সাম্প্রতিক ঝুরো সহিষ্ণুতা ও উড়ো অনুভূতি বিষয়ে

প্রবুদ্ধ ঘোষ

আমার উপমহাদেশ

"নীরেনকে এর আগেই বাবর নিয়ে গেছে তার পড়ার ঘরে। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকতে নীরেনের বাধো বাধো ঠেকছিল, পিসি থাকতে এই ঘরে সে কখনো ঢুকতে পারেনি। এটা ছিল পিসিমার ঠাকুরঘর। খুব ছোটোবেলায় চুপ করে এই ঘরে ঢুকে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পিসিমার পিঠে। পূজা ছেড়ে পিসিমা তাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় তার মায়ের কোলে তুলে দিয়ে বলেছিল, 'দুষ্টু ছেলে, তোমার জন্যে আমাকে এখন ফের ঠাকুরের ভোগ রাঁধতে হবে।' সেই থেকে ঠাকুরকে নীরেন একটু হিংসাই করতো। বড়ো হতে হতে সেই হিংসা আর রাগ আপনাআপনি মরে যায়। ঠাকুর কেউ থাকলে তো তার ওপর হিংসা হবে! ঠাকুরদেবতা নিয়ে স্কুলের ছেলেদের সামনে নীরেন কম ঠাট্টা করে না। বাবরদের ক্লাসেই একদিন বলেছিল, পৈতার অসম্মান করলে নাকি মাথায় বজ্রপাত ঘটবে। তা কলেজে ভর্তি হয়েই তো পৈতা দিয়ে সে খাতা সেলাই করেছে। কই তার মাথায় তো একটা দেশলায়ের কাঠিও জ্বললো না। আর এখন প্রিয় ছাত্রের দেওয়াল জুড়ে টাঙ্গানো পৃথিবীর মানচিত্র, আলমারির ওপরে গ্লোব, বাবরের টেবিলে ইনস্ট্রুমেন্ট বক্স, রঙের বাক্স, বই, খাতাপত্র। তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো দেখেও ঠাকুরের অভাবে নীরেনের বুকটা পিসিমার জন্যে হু হু করতে থাকে।"

ঠিক এই লাইনগুলো পড়লে উপমহাদেশে ধর্মের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়, যা সবসময় মোটাদাগের নয়, হিংসা-জাগানিয়া নয়; বরং হেমন্তের শিরশিরে হিমের মতো, যা ঝরছে নিঃসাড়ে, ভিজিয়ে দিচ্ছে নরমে কিন্তু প্রকট নয়। এক্ষেত্রে নস্টালজিয়ার আর্দ্র ওমে নাস্তিকতার চাদর সরে যাচ্ছে। দেশভাগের ফলে সম্পত্তি বদলাবদলি। নীরেনের পিসিমারা ঠাকুরঘর, বাড়ি সব মুসলিম আজিজকে বেচে ইন্ডিয়ায় চলে গেছেন। ফিরবেন না আর। সেই শূন্যতাবোধ আর আচার-বিশ্বাস কখন যেন আস্তিক হিন্দু ক'রে তুলছে নীরেনকে। তার ঈশ্বরবিশ্বাস হয়তো ফেরেনি, তার পৈতা ওঠেনি আর গায়ে; তবু, ঠাকুরের অভাব আর পিসিমার অভাব সমাপতিত যেমন হেমন্তের বিকেল আর সন্ধ্যের মিশে থাকা ঘন অথচ চুপচাপ হয়ে। আর, এই শূন্যতার আখ্যান থেকে পিসিমা ও ঠাকুরের একত্রীভূত হওয়া যে আমরা বেদনার গাঢ় অনুভবে বুঝব না, তার কারণ ওই সেই অমোঘ সংলাপ, "ওরা দাঙ্গা দ্যাখে নাই, দেশভাগ দ্যাখে নাই, যুদ্ধ দ্যাখে নাই, মন্বন্তর দ্যাখে নাই"

ঋত্বিক ঘটক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আমরা এসব দেখি নাই। কিন্তু, আমরা নাজিবের হারিয়ে যাওয়া দেখছি, আমরা এনডিটিভি-র সম্প্রচার বন্ধ হওয়া দেখছি, ব্রাহ্মণবেড়িয়ায় ঘর জ্বালানো দেখছি, আমরা ধর্ষণ ও ভুয়ো সংঘর্ষ দেখছি এবং আমরা রোজ আগাম ভয়ের আখ্যান জানছি। চলুন, একদিন বসা যাক, আপনাদের সময়ের ওই দেখা আর আমাদের সময়ের এই দেখা- কাদের গল্পগুলো কতটা ভয়ের হয়!!

