কবি ও পাঠকের যৌথশিল্প কবিতা

মাসুদুজ্জামান

আমাদের দেশে পাঠক নাই, ভাবের প্রতি আন্তরিক আস্থা নাই, যাহা চলিয়া আসিতেছে তাহাই চলিয়া যাইতেছে, কোনো কিছুতে কাহারও বাস্তবিক বেদনাবোধ নাই; এরূপ স্থলে লেখকদের অনেক কথাই অরণ্যে ক্রন্দন হইবে এবং অনেক সময়েই আদরের অপেক্ষা অপমান বেশি মিলিবে। (বাংলা লেখক)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিতা যারা ভালোবাসেন, শব্দটি মাথায় এলেই সমস্ত ইন্দ্রিয় তীক্ষ্ম হয়ে ওঠে; স্নায়ুসংবেদে মনে হয় প্রবেশ করছি অন্য কোনো লোকে, লোকান্তরে। কবিতা পড়াতেও জাগে সুখদ অনুভূতি। কিন্তু কখন কবিতা পড়তে হবে? জোৎস্নাপ্লাবিত মধ্যরাতে? নাকি গনগনে কোনো দুপুরে? নদীর ধারে বসে, নাকি বন্ধুর একচিলতে নাগরিক আবাসনে দু’জনে গড়াগড়ি খেয়ে? যেখানেই হোক, যখনই হোক, কবিতা যারা ভালোবাসেন, কবিতা তাদের গ্রাস করে, বিমুগ্ধ আচ্ছন্নতায় তারা কবিতা পড়ে অকারণ পুলকে কাটিয়ে দিতে পারেন অনেক অনিঃশেষ মুহূর্ত।
ভালো কবিতা এভাবেই ঢুকে যায় পাঠকের মর্মে, ঠাঁই করে নেয় হৃদয়ের গভীরে। কবিতার প্রতি এই যে আকর্ষণ কীভাবে তাকে ব্যাখ্যা করবো আমরা? মনোবিদরা নানাভাবে এর ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু বিশেষ বিশেষ কবিতার প্রতি কোন পাঠক কেন পাঠক আকৃষ্ট হয়, তার ঠিক ঠিক কারণ আজও আবিষ্কার করা যায়নি। মানুষের হৃদয় এতটাই ব্যক্তিক, এতটাই একান্ত, এতটাই গভীর। তবে এ প্রসঙ্গে ফরাসি দার্শনিক মেলব্রাঁশের এই উক্তিটি বোধ হয় যথার্থ মনে হতে পারে, “আত্মার স্বাভাবিক প্রার্থনা হচ্ছে সুন্দরের প্রতি ধাবিত হওয়া।” এই অমোঘ বচনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন আরেক ফরাসি দার্শনিক সিমোঁ ভেল, যিনি ছিলেন গীতার প্রতি অনুরক্ত; আকৃষ্ট হয়েছিলেন রুমানীয়-জার্মান কবি পল সেলান। ভাল্টার বেঞ্জামিন কাফকা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে সেলানের এই আকর্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। সেলান বলেছিলেন :
একটি কবিতা, ভাষার দ্বারা নির্মিত, ফলে অনিবার্যভাবে তা সংলাপ, হতে পারে বোতলে-পোরা তথ্যরাশি, তবে খুলে দেয়া হয় এর বহির্মুখ Ñ হয়তো আশাব্যঞ্জকভাবে দেয়া যায় না Ñ কবির বিশ্বাস কখনও হয়তো তা ধুয়ে দিতে পারে মৃত্তিকা, ধুয়ে দিতে পারে সম্ভবত আমাদের হৃদয়ভূমি। এই অর্থে কবিতা কিছু না কিছু ঘটিয়ে চলেছে : নির্মাণ করছে একটা কিছু।
কল্পনা করুন কোনো এক সমুদ্রের বেলাভূমি ধরে আপনি হেঁটে চলেছেন, আপনার পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে আবর্জনার ¯তূপ, মৃত মাছের আঁশ, সৌখিন টুরিস্টদের ফেলে যাওয়া টিনের কৌটা, এইসব। এরকম দৃশ্যপটেই কী লেখা হয়নি উৎপলকুমার বসুর ‘পুরী সিরিজ’ কবিতাটি?
এখন আকাশ নীল। অর্জুন গাছের মতো সমুদ্রছায়ায়
বসে আছি। বহু সিগারেট টিন নিয়ে উড়োপাতা, বালি
ছেঁড়া খবরকাগজ সমেত তোমাদের হৃদয়বত্তা নেড়ে
লাখো লাখো গুণ্ঠনমিছিল এই নীল ঢেউ।....
এখন তোমার মুখ চামচের মতন উজ্জ্বল
তোমার বিনষ্ট মুখে রুধিরের বিসম্বাদী ডৌল
টলায় নাবিক, পণ্য, কফি, নুন, কস্তুরী, গন্ধক,
নাকছাবিটির হীরা - এত বস্তুগত সবই!
