‘পথের পাঁচালী’-র স্মৃতি আর ‘সহজপাঠের গপ্পো’: কোন পাঠ? কি পন্থা?

অনিন্দ্য সেনগুপ্ত

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া মানসমুকুল পালের ‘সহজপাঠের গপ্পো’ কলকাতার চলচ্চিত্রামোদীদের মধ্যে ছোটখাটো হলেও একটা আলোড়ন তুলেছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প ‘তালনবমী’ অবলম্বণে এই ছবির দুই শিশু-অভিনেতা নুর ইসলাম ও সামিউল আলম ইতিমধ্যেই জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। এই লেখাটি ‘সহজপাঠের গপ্পো’-র কোনো রিভিউ নয়। কিন্তু প্রসঙ্গক্রমে ছবিটির আলোচনা চলেই আসতে পারে। এই লেখার বিষয় হল যে যারা বাংলা ছবিতে নতুন ধরণের কাজ করতে চান, অথবা আমার মত যারা নতুন বাংলা ছবি কেমন হতে পারে তা বুঝতে চান – তারা ‘সহজপাঠের গপ্পো’ থেকে কি পাঠ নেবেন। প্রসঙ্গত, এই লেখাটায় পরোক্ষ আরেকটি ছবির কথাও আসবে। ‘সহজপাঠের গপ্পো’ প্রসঙ্গে বারবার ‘পথের পাঁচালী’-র রেফারেন্স আছে – সেটা খানিকটা নির্মাতাদের ডিজাইনের অন্তর্গত বলে, খানিকটা মূল গল্পের লেখকের সূত্রে ও গল্পের বিষয়ে, খানিকটা আমাদের – অর্থাৎ দর্শকদের – পর্দায় গ্রামকে মনে রাখার অভ্যেসে। কিন্তু একাধিক লেখা পড়ে আমার মনে হচ্ছে যে আমরা ‘পথের পাঁচালী’-কে ঠিকমত মনে রাখিনি, সেই ছবির নস্টালজিয়া উদ্রেককারী গ্রামবাংলা, সেই ছবির শৈশব, সারল্য, সহজিয়া ভাব ইত্যাদি আমাদের মনে আছে। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’ শুধুই সেরকম ছিলনা। সেই নিয়ে কিছু ব্যক্তিগত মতামত এই লেখায় থাকছে।
কিন্তু তার আগে একধরণের ডিসক্লেমার – এই লেখা দাঁড়িয়েই আছে বাংলা সিনেমা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি হতাশা, অতৃপ্তি এবং (আমার ক্ষেত্রে) রাগের উপর। আমার মতে বাংলা ছবি বন্ধ্যা, তার শিল্পমূল্য বা তৃপ্তিমূল্য তলানিতে ঠেকেছে। হাতে গোনা যে কয়েকটি ছবি গত দশ বছরে আমাদের ভালো লেগেছে, সেগুলি সবই ‘একসেপশন’-এর দৃষ্টান্ত, অন্য গড্ডালিকার দিকে তাদের ইঙ্গিত। যে পাঠক এই মতামতের সঙ্গে সহমত নন, তার হয়তো লেখাটা না পড়লেও হবে – কারণ এই ডিসক্লেমারটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা ঘটানোর সুযোগ এই লেখায় নেই। আমি চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষক, গবেষক, ছাত্র। আমার বিষয়টি সিনেমা বানাতে শেখায় না, সিনেমা পাঠ করতে শেখায়, সিনেমা নিয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণাই আমাদের লক্ষ্য। আমি যেহেতু পড়াচ্ছি, পড়ছি কলকাতায়, তাই বাংলা সিনেমা নিয়ে আগ্রহ থাকার কথা। আবশ্যিক নয়, কারণ একশো বছরের উপর বিশ্বসিনেমার ইতিহাসে এতটাই না দেখা, না পড়া রয়েছে যে একটি ভাষার ছবির কি হল না হল, বা কি হতে পারে – তা নিয়ে না ভাবলেও অনেক কিছু পড়ার থাকে। সেক্ষেত্রে, অধিকাংশ মানুষের মতই, যাদের কাছে চলচ্চিত্র বিনোদন বই আর কিছু নয়, এইসব ভাবনা অহৈতুকি।
