অবশ্য জম্মুকাশ্মীরে অমরনাথ যাত্রার পুরো যাত্রা পথ ধরেই। পাশাপাশি অন্যান্য ছোট খাট প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছে স্থানীয়রা । আমরা অবশ্য ক্যাম্পে থাকিনি, ছিলাম বাইরে JKTDC র গেষ্টহাউসে, দু’রাত ছিলাম। মাঝের দিনটাতে পহেল্‌গাঁও ও তার আশপাশের আরু ভ্যালি, বৈসারন ভ্যালি, ও ‘বেতাব’ সিনেমাখ্যাত বেতাব ভ্যালি ঘুরে নিলাম। সেই সুবাদে স্থানীয় লোকজন,দোকানি,গাড়ি চালকদের সাথে দুটো দিন কাটিয়ে ছিলাম। কোথায়, তখন তো মনে হয়নি যে এদের মধ্যে আতঙ্কবাদী অথবা বিচ্ছিন্নতাবাদী লুকিয়ে আছে । তবে পহেল্‌গাঁও-এর মেইনরোডের ধারে ছোট্ট বাজারেই প্রকাশ্য ‘ঘা’ নিয়ে একটি পোড়া ভাঙাচোরা বাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। আশেপাশের লাগোয়া বাড়িগুলি তো ঠিকঠাক আছে তবে এ কেন একলা এমন- এই জিজ্ঞাসা একটি প্রশ্ন খুঁচিয়ে দিল মনে। কাশ্মীরে তো জঙ্গি-সেনা লড়াই আকছার ঘটেই আর জঙ্গিদের লুকানোর ডেরা গ্রেনেড দিয়ে সাধারণত উড়িয়েই দেয় সেনাবাহিনী । এই বাড়িটিও কি তবে সেই চিহ্নই বহন করছে ! এটা ভেবেই সেই ‘ঘা’ খুঁচিয়ে স্থানীয়দের কাছে উত্তর চাইতে ভয় হল।
চন্দনবাড়ি থেকে পিসু টপ- শেষ নাগ- গণেশ টপ- পঞ্চতারিণীর দুর্গম পাহাড়ি পথে ট্রেক করে অমরনাথ গুহায় পৌছতে হয়। মাঝখানে শেষনাগে ও পঞ্চতারিণীতে দু’দিনের রাত্রিযাপন। ১৫০-২৫০ টাকা জনপ্রতি বিভিন্নরকম তাঁবু পাওয়া যায় থাকার জন্য। পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে বালতি ভর্তি গরম জল ও পাওয়া যায় স্নান-শৌচের জন্য। প্রতিকূল আবহাওয়ার দুর্গম পথে এসব কিছুরই ব্যবস্থা করে যাত্রিদের যাত্রা সুগম করে দেয় কাশ্মীরিরা। পরিবর্তে তাদের যা রোজগার হয় তা তাদের কষ্টের তুলনায় সামান্যই।

মহম্মদ আশরাফ ওয়ানি আর ফয়াজ মালিক দুজন পিঠ্‌ঠু (মাল বাহক)প্রথমদিন চন্দনবাড়ি থেকে শেষনাগ ও দ্বিতীয়দিন শেষনাগ থেকে পঞ্চতারিণী পর্যন্ত আমাদের তিনজনের ব্যাক-প্যাক পিঠে করে পৌছে দিল, যাদের ছাড়া আমাদের এক-পা ও এগোনো অসম্ভব ছিল। পরিবর্তে ওদের মোট পারিশ্রমিক একেকজনের হাজার টাকা মাত্র, মাঝে রাত্রিতে ওরা কোথায় কিভাবে ঐ তুষার প্রান্তে ছিল সেটা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। পথ চলতে গিয়ে স্বভাবতই ওদের থেকে পিছিয়ে পড়ছিলাম আর মনে মনে শঙ্কা করছিলাম – যদি লাগেজ নিয়ে পালিয়ে যায় ! তবে গুহা থেকে বালতাল হয়ে নামার সময় যে পিঠ্‌ঠু আমাদের লাগেজ নিয়ে আগে নেমে এসেছিল সে কিন্তু আমাদের এক সন্দেহের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। নামার পর বালতাল রুটের এন্ট্রি গেটের সামনে তাকে খুঁজে না পেয়ে অপেক্ষার পর আমরা নেমে যাই বেস্‌ক্যাম্পের দিকে। অমরনাথ যাত্রা চলাকালীন প্রশাসনের তরফ থেকে মাল বাহকদের একটি পরিচয়পত্র ইস্যু হয়, পথে যাত্রী আলাদা হয়ে পড়ে যাতে অসুবিধায় না পড়ে সেইজন্য মাল বাহকেরা তাদের পরিচয়পত্রটি তার যাত্রীর কাছে রেখে দেয় যতক্ষণ না গন্তব্যে পৌছচ্ছে । সেটি নিয়ে আমরা