পাগলা গারদের ভেতর থেকে দেখা

রোখসানা চৌধুরী

১.
একথা আজ আর জানার উপায় নেই যে, দার্শনিক মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪) ব্রাজিলিয়ান ঔপন্যাসিক হোয়াকিম মারিয়া মাশাদু দো আসিসের লিখিত ‘মনোচিকিৎসক’ উপন্যাসটি পড়েছিলেন কিনা। তবে ঔপন্যাসিক যে ফুকোর দর্শন জেনে যেতে পারেননি এব্যাপারে সুনিশ্চিত। কারণ মারিয়া মাশাদুর মৃত্যুর আঠারো বছর পর মিশেল ফুকোর জন্ম। একজন দার্শনিক, একজন ঔপন্যাসিক তবু কি অদ্ভুত সামঞ্জস্য। দু’জনই পাগলা গারদের ভেতর থেকে অবলোকন করেছেন মানুষের সাথে মানুষের, মানুষের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক; সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতা, জ্ঞান ও ক্ষমতার ওতপ্রোত সম্পর্ক ইত্যাদি।

২.
‘মনোচিকিৎসক’ উপন্যাসটি বের করেছিল কাগজ প্রকাশন, ২০০২ সালের একুশে বইমেলায়। এককভাবে নয়, মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের অনুবাদে আরো কয়েকটি ল্যাটিন আমেরিকান উপন্যাসের সঙ্গে সঙ্কলিত হয়ে।
‘মনোচিকিৎসকে’র গল্প একজন চিকিৎসকের জীবনকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। স্ত্রীর মনোভাব নিয়ে ভাবতে ভাবতে যিনি মনোচিকিৎসক বনে যান।
বাঁকামারৎ নামের সেই মনোচিকিৎসক এরপর সমাজকে উত্তমরূপে অবলোকন করে দেখলেন যে, এই সমাজের চার-পঞ্চমাংশ মানুষই কোন না কোনভাবে মনোরোগের আওতায় পড়ে যায়। অথচ সেই উন্মাদেরা যথেচ্ছ সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। মনোচিকিৎসক প্রথম ধাপে সমস্ত মনোরোগীকে শ্যামভবনে (পাগলা গারদে) আটক করে স্ব-নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। অবশ্যই চিকিৎসার নিমিত্তে। পুরো রাষ্ট্রই তখন প্রকারান্তরে রূপ নেয় পাগলা গারদে। তাই তিনি অধিকাংশ মানুষকে কয়েদ রাখার বদলে মুষ্টিমেয় সুস্থ মানুষদের পাগলা গারদে রাখার উপদেশ প্রদান করেন এবং উন্মাদ-চিহ্নিতদের মুক্ত করে দেন। এই অদ্ভুত (নাকি যৌক্তিক!) সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ হিসেবে তিনি নতুন এক তত্ত্ব বাৎলে দেন, তা হলো ‘স্বাভাবিকতা নির্ভর করে ভারসাম্যের অভাবের উপর এবং অস্বাভাবিক বা ‘অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি অর্থাৎ যাহারা সত্যই অসুস্থ, তাহারাই কান্ডজ্ঞানধারী সম্পূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখা ব্যক্তি; অবধারিতভাবে মনে পড়ে যায় আরেক উন্মাদ (সজনীকান্ত কথিত) কবি জীবনানন্দের কথা। সুস্থ মানুষ-মানুষীদের অবিরাম নির্লিপ্ত বিকৃতি দেখে যিনি লিখেছিলেন ঃ
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেইÑপ্রীতি নেইÑকরুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
এরপর বাঁকামারৎ সেই মুষ্টিমেয় ভারসাম্যপূর্ণ মানুষদের চিকিৎসা করলেন। নৈতিকতা, বিনয়, কর্তব্য পরায়নতা, সাহসিকতা, দায়িত্ববোধ ইত্যাদি গুনগুলোকে সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দূরীভূত করলেন। রাষ্ট্রে ধন্য ধন্য রব পড়ে গেল। কারণ এরাই শ্যাম ভবনের বিরুদ্ধে, মনোচিকিৎসকের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ আন্দোলনে নেমেছিল। পুরো রাষ্ট্রকেই আপাতসুস্থতা প্রদানপূর্বক বাঁকামারৎ নিজের মুখোমুখি হলেন এবং সিদ্ধান্তে এলেন ‘দুর্দান্ত কোনো পাগল বানাইতে যাহা-যাহা লাগে তাহার সমস্ত কিছুই তাহার মধ্যে আছে।’ এরপর নিজেকে কারারুদ্ধ করে স্ব-চিকিৎসা গ্রহণ করতে করতে মৃত্যুবরণ করলেন।

৩.
