একা মেরে সাঁই, ফেরে সর্বঠাঁই—অন্তেবাসীর মনের কথা

প্রসেনজিৎ দত্ত

লালনের সমাধিক্ষেত্র ছেঁউড়িয়ার মাজার আজ বিশ্ববাউলের পবিত্র তীর্থ। কিন্তু বাউলদের ক্ষোভ, তাঁদের প্রিয় সাঁইজির এই স্মৃতিসৌধ আজ হাতছাড়া। মাজারে প্রকৃত বাউলদের আজ ঠাঁই নেই। রাতের আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গেই মাজার চলে যায় ইন্দ্রিয়াসক্ত অ-বাউল গাঁজাখোরদের হাতে। ১৮ জানুয়ারি। ১৯৯২। আবুল আহসান চৌধুরী দেশ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এমনই এক সত্য তুলে ধরেছিলেন। এখন কেমন আছে আখড়াবাড়ি? ১৮৯০-এর ১৭ অক্টোবর—এই দিনটিতে মহাত্মা লালনের তিরোধান ঘটে। এরপর থেকে লালনের অনুসারীরা প্রতি বছর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই দিনটি পালন করে আসছেন। লালন শাহের তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে সাঁইজির বারামখানায় চলে লালন মেলা। কুষ্টিয়া লালন অ্যাকাডেমির আয়োজনে যে মেলা বসে, সেখানে ভিড় জমান লালন অনুরাগীরা। তবুও মহাত্মার আখড়াবাড়ি এখন ভালো নেই। একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, প্রকৃত বাউলরা জজ আদালতে ডিক্রি পেয়েছেন। আখড়াবাড়ি ও মাজার শরীফ যে একান্ত তাঁদেরই, ছেঁউড়িয়ার সাধনপীঠে সেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এখনও তাঁদের জন্য সেই জায়গা আপন নয়। লালনপন্থীরা এখন নিজভূমে পরবাসী। আর লালন? মানুষটি জীবিতকালে এবং মরণোত্তরেও যে সেই পরবাসীই রয়ে গেলেন!
এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলি। বীরভূমের কঙ্কালীতলায় গেলেই দেখা মিলবে তাঁর। তিনি দিলীপ দাস বৈরাগ্য। কোলের কাছে মাধুকরীর বাটি রেখে তিনি দোতারা বাজান। আর তাঁর ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের সঙ্গে তাল দেওয়ার জন্য বাঁধা নূপুর। আমাদের দেখে ডাকলেন। বললেন, ‘সাঁইজি তো অমন ছিলেন না। তবে কেন মানুষ নিজের স্বার্থে চলে? কেন ধর্ম নিয়ে মারামারি করে? কেন কঙ্কালীতলার মতো জায়গায় এসে এই মানুষই পিকনিক করে উচ্ছিষ্ট ফেলে নোংরা করে চলে যায়? আমাদের পয়সার লোভ দেখিয়ে গান গাওয়াতে চায় ওরা। আমরা ফকির। ফকিরিই আমাদের ভাত দেয়। মাধুকরী আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। অথচ নিজেদের ফুর্তির জন্য দাক্ষিণ্য দিয়ে ওরা আমাদের কিনতে চায়।’ যা ঘটে চলে আর কী। পকেট ভারী হলে তুমি রাজা, নাহলে ফকির—বেশ টাকা-টাকা খেলা চলে এই দুনিয়ায়। আসলে সময় তথাকথিতভাবে আধুনিক হয়, তা সে যে দেশই হোক বা কেন—নির্যাসটা এক। হাজার বছর আগের সেই চর্যার যুগ থেকেই এইসব সহজিয়া মানুষরা উচ্চবর্ণের কাছে তাচ্ছিল্যের শিকার। এই তাচ্ছিল্য থেকেই আসে অবহেলা। অবহেলা থেকে দারিদ্র্য। ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।/হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী॥’