ক্যাম্পের দুএকটি সূচনা কেন্দ্র থেকে গুলাম রসুল এর নামে অনেকবার অ্যানাউন্স করলাম তবুও তাকে পাওয়া গেল না । এভাবে আধঘন্টা পর আমরা বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলাম- সেখানকার ক্যাম্প থেকেও প্রায় আধঘন্টা ধরে অ্যানাউন্স করে তার পাত্তা পাওয়া যায়নি। যাই হোক সে কিন্তু পালায়নি । আমাদের এক সাথি সঞ্জয় যখন আবার ফিরে গেল বালতাল রুটের এন্ট্রি গেটের দিকে,দেখল সেখানেই একটি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে বসে আছে গুলাম আমাদের ব্যাগ আঁকড়ে। ততক্ষণে কাশ্মীরে সব সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় সেনাবাহিনীর এক জওয়ানকে আমাদের উদ্ভূত সমস্যার জিকর্‌ করে ফেলেছি কোন উপায় না দেখে। তার সাথেই আমি আর আমাদের অন্য সাথী সিদ্ধার্থদা আলাপ করছিলাম। কথায় কথায় সেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানটি বলছিল –‘আরে এদের বিশ্বাস করা যায় না, সেনা আছে বলেই কিছু করতে সাহস পায় না নয়তো বাইরের রাজ্য থেকে লোক আসতেই পারত না । আর কবেই পাকিস্থানকে ঢুকিয়ে দিত কাশ্মীরে।’ যাই হোক আমাদের সব আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে গুলাম রসুল ফিরে এল মালপত্র সমেত সঞ্জয়ের সাথে। স্বস্তি পেলাম। সিআরপিএফ জওয়ানটি তো ‘কিয়া রে যাত্রী লোগোকো পরেশান্‌ কিউ করতা হ্যাঁয়’ বলে প্রায় লাঠি উঁচিয়েই যাচ্ছিল গুলামের দিকে, আমরা বাঁধা দিয়ে বললাম – না না ও কোনো দোষ করেনি। আমাদেরই উচিত ছিল আমাদের নাম-ঠিকানা ওকে লিখে দেওয়া যাতে ও আমাদের না পেলে অ্যানাউন্স করে দিতে পারে।
এত খাটাখাটুনির পরিষেবা, যাত্রীদের বিরক্ত মুখ, সেনা-জওয়ানের চোখ-রাঙ্গানির (একটু বেচাল দেখলে লাঠির ‘ঘা’ ও) পরেও বিস্ময় বদনে এই গরিব খেটে খাওয়া মানুষগুলো সেলাম জানিয়ে আর যৎসামান্য পারিশ্রমিক নিয়ে যখন ফিরে যায় আবার অন্য কোন যাত্রীর মাল বইতে তখন কিন্তু সে আর কাশ্মীরি থাকে না আমার কাছে। গুলাম, ফয়জল, আশরাফ-রা তখন আর দশটা খেটে খাওয়া ভারতীয়র মতই আমার সহনাগরিক হয়ে যায়। ওদের চোখে-মুখেও ভেসে ওঠে সুখ, ভেসে ওঠে দুঃখ আমার দৈনন্দিন দেখা চারপাশের সহনাগরিকদের মতই।
আবার যখন সোনমার্গের রেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার ৪৫ বছরের মহম্মদ সিদ্দিকি গল্পে গল্পে তার বউ-মেয়েদের কথা শোনায় , তাদের ছবি দেখায় তখন কিন্তু সে আর আমাদের হিন্দুস্থানী মনে করে না। তার কাছে তখন আমরা বাঙ্গালী পর্যটক ! নির্জন প্রান্তে পড়ে থাকা এই গেষ্ট হাউসে যখন রাত্রি নামে গা ছমছম করে। গেষ্ট হাউসের রেস্টুরেন্টটি আবার তার থেকে প্রায় তিনশ মিটার দূরে অন্য একটি বাংলোতে। রাত আটটায় ডিনার সেরে গেষ্ট হাউসে ফেরার পথে কিছু একটা কথা শুরু করতেই অন্য দুজন সঙ্গী নিঃশব্দে দ্রুত পা চালানোর ইঙ্গিত দেয়। হঠাৎ মনে হল অনতিদূরের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যেন এক গাঢ় ছায়ার মত আতঙ্ক সাথীদের মত আমারও বুকে এসে চেপে বসেছে। একটি টর্চের আলো আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। কাছে আসতেই দেখি দু’জন পুলিশ গেষ্ট হাউসের দিকেই আসছে। সামনা সামনি হতেই আমাদের গন্তব্য ও উদ্দেশ্য জেনে নিল। বুকে শ্বাস ফিরে এল। তারপরও দুটো রাত কাটিয়ে দিই সিদ্দিকি ভাইয়ের সাহচর্যে। বিদায় নিই সপরিবারে আবার ঘুরতে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