‘সহজপাঠের গপ্পো’ গ্রামীন পটভূমিকার ছবি। এই ছবিতে কোনো স্টার নেই একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চরিত্রে শকুন্তলা বড়ুয়া ছাড়া, যিনি মূলত আশির দশকে নায়িকা ছিলেন। এইটুকুই এই ছবিকে ‘ব্যতিক্রমী’ ও অসম্ভব তকমা দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ। ‘সহজপাঠের গপ্পো’ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি নাতিদীর্ঘ ছোটগল্পকে সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে ফেলে দেয়, সেইক্ষেত্রেও ছবিটি ব্যতিক্রমী বলতে হয়। ছবিটিতে ক্রাফটের কনসিস্টেন্সি আছে, অর্থাৎ মোটামুটি ছবিতে লং শট প্রাধান্য পায়, গড় শটের দৈর্ঘ্যও বেশ দীর্ঘ। অর্থাৎ এই ছবির নন্দনতত্ত্ব সুচিন্তিত ছিল – (একমাত্র দেব ও জিৎ অভিনীত মূলধারার স্টারনির্ভর বিনোদনধর্মী ছবির বাইরে) এই ব্যাপারটি তো বাংলা ছবির ক্ষেত্রে রীতিমত চমকপ্রদ। এই ছবির অন্যতম তৃপ্তির জায়গা হল – এই ছবি দেখতে দেখতে মনে হয়না বড়পর্দায় টেলিভিশন দেখছি। এই ছবির তৃপ্তি আদ্যন্ত সিনেমাটিক – এই অভিজ্ঞতাও বাংলা ছবিতে বেশ বিরল।
অতএব এই বিরল অভিজ্ঞতার পর বাংলা সিনেমায় মানসমুকুল পালের মত প্রথম ছবির নবীন পরিচালকরা কি করবেন? তারা কি গ্রামবাংলার পটভূমিকায় ছবি করার কথা ভাববেন, ভাববেন শৈশব নিয়ে ছবি করার কথা, ভাববেন তাহলে ধ্রুপদী ছোটগল্প বা সাহিত্য নিয়ে ছবি করার সুদিন ফিরে এসেছে? এমন ভাবলেই ভুল হবে। এটা নেহাতই অপরের সাফল্যের পদানুসরণ করে সাফল্যের ইনসুরেন্স করা হবে। তার বদলে ভাবা যাক ‘সহজপাঠের গপ্পো’ থেকে কি শিক্ষা পেতে পারি, এবং অন্যভাবে মনে করি ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’-র কথা। ‘সহজপাঠের গপ্পো’ অর্থনৈতিক সাফল্য পাবে নাকি, পেলে তা থেকে কি শেখার আছে তা নিয়ে লিখবো না, কারণ এই জরুরী প্রসঙ্গটি ভিন্ন এক্সপার্টাইজ দাবি করে যা আমার নেই।
‘পথের পাঁচালী’-র গুরুত্ব কোথায় ছিল সেই সময়ে? তার নানাবিধ উত্তর হতে পারে, আমি খুব স্পেসিফিক একটা উত্তরের বিস্তার ঘটাচ্ছি। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি কিন্তু প্রথম সফল সাহিত্য-অবলম্বণে ছবি নয় বাংলায়। বস্তুত নির্বাক ছবির যুগ থেকেই বাংলা ছবি সাহিত্য অবলম্বণে তৈরি হয়েছিল। বস্তুত, ‘পথের পাঁচালী’-র গুরুত্ব সেই ‘অবলম্বণ’ না করাতেই; অর্থাৎ সত্যজিৎ রায় এমন একটি পন্থায় ছবিটি করেছিলেন যেখানে সাহিত্যর অবলম্বণ শুধুমাত্র গুরুত্ব পায়না। ‘পথের পাঁচালী’ চমকপ্রদ ছিল তার নির্মাণের পন্থায়। স্টুডিওর কৃত্রিম পরিবেশের বাইরে গিয়ে, ন্যুণতম কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে ছবিটি বাংলা ছবির দৃষ্টিকে খুলে দিয়েছিল প্রান্তর থেকে প্রান্তরে। এমতাবস্থায় বাস্তবতা সোজাসুজি স্পর্শ করেছিল ক্যামেরায়।