এই উড়োপাতা, বালি, কফি, নুন, গন্ধক এরই মাঝে অনেকটা আকস্মিকভাবে আপনার হয়তো চোখে পড়তে পারে একটা বোতল, যার গায়ে লেগে আছে অতীতের চিহ্ন। কী ভেবে আপনি হয়তো সেই বোতলটাকে বাড়ি নিয়ে এলেন, তারপরই বিস্ময়। বোতলের মধ্যে কাগজের একটা চিরকুট - একটা চিঠি - তাতে কী-সব যেন লেখা। এই চিঠি খুবই আকস্মিক ও বিব্রতকর, হয়তো অনেক দিন আগে কেউ একে বোতলের মধ্যে পুরে সমুদ্রগর্ভে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল; কিন্তু এখন ঘটনাচক্রে এসে পড়েছে আপনারই হাতে। রুশ কবি ওসিপ ম্যান্দেলস্তাম যখন স্তালিনের বন্দিশিবিরে ধুকছেন, তখন তার এরকম একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ‘প্রাপকের প্রতি’ কবিতায় তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, “একদিন যেসব বন্ধু খুব স্বাভাবিকভাবেই তার অন্তরঙ্গ ছিল, ঘনিষ্ঠ ছিল, কেন কবি তাদের কথা স্মরণে আনছেন না?” ওই বন্ধুরা সাধারণ মানুষের ভীড়ে মিশে যাওয়া আর দশজন মানুষ নন, তারা তার ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু, নিশ্চয়ই বেঁচে আছেন তারা, বেঁচে থাকবেন; তাদের উদ্দেশেই তার যতো কথা। ম্যান্দেলস্তাম লিখছেন :
কোনো এক কঠিন মুহূর্তে কোনো এক নাবিক হয়তো মুখ আটকানো বোতলের মধ্যে কাগজে তার নাম ও জীবনের পরিণামের কথা লিখে সমুদ্রের ঢেউয়ে ছুড়ে মেরেছে। তারপর অনেক বছর পর একদিন সমুদ্রের বেলাভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে সেটা এসে পড়লো আমার হাতে। পড়লাম, কী লেখা ছিল তাতে -এমন কোন বার্তা, লক্ষ করলাম কোন তারিখে এটা লেখা হয়েছে, পড়লাম অনেক দিন আগে যার জীবন গত হয়েছে, তার জীবনের অন্তিম ইচ্ছার কথা আর স্বীকারোক্তি। এটা পড়ার অধিকার আমার আছে। অজানা কারুর চিঠি আমি খুলে পড়িনি। এই চিঠি আর বার্তা পাঠানো হয়েছে বোতলে পুরে প্রাপকের কাছে; আর আমিই সেই গোপন প্রাপক যার কাছে পাঠানো হয়েছে এটি।
আমরা যারা কবিতা পড়ি তারা সাহিত্যের এরকম এক-একজন গোপন প্রাপক। মধ্যরাত, কবিতা পড়ছি, কিন্তু মনে হচ্ছে কে যেন হঠাৎ আমার নাম ধরে ডাকছে। উঠে পড়ি, তারপর বইয়ের তাক থেকে টেনে নামিয়ে এনে পড়ি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই কবিতা : “দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া / কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া / ‘অবনী বাড়ি আছো?’” এও যেন সেই বোতলে-পোরা বাণী Ñ কবিতা। আজ রাতে আমিই এর প্রাপক, আমিই এর পাঠক, আমিই হয়তো সেই অবনী, আমার হৃদয়ভূমি কবিতাসিঞ্চনে যেন ধুয়ে যাচ্ছে।
আমি কী সত্যি সত্যিই পাঠক? কবিতার পাঠক? সন্দেহ নেই। কিন্তু কী ধরনের পাঠক আমি? কবিতাকে তো পাঠকতীর্থেই পাঠাতে চান কবি। ওয়ালেস স্টিভেন্স পাঠককেই উল্লেখ করেছিলেন ‘স্কলার’ বা প-িত বলে। কবিতা লেখা যেমন সৃজনশীল কাজ, কবিতা-পড়াও তেমনি; শব্দের সিঁড়ি ভেঙে-ভেঙে অভিযান, পুনরাবৃত্তি, অনিঃশেষ সূচনা, অজানা পুলকে পুনর্জন্ম লাভ। “সূচনা শুধু সক্রিয়তা নয়, সূচনা হচ্ছে মনের একধরনের বিশেষ কাঠামো, একধরনের কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি আর সচেতনতা”, বলেছিলেন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যকে অগ্রাহ্য করে তৃতীয় বিশ্বের নতুন জ্ঞানতত্ত্ব প্রাচ্যবাদের প্রবক্তা ভাবুক এডওয়ার্ড সাঈদ তার সূচনা : অভিপ্রায় ও প্রক্রিয়া (১৯৭৫) শীর্ষক গ্রন্থে। মনের এই বিশেষ কাঠামোকেই তো পাঠক হিশেবে আমি পছন্দ করি, খেলার কাজ ও কাজের খেলা, সচেতনতার বিশেষ রূপ-রূপান্তর, স্বপ্নলোকে পৌঁছে যাওয়া - কবিতার মধ্য দিয়েই তো পাঠক এসব অর্জন করেন।
পাঠ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সেই প্রস্থান, সেই উদ্বোধন, অথবা বোধন। ওয়াল্ট হুইটম্যানের ঘাসের পত্রালি শীর্ষক কবিতার বইটি খুলে পড়–ন, আপনার চোখে পড়বে পাথরে খোদিত সেই ‘অভিলিখন’, ছাব্বিশটি কবিতায় যা ছড়িয়ে আছে, যে-কবিতাগুলো লিখে শেষ করতে প্রায় তিরিশ বছর সময় লেগে গিয়েছিল তার। একটিমাত্র বই, কিন্তু বিশেষভাবে উেেল্লখযোগ্য, প্রায় সারাজীবন ধরে লিখেছেন তিনি, “সূচনাতেই আমার পাঠ প্রথম পদক্ষেপ কত যে আনন্দের, / সেই সচেতনতা, সেই রূপকাঠামো, গতির শক্তি।” সূচনার সম্মোহন, সচেতনতা, রূপকাঠামো - সমস্ত ইন্দ্রিয়ের যেন ক্ষমতায়ন ঘটলো, করতলেই যেন উদিত হলো সমগ্র বিশ্ব। জেগে-ওঠা মানসচৈতন্য পৌঁছে দিল ভালোবাসার শক্তির শীর্ষে। পৃষ্ঠার পর পর উল্টে গেলে সূচনার সে কী গভীর অনুভব, পাঠক হিশেবে হুইটম্যান সূচনার আনন্দ অবগাহনেই পাঠককে বিমুগ্ধ করে রেখেছেন।
কবিতা আসলে সেই অভিলিখন যা আমাদের পৌঁছে দেয় অনুভূতির চূড়ায়। আমাদের তাই ভুলে যাওয়া উচিত নয় কবিতার হার্দ্র স্পর্শ, খুলে দেয়া দিগন্তের ইশারা। দুই পঙ্ক্তির আরেকটি অভিলিখন বা কবিতা, হুইটম্যান যেটি লিখেছিলেন ১৮৬০ সালে, তাতে পাঠককে শুধু ‘তোমার প্রতি’ বলে উল্লেখ করে মাত্র দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন :
অচেনা আগন্তুক, তুমি যদি যেতে-যেতে আমার সঙ্গে দেখা করো আর কথা বলার অভিলাষ রাখো,
কেন তাহলে কথা বলবে না?