"যখন আকাশে আলো নেই,/ যখন মাটিতে আলো নেই,/ যখন সন্দেহ জাগে, আলোকিত ইচ্ছার উপরে রেখেছে নিষ্ঠুর হাত,/ পৃথিবীর মৌলিক নিষাদ- এই ভয়"


#
গুজরাত দাঙ্গা নয়, গণহত্যা

মহাত্মা গান্ধী মেট্রোস্টেশন থেকে বেরিয়ে অটো না পেলে কলাবাগান-মেছুয়া বস্তির মধ্যে দিয়ে হেঁটে আসি কলেজ স্ট্রিট বাটা পর্যন্ত। আজও আসছিলুম। কারণ, অটো চলাচল বিপর্যস্ত। কারণ, কীসের যেন সভা চলছে। ওখানের দোকানগুলোতে কাটা পাঁঠা আর কাটা গরু পরপর ঝোলে। আগে ওখানকার দোকানে কাবাব খেয়েছি, মন্দ নয়। যাইহোক, আসতে আসতে শুনছিলুম "বঙ্গাল হিন্দুয়ো কা হ্যায়, মুসলিমোঁ কা হ্যায়"... ভাবলুম তৃণমূলের সভা হচ্ছে।
সভাটাকে পাশ কাটিয়ে বেরোতে গিয়ে শুনলুম, ১০ ফুট বাই ৫ ফুট মঞ্চে তখন ভাষণ হচ্ছে "আপ আভিতক গুজরাত দাঙ্গাকে বাত করতেঁ হ্যায়, আপ আভিভি বাবরি মসজিদ তোড়নেকে দিন ইয়াদ রাখতে হ্যায়। হাম গুজরাত দাঙ্গাকে লিয়ে, বাবরি মসজিদ তোড়নেকে লিয়ে শরমিন্দা হ্যায়।" আরও যা শুনলুম, তার হিন্দি থেকে বাংলা করলে দাঁড়ায়- "হিন্দু ধর্মেও কিছু বদমাশ লোক আছে, ইসলাম ধর্মেও আছে। গুজরাত দাঙ্গা এখন অতীত, তার জন্যে ক্ষমা চাইতে অসুবিধে নেই আমাদের"! দেখলুম, সভায় পদ্মফুল আঁকা। বিজেপির সভা। ৫০-৬০ জন মতো লোক বসে আছে মঞ্চ ঘিরে।
একদিকে দেশজুড়ে জুনেইদ, আসগর আলি, আখলাখদের খুন করা হচ্ছে; আবার অন্যদিকে জনমত তৈরি করতে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে সভা করছে। কখনো মুখোশ পরে 'ভুলস্বীকার' করছে কখনো মুখোশ খুলে দাঙ্গা বাধাচ্ছে গণহত্যা করছে। আর, দুটোই করছে সেই বিজেপি, বকলমে আরএসএস। 'কনসেন্ট আদায়' করার খেলা এত ভাল করে খেলছে তারা... প্রচারে-মিথ্যাপ্রচার মতাদর্শভিত্তি শক্ত করছে তারা...

জুনেইদের মৃত্যুর পরে, আখলাখের মৃত্যুর পরে, ভুয়ো খবরে জায়গায় জায়গায় ওরা দাঙ্গা বাঁধানোর পরে আমরা পারিনি কলাবাগান বস্তিতে, রাজাবাজার চামড়াপট্টিতে সভা করতে। একটা ৫ ফুট বাই ৫ ফুট মঞ্চ বেঁধে বা খালি গলায় বলে আসল সত্যিগুলো বলতে পারিনি এখনো। বোঝাতে পারিনি তাদের, যারা আরেসেস-বিজেপির মতাদর্শের সম্ভাব্য ও আশু শিকার। যারা মারছে, তারাই বোঝাচ্ছে। অন্ততঃ ৬০ জন লোককেও ভুল বোঝাচ্ছে তারা প্রকাশ্যে।

আমরা তখন দক্ষিণাপণে সভা করছি। কিংবা কোনও নিরাপদ সভাগৃহে আলোচনা করছি কীভাবে আরেসেস ঠেকাব।