দার্শনিক বেনথামের একটি প্রায় অপরিচিত বইয়ের নাম ‘প্যান অপটিকন’ (১৭১১)। এই প্যান-অপটিকনের ধারণা থেকে ফুকো একটি নতুন তত্ত্বের সৃষ্টি করেন। পুঁজিরাষ্ট্র সমস্ত নাগরিকদের শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের জীবৎকালের প্রতি মুহূর্তের উপর নজর রাখার জন্য অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বানিয়ে তোলে। এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান মানুষের ব্যক্তিক ও সমাজ-রাজনৈতিক সমস্ত আচরণের কিছু বিধি নির্ধারণ করে। বিধিগুলি মেনে চলার শিক্ষা শুরু হয় শিশু বয়স থেকেই। শিক্ষাদানে অংশগ্রহণ করে বিদ্যালয়, ধর্ম প্রতিষ্ঠান, সামরিক বাহিনী, হাসপাতাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। যাতে সব মানুষের সব আচরণের উপরই প্যান-অপটিকনের আলো পড়ে, সেজন্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিধিবিবদ্ধ আচরণের জন্য পৃথক পৃথক শাস্তি নির্দিষ্ট করা হয়। যেমন, সময় সংক্রান্ত আচরণ বিধি, বিলম্ব, অনুপস্থিতি, ধীরলয়ে কাজ করা, ছুটির আগে পালানো- এমন সহস্রভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে। আবার ব্যবহার ও ভাষা সংক্রান্ত আচরণ বিধি ভাঙা বলে রূঢ়তা, অবাধ্যতা, উদ্ধত স্বভাব, মিথ্যা ভাষণ ইত্যাদি নানা প্রকার। অপরাধের তারতম্য অনুসারে সামান্য অপমান থেকে কঠোর দৈহিক শাস্তি প্রদানের অধিকার উপরে উল্লেখিত প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের আছে।
বেনথানের ‘প্যান-অপটিকন’ বইতে প্রতীকীভাবে পুঁজিবাদী আদর্শ সমাজকে দেখানো হয়েছে যা কিনা প্রকৃতপক্ষে আধুনিক স্থাপত্য নকশায় তৈরি জেলখানার নকশা। এই নকশা অনুযায়ী সাবেক রীতির অন্ধকার কুঠুরি ও মাটির নিচের সুড়ঙ্গে অপরাধীদের বন্দী রাখার প্রথা বাতিল করা হয়। গোলাকৃতি জেলখানার মাঝখানে রাখা হয় একটি আলোকস্তম্ভ¢, যার কাজ হলো ক্রমান্বয়ে সার্চলাইট ঘুরিয়ে সারা জেলখানার উপর নজর রাখা। এই আলোকস্তম্ভের নাম ‘প্যান-অপটিকন’। অন্ধকার পাতাল কক্ষে শিকলবন্দী কয়েদীরা আপাতভাবে মুক্ত আলো-বাতাসের অনেক কাছাকাছি এলেন বটে, আসলে কিন্তু তাদের শরীরের বদলে মনের উপর শুরু হলো রাষ্ট্রিক