আরেকটু বুঝিয়ে বলি। সত্যজিৎ নিজে বলেছেন যে ‘পথের পাঁচালী’ হল বাংলার গ্রামজীবনের ‘এনসাইক্লোপেডিয়া’-র মত। তিনি নিজে বলেছেন যে এই ছবির জন্য তিনি সংলাপ লেখেননি, উপন্যাসকে অনুসরণ করেই সংলাপ পাওয়া গেছে। তাহলে সেই ছবির নির্মাণকালীন যে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হত অর্থের জন্য সেই সময়ে বোড়ালের গ্রামে সত্যজিতের যে থাকার অভিজ্ঞতা, এবং নির্মাণের আগে লোকেশন সংক্রান্ত যে প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল ঐ অঞ্চলে গিয়ে – তার গুরুত্ব কোথায়? সত্যজিৎ নিজে লিখেছেন একবার যে যখন ছবি শেষ করার আশাই ত্যাগ করে দিতে হচ্ছিল, তখন তিনি বোড়ালের গ্রামে একা একা কিছুদিন থাকার পরে বুঝতে পারেন যে তিনি এতদিন গ্রামের শব্দ ভালো করে শোনেননি। অতএব উত্তেজিত হয়ে পড়েন তিনি, বুঝতে পারেন যে টাকার অভাব আখেরে শাপে বর হয়েছে, কারণ প্রস্তুতি অসমাপ্ত ছিল, তিনি অতএব দিনের পর দিন মন দিয়ে গ্রামের শব্দ শুনতে থাকেন।
তাহলে যে উপন্যাস গ্রামবাংলার বিশ্বকোষ, তার বাইরেও এতটা জানা থাকার কথা কিসের, তা ছবিকে কি দেয়? ততদিনে এ তো প্রতিষ্ঠিত যে ‘পথের পাঁচালী’ ক্লাসিক উপন্যাস, তাকে সঠিকভাবে অনুসরণ করলেই তো প্রামান্য ভালো ছবি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই – তাহলে তার বাইরে জানার কি থাকে? আমাদের বুঝতে হবে এর উত্তরেই আছে সত্যজিতের প্রথম ছবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব, কারণ সত্যজিৎ শুধুমাত্র উপন্যাসটি অবলম্বণ করছেন না, তিনি পর্দায় আনছেন গ্রামবাংলার বাস্তবকেও। তাহলে কি সেই বাস্তব উপন্যাসে নেই? এ কথা বলা তো ধৃষ্ঠতার সামিল হবে! মনে রাখতে হবে যে সত্যজিৎ দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উৎস অবলম্বণে ছবি করছেন – সাহিত্য এবং বাস্তবতা। বিভূতিভূষণ ওনাকে দিচ্ছেন জীবন ও বাস্তবতাকে অনুধাবণ করার কাঠামো, সিলেবাস; কিন্তু তারপরও তার মত আদ্যন্ত নাগরিক মানুষের ‘পড়াশোনা’ বাকি থেকে যায়।
গ্রামকে দেখা তিনরকম হতে পারে – শহরের মানুষ হয়ে গ্রামকে দেখা, গ্রামের মানুষ হয়ে গ্রামকে দেখা, শহরের মানুষের সত্তাটা মুছতে মুছতে গ্রামকে দেখা। সত্যজিৎ প্রথম দুটি পথ নেবেন না – প্রথমত, তিনি ব্যুরোক্রাট-টুরিস্টে দৃষ্টি দিয়ে গ্রামকে দেখবেন না বলে, দ্বিতীয়ত, তিনি গ্রামের মানুষ নন বলে। অতএব তিনি তৃতীয় পথটি নিলেন, যেটি সবচেয়ে কঠিন পথ – সেটা অধ্যয়নের পথ – অর্থাৎ গ্রাম সম্পর্কে নাগরিক মানুষের প্রি-কনসিভড ধারণাগুলোকে মুছতে মুছতে, দৃষ্টি পাল্টাতে পাল্টাতে এই নতুন পরিসরকে দ্যাখা। এভাবে দেখতে ‘শিখলে’ গ্রাম কথা বলতে আরম্ভ করে, জানা যায় যে সেখানে শুধু শব্দ নয়, টোনালিটি, আলোর রূপ, ছন্দ, ডিটেল কিরকম। এগুলো কি বিভূতিভূষণের গদ্যে পাওয়া যেত না? যেত, কিন্তু তা শুধুই পুঁথি-পড়া বিদ্যে হত, অধ্যয়ন হত না।