তবু উত্থান থেমে থাকে না। যেমনটা থামে থাকেননি লালন। অলৌকিকতা-বিরোধী এই মানুষটি ‘মানুষধর্মে’ বিশ্বাস করতেন। নিম্নবর্গের সীমানায় দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন—‘জিন-ফেরেস্তার খেলা পেঁচোপেঁচি আলাভোলা—/ফেঁও-ফেঁপি ফ্যাক্‌সা যারা/ভাকা-ভুকোয় ভোলে তারা।’ এর অর্থ খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন গবেষক সুধীর চক্রবর্তী। ‘ফেঁও-ফেঁপি’ অর্থাৎ নীচু চেতনার মানুষই অপদেবতা, পেঁচোপেঁচি জাতীয় প্রতিহিংসাপ্রবণ গ্রাম্যদেবতা, আলাভোলা বা আলেয়ার আলোয় ভোলে। তারা অন্তঃসারহীন (ফ্যাক্‌সা), তাই মিথ্যা প্রতারণায় (ভাকা-ভুকো) বিশ্বাস করে। লালনের এই সবল উচ্চারণ তাঁকে অনেকের থেকে পৃথক করে। এ হল লালনপন্থার প্রতিবাদী পরম্পরা। আর সভ্যতার ইতিহাসে কোন্‌ প্রতিবাদী প্রতারিত হননি?
লালনের জন্ম ১৭৭৪-এ। তাঁর মৃত্যুর পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হিতকরী পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, ‘ইহার জীবনী লিখিবার কোনো উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারে না।’ (হিতকরী, সম্পাদক: মীর মশাররফ হোসেন [পাক্ষিক, কুষ্টিয়া], ১৫ কার্তিক ১২৯৭/৩১ অক্টোবর ১৮৯০)। লালনের জন্ম কোথায়, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিছু সূত্রে পাওয়া যায়, লালন ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও এই মতেরও দ্বিমত আছে। বাংলা ১৩৪৮ সনের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে মুনসুরউদ্দিন মুহাম্মদের গভীর অধ্যাবসায়ে প্রকাশিত ৭ খণ্ডের হারামনি সংকলনে যে বিবরণী প্রকাশিত, তা থেকে জানা যায়—‘লালন ফকির অব্বিভক্ত নদীয়া জেলার কুষ্টিয়ার অন্তর্গত কুমারখালি সংলগ্ন গড়াই নদীর তীরে ভাঁড়ারা (চাঁপড়া-ভাঁড়ারা) গ্রামে জন্মান। তাঁর জন্ম কায়স্থ পরিবারে, পদবী কর (মতান্তরে রায়)। বাবা-মার নাম মাধব ও পদ্মাবতী।...পরবর্তী কোনও সময়ে দাসপাড়ার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে তিনি বহরমপুরে গঙ্গাস্নানে যান এবং বাড়ি ফেরার পথে আক্রান্ত হন বসন্তরোগে। আচ্ছন্ন ও অচৈতন্য লালনকে ফেলে সঙ্গীদল সম্ভবত রোগের ভয়ে পালিয়ে আসেন গ্রামে এবং লালনের মৃত্যুর খবর রটিয়ে দেন। তাঁরা হয়ত লালনকে মৃত মনে করে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।...মৃতকল্প সংজ্ঞাহীন লালনের দেহ নদীর কূলে ভাসমান দেখতে পেয়ে একজন স্নেহশীলা মুসলমান নারী উদ্যম করে তাঁকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে সেবা করে বাঁচিয়ে তোলেন। কেবল বসন্তরোগ রেখে যায় তার অনপনেয় দাগ।’ তবুও গবেষক সন্দেহের অবকাশ নেই। লুৎফর রহমান ১৩৬০ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যা মাহে নাও পত্রিকায় সমস্ত প্রচলিত ধারণার প্রতিবাদ করে বলেন—‘আনুমানিক ১১৭৩ (১৭৬৬ ইং) সালে যশোহর জিলার অধীন হরিণাকুণ্ডু থানার অন্তর্গত হরিশপুর (কুলবেড়ে হরিশপুর) গ্রামের এক খোনকার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন লালন শাহ।’ যুক্তি, প্রতিযুক্তির বশে মানুষের মূলভাব থেকে সরে আসার অভ্যাস চিরাচরিত। একদল তাঁকে হিন্দু বলেন, আর এক দল মুসলমান—এ তো তাঁর জীবদ্দশা থেকেই চলে আসছে। সত্যকে খুঁজতে গিয়ে যদি ‘মানুষ লালন’ ভাগাভাগি হয়ে যান, তবে এমন অনুসন্ধান বন্ধ হোক।