আর কেনই বা আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো না?
আগন্তুক কী এখানে একজন, নাকি দু’জন? পথ চলতে-চলতে তারা কথা বলছেন আর নিজেদের মধ্যে রচনা করছেন যোগাযোগের সেতুবন্ধ। পাঠক তো এরকমই এক-একজন আগন্তুক, কবির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হলেই বন্ধু হয়ে যেতে পারেন। হুইটম্যান এভাবেই তো নেমে এলেন পাঠকের স্তরে, অবস্থানের কোনো উচ্চাবচ্চ নাই, শ্রেণীভেদ নাই, উভয়ের অবস্থান একই তলে। কী সহজেই না কবিতাকে লক্ষ করে সবকিছু বলছেন, কিন্তু চারপাশের মানুষজন যাদের তিনি আগে থেকেই জানেন তাদেরকে লক্ষ করে কিছু বলছেন না; বলছেন আগন্তুককে - তার কবিতার ভবিষ্যতের পাঠককে, আমাকে, আপনাকে; বলছেন পরম মমতায় হৃদয়ের ভাষায়। পরের কবিতা, যেটি তিনি লিখেছিলেন এর প্রায় একুশ বছর পর, সেখানেও লিখেছেন, “পাঠকের জীবন ও গৌরব আর প্রেম আমারই মতো, / তারই জন্যে এই স্তবগাথা।” পাঠককে উদ্দেশ্য করে সব সময় কথা বলেছেন হুইটম্যান, ভেবেছেন তারই সমস্তরে পাঠকের অবস্থান; কবির মতোই তার জীবন, কবির মতোই তার সংবেদ। বন্ধুতার এ এক নতুন আবাহন, পাঠককে কাছে টেনে নিচ্ছেন কবি, বারবার নিজের কবিতা আগন্তুক, পাঠক আর অনাগত কবিকে উৎসর্গ করছেন; তাদের উদ্দেশেই হুইটম্যানের যত স্তব।
হুইটম্যান অবশ্য এভাবে কবির স্তরে নামিয়ে আনলেও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পাঠকের প্রতি তেমন আস্থা ছিল না। কবির যতো সমস্যা পাঠককে নিয়েই :
কবি-পাঠকের সম্বন্ধই সাহিত্যের সনাতন সমস্যা। কাব্যবিবেচনার জন্মদিন থেকে প্রত্যেক সমালোচক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যে-প্রশ্নের জবাব দিতে চেয়েছে তা এই : লেখক অধোগতির ধাপে নেমে পাঠকের পাশে দাঁড়াবে, না পাঠক সিঁড়ি বেয়ে লেখকের স্তরে উঠবে?
শুরুতেই তাই সংরাগ, সংযোগ - কবি ও পাঠকের। কবিতা বোতলে-পোরা বাণী, লিরিক কবিতা, ফলে বিশেষ ধরনের সংযোগ স্থাপন করে চলে। নৈঃসঙ্গ্য থেকে নৈঃসঙ্গ্যে কবির অভিযাত্রা। এই কবিতার শুরুতে নিস্তব্ধতা শেষেও তাই। পথের ধারে দাঁড়িয়ে সংলাপ চালাচালি নয়, যেমনটা করতে পেরেছিলেন হুইটম্যান। লিরিকের মধ্য দিয়ে কিছু একটা যেন লেখা হয়, পঠিত হয়। ভাষার গুরুত্ব এতে অপরিসীম, সহজেই যা সময়কে অতিক্রম করে যায়, শতবর্ষ পেরিয়েও যা অমলিন।
কবিতা পড়া একধরনের বিনিময়। লিরিকের একটা প্রধান কাজ হলো পাঠকের সঙ্গে কবির পারস্পরিক যথার্থ সম্পর্ক ও সখ্য তৈরি করা। লেখক ও পাঠকের মধ্যে এই সম্পর্ক স্থাপিত হয় রচনা বা টেক্সট, অর্থাৎ শব্দশরীর দিয়ে। লিরিক ঘনসংবদ্ধ কবিতা, তুঙ্গস্পর্শী আবেগের স্বরায়নে গভীর। কবিতা-আগন্তুকের সঙ্গে এটি মুহূর্তের মধ্যে স্থাপন করে সংযোগ; ফলে একে অব্যবহিত, অতলান্তিক, অনিশ্চিত ডিসকোর্স বা বয়ান বলে ব্যাখ্যা করা যায় নিঃসন্দেহে। কবিতাপাঠ তাই ভাষার মাধ্যমে একধরনের গভীর সংযোগসেতু রচনা করা। এর ভাষাপুঞ্জই আমাদের পৌঁছে দেয় অন্তরঙ্গ ও আভ্যন্তর, একাকীত্ব ও অংশগ্রহণের অনির্বচনীয় জগতে।
কবিতা তাই স্বর ও সম্মোহন, আহ্বান ও আবাহন; লিরিক বা গীতিকবিতার অবস্থানও বচন ও সংগীতের মাঝামাঝি স্থানে। কবিতার ভাষা মুখের ভাষাকে ধারণ করে একে অতিক্রম করে যায়। মহৎ কবিরা প্রতিদিনের বাচনিক রীতিকে গ্রহণ করে কীভাবে একে দীর্ঘজীবী করা যায়, সেই সাধনাকেই সিদ্ধি বলে মেনেছেন। মানবিক ইতিহাসে কবিতা মৌখিক শিল্প হিশেবেই গণ্য হয়েছে। ফলে কবিতার ভাষা বাচনিক রীতিকে কখনই পরিত্যাগ করতে পারেনি, গভীরভাবে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে ধারণ করেছে। তবে লেখা কিন্তু বচন নয়, বচননির্ভর নির্মাণ অথবা জাক দেরিদার ভাষায় অবিনির্মাণ। এই লেখার আছে নক্শা, চিত্ররূপময়তা, চিত্রকল্প আর চিহ্নের পর চিহ্নের বিস্তার। প্রথম দিকের একটা কবিতা সম্পর্কে ইয়েট্স বলেছিলেন, “মুখের ভাষা দিয়ে আমি একে নির্মাণ করেছি।” শুধু ইয়েট্স