সোনমার্গ থেকে শ্রীনগর যাবার জন্য ট্যাক্সি ঠিক করে দিয়েছিল সিদ্দিকি ভাই। গাড়ির ড্রাইভার খুরশিদ আহ্‌মদ কাশ্মীরের স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখাতে দেখাতে নিয়ে চলল। খুরশিদ হিন্দিতে চোস্ত্‌,ব্যবহার ও বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ। আমার একটা বদভ্যাস আছে – যেখানেই ঘুরতে যাই সেখানকার স্থানীয় ড্রাইভারদের কাছ থেকে সেই স্থান সম্বন্ধে নানা তথ্য জানার আগ্রহ করি। খুরশিদের সাথেও জমিয়ে নিলাম। আলোচনায় শুধু কাশ্মির-তার সৌন্দর্য আর তার সমস্যা। কাশ্মীর সম্বন্ধে যে ধারণা ছিল আর যা দেখছি তার জিক্‌র ও পাড়লাম। খুরশিদও খুব সাবলীলভাবে একটা সরল সত্য আমাদের বোঝাতে চাইল যে কাশ্মীরে অশান্তি তারা কখনই চায় না, সাধারণ কাশ্মীরিরা জড়াতেও চায় না। এসবই রাজনীতি আর ইয়াসিন মালিক, সইদ আলি শাহ্‌ গিলানির মত সুবিধাবাদী নেতা যারা একদিকে হিন্দুস্থানের পালিতপুত্র আর পাকিস্থানের ঘরজামাই হয়ে থাকতে চায়, সমস্ত সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ভোগ করে – তাদেরই ষড়যন্ত্র। সাধারণ বাসিন্দারা শুধু না জেনে বুঝেই বা বাধ্য হয়েই এই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে যায়। খুরশিদের মত একদম নিচু তলার সাধারণ কাশ্মীরিদের সুবিধা অসুবিধা, দুঃখ দুর্দশা দূর করবার সদিচ্ছা কোন রাজনৈতিক দলেরও নেই সে ওমর আবদুল্লাহ্‌ হোক অথবা মেহ্‌বুবা মুফতি।
এবার সাহস করে খুরশিদকে চরম অনুভূতিশীল প্রশ্নটা ও করে ফেললাম- যে কাশ্মীরি মুসলিমরা সতিই কি ভারতের থেকে পাকিস্থানকে বেশি সাপোর্ট করে? খুরশিদের এবার মোক্ষম জবাব – পাকিস্থান কি কাশ্মীরিদের দারিদ্রতা দূর করতে পারবে ? সাথে তার সংযোজন ‘হিন্দুস্থান হোক বা পাকিস্থান, কাশ্মীরের সমস্যা নিয়ে কোন দেশেরই কোনরকম মাথাব্যাথা নেই’-মন্তব্যটি যেন বুকে এসে সরাসরি বিঁধল, যেন আমার ভারতীয় নাগরিকত্বের অহংকারের কোথাও।
তবে খুরশিদের কথাটি যতই আঘাত দিক, দুটি প্রশ্ন কিন্তু তারপর থেকে মনের মধ্যে আসেই যে ভারত রাষ্ট্র কি সত্যিই কাশ্মীরিদের দারিদ্রতা ও দুর্দশার সমাধানে সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না? নাকি কাশ্মীরিদের মৌলিক চিন্তা ভাবনার মধ্যেও এমন কিছু বীজ ঢুকে গেছে যে বৃহৎ ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে সেই সমাধান আর্থিক, সামাজিক ভাবে করা সম্ভব নয়। আর সেখানেই কি চলে আসছে রাজনীতি ! আর তার পিছু পিছু দ্বন্ধ, হিংসা, প্রতিহিংসা ? দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও বেশি করে নাড়া দেয় যখন শ্রীনগরে আসি। এটাও ভারতের আর