#
আমার শহরে

ফোনের ব্যাটারি ফুরিয়ে গিয়েছিল গতকাল ৮টায়। নিঃশেষ। রাজাবাজার মোড়ে তখন আমি যোগাযোগরহিত। বাড়ির লোকের সঙ্গে গাড়িতে মধ্যমগ্রামে এক নিমন্ত্রণরক্ষায় যাওয়ার কথা ছিল। বাড়ির সবাই বেরিয়ে গেছে; গাড়ি কোথায় আমার জন্যে অপেক্ষা করছে জানি না। আর, পাড়ার মোড়ে মোড়ে একসময় জাঁকিয়ে বসা ফোন-বুথ টেলিগ্রামের মতোই কবে যেন উঠে গেছে। ফলে, রাজাবাজার মোড়ে সে মুহূর্তে আমি নিঃসহায়। কী করে যোগাযোগ হবে? পিছন ফিরে একটি মোবাইলের দোকানে গিয়ে মিনতি করলুম, "দাদা, একটা ফোন করতে দিন, পয়সা দিয়ে দিচ্ছি। নয়তো চার্জারটা দিন, মোবাইল চার্জে বসিয়ে ফোনে কথা বলে নেব।" তিনি দেখিয়ে দিলেন পাশের দোকান। তারপর তাজ বিরিয়ানির পাশে যে মসজিদ, তার লাগোয়া দোকানটিতে একই অনুরোধ করতেই সঙ্গে সঙ্গে দোকানদারটি চার্জার এগিয়ে দিলেন। 'হাতে চাঁদ পাওয়া'-র থেকেও 'ফোনে চার্জার পাওয়া' সে মুহূর্তে বেশি প্রয়োজনীয় ছিল। চার্জে বসিয়ে মিনিট দুই পরে অবশেষে ফোন অন্‌ হল। বাবাকে ফোন করে যোগাযোগ হল। অসহায়, উদ্বিগ্ন মুহূর্তের অবসান। আমি টাকা দিতে চাইলুম দোকানদার ছেলেটিকে। সে হেসে বলল, 'নেহি নেহি, ছোড় দিজিয়ে।' 'বহোত সুক্রিয়া ভাইসাব' বলে আমি চলে এলুম, গাড়ি পেলুম। চললুম মধ্যমগ্রামের দিকে।
সেই মধ্যমগ্রাম, যার অনতিদূরে বাদুড়িয়া। সেই বাদুড়িয়া, যেখানে সেই প্যাচপ্যাচে হেঁদু বনাম মোসলা। অথচ, আমার বাড়ির কাছের আরশিনগরে সেই মুসলিম ছেলেটির দোকান যে আমাকে সেই বিপন্ন মুহূর্তে সাহায্য করতে দ্বিধা করেনি। না, কোনো হেঁদু বনাম মোসলমান বাইনারি কাজ করেনি। আর, আমার ভাবতে গর্ব হয় যে, আমি এই শহরে জন্মেছি, থাকি। এই শহর এখনো বাইনারিতে, দাঙ্গায় ভেঙ্গে যায়নি।

ফেসবুকে, হোয়াটস্‌অ্যাপে যখন পরিচিত-অপরিচিত শিক্ষিত ধর্মগাণ্ডুদের পাঠানো মিম, ট্রোল আর ধর্মীয় বিদ্বেষের পোস্টগুলো পড়ি, তখন তাদের ঘেঁটি ধরে নিয়ে যেতে ইচ্ছে হয় এই উদাহরণগুলোর সামনে। জানি, আমার এই বাস্তব ফেসবুক, হোয়াটস্‌অ্যাপে ছড়াবে না। বরং রোজ রোজ ছড়াবে কিছু হেঁদু বনাম কিছু মোস্‌লমানের বজ্জাতি আর ক্যাওড়ামো। তবু, কোথাও তো একটা দায় থাকে ঘটনাগুলো বলার। ক্রমশঃ বিপন্ন সময়ে কিছু বোকা বোকা 'আমরা সবাই ভাই-ভাই' জাতীয় ফেক্‌-সম্প্রীতির পোস্ট এবং ততোধিক শয়তানি ভরা উগ্র ধর্মবিদ্বেষের পোস্ট দুটোতেই থুথু দিতে ইচ্ছা করে।

আমি জানি, যদি আমার শহরের ধর্ম বিপন্ন হয়, রাজাবাজারের ওই মুসলিম ছেলেটি আমার পাশে থাকবে। ছেলেটি হয়তো জানবে না, তবু বলে রাখা ভাল, আমিও দ্বিধাহীনভাবে তার পাশে থাকবই। সময় বিপন্ন হোক, তবু এরকম অনেকেই অনেকের পাশে থাকবে। নিশ্চিত।