এইবার দেখুন – তর্কের খাতিরে – এই দুই ‘উৎস’ কিন্তু দুইরকম বাস্তবের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রথমত, বিভূতিভূষণের উপন্যাস, যেখানে আনুমানিক ১৯২০-এর দশকের গ্রামবাংলার বিবরণ আছে; দ্বিতীয়ত, সত্যজিৎ দেখছেন ১৯৫০-এর প্রথম অর্ধের গ্রামবাংলা। এই দুই গ্রামের মধ্যে আছে বেশ কয়েক দশকের ব্যবধান, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও বাংলার দেশভাগ – অর্থাৎ ইতিহাস। অতএব, যতই বিমূর্ত হোক না কেন সেই ইতিহাসের উপস্থিতি, তাকেও ‘পড়তে’ জানতে হয়।
কেউ কি কখনও ভেবেছেন যে ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যু – যা দিয়ে উপন্যাসের প্রথম পর্ব ‘বল্লালী বালাই’-এর শেষ এবং অপুর ট্রেন দ্যাখা – যা আছে উপন্যাসের তৃতীয় পর্বে – তা সত্যজিৎ যুগপৎ হাজির করেন কেন ছবিতে, একই সঙ্গে প্রায়? অর্থাৎ, যখন অপু ট্রেন দেখতে পেল তখন বাঁশবনে ইন্দির ঠাকরুণ মারা যাচ্ছেন কেন?
কারণ বিভূতিভূষণ লিখেছেন যে ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুর সঙ্গে নিশ্চিন্দিপুরে ‘সেকালের অবসান ঘটিলো’, কারণ সত্যজিতের কাঠামোয় ট্রেনই হল প্রথম দৃশ্য-উপাদান যা ‘পথের পাঁচালী’-তে আধুনিকতার দ্যোতনা নিয়ে সরবে হাজির হয়ে দৃশ্য ফালা ফালা করে বেরিয়ে যাবে, এই ছবির মন্দ্রগতির ছন্দ ও এডিটিং-কে পর্যুদস্ত করে। অতএব এই দৃশ্য ইতিহাসের দৃশ্য, এই দৃশ্য ইতিহাসের ভায়োলেন্সের দৃশ্য। শুধু যে অচেনা গতি এসে পর্দাকে আঘাত করবে তা নয়, পরিবারের গরিষ্ঠতমর মৃত্যু হবে একাকীত্মে, অবহেলার ফলে। ইন্দির মিশে যান প্রকৃতিতে, ঠিক যেরকম বাঁশবনে দুর্গাকে প্রথম দেখেছিলাম; সেই প্রকৃতির মধ্যেই হাজির হয় এমন একটি লৌহড্র্যাগন, যার প্রতাপকে প্রকৃতি আয়ত্ত্ব করতে পারেনা। ইতিহাস এখানেই আছে; অধ্যয়নে এই ইতিহাস দেখা যায়, দেখতে শেখা যায়। উদবাস্তুর ইমেজ না দেখলে বাঁশবনে মৃত বৃদ্ধার ইমেজ, ফেলে যাওয়া ভিটেতে সাপের প্রবেশের ইমেজ, গরুর গাড়ি করে বিদেয় নেওয়া পরিবারের অবশিষ্টের ইমেজকে রচনা করা যায় না। এই দ্যোতনা নিয়ে ইমেজগুলি বিভূতিভূষণের উপন্যাসে থাকার কথা নয়, তিনি দেশভাগের সময়ে গ্রামপতনের শব্দ শোনেননি।
আমাদের চলচ্চিত্রের চর্চা এক অলস বাচালতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে যা ধরেই রেখেছে যে সত্যজিতের ছবিতে এই ইমেজ নাকি পাওয়াই সম্ভব নয়!