সমস্যাটা আজকের নয়। ‘নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ।/ছোই ছোই জাহ সো বাহ্ম নাড়িআ॥’ নীচু জাত জাতপাতের ঊর্ধ্বে প্রণয়-উৎপ্রেক্ষা সহজ সাধনাই ছিল তাঁদের ধর্মাচারণ। কিন্তু উদ্ধত ব্রাহ্মণদের কাছে তা অবৈধ। তাই তাঁরা সমাজচ্যুত। মূল নগরীর বাইরে তাঁদের কুঁড়েঘর। বহুবছর পেরিয়ে গেলেও সমস্যাটা রয়ে গিয়েছে একই জায়গায়। বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটেও তাঁদের সহজ সাধনাকে উচ্চবর্ণ কখনোই মেনে নেয়নি। এমনকী ‘বাউল ধ্বংস ফতোয়া’ পর্যন্ত জারি হয়েছিল। লালনও সেই ব্রাত্যজনের দলের একজন। তিনি অত্যাচারিত হয়েছেন, তাঁর ভিটের মাটি জমিদারদের কুনজরে পড়েছে, মার খেয়েছেন, তাঁকে নাপাক বলা হয়েছে—তবুও থামেননি লালন। আজও যে পরিস্থিতির আমূল বদল ঘটেছে, তা নয়। কুসংস্কার তো একটা অভ্যাস। তা এতদিনের সমাজদেহ থেকে মোছেনি আজও। যাইহোক, যে বাউল ধ্বংস ফতোয়া জারি হয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিল, ‘…ন্যাড়ার ফকিরগণ লালন সাহার সম্বন্ধে কোনই পরিচয় না জানিয়া হুজুগে মাতিয়া হিন্দু বৈষ্ণবগণের দেখাদেখি লালন সার পদে গা ঢালিয়া দিয়া মোছলমান সমাজের কলঙ্কস্বরূপ হইয়াছে ইহা অতিশয় পরিতাপের বিষয়।’ লালনের পদকে অনেকই ‘গ্রাম্যতা দোষে দুষ্ট’ও বলেছেন। অনেক সুধী গবেষক আবার তাঁকে ‘জারজ’ও বলেছেন। প্রসঙ্গত, আবুল আহসান চৌধুরী লিখছেন, ‘‘অগণন ভক্ত এবং রবীন্দ্রনাথ থেকে অন্নদাশঙ্কর রায়ের লালন-অনুরাগ কি তবে এই ‘জারজ’ মন্তব্যের পাঁকে ডুবে যাবে? কী ভেবে এঁদের সম্পর্কে আগেই লালন লিখে গিয়েছিলেন: ‘পণ্ডিত কানা অহংকারে’। আশা আর আনন্দের কথা এই শহুরে শিক্ষিত অনুদার প্রতিক্রিয়াশীলদের অপ-মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন শওকত ওসমান লালনকে নিয়ে গল্প লিখে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উপন্যাস লিখে, শামসুর রাহমান কবিতা লিখে, আর তানভীর মোকাম্মেল ও গৌতম ঘোষ ছবি বানিয়ে, যেখানে লালন ফুটে উঠেছেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মানবতাবাদী দার্শনিক, সাধক ও কবি হিসেবে।’’
মুহম্মদ মনসুরউদ্দিনের বাউল-গানের সংগ্রহের গ্রন্থ হারামনি-র কথা বলব এরপর। যার প্রথম ভাগের ভূমিকা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারিখটি ছিল পৌষ সংক্রান্তির দিন ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে। এ গ্রন্থ-ভূমিকার শেষ অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ বাউল সম্প্রদায় বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে কীভাবে অবদান রাখছে