#
আমার জন্মপাড়ায়

ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি মেলা। উত্তর কলকাতার বাগমারিতে। মেলা বসে বড়দিনের সময় থেকে। উপলক্ষ্য যীশু, সান্তা নয়। উপলক্ষ্য পবিত্র উরস্‌। হজরত মওলানা সুফী মুফতী। ২৫শে ডিসেম্বরের ঠিক পরের শনিবার খোলা হয় পীরের পবিত্র মাজার। সারাবছরে ওই একটিমাত্র দিন।

শুক্রবার ভোররাত থেকে বিশাল লাইন পড়ে। মাজারে দর্শনপ্রার্থী মানুষ লাইন দেন। সেই উরসকে কেন্দ্র করে মেলা। বাগমারিতে। সমস্ত পশ্চিমবঙ্গ থেকে লোক আসে, এমনকি বাংলাদেশ থেকেও। লোকে লোকারণ্য, মেলায় মেলাক্কার। বহুবার এমন হয়েছে যে, কোনো আত্মীয় আমাদের বাড়ির গেট চিনতে পারেনি! মানিকতলা মেইন রোড থেকে আমাদের বাড়িতে আসতে লাগে ৫ মিনিট আর, মেলার সময় মিনিমাম ১০ মিনিট! বাগমারি মাঠে বিশাল বিশাল তাঁবু খাটিয়ে লোকেরা থাকে। একবার গুজব রটে গেল, মুসলিমরা নাকি মাঠের পাশের জলাধারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে! একবার রটে গেল, কিছু সন্ত্রাসবাদী এই উরসেকুলে লুকিয়ে রয়েছে! অবশ্য, রটনাগুলো গুজব হিসেবে বুঝে ফেলে বাগমারির মানুষই। একবার বাংলাদেশের এক বিক্রেতার থেকে গরম জামা কিনেছিলুম, এখনো সেটা পরি। মেলা চলার সময় ছোটবেলায় দারুণ রাগও হতো; কারণ, খেলার মাঠটাই তো বেদখল! কিন্তু, মেলা ভাঙ্গলে মনখারাপ হতো। আমার বাবাও একবার গেছিল মাজার দর্শনে, বিকেলের দিকে যখন লাইন ছিলনা। আর, শর্ত একটাই মাথায় রুমাল বা টুপি পরে ঢেকে নিতে হবে।
আমি যে বাগমারিতে জন্মেছি, সেখানে পরপর শিবন্দির, গুরুদ্বার আর মসজিদ। মসজিদ আর মন্দিরের ঠিক মাঝে আমাদের বাড়ি। শুনেছি ১৯৮৪ সালে শিখ-হিন্দু দাঙ্গার সময় হাল্কা আঁচ পড়েছিল এখানেও, কিন্তু সে আঁচে আগুন জ্বলতে পারেনি। ১৯৯২-তে বাবরি ভাঙ্গার পরে কিছু উত্তেজিত লোক ওই মসজিদের পাশে মুসলিম-ছাত্রাবাস আক্রমণ করতে গেছিল; আক্রমণ ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল পাড়ার বড়দের বুকে লেগে। ক্লাস এইটে পড়ি, আমাদের বাড়িতে পড়াতে আসত ছাত্রাবাসের এক মুসলিম ছাত্র। তার সাথেই একবার গেছিলুম ছাত্রাবাস-লাগোয়া মসজিদে। সাদা-কালো, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা, পুরনো... এরকম ছবি একটা মনে আছে।

আজ শুনলুম পার্কের মাঠে বক্তৃতা হচ্ছে। বাংলাদেশের কোনো এক মওলানা বক্তব্য রাখছিলেন। "সিরিয়ায় কয়েকহাজার শিশু মারা গেছে। প্রচুর লোক ঘরছাড়া..." প্রথমে আমার গণমাধ্যমে-অভ্যস্ত মন ভেবেছিল লোকটা কি আইএসআইএস-কে জাস্টিফাই করছে নাকি? তার পরের লাইনে শুনলুম, "বাংলাদেশেও ওরা হামলা করেছে..." শুনলুম ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধেও বলছে লোকটা। ভাল লাগল। মেলা এখন জমে গেছে। দুপুরে খেয়ে উঠে শীতের কমলালেবু রোদ গায়ে মেখে মেলা ঘুরতে বেরোচ্ছে পাড়ার মেয়ে-বৌরা। অফিসফেরত কেউ ভিড় ঠেলতে বিরক্ত হলেও, বাড়ির দরজা খুঁজে পাচ্ছে ঠিক। আর, কোনো কেতাদুরস্ত যুবক রাস্তাভরে থুতু পরে থাকতে দেখে নাক কুঁচকোচ্ছে। উরসে আসা কোনো বাচ্চা ছেলে মাঠের পাশের হিন্দুপাড়ায় সমবয়সীদের সাথে ক্রিকেট খেলছে, দ্বিধা কাটিয়ে।