নন, সব কবিই এমনটা করে থাকেন। পাঠকের কাছেও এর নির্মাণরহস্য অজানা থাকে নাই, পাঠকও তাই মুখের ভাষার ছাঁচে ফেলে কবিতাকে নির্মাণ-পুনর্নিমাণ করে চলেন। কোনো কবিতাকে আমি যখন আবৃত্তি করি তখন তার শব্দ ও স্বরায়নের ভেতরেই ঢুকে পড়ি; যেন কবিতা কোনো রহস্যঘেরা ধূসর স্বপ্নপুরি - যার স্তরে স্তরে ছড়িয়ে আছে নানা সুরমূর্চ্ছনা, স্বর ও রোমাঞ্চের নানা উপকরণ। কবিতার গা থেকে এর শব্দকে ছাড়িয়ে এনে মুখের মধ্যে পুরে দেই, মিশিয়ে দেই শরীরের সঙ্গে। আমিই তখন এর কথক, এর মৌখিক-বাচনিক সুর আমার মুখ ও শরীরের শিরা-উপশিরায় বেজে ওঠে। মনে হয় কবিতা বুঝি কোনো বাদ্যযন্ত্র আর আমি তার বাদক। সমস্ত প্রক্রিয়াটাই হয়ে ওঠে সাঙ্গীতিক-শারীরিক; শব্দ ও শরীরের সংযোগে সংবেদী। কবিতা চায় ভাষার সূত্র ধরে অংশগ্রহণ - কবির সঙ্গে পাঠকের অংশগ্রহণ, পরস্পরকে জানার সেতু হয়ে ওঠে কবিতা।
বাইবেলীয় একটি উক্তি এখানে স্মরণ করতে পারি : “শুরুতেই ছিল শব্দ।” কোনো কোনো কবি একে শিরোধার্য মনে করেছেন, কিন্তু বিশশতকের অস্ট্রীয় দার্শনিক মার্টিন বুবের ভাষায়, “আমার মনে হয় শুরুতে থাকে সম্পর্ক।” এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই আসে শব্দ, মানুষই নির্মাণ করে একে। গীতিকবিতার হয়তো একটা ঐশ্বরিক ঐন্দ্রজালিক সম্মোহন আছে, কিন্তু একে কোনো-না-কোনো ভাবে মানুষের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া ঘটাতে হয়। এই সম্পর্ক স্থাপিত হয় কবি, কবিতা ও পাঠকের মধ্যে; আমি ও তুমির মধ্যে। কবিতার সমস্ত প্রক্রিয়াটাই সম্বন্ধসূচক।
কিন্তু কী আদানপ্রদান করেন কবি ও পাঠক? আধুনিক লিরিক কবিতার স্বভাবধর্ম হচ্ছে সম্মোহিত করা। ফলে এই ধরনের সম্মোহিত কবিতা সহজেই অতিক্রম করে যায় সময় ও সীমানা। মার্কিন কবি জন বেরিম্যান তাই বলতে পেরেছেন কবিতা বোঝার জন্যে নয়, অর্থাৎ কবিতা তেমন কোনো অর্থ দেয় না, বরং পাঠককে মুগ্ধ ও সন্ত্রস্ত করে রাখে। কবিতার শুরু থেকেই পাঠক উপলব্ধি করতে শুরু করে কবির সঙ্গে ক্রমশ তৈরি হচ্ছে সখ্য, একসময় যা একেবারেই ঘুঁচে যায়। অচেনা অজানা পাঠকের সঙ্গে লিরিক কবিতার পাঠকের তাই সহজেই তৈরি হয়ে যায় অনুভবের সেতু। এই কবিতা ভাষাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে; ধারণ করতে পারে কবির যা-খুশি-বলার ইচ্ছে। কবির হাতেই শব্দ আকার পায়, কবিতা তার নিজের স্বভাবধর্ম হিশেবে নির্মিত হতে থাকে। প্রখ্যাত মার্কিন কবি রবার্ট গ্রেভ্স একেই চিহ্নিত করেছেন শ্বেতকায় ঈশ্বর বলে, তিনি লিখেছেন :
সত্যিকার কবিতাচর্চা চমকপ্রদ গ্রন্থনার মধ্য দিয়ে প্রজ্জ্বলিত করে শব্দকে আকার দিতে পারে। পরম্পরিত হয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে এগিয়ে যেতে যেতে ক্রমশ শব্দগুলো হয়ে ওঠে অস্তিত্ববান - কবিতা আত্মসংরক্ষিত যাদুমন্ত্রের মতো নিজের মতো করেই এগোয় (কবির মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও)।
কবিতা এরকমই এক স্বয়ংচালিত সত্তা, সম্মোহন ও শক্তি। কবি ও পাঠক অনুভব ও বোধের প্রায় একই সমতলে থেকে এই সৃজনীবিস্ময় ও সৃজনী প্রতিক্রিয়াকে অস্তিত্ববান সত্তা হিশেবে দেখে। পাঠকের ভূমিকা এক্ষেত্রে আরও একটু বেশি, পাঠকই কবিতাকে সম্পূর্ণ করে - নিজের অভিজ্ঞতার পথরেখা ধরে। পাঠক যখন কবিতা পড়ে - সত্যিকার অর্থেই কবিতা পড়ে - কবিতার সঙ্গে তার মন চালাচালি হতে থাকে, অনুভবের নিবিড়তা জাগে, কেউ কেউ কবিতার সংক্রমণে বদলেও যায়। ভালো কবিতা পাঠের মুহূর্তে বা অব্যবহিত পরে পাঠকের মধ্যে প্রতিক্রিয়া জাগবেই; কখনও কখনও শব্দ ও ছন্দোবন্ধের এই অনুকম্পন ছড়িয়ে পড়ে মন থেকে শরীরে, শরীর থেকে মস্তিষ্কে, অথবা পুরো বিষয়টিই পরস্পরের মধ্যে জড়াজড়ি করে মথিত হয়ে পাঠককে পৌঁছে দেয় তুড়ীয় কোনো লোকে। রিলকে এরকম অবস্থাকে বর্ণনা করেছিলেন এইভাবে, “এমন কোনো স্থান নেই যেখান থেকে তোমাকে দেখা যায় না।” কবিতার প্রভাবে, সত্যিকারের পাঠক হলে “তোমার জীবনকে তুমি বদলে ফেলবে।”