খবরদারি। প্যান-অপটিকনের ফোকাস কখন কার উপর পড়বে কেউ জানেনা- সুতরাং, সবাইকে সর্বক্ষণ আদর্শ কয়েদির মতো আচরণ করে চলতে হবে। আগে মৃত্যুদন্ডিত মানুষ মরার আগে প্রকাশ্যে চিৎকার করে রাজাকে শাপ-শাপান্ত করতে পারত, বন্দীত্বের নামে যে অপরাধীকে প্রায় কবরে পাঠানো হতো, সেও কল্পনায় ও আচরণে কিছুটা নির্জনতা বা স্বাধীনতার অধিকার পেত। কিন্তু আলোক প্রাপ্তির যুগে কয়েদীরা বন্দী হলো শিকলে নয়, প্যান-অপটিকনের আলোর ফোকাসে। হাত-পা নয়, রুদ্ধ হলো অন্তরের বিকাশ। তাই সুস্থ-অসুস্থ সব মানুষই এখন রাষ্ট্রের বিচারাধীন। পুঁজিরাষ্ট্রের শ্যেনদৃষ্টিতে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অপরাধের জন্যেও যে কেউই হতে পারে শাস্তিযোগ্য। (কাফকার ‘ট্রায়াল’ উপন্যাসেসর নায়কের মতো যে কেউ ঘুম ভেঙে উঠে দেখতে পারে, পরোয়ানা ঝুলছে মাথার উপরে)।

৪.
বাঁকামারৎ এক অর্থে পুঁজিরাষ্ট্রের প্রতিভূ। কেননা সে তার জ্ঞানকে ক্ষমতায় পরিণত করে। নির্লিপ্ত নির্বিকারভাবে কোন জবাবদিহিতা ছাড়াই নির্বিচার গণ গ্রেফতার চালিয়ে।
ফুকো বলছেন পুঁজিরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো আমরা নিঃশর্তভাবে মেনে নিই যে, আমাদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু রাষ্ট্রিক নয়, চূড়ান্ত নৈতিক অধিকারও এইসব প্রতিষ্ঠানের করায়ত্ত্ব। আমরা আসলে মেনেই নিয়েছি যে, রাষ্ট্র-আরোপিত যাবতীয় বিধি আমাদের ভালোর জন্য- সেগুলো লঙ্ঘন করলে আমাদেরই ক্ষতি। ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি যেমন বিশ্বাস করে স্রষ্টা যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্র ঈশ্বরে পরিণত হয়।
কথা হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্য নির্ণয় হবে কিসের ভিত্তিতে? সেই মাপকাঠি নির্ধারণের দায়িত্বই বা কাদের হাতে ন্যস্ত? যাদের হাতে ন্যস্ত তারা যে সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ এব্যাপারে আমরা কতটুকু নিশ্চিত? যদি না হয় তবে আমরা তাদের মানব কেন? ইতিহাসের অধিকাংশ অধিকর্তাই উন্মাদশ্রেষ্ঠ (বিভিন্ন বিবেচনায়) বলে আজ চিহ্নিত। একজন উন্মাদ আরেকজন উন্মাদকে শাস্তি দেবার অধিকার পায় কীভাবে?