অতএব – সাহিত্য এবং বাস্তব, এবং বাস্তবে ধৃত ইতিহাস – এগুলি পাঠ করতে জানতে হয়। সত্যজিৎ জানতেন; আমরা যে ‘পথের পাঁচালী’-কে মনে রাখি তা আমাদের খেয়ালমত মর্জিমত, সত্যজিতের ছবিটি নয়।
দেখুন ‘সহজপাঠের গপ্পো’-তে কি ঘটছে। সেখানে বিভূতিভূষণের চারপাতার গল্পটি আছে, এবং তার সাথে আছে একটি বিস্তারিত প্রেক্ষিত। সেই প্রেক্ষিত কিন্তু ২০১৫-১৭-র। অর্থাৎ পরিচালক মানসমুকুল পাল কিন্তু এক অর্থে সত্যজিতের পথটিই ধরেছেন, যে পথ ১৯৫৫ সালে শুরু হয়েছিল ২০১৫-১৬ সালে সে পথ যেখানে যাওয়ার ঠিক সেখানেই মানসমুকুল নিজেকে এনেছেন। তাই তার পথ সত্যজিতের পদাংক অনুসরণ করে চলেনি, চলেছে সেই পন্থা ধরে।
তাহলে ২০১৫-১৭ কীভাবে এসেছে এই ছবিতে? তথ্য হয়ে? তাহলে কিন্তু তা আড্ডাটাইমসে পরমব্রত অভিনীত ফেলুদার মতই নেহাতই কসমেটিক একটি আপডেটিং হবে। না, এসেছে নতুন কিছু আবেগ হয়ে। এই ছবি যারা দেখেছেন তারা জানেন যে এই ছবি দুই ভাইয়ের গল্প বলে, তার মধ্যে কনিষ্ঠজনের গল্পটি বিভূতিভূষণের লেখাতেই মোটামুটি পাওয়া যায়, অন্যজনের গল্পটি পাওয়া যায়না তেমন। তাই ছোটুর গল্পটি বিভূতিভূষণের লেখা, গোপালের গল্পটি মানসমুকুলকে তৈরি করতে হয়েছে অধুনার গ্রামবাংলাকে অবলম্বণ করে। সেখানে যা পেয়েছি আমরা তা কিন্তু সেভাবে ছিল না গল্পে – দুই ভাইয়ের অর্থাভাবে অসহায়ত্ত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে, সেই অসহায়ত্ত্ব থেকে তৈরি হয়েছে ভীতি, দশ-বারো বছর বয়সে চাকরির সন্ধান, এবং সবমিলিয়ে একধরণের নিউরোসিস যা পর্দায় বিস্ফোরিত হয় একটি হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত স্বপ্নের দৃশ্যে। এই দৃশ্যের সুর বিভূতিভূষণ থেকে আসেনা। এই দৃশ্যেই ‘পথের পাঁচালী’-র স্মৃতি উদ্রেক করে ফিরে আসে সেই অমোঘ ট্রেনলাইন। ‘অপুর সংসার’-এ সদ্য স্ত্রী হারিয়ে উন্মাদপ্রতিম অপু রেললাইনে গলা দেওয়ার কথা ভাবে। সেই দৃশ্যেরও দ্যোতনা ‘সহজপাঠের গপ্পো’-র এই স্বপ্নদৃশ্যে আছে, এতটুকুই বলতে পারি যারা দ্যাখেননি তাদের জন্য। এই ভীতি, এই অসহায়ত্ত্ব, এই নিউরোসিসই ‘সহজপাঠের গপ্পো’-র রিডিফাইনড প্রেক্ষিত।