সে প্রসঙ্গে বলেছেন—‘আমাদের দেশে যাঁরা নিজেদের শিক্ষিত বলেন তাঁরা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশের ঐতিহাসিক স্কুলে তাঁদের শিক্ষা। কিন্তু, আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত, প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্তু মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল-সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি—এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই; একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভাসমিতির প্রতিষ্ঠা হয়নি; এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে, কোরান পুরাণে ঝগড়া বাধেনি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদে বিরোধে বর্বরতা। বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা ইস্কুল-কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কিরকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।’
জাতিত্ব, শাস্ত্র, মৌলবি কিংবা বামুনের বিধান বাউলদের কাছে ছিল ব্রাত্য। বাউল সাধারণের মধ্যে বাসকরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী। খোদ লালনই তো গেয়েছেন—‘কার বা আমি কেবা আমার/আসল বস্তু ঠিক নাহি তার/বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার/উদয় হয় না দিনমণি।’ আর ঈশ্বরের বিভিন্ন নাম এই বাউল-দুনিয়ায়। স্থানবিশেষে এই তারতম্য দেখা যায়। জায়গা বদলের সঙ্গে উচ্চারণ বদলে যায় যেমন, এ তারতম্য তেমনই। ‘ঈশ্বর’ শব্দে বদল ঠিক এইভাবেই। সেখানে তিনি ‘দয়ালহরি’, ‘দীনদয়াল’, ‘সাহেবধনী’ অথবা ‘দীনবন্ধু’—বহু ‘বচন’, বাচন (discourse)-ও বহু; কিন্তু ভেদাভেদ নেই। সবকিছুর মূলে মানুষই। বাউলমানুষই বহু ‘বচন’-এ ঈশ্বরকে মানুষ বা মানুষকে ঈশ্বর করল। আবার সেই বহুত্বকে খণ্ডন করল সেই মানুষই। একদিকে হিন্দুদের ধর্মাদর্শ, আরেকদিকে কট্টর মৌলবিদের সক্রিয় দমননীতি বাউল ফকিরদের ধ্বংস করতে খরতর হল। বাউলদের ক্ষতি হল। কিন্তু একজন অকেজো নাপিতের সবথেকে বড় বোঝা কি জানেন? তার ক্ষুর। ফতোয়া জারির বাহকদের বদান্যতায় বাউল-ফকিররা অন্তেবাসী হল, কিন্তু ধ্বংস হল না। তবে তাদের অন্তেবাসী হওয়ার পিছনে কি কেবল বাউল ধ্বংস ফতোয়াই দায়ী? উনিশ শতকের দিকে নজর দিলে এর আরও একটি কারণ কিন্তু সামনে আসবে। ব্রাহ্মধর্মের উত্থান, মিশনারিদের প্রসিদ্ধি, হিন্দু-মুসলমান সংস্কার আন্দোলন বাউলদের মতো উপসম্প্রদায়ীদের পিছড়েবর্গ করে তুলেছিল। উচ্চস্তরের কেউ কেউ এদের ‘পায়খানা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে গায়ে নোংরা লাগানো’ বলেছেন। কেউ একে ‘বিষ্ঠামূত্র খেয়ে ধর্মসাধনা’ নামে অভিহিত করেছেন। ফলত, তাদের সংখ্যায় কমে যাবার পিছনে এইসব যুক্তিও কম যায় না। আশ্চর্যের বিষয়, বাউল ফকিরদের মধ্যে যারা মুসলমান ধর্মত্যাগী তারা কিন্তু প্রচণ্ড লড়াই চালিয়ে এসেছেন সেই আঠারো শতক থেকেই। বাউলদের বড় সংগ্রাম শুরু হয় উনিশ শতকে নদিয়া, যশোর এবং পূর্ববঙ্গের শরিয়তি মুসলমানদের সঙ্গে। বাউলদের ঝুঁটি কেটে নেওয়া, গান-বাজনা বে-শরিয়তি বলে ফতোয়া দেওয়া এবং নানারকম দৈহিক নির্যাতন করা ছিল নির্যাতনের উপায়।