তাছাড়া মধ্যযুগে উন্মাদনা ছিল সৃজনশীলতার অপর নাম। প্রকৃতপক্ষেও তাই। কেননা, ইতিহাসের সর্বত্রই পরিলক্ষিত তাই। কেননা, ইতিহাসের সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয় গ্যালিলিও থেকে সক্রেটিস, ভ্যানগগ থেকে নজরুল-জীবনানন্দ এরা সর্বদাই সমাজের চোখে প্রথাবিরোধী, শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীরূপে নিগৃহীত হয়েছেন। শেক্সপীয়রের নাটকে উপস্থাপিত আপাত বাতুল বিদূষক চরিত্রসমূহ অথবা হাতের কাছে ‘সধবার একাদশী’ প্রহসনের নিমচাঁদ চরিত্র স্মর্তব্য।
ফুকো দেখিয়েছেন কিভাবে ক্লাসিক্যাল যুগে যুক্তির প্রতি অদম্য আকর্ষণের দরূণই ‘যুক্তিহীনতা’ শরীরবৃত্তীয় বিকার বলে বিবেচিত হতে শুরু করল। ‘আধুনিক একটা মানসিক হাসপাতাল আসলে পুঁজি সমাজেরই একটি অণুবিশ্ব। কখনও হাসপাতাল হয়ে ওঠে পরিবার আর উন্মাদ ব্যক্তি সেই পরিবারের শাসনাধীন শিশু। কখনও হাসপাতাল হয় পবিত্র ধর্ম প্রতিষ্ঠান আর উন্মাদ ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলী লঙ্ঘন করার দরুণ শাস্তি ভোগ করে; সব মিলিয়ে বহির্বিশ্বের হুবহু অনুকরণ চলতে থাকে উন্মাদ-আশ্রমের অন্তর্বর্তী বিশ্বে।
উন্মাদ-আশ্রমের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ফুকো আরো বলেন যে, পুঁজির বিকাশের যুগে নতুন নতুন শিল্পোদ্যোগের স্বার্থে প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন হয়ে পড়াতে সমাজপতিরা উন্মাদ ব্যক্তিদের আটক না রেখে, সুস্থ করে তুলে শ্রম উৎপাদনের উপযোগী করে তোলে। তদুপরি পুঁজিবাদী সমাজের শোষণমুখী রাষ্ট্র চরিত্র ঢেকে রাখতে যে উদার আধুনিকতার মুখোশ বানানোর কাজ তখন সর্বস্তরে চলছিল, উন্মাদদের সম্বন্ধে সহিষ্ণু ও হিতবাদী মনোভাব গ্রহণ তার সঙ্গেও বেশ খাপ খেয়ে যায়।

৫.
বাঁকামারৎকে বলা হয়েছে পুঁজিরাষ্ট্রের প্রতিভূ। তাই তার জ্ঞান (যিনি স্ত্রীর কান্ডকারখানা দেখে চিকিৎসক থেকে মনোচিকিৎসক বনে যান) ক্ষমতা প্রয়োগে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ফুকো দেখিয়েছেন ক্ষমতা কিভাবে তার নিজস্ব প্রয়োজনে জ্ঞানকে ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষের তথাকথিত অসুস্থতাকে সারিয়ে তোলার মহৎ অভিপ্রায়ে বাঁকামারৎ রাষ্ট্রের প্রায় চার-প মাংশ নাগরিককে গারদে ভরে দেন। একশ ভাগ সফল চিকিৎসার পর মনোচিকিৎসক বিবেচনা করেন, যে শর্তে সবাই সুস্থ, সেই শর্তানুযায়ী তিনিই পরিপূর্ণ মনোরোগী। প্রকারান্তরে সবাইকে পাগল বানিয়ে দিয়ে তিনি কি নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন? কিন্তু তিনি তো সুস্থতাই চেয়েছিলেন, নান্দনিক-সুকুমার সুস্থতা। কিন্তু তাতে তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেধে উঠতে থাকে, সমবেত আন্দোলনে তার মৃত্যুদন্ড ধার্য হয়ে যায়। কারণ এটা সেই দেশ যেখানে সুকুমারবৃত্তি শেয়াল ও শকুনের খাদ্য। তাই মনোচিকিৎসক মুষ্টিমেয় ইতিবাচক শক্তিকেও পাল্টে দেন, যাতে তারা ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে না পারে। যাতে তারা কেউ বলতে না পারে, ‘আমি একা হতেছি আলাদা’। সবশেষে তিনি নিজেই আলাদা হয়ে যান কারণ তাঁকে চিকিৎসা করবে কে? তিনি যে জ্ঞানপাপী। সবকিছু জেনে ফেলার অপরাধে ইডিপাসের মত নিজেই নিজেকে কারারুদ্ধ করে শাস্তি দেন। অবশেষে আলোর জগতের বাইরে নিভৃত অন্ধকারে একান্ত পৃথকত্ব উপভোগ করতে করতে মৃত্যুবরণ করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘মেঘ ও রৌদ্র’ ছোটগল্পের নায়ক শশীভূষণ যেমন জেলের বাইরের অনৈতিক মানুষের কুৎসিত চেহারা দেখতে দেখতে জেলখানাকেই নিরাপদ বলে ভেবেছিলেন।
নাকি এও এক ধরনের উচ্চম্মন্যতা? এতটাই যে, নিজেকে আর জনগণের সমপর্যায়ে ভাবতে পারেন না। বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা ক্রমেই মানুষকে করে তুলেছে বিচ্ছিন্ন-নিঃসঙ্গচার -দাম্ভিক। মিশেল ফুকো নিজেও ছিলেন নিভৃতচারী। মেধার তীব্রতা তাঁকে বাঁকামারৎ-এর মতই নিঃসঙ্গ আর দাম্ভিক করে তুলেছিল।

৬.