কবিতা, বিশেষ করে লিরিক কবিতা এভাবেই মানুষের সত্তার সঙ্গে মিশে যায়, মানবীয় সংবেদনার অংশ হয়ে ওঠায় তার সংক্রমণ থেকে পাঠক রেহাই পায় না। মালতে লরিড ব্রিজের নোটবুক শীর্ষক একমাত্র উপন্যাসের একটি পরিচ্ছেদে রিলকে লিখেছেন, “কবিতা, মানুষ যে রকম ভাবে, শুধু আবেগের উৎসারণ নয় (যে কোনো মানুষেরই যথেষ্ট আবেগ থাকতে পারে), কবিতা হচ্ছে অভিজ্ঞতা।” পাঠক হিশেবে আমারও মনে হয় কবিতা হচ্ছে অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞান; কবিতা থেকে একজন পাঠক এই যে অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞানের মধ্য দিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করতে শেখে, তার কোনো দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নেই, প্রতিরূপ নেই; দ্বিতীয় দৃষ্টান্তের অবকাশও কখনও হয় না। প্রত্যেকটি উৎকৃষ্ট লিরিক কবিতা সেদিক থেকে অনন্য, অসাধারণ। জীবন অথবা জীবনের খ-াংশ কবিতায় ঘনিয়ে ওঠে, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি পায় আকার - শব্দের মধ্য দিয়ে কবিতা হয়ে ওঠে শরীরী - যেন সেই বোতলে-পোরা বাণী; কবির হাতেই বিন্যস্ত হয়ে পাঠককে সম্মোহিত করতে শুরু করে। এ যেন এমন এক সত্তা যার সৃষ্টি আমার হাতে, কবির হাতে। হিস্পানি কবি হুয়ান র‌্যামোন হিমেনেথ, আমৃত্যু যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পরম অনুরাগী, ‘শিকড় ও পাখা’ নামের একটি কবিতায় শিকড় ও পাখার ভূমিকাকে উল্টে-পাল্টে ইন্দ্রিয় বিপর্যাস ঘটিয়ে মানুষকে পরমলোকের সন্ধান দিতে চেয়েছিলেন : “এসো ডানা পেয়ে যাক শিকড় আর শিকড় উড়–ক আকাশে।”
এই জগৎ সংসারেই এমন অনেক মানুষ আছে যারা কবিতার দ্বারা তাড়িত নয় বলে জাহির করে আনন্দ পেয়ে থাকেন। বলা বাহুল্য তারা জীবনের একধরনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা থেকে সবসময়েই বঞ্চিত থেকে যাবে। এমন মানুষেরও অবশ্য অভাব নেই যারা কবিতার দ্বারা শিহরিত হতে ভালোবাসেন। কবিতাকে তারা বারবার তাদের ভাবনায় আবাহন করেন। কবিতাকে তারা যাঞ্ছা করেন কর্মে, শয়নে, স্বপ্নে, বিস্মরণে। কবিতা তাদের কাছে যেন রূপান্তরিত এক ভাবনা বিশেষ; যারা শব্দের দ্বারা নির্মিত শিকড়ের বাস্তবতা ও ডানাকে স্বীকার করে নিয়েছেন, তারা এও চান যে ডানা শিকড়িত হয়ে যাক, মৃত্তিকার মধ্যে প্রোথিক হোক সেই ডানা আর শিকড় উড়–ক আকাশে, পাঠককে নিয়ে যাক সেই তুড়ীয় লোকে। কবিতা এভাবেই প্রতীকী অর্থে জীবনের উত্থান ও পতনকে ধারণ করুক। এই অভিজ্ঞতা খুবই গভীর, অতলস্পর্শী। এভাবে যারা অভিজ্ঞতার সমস্ত প্রান্তকে ধরতে পারেন, অনুভবের গভীরে ডুবে যেতে পারেন, তারাই তো কবি।
কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতা তাই একেবারেই ভিন্ন; কবিতা পড়লে ঠাণ্ডা হিম হয়ে যেতে পারে স্নায়ু কিংবা মাথা হয়ে যেতে পারে শূন্য, নিরাবলম্ব। এমিলি ডিকিনসনই এরকম একটা কথা বলেছিলেন কবিতা প্রসঙ্গে :
কখনও কোনো বই পড়তে পড়তে যদি আমার শরীর হিম হয়ে আসে; বুঝতে পারি আমি কবিতার বই পড়ছি। যদি শারীরিকভাবে অনুভব করি আমার মাথা শূন্য শূন্য লাগছে, বুঝতে পারি আমি কবিতা পড়ছি। কবিতা পড়লে আমার এরকমই লাগে। অন্য কিছু হয় কিনা জানি না।