বোধহয় পালটা দেওয়াও শুরু হয়েছিল এই কারণেই। লালন লিখলেন—‘একা মেরে সাঁই, ফেরে সর্বঠাঁই/মানুষে মিশিয়া হয় বিধান তার/মানুষগুরু নিষ্ঠা যার/সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার...’। জালালউদ্দিন ফকির নামে আরেকজন ফকির লিখলেন—‘মানুষ থুইয়া খোদা ভজ এ মন্ত্রণা কে দিয়াছে/মানুষ ভজ কোরান খোঁজ পাতায় পাতায় লেখা আছে...’। অরূপ রাহী নামে একজনের বাউল-ফকিরদের ওপর নিপীড়ন: গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতি চ্যালেঞ্জ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। প্রসঙ্গত সেই প্রবন্ধের শুরুটা তুলে দিলাম—‘রাজবাড়ি রূপক হয়ে ধরা দিল বাংলায়। রাজার বাড়িতে ফকিরের ওপরে নিপীড়ন চলছে। সারা বাংলাদেশ রাজবাড়ি। প্রতিদিন বাউল-ফকিরদের ওপর নিপীড়ন চলে। সব ঘটনার খবর হয় না। রাজবাড়ির পাংশার হাবাসপুরের ঘটনা একটা মাত্রা ছাড়িয়েছে বলে তা খবর হয়েছে। বাউল- ফকির- সহজিয়া- কর্তভজা- সাহেবধনী-
বলাহারি- পঞ্চসখী- সুফি- বৈষ্ণবরা তো রাজা নয়। রাষ্ট্রও বানায়নি তারা। ফলে রাজার বাড়িতে তারা ফকির-মিসকিন। কখনও ভিক্ষা পাবে। কখনও বিতাড়িত হবে। সেই কতকাল আগে থেকে চলে আসা ঘটনার পুনরাবৃত্তি! নতুন কি? প্রাথমিক উত্তেজনা শেষ হয়েছে। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন সংবেদনশীল বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। থানায় মামলা করেছেন ফকিররা। অনেকেই এই নিপীড়নের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছেন তাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে।’ বিশ শতকে মৌলবি রেয়াজুদ্দিন ‘বাউল ধ্বংস ফতোয়া’ যেমন লিখেছেন, তেমনি হিন্দু সংস্কারক বিপিনচন্দ্র পাল, আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতী, রামমোহন, অক্ষয়কুমার দত্ত, রামকৃষ্ণ, প্রমুখ যে বাউল-বৈষ্ণবদের ওপর প্রসন্ন ছিলেন না—তার প্রমাণ দুর্লভ নয়। এমনকী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাঁর ‘বাউলপ্রেম’ কিংবদন্তির চেহারা নিয়েছে, তারও বাউলদের যৌনচর্চার ব্যাপারে শ্রদ্ধাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং বিপরীত মানসিকতার খবর পাওয়া যায়। উনিশ শতকের হিন্দু এবং মুসলমান সমাজ সংস্কারকরা একযোগে বাউল-ফকিরদের বিরুদ্ধে হিংসা-দ্বেষ ছড়িয়েছেন। আভিজাত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা এই বেসরা-বেদবিরোধী ‘সহজে পাগল’দের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে কসুর করেননি। রাহী দেখাচ্ছেন, ১৯৪২-এ কুষ্টিয়ায় দোল পূর্ণিমার অনুষ্ঠানে মাওলানা আফসারউদ্দিন লোকজন নিয়ে বাউল-ফকিরদের অনুষ্ঠানে হামলা করেন, বাউল-ফকিরদের দাড়ি-গোঁফ কেটে দেন। রাষ্ট্রের তরফে লালন আখড়া দখল শুরু হয় ১৯৬৩-এ। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর মোনয়েম খাঁ লালনের সমাধিস্থলের পাশে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র নামে একটি প্রতিষ্ঠান বানান পদাধিকার বলে। যার সভাপতি হন জেলা প্রশাসক। ১৯৭৬-এ তৎকালীন সরকার তার নাম রাখে লালন একাডেমি। এরপর এরশাদ আমলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফজলুল হক মিয়া সেখানে ভক্তদের প্রথাগত অনুষ্ঠানে বাধা দিয়ে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেন। এই ঘটনা ১৯৮৪-র। লালন ভক্তদের তওবা পড়ানোর নির্দেশ দেন তিনি। সমাগত বাউল-ফকিরদের পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে আখড়া থেকে বের করে দেওয়া হয়। ১৯৯৭-এ তৎকালীন সরকার আখড়া চত্বরে লালন কমপ্লেক্স নির্মাণ শুরু করে। সাধু-ভক্তদের সাধন-ভজনের পরিবেশ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আখড়ার নিকটে কালিগঙ্গা নদী ভরাট করে মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। সাম্প্রতিককালে লালন স্মরণোৎসব এবং দোল উৎসব—দু’টোই রাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দখল নিয়েছে বহুজাতিক ফোন কোম্পানিগুলো। তারা পালাক্রমে এসব অনুষ্ঠান স্পন্সর করছে। বাউলরা চেয়েছিল নতুন মানুষ নির্মাণ করতে। কেবল বাউল নয়। সঙ্গে সহজিয়া- কর্তভজা- সাহেবধনী- বলাহারি- পঞ্চসখী- সুফি- বৈষ্ণব সবার বাচন নতুন মানুষ নির্মাণের কথা বলেছে। এবং এখানেই বিরোধ। আসলে সমান্তরালভাবে কিছু চলতে পারবে না। চললেই বিপত্তি। মূলধারার সঙ্গে শ্রেণিবিরোধের জায়গাটা এখানেই। তাত্ত্বিকরা একে শ্রেণিসংগ্রামের বর্ধিত রূপও বলতে পারেন।
মন্মথ রায় লালন ফকির নামে যে নাটকটি লিখেছিলেন (প্রথম প্রকাশ—২৫ নভেম্বর, ১৯৮২)। সেখানে যখন দেখা যায় লালনের আশ্রম পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য বন্দোবস্ত করছে উচ্চবর্ণরা, তখন লালন তা আঁচ করেন। রহিম, গরিবুল্লা, সৈজুদ্দিন, কামাল, ভুবন, মুরশিদ সকলের উদ্দেশ্যে বলেন—‘ভয় পাবি ক্যান? সাঁইজি বুলতেন—আমরা হলাম মানুষের বাচ্চা! আমি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম—আমি কেডা, বুলেছিলেন তুই তো মানুষের সৃষ্টি, তুই খোদাতালার সৃষ্টি মানুষ, মানুষের বাচ্চা মানুষ। আমি বুললাম, আমার ধম্ম—তা বুললেন, ধম্ম মনুষ্যত্ব। তাই তো বলি, ভয় পাবি কেন? মানুষের বাচ্চা কখনো ভয় পায়? অন্যায় কি অত্যেচার করপিও না সইপিও না। শোননি হজরৎ মহম্মদের কতা? কেরেশদের অত্যাচারে তিনি তো মাতা খাঁড়া কইরে লড়াই করেছেন। শুনিছিতো শ্রীচৈতন্যের কতা—কাজী কত অত্যাচারই না করেছিল তার উপর; কিছু কি করতি পারলা? কি শিক্ষাই না তাক দিয়েছিল ঐ মাটির মানুষ।’ মাটির মানুষেরাও লড়তে জানেন মনুষ্যত্বের লড়াই। লালনপন্থীদের কাছে এটাই প্রেরণা। মাঝখানে থাকার দিন শেষ হয়েছে তাঁদের।