মিশেল ফুকো আজীবন আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, আত্মহত্যা হলো সরলতম সুখ। একজন আত্মহত্যাকারীর উচিৎ আত্মহত্যা নামক ঘটনাটিকে একটু একটু করে বানিয়ে তোলা, তাকে অলংকৃত করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
১৯৮৩ সালে একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আজ যদি জাতীয় লটারিতে কয়েক বিলিয়ন ফ্রাঁ জিততাম, একটি প্রতিষ্ঠান বানাতামÑ সেখানে যেসব মানুষ মরতে চান তারা আসতেন, একটি সপ্তাহান্ত, সপ্তাহ বা মাস কাটাতেন, যতদূর সম্ভবÑ হয়তো মাদকের সাহায্যে- জীবনকে উপভোগ করতেন, আর তারপর উধাও হয়ে যেতেন।
এছাড়াও বহুবার ‘আত্মহত্যা-উৎসব’ চালু করার কথা বলেছেন নানা লেখায়। এই বিকারগ্রস্ততার অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে উন্মাদ রোগী ও তাদের চিকিৎসার প্রকরণ সম্পর্কে যুগান্তকারী গবেষণা করতে তাঁকে প্ররোচিত করে। অতুল প্রতিভার অধিকারী এই দার্শনিক আজীবন নিজের সমকামী জীবন-যাপন নিয়ে ছিলেন কুণ্ঠিত, অবসাদগ্রস্ত। এইডস রোগে মৃত্যু ঘটায় তাঁর আত্মহননেচ্ছা সার্থকতা লাভ করে। অন্তহীন নিঃসঙ্গতার বোধ জন্ম নেয় জ্ঞানজাত যে অন্ধকার থেকে মিশেল ফুকো অথবা বাঁকামারৎ কারোরই সেই আঁধার থেকে মুক্তি নেই। রাষ্ট্রীয় দাপট, প্রশাসনিক ক্ষমতার দম্ভ, পারিবারিক বাধ্যতা, সর্বোপরি মানবদেহে বন্দীত্ব যাপনকারী নিজেরই সত্তার হাত থেকে মুক্তি পেতে একের পর এক গরাদ আঁটতে থাকেন তাঁরা। অতঃপর ‘সুন্দরের জন্ম দিতে হলে-প্রেম নয়, স্বাধীনতা নয়-অবিনাশী একাকিত্বের ভেতর এক ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষে তোমাকে বাচঁতে হবে, মরতে হবে’ এই আর্তিক ধারণ করে গরাদের ভেতর থেকে দর্শন করেন সমাজ ও রাষ্ট্রকে। পাগলা গারদের ভেতর থেকে সৃষ্টি হতে থাকে উত্তরাধুনিক দর্শন ও সাহিত্য।