কবিতা, ডিকিনসন যে-রকমটা অনুভব করেছেন, শরীরী সংবেদনা সৃষ্টি করতে পারে। কবিতার অন্য কোনো গুণের কথা তিনি উল্লেখ করেননি। কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই মূল কথা; এই সংযোগ শরীরেও ছড়িয়ে যেতে পারে। একমাত্র ভালো কবিতারই এই শক্তি থাকে। কবিতাপাঠের ক্ষুধা ডিকিনসনের ছিল অপরিসীম। মনের তীব্র টানে, সত্তার গভীর আকর্ষণে তিনি কবিতা পড়তেন। কবিতাই মেটাতো তার মনের সব চাহিদা। নিঃসঙ্গ থাকতেই ভালোবাসতেন তিনি আর পড়তেন কবিতার পর কবিতা, কবিদের সঙ্গেই তিনি অনুভব করতেন মানসিক সখ্য। ডিকিনসনের জীবনীকার রিচার্ড সেওয়াল এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “কবি হিশেবে তিনি কবিসংঘের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করতেন। অন্য কবিদের কবিতা পড়তেন তাদের সঙ্গ পাওয়া বা সঙ্গ দেয়ার জন্যে।” ডিকিনসন বলতেন, “কবিরা হচ্ছেন সময়ের আর আত্মার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতম বন্ধু।” কবিতাই তাকে দিয়েছে অনন্তের ইশারা, অসীম গহনলোকের সন্ধান। কবিতাকে তিনি অনুভব করেছিলেন তার সমস্ত সত্তা দিয়ে। কবিতা প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে গিয়ে একবার তাই তিনি একে “আত্মার সংস্কৃতি” বলে চিহ্নিত করেছিলেন। কবিতা আসলে আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, নৈঃসঙ্গ্য যখন আমাদের ওপর চেপে বসে, কঠিনতম আঘাত যখন বেদনার অতলে ডুবিয়ে দেয়, কিংবা বিশেষ কোনো আনন্দের মুহূর্তে জীবনকে যখন মনে হয় রৌদ্রস্নাত, তখনই কবিতার কথা মনে পড়তে পারে। কবিতা এভাবেই আমি আত্মার সংস্কৃতি হিশেবে পড়ি বা লিখতে চেষ্টা করি।
নিঃসঙ্গদের সঙ্ঘ হচ্ছে কবিসঙ্ঘ, ডিকিনসন এরকমই ভাবতেন। বাস্তবতাও অনেকটা এরকমই, কবি বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ থেকে বিশেষ কোনো মুহূর্তে কবিতা রচনা করেন। পাঠক Ñ-যিনি কবিতা পড়েন, তিনিও কবিতা পড়ার মুহূর্তে নিঃসঙ্গ থেকেই কবিতা পড়েন। কবিতাপাঠের মধ্য দিয়ে দ্ইু নিঃসঙ্গ মানুষ - কবি ও পাঠকের নিবিড় ও গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কবিতার মধ্যে পাঠক হিশেবে আমি যা পাই তাতে আমার বোধ ও সত্তা দারুণভাবে ঝাকুনি খায়, কবিতা আবার ব্যক্তিমানুষ হিশেবে আমাকেই আবিষ্কার-পুনরাবিষ্কা করে চলেছে। কবিতায় কী উপস্থাপিত হয়েছে শুধু তা-ই নয়, কবিতা আমাকে কীভাবে দেখে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমার গোপন পৃথিবী, আমার অন্তর্গত সত্তা, একান্ত ব্যক্তিক অনুভব, এসবই কবিতায় সক্রিয় থাকে। শব্দ ছাড়া অন্য কোনোভাবে আমি আমার সেই জগতে প্রবেশ করতে পারি না। শব্দ আমাকে আলোড়িত করে আর ছন্দোস্পন্দ আমাকে নিয়ে যায় অন্য কোনো সময়ে কিংবা সময়ের বাইরে। ছন্দ তাই সম্মোহন আর অনুপ্রাস আমাকে বিমুগ্ধ করে। কবিতায় চিন্তার আগে আগে চলে শব্দ। স্বপ্নকল্পনা, ভাবনা, চিন্তার ইশারা শব্দ ও চিত্রকল্পের মধ্য দিয়েই গতি পায়।
ব্যক্তির নিজের অভ্যন্তরে বা পাঠকের নিজের ভেতরে প্রবেশের গোপন দরোজা হচ্ছে কবিতা। কবিতাই আমাদের ডুবিয়ে দিতে পারে গভীর থেকে গভীরতর বোধে; কবিতা এই বোধেরই শিল্প। এক-একজন পাঠকের ভেতরেই যে রয়েছে অন্য এক পাঠক, এই জগতের মধ্যেই আরেক জগৎ, কবিতা সেই জগতকে আমাদের কাছে উন্মোচন করে দেয়। জীবনানন্দের কবিতা পড়–ন বা নেরুদার, হোলুবের কবিতার পড়–ন কিংবা হিনির, এই ‘অন্য’ জগতেরই সন্ধান মেলে তাদের রচনায়। পল এলুয়ার তাই বলেছিলেন, “আমাদের চোখের দেখার পৃথিবীর বাইরেও আরেক পৃথিবী আছে, আর সে হলো এই - কবিতার পৃথিবী।” কবিতা আমাকে স্পন্দিত করুক, ঝাকুনি দিক, জাগিয়ে তুলুক, আত্মসচেতন করুক, উন্মুক্ত করে দিক নতুন কোনো পৃথিবী - শব্দের মাধ্যমে, নতুনভাবে, পাঠক হিশেবে সেটাই তো আমি চাই। শিল্পতো এভাবেই অস্তিত্বের সমার্থক হয়ে ওঠে, হয়তো বা আত্মজাগৃতির অথবা বেঁচে থাকার। কবিতার তাই পাঠক চাই যে তাকে ধারণ করবে, আবার কবিতাও ধারণ করবে পাঠককে; এর উপরই নির্ভর করে কবিতার শক্তি।