এখান থেকে আমাদের সহজপাঠের শিক্ষা কি হতে পারে? আমাদের অধুনার বাংলা ছবিতে যে জিনিসটার প্রচন্ড অভাব সেটা হল ক্যামেরার, গল্পের নতুন স্পেসে যাওয়া এবং সেই পরিসরের সঙ্গে ওতপ্রোত জীবনের কোনও উপস্থিতির। আমরা বাংলা ছবিতে দক্ষিণ কলকাতার এবং মাঝেমধ্যে উত্তর কলকাতার কিছু সীমাবদ্ধ পরিসরেই আটকে থাকি, এবং সেখানেও চরিত্রদের সংজ্ঞা খুব কমনসেনসিকাল ও অগভীর – উত্তর কলকাতা সেকেলে, দক্ষিণ হল হালফ্যাশানে। এভাবে পর্দার চরিত্রগুলোও আর বাস্তবোচিত থাকেনা, ক্লিশেতে পরিণত হয়, জলের মধ্যে তেলের মত ভেসে থাকে সোশাল প্রেজুডিস। যেমন, অপর্ণা সেনের ‘পারমিতার একদিন’-এ উত্তরের মানুষ হল অবক্ষয়প্রাপ্ত প্রাগাধুনিকমনস্ক মানুষ, আর দক্ষিণের মানুষ অতিআধুনিক, বিজ্ঞাপনের এজেন্সিতে কাজ করা প্রগতিশীল।
অতএব, কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা ছবিতে আমরা ছোট শহর, মফঃস্বল, গ্রাম দেখতে পাইনা। সেখানকার মানুষ দেখতে পাইনা, শুনিনা সেখানকার গল্পও। অতএব বিভূতিভূষণের গল্প নাও লাগতে পারে; হয়তো কোন প্রেমের গল্প, হয়তো গ্যাংস্টারদের গল্পই বলা হল – কিন্তু প্রেক্ষাপট করে দেওয়া হল এতদিনের সিনেমার পর্দায় না-দেখা কোনো অঞ্চলে, এবং সেই অঞ্চলের ইতিহাস, ডিটেলের প্রতি যদি নিবেদিত থাকেন শিল্পী, তাহলেই বাংলা সিনেমায় নতুন তরঙ্গ আসতে পারে। গল্প চেনাজানাই হোক, পরিচালক-চিত্রনাট্যকা যদি অঞ্চলের বাস্তবতার প্রতি মনোযোগী হন, এবং সেই অঞ্চলকে যদি কলকাতা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যান, পড়তে শেখেন সেই অঞ্চলের ইতিহাস ও বর্তমান এবং সেই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে যদি ফের রাঙিয়ে নেন গল্পকে, তাহলেই গল্প পালটে যাবে আমাদের চলচ্চিত্র্রর।
বাংলা সিনেমার এখনকার পরিবেশে এই কল্পনা প্রায় কল্পকাহিনী মনে হয়। আবার এও ঠিক, যে বিশ বছর আগে এটা যতটা কল্পকাহিনী ছিল এখন ততটাই এর বাস্তবায়ন সহজে সম্ভব। সিনেমা তৈরি করার প্রযুক্তি এখন যতটা অনায়াস ও নির্ভার হয়ে গেছে ডিজিটাল বিপ্লবের পর, পরিকাঠামো এতটাই ছোট এবং হালকা হয়ে গেছে – যে পশ্চিমবঙ্গের যে কোনো প্রান্তে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র নির্মাণ করে ফেলা সম্ভব – তথ্যচিত্র তো বটেই।