দশটা শহরের মতই। তবে তার ভীতটা কিন্তু অন্যান্য শহরের থেকে আলাদা। এখানকার পত্র পত্রিকাগুলিও উল্লেখযোগ্য ভাবে নজর কাড়ে – তাতে ভারত কিন্তু তাদের কাছে ‘হিন্দুস্থান’ -যেন আলাদা একটি রাষ্ট্র যেমন পাকিস্থান তাদের কাছে। সর্বভারতীয় অনেক কিছুই তাদের চোখে হিন্দুস্থানের ব্যাপার-স্যাপার; যেন কাশ্মীর তার মধ্যে পড়ে না- এরকম একটা চোরাস্রোত কিন্তু ঝীলম নদী দিয়ে বয়েই যায়। আর আমার মনে হয় এই চোরাস্রোতের উৎপত্তিস্থলও কাশ্মীরিদের ভয়গ্রস্থ মন। অবশিষ্ট হিন্দুস্থান বিশেষ করে হিন্দুস্থান রাষ্ট্রের প্রতি ভয়, অবিশ্বাস, সন্দেহই তাদের নিজেদেরকে ভারতীয় ভাবার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়, যেমন আমার ছিল কাশ্মীরিদের সম্বন্ধে। বাকি ভারতীয়দের তো তবু সুযোগ আছে কাশ্মীর, কাশ্মীরিদের ছুঁয়ে দেখার, অনুভব করার। কিন্তু কাশ্মীরিদের তো বৃহত্তর ভারতকে বোঝার, ছুঁয়ে দেখার সেই সুযোগটাই কম। তারা তো ভারত রাষ্ট্রকে অনুভব করে সেনাদের টহল ও সন্দেহের চোখ রাঙ্গানিতে, তাতে আতঙ্কের সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর কিছুটা ভারতের স্পর্শ তারা পায় আমাদের মত পর্যটকদের উপস্থিতিতে- তখন কিন্তু তারা বেশ স্বচ্ছন্দ ও হৃদ্যতাপূর্ণ। কেয়ারটেকার সিদ্দিকি ও ড্রাইভার খুরশিদের থেকে এটা জানতে চেয়েছিলাম যে কাশ্মীরে এত অশান্তি হয়, পর্যটকদের উপরে কোন হামলা হয় না তো ! দুজনের কথাতে এটাই স্পষ্ট হচ্ছিল যে আতঙ্কবাদীরা বা বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সাধারণত পুলিশ ও সেনার উপরেই হামলা চালায়, পর্যটক বা অনান্য সাধারণের ক্ষতি তারা করে না। তবে যেকোন ছোট বড় অশান্তির জের কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে তাদের প্রধান জীবিকার উপায় পর্যটনের উপর পড়েই, তাতে কিন্তু আখেরে ক্ষতি সাধারণ কাশ্মীরিদেরই- এই সত্যিটা খুরশিদ, সিদ্দিকি,রসুলদের মত অধিকাংশ কাশ্মীরিরা এখন বুঝতে পারে। তারপরেও তাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা ভাবনা ও তার প্রকাশ করতে না পারার একমাত্র কারণ তারা ভারতীয় হয়ে উঠতে পারছে না। আর এখানেই ভারতীয় প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য – কাশ্মীরের অর্থনৈতিক ভীত শক্ত করা, সেখানকার যুবক-যুবতীদের শিক্ষা ও কর্ম সংস্থানের পাশাপাশি তাদের ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শরিক করে তোলা। তাতেই কাশ্মীরে স্থিরতা আসবে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে তারা যত স্বাধীন হবে তত তারা অন্যের চিন্তাধারা ও ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিজেরা স্বাধীন ভাবে চিন্তাভাবনা করতে পারবে। তাদের মৌলিক চিন্তাগুলির বিকাশ ঘটবে। কাশ্মীরি পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে তারাও পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের এক একটি চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। তারা ভারতীয় হয়ে উঠবে!