নারীবাদী আন্দোলনের তুঙ্গতম মুহূর্তে নারীর প্রতি নারীর আকর্ষণের সূত্র ধরে পাশ্চাত্যের পাঠকেরা আবিষ্কার করেছিলেন স্যাফোর কবিতা। এথেন্সের একটা যাদুঘরে সংরক্ষিত একটি প্রাচীন পাত্রের গায়ে উৎকীর্ণ আছে তার কবিতার একটি পঙ্ক্তি : “মৃদুমন্দ সামান্য বাতাস, এই শব্দরাজি, কিন্তু কী-যে শ্রবণসুখদ।” কবিতায় ঊর্ধ্বায়ন এভাবেই শব্দ আর ধ্বনির সংযোগে তৈরি হয়, পাথরের পাত্রে যেভাবে খোদাই করে রাখা হয়েছে স্যাফোর কবিতা। কবিতা এভাবেই চিরজীবী হয়ে যায়। ধ্বনির প্রতি আকর্ষণ থেকেই মানুষ প্রথম অন্য কোনো সাহিত্য নির্মাণ না করে আদিম যুগে কবিতা রচনাতেই অগ্রসর হয়েছিল। ওয়ালেস স্টিভেন্স হয়তো একারণেই বলেছিলেন, “শব্দকে আপনার সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ভালোবাসতে হবে; সেই সঙ্গে কবিতার কথিত সূক্ষ্ম বিষয়বস্তু, চিত্রকল্প ও ধ্বনিস্পন্দের প্রতিও সাড়া দেয়া চাই।” স্টিভেন্স কবিতার প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই বলেছেন এর শব্দকে ভালোবাসার কথা, কেননা কবিতায় যা কিছু ঘটে তা শব্দের মাধ্যমেই ঘটে। প্রথম আধুনিক বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তও এই বিষয়টি বুঝেছিলেন বলেই কবি শব্দের সঙ্গে শব্দের বিয়ে দেন বলে মনে করেছিলেন।
কবিতাপাঠের সময়, আমার যেমন মনে হয়, তেমনি অন্য পাঠকেরও এই অনুভব নিশ্চয়ই জাগে যে বদ্ধাক্ষর ও মুক্তাক্ষরের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে কবিতার শব্দগুলো প্রাণময় হয়ে ওঠে; উচ্চারণের মুহূর্তে যা মুখের মধ্যে স্পন্দিত, অনুরণিত হতে থাকে। এই অক্ষরের সমন্বয়েই সৃষ্টি হয় শব্দ, শব্দ থেকে আবার সৃষ্টি হয় শব্দবন্ধ ও বাক্যের। কবি এই শব্দবন্ধ ও বাক্যের মাধ্যমেই কবিতার পঙ্ক্তিকে ছন্দোস্পন্দে দুলিয়ে দেন। ছন্দোস্পন্দ এভাবেই কবিতার একটি বাক্য থেকে আরেকটি বাক্যে গড়িয়ে চলতে চলতে সৃষ্টি করে ছন্দের দোলা, সাংগীতিক মাধুর্য, যাদু, বিশেষ মুহূর্ত, কোনো কাঠামো, কোনো ভঙ্গি। কবিতার পৃষ্ঠা থেকে শব্দ উঠে আসে পাঠকের মুখে; কবিতার পৃষ্ঠা থেকে তা সঞ্চারিত হয়ে যায় পাঠকের শরীরে, সংবেদে। তবে শরীর থেকে সৃষ্টি হলেও শব্দ শরীরকেও ছাড়িয়ে যায়। ভাষা আসলে তার নিজের মতো করেই কাজ করে, সবশেষে তা যুক্ত হয় মনের সঙ্গে, পাঠকমনকে যা আবিষ্ট ও আচ্ছন্ন করে ফেলে।
স্যাফো তাই মনে করেছিলেন, “মৃদুমন্দ সামান্য বাতাস, এই শব্দরাজি, কিন্তু কী-যে শ্রবণসুখদ।” কবিতার মধ্যে শব্দ গেঁথে যায় আর নিজের মতো করেই যা বলার তা বলে ফেলে; জেরাল্ড ম্যানলি হপকিন্স এজন্যেই বলেছিলেন, “ওরা গড়িয়ে চলে, উঠে দাঁড়ায়, স্তবগীতি গায়, সৃজন করে।” হপকিন্সের তীব্র আকর্ষণ ছিল অনুপ্রাসের প্রতি, সেইসঙ্গে ছিল পরিমিতিবোধ। একাক্ষরবিশিষ্ট শব্দকে বারবার ব্যবহার করে কবিতায় তিনি ওই গড়িয়ে চলা ও উঠে দাঁড়াবার বৈশিষ্ট্য সঞ্চারিত করতে চেয়েছিলেন। হপকিন্সের এ-দুটি বৈশিষ্ট্যের দ্বারা পরবর্তীকালে প্রভাবিত হয়েছিলেন কবি অমিয় চক্রবর্তী। কবিতার ধ্বনিমাধুর্য যে কতটা মধুর হতে পারে, হপকিন্স ও অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা পড়লে তা বোঝা যায়।
কবি হচ্ছেন শব্দকর্মী আর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শব্দের উপর নির্ভরশীল হয়েও শব্দের অনুশাসনকে অতিক্রম করে গিয়ে তা অনুভবের ভিন্ন এক জগতে পাঠককে পৌঁছে দেয়। অর্থাৎ কবিতা যেভাবে লেখা হয় এবং কবিতা যা বলে, এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে যাওয়া নিরর্থক। ফলে কবিতা হচ্ছে শব্দ-অতিরেক এক শিল্প। ওসিপ মান্দেলস্তাম মনে করতেন কবিতাকে এরকম শিল্প হিশেবেই সিদ্ধি পেতে হবে। তার মতে কবিতার শব্দ যেন একধরনের যৌনঅভিযানে বের হয়; শব্দ দিয়ে শুরু হয় কবিতা আবার শব্দেই ঘটে এর সমাপ্তি। জর্মান কবি হেনরিখ হাইনে বলেছেন কবি ভাষাকে আকার দেন, ভাষা নির্মাণ করেন। ভাষাতাত্ত্বিক এডওয়ার্ড শাপিরও তার ভাষা শীর্ষক গ্রন্থে কবি সম্পর্কে এরকম ধারণা দেয়ারই চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “জার্মান কবিতা পড়লে যে-কারু মনে হতে পারে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ বোধ হয় জার্মান ভাষাতেই কথা বলেন। শেক্সপীয়রের রচনা পড়লে আবার মনে হতে পারে পৃথিবীর মানুষ বুঝি ইংরেজি ভাষায় কথা বলে।” কবিতার শক্তি মূলত এইখানেই, মাতৃভাষাকে কবিরা এমন এক স্তরে পৌঁছে দিয়ে থাকেন যে সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে সমস্ত পৃথিবী কথা বলে একমাত্র মাতৃভাষায়, অন্য কোনো ভাষায় নয়। মাতৃভাষার শক্তিকেই তারা বাড়িয়ে দেন, মাতৃভাষাকেই আকার দেন। বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ তাই শুধু কবি নন, মাতৃভাষা আধুনিক বাংলার স্রষ্টা।