মাজারের বয়স বাড়ছে। শিবমন্দির পুরনো হচ্ছে। গুরুদ্বারের লোহার গেটে মরচে পড়ছে। মানুষ আসছে। মানুষ ফিরে যাচ্ছে উরস শেষে। এও তো এক আখ্যান। মাজার মন্দির গুরুদ্বার সুদীর্ঘ-লাইন মাঠে-বিশাল-হাঁড়িতে-রান ্না মেলা ক্রেতা-বিক্রেতা-রসিকত আর আমাদের আখ্যান। কলকাতার আখ্যান।


#
অনেকের আখ্যান

হাড্ডি খিজির ভর করেছিল ওসমানের মাথায়। মৃত শ্রমিক খিজিরের প্লায়ার আর স্ক্রু-ড্রাইভার ওসমানকে তাড়িয়ে বেড়াত। আর, মধ্যবিত্ত ওসমান দোদুল্যমানতা, ব্যক্তিগত টানাপড়েন ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়েছিল।

শারিবা বাজিকর। বিশ শতকের শেষে এসে বাজিকররা থিতু হতে চাইছিল। জমি আর জীবিকা নিয়ে। কিন্তু, কে দেবে স্বীকৃতি? না-হেঁদু, না-মোল্লা তারা। শেষমেশ মোল্লা হাজি শর্তবিশেষে অধিকাংশ বাজিকরদের মোল্লা করল। আর, রূপা বাজিকর স্ত্রী ও জনাকয়েক আত্মীয় নিয়ে বিষহরির মন্ত্র, তুলসিমালা পরে হেঁদুয়ানি পেলো (জলচলও নয়, আরো নিচে।) একমাত্র শারিবা ছাড়ল না বাজিকর পদবী। চাকরির ফর্মে ধর্ম লিখল বাজিকর। সে শুধু বেজাতের ধর্ম মানে। ধর্মগণ্ডি নয়। তার মাথায় যে রহু। আর, তার মাথায় পরে হানিফ। সেই হানিফ যে ঘুমের মধ্যেও রোড রোলার চালানোর স্বপ্ন দেখে আর তাড়ি খায় আর জাতহীন বাজিকরদের বুকে টেনে নেয়। শ্রমিক হানিফ।

কারখানার চিমনি পরিষ্কার করতে চার-ছয় বছরের শিশুদের নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে চিমনির ভিতরে। কেউই প্রায় বেরিয়ে আসতে পারছে না। চিমনির ভিতরেই হাঁসফাঁস করে... উৎপাদন তো বন্ধ থাকতে পারে না! তাই, জ্বলেপুড়ে ওখানেই ছাই হয়ে থাকছে শিশুটি। পরিষ্কার চিমনিতে উৎপাদনের ধোঁয়া।

বিটি রোডের ধারের ওই চটকল বস্তি। ফুলকি, দুলারী, গোবিন্দ, ফোরটুয়েন্টিদের প্রতিদিন। লড়ছে, মরছে হেরে যাচ্ছে না। তাদের নিজেদের ভেতর হাজারো দ্বন্দ্ব, তবু একসাথে সেই প্রতিরোধ! কারখানার ভোঁ শুনে দৌড়ে যাওয়া। আর, গোবিন্দ্র প্রতিরোধের মুহূর্তে সেই কালবৈশাখী...

সেই পরিবারটা তো চলেই যাচ্ছিল এদেশ ছেড়ে। দেশভাগের পরে। ওদেশে। না-পাওয়া আর অপমান নিয়ে। হঠাৎ রাস্তায় দেখা সেই লালপতাকার মিছিল- সিকান্দার ছুটে যায় যোগ দিতে। ভাঙ্গামন সেলিম সাহেবও থেকে যাচ্ছেন এদেশেই, মিছিলে সহর্ষে। পরম আশার সেই লালপতাকা।