এরপরেও শেষে কিছু বলার থাকে, সদর্থক ভাবনার আড়ালেই বিশ্বাস ভঙ্গের খেলা লুকিয়ে থাকে। এবছরই জুলাই মাসের প্রথম দিকে অমরনাথ যাত্রীদের উপর সন্ত্রাসবাদী হামলা হল অনন্তনাগে। গোপন-সূত্রে জানা গেছে জঙ্গিরা নাকি পাকিস্থান থেকে এসেছিলো। সন্ত্রাসবাদীরা তো ন্যায়-নীতি-আদর্শ-বিশ্ব াস এসব মেনে চলে না তা তাদের কার্যকলাপের মধ্যেই প্রমাণিত। তবে সাম্প্রতিককালে দেখতে পাচ্ছি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলগুলিও একটা অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করতে মরিয়া। কিন্তু দায়িত্বশীল মানুষ কেউ কেউ মরে গিয়ে কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছে, তাদের শুভশক্তি প্রবহমান। আমাদের যাত্রার ক’দিন আগেই বলিউডের এক বিগ বাজেটের সিনেমার শ্যুটিং হয়ে গেল পহেল্‌গাঁওয়ের বিভিন্ন গ্রামে। এখানেই তারা সাজিয়েছিল হিন্দুস্থান আর কাল্পনিক পাকিস্থান সিনেমার প্রয়োজনে। সেখানে কোনও বাস্তবিক কাঁটাতার ছিলনা। কিন্তু আমাদের হৃদয়ে পুষে রাখা দেশপ্রেমের খাতিরে সিনেমাতেও সেই বিভাজনের রেখাটি রেখে দিই। কিন্তু কথা হল আমরা কি এই বিভেদনীতির সুপ্রাচীন রগরগে খেলাটির মজায় মজে থাকব যথারীতি যেমন ছিলাম বা আছি? নাকি এর বাইরে কিছু ভাবব! লিড্ডার নদীর স্বচ্ছ রুপোলী প্রবাহের মত একটা ভাবনা বয়ে যায় নিউরন বেয়ে। কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও তা দুই বঙ্গের সাহিত্য সংস্কৃতির মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারেনি শুধু মাত্র শিল্প,সাহিত্য ও সংস্কৃতির কারিগর ও তার পৃষ্ঠপোষকদের শুভবুদ্ধির জন্য। এরকমটা কি ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমান্তের জন্য হতে পারেনা? হলে হয়ত কাশ্মীরি সহ আরও অনেকেরই ‘ঘা’-য়ে একটু আদুরে জল ছুঁয়ে যাবে! জানিনা আমরা পারব কি না ! নাকি শুধুই কল্পনায় তুলে রেখে দেব যতন করে। আর ভাব জাগলেই কবিতা লিখব ‘নিজস্ব একটা স্রোত খুঁজতে গিয়ে’......

গোপন সূত্রে একটা অনুভূতি পেয়েছি,ঘরে ফিরে
অভিধান খুঁজি। কোথাও নেই তার মানে
অনুমতি না পাওয়া একটা দিনের সাথে অবগাহন
করার পর একটা অনুভূতি এসেছে- তারপর থেকে
আমি নিজস্ব স্রোত খুঁজি!

অবৈধ অনুপ্রবেশের পর আমি একটা নতুন দেশ খুঁজে
পেয়েছি। আবহমান রাত্রি সাঁতরে কাঁটাতারের সীমান্ত
পেরিয়ে এসেছি ফিরে যবে থেকে- তবে থেকে আমি
সেই দেশ সবার মধ্যেই দেখতে পাই। না পেলে গোপন সূত্রে
খবর নিয়ে খোঁজে বেরিয়ে পড়ি

দেশের সীমানাগুলি কাঁটাতারেরই হয় শুনেছি, নদী ও সমুদ্র ছাড়া
দেখেওছি। হলদিবাড়ি সীমান্তে আমি, প্রলয়,পলাশ, সঞ্জু
আর দীপঙ্কর নো-ম্যান্স-ল্যান্ডের ধুলো মেখে এসেছিলাম
স্টুডেন্ট বলেই হয়ত বি এস এফ জওয়ানটি আস্কারা দিয়েছিলো
আমাদের। আগামীদিনে হয়ত আগুন দিয়ে সীমানা বেড়া
দেব আমরা, অবশ্যই নদী ও সমুদ্রেও

নিজের দেশকে ভালবাসলে অন্য দেশকে ভালবাসতে নেই-
যেমন নিজ নারীকে ভালবাসলে অন্য নারীকে ভালবাসতে নেই!
কারা যেন গোপন সূত্রে পরামর্শ দেয়- নিজের সন্তানকে ভালবাসলে
অন্যের সন্তানকে স্নেহ করতে নেই। আমি সেই প্রেমের মানে খুঁজতে
অভিধান নিয়ে বসে পড়ি। খুঁজে না পেয়ে আমি নিজস্ব একটা স্রোত খুঁজতে বেরিয়ে পড়ি ...



*********************************