কিন্তু তা সত্ত্বেও হয়না। এর কারণগুলো খতিয়ে দেখলে বুঝবেন কেন কলকাতারও হাতে গোনা কিছু অঞ্চলের বাইরের পরিসর ও মানুষ আমরা পর্দায় দেখিনা। সেই সমস্ত কারণ খতিয়ে দেখার উপায় এই লেখায় নেই; কিন্তু এতটা বলতে পারা যায় যে ছবি বানানোর স্কিল, জ্ঞান, বোধ ও বুদ্ধির পুঁজি সবই কলকাতার কুক্ষিগত হয়ে আছে; অর্থাৎ গ্রাম বা মফঃস্বলের যে ছেলেটির (মেয়েদের কথা ভাবা যাচ্ছেনা, এতেই বুঝবেন আমাদের ছবি বানানোর আধুনিকতা কোন স্তরে আছে) ছবি করবেন ভেবে সেই সংক্রান্ত জ্ঞান ও স্কিল অর্জন করতে কলকাতায় আসেন, এই কলকাতার বৌদ্ধিক পরিবেশ তাকে গিলে খায়। তিনি আর ফিরতে পারেন না তার পূর্বতর বোধজগতে। তিনিও অতঃপর ছবির পর ছবি জুড়ে কলকাতা-কেন্দ্রিক কিছু গল্প ভাবতে থাকেন যে কলকাতাও বাস্তবোচিত থাকেনা। আমি এখনও একটা বাংলা ছবি দেখিনি যেখানে কলকাতাকে বাইরের দৃষ্টি থেকে দেখা গেছে, ‘অপরাজিত’ বা ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-র মত। যিনি আসেন তার ফিরে যাওয়াটা আর হয়না।
‘সহজপাঠের গপ্পো’-তে এই প্রক্রিয়াটার শুরু আবার দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। খুটিয়ে দেখলে হয়তো এই ছবিও গ্রাম থেকে দ্যাখা গ্রামের জীবন নয়। এই ছবিতেও অঞ্চলের সেভাবে নাম করা নেই, অঞ্চল তার নাম নিয়ে হাজির না হয়ে টিপিকাল গ্রামবাংলাই হয়ে থাকে। বাংলা ছবি যে অতলে ঠেকেছে একটি অঞ্চলের ভালোনামও এখন প্রত্যাশা করা যায় না। কিন্তু কলকাতা থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটা অঞ্চলে যাওয়ার প্রচেষ্টা এই ছবিতে শুরু হয়েছে বলতে পারি। ছবির ইমেজের ডিজাইনে হয়তো এখনও সেটা অর্জিত হয়নি, কিন্তু অর্জন হয়েছে এই ছবির অভিনেতাদের উপস্থিতিতে, অর্জন হয়েছে ‘তালনবমী’-কে বিস্তারিত করার কিছু স্ট্র্যাটেজিতে। এই প্রবন্ধে ‘পথের পাঁচালী’ দিয়ে আলোচনার সুত্রপাত হল সেই ছবির প্রসঙ্গ হয় ‘সহজপাঠের গপ্পো’ প্রসঙ্গে আসছে বলে, নয় এই ছবির নির্মাতারা এনেছেন বলে, নয়তো দুটোই। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’-কে যেভাবে আমরা মনে রেখেছি তাতে মনে হয় আমাদের বহুস্তরীয় শিল্পকর্মকে গভীরতাহীন করে তোলার ব্যাধিতে ধরেছে। অতএব, আমরা কীভাবে আমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবিকে মনে রাখি, তার মধ্যে হয়তো সূত্র আছে আমরা একটি নবীন ছবিকে কীভাবে দেখতে পারি, তার মধ্যে কোন সম্ভাবনাকে ধরবো, আর কোন সহজপাঠের আরামকে ছাড়বো।