কথা আর সংগীতের মধ্য দিয়ে লিরিক কবিতার পঙ্ক্তিগুলো হেঁটে চলে। কবিতাকে তাই ঠিক কথা বা উক্তি বলে চিহ্নিত করা যায় না। মানুষের মুখের ভাষা হচ্ছে প্রতিদিনের বচন, কিন্তু কবিতা হচ্ছে শিল্প, আরও স্পষ্ট করে বললে ভাষাশিল্প; মুখের ভাষার তুলনায় এর চরিত্র, চালচলন সম্পূর্ণ আলাদা। তবে কবি যে ভাষায় কবিতা লেখেন, সেই ভাষার বোলচাল তাকে রপ্ত করে নিতে হয়। ওয়ালেস স্টিভেন্স ‘আধুনিক কবিতা’ শীর্ষক একটি কবিতায় এরকমটাই লিখেছেন। ইয়েট্সও ‘আধুনিক কবিতা’ শীর্ষক রচনায় কবিতাকে “মুখের ভাষার ছন্দময় সম্প্রসারণ ও সুগভীর অনুভূতির সংগতিপূর্ণ পারম্পর্য” বলে উল্লেখ করেছেন। অডেন ‘লেখালেখি’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, “ইংরেজি কবিতা, এমনকি শেক্সপীয়রের আলঙ্কারিক পরিচ্ছেদগুলো পড়বার সময় তার ভাষাভঙ্গির সঙ্গে প্রতিদিনের কথার মিল লক্ষ করে আমাদের কানও সজাগ হয়ে ওঠে।” মার্কিন কবি ম্যারিয়েন মুর আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, আধুনিক কবিতা মুখের ভাষার এতটাই কাছাকাছি অবস্থান করে যে কুকুর বেড়ালও তা পড়তে পারে। মার্কিন আরেক কবি র‌্যান্ডেল জ্যারেল ‘পরবর্তী দিন’ নামে একটি কবিতা লিখেছেন। এই কবিতায় দেখা যায় এক নারী তার প্রতিদিনের কাজ - যেমন রান্নাবান্না, মুরগির খাবার দেয়া, কাপড়চোপড় কাচা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষ যে এসব কাজকে অবজ্ঞা করে, জ্যারেল তার নিজের ভাষাভঙ্গির সঙ্গে নারীমুখের বিশিষ্ট ভাষাকে মিশিয়ে দিয়ে চমৎকার এই কবিতাটি রচনা করেছেন। এতে নারীর কাজ, একাকীত্বের বোধ, প্রতিদিনের জীবন উজ্জ্বল মহিমায় উপস্থাপিত হয়েছে।
কবিতার মাধ্যম মূলত যে ভাষা, তা মানবজাতির সাধারণ সম্পদ। এই ভাষা কোনো একজন মানুষের নয় বরং সবার। সমকালের ব্যবহৃত ভাষা থেকে কবিতার ভাষা কখনই দূরে সরে থাকতে পারে না। তবে ভাষার চরিত্র হচ্ছে মিশ্র, অর্থাৎ বিশেষ সীমার মধ্যে থেকেও বহু মানুষ তা বহুভাবে ব্যবহার করে থাকে। এই ভাষা বা বাচন মূলত সাধারণ মানুষের সম্পদ, সমাজই হচ্ছে এর উৎস, এটি তাই বিচিত্রগামী, সহস্র অভিমুখে বিস্তৃত।
ভাষার রূপান্তর ও পরিবর্তনকে কবিতার ভাষা চমৎকারভাবে ধারণ করে। তবে মুখের ভাষাকে তা হুবহু উপস্থাপন করে না। আধুনিক কবিতা শব্দকে এর পরিচিত অনুষঙ্গ ও পরিবেশ থেকে ছাড়িয়ে এনে ‘অপরিচিতকরণ’ করে দেয়। ফলে এতে যুক্ত হয়ে যায় সম্মোহনী শক্তি। আদি কবিতাতাত্ত্বিক হোরেস বলেছেন এই সম্মোহনের কারণেই সাধারণ ব্যবহৃত শব্দ সম্পূর্ণ নতুন হয়ে ওঠে। কবিতার ভাষা, তাই বলা যায়, কবিতার শব্দকে সজীবতা দেয়। কবিতায় এই শব্দ যখন উচ্চারিত হয় তখন সেই সম্মোহন ইন্দ্রজাল ছড়ায়।
লাতিন ভাষায় কারমেন নামে একটি শব্দ আছে যার অর্থ হচ্ছে ’গান’ অথবা ’কবিতা’। এরই আরেকটি সমধর্মী ইংরেজি শব্দ হচ্ছে চার্ম। পুরানো লাতিন লেখালেখিতে এই শব্দটির অর্থ হচ্ছে যাদুময়তা। শব্দ যখন কথিত, গীত বা উচ্চারিত হয় তখনই তা সম্মোহিত করে, যাদু ছড়ায়। ফিলিপ সিডনির কাল পর্যন্ত এই যাদুময়তা ইংরেজি কবিদের আকৃষ্ট করেছে। আধুনিক গীতিকবিতা প্রতিদিনের বলা, জীবন্ত বাচনের মধ্যে ঢুকে থাকা শব্দকে শিকড়চ্যুত করে তাকে যাদুবাস্তবময় করে তোলে, সম্মোহন ছড়ায়। ওক্তাভিও পাজ তার ছড় ও বীণা গ্রন্থে লিখেছেন :
দুই পরস্পর প্রতিস্পর্ধী শক্তি কবিতার মধ্যে সঞ্চারিত থাকে : এক হচ্ছে ঊর্ধ্বায়ন বা শিকড়চ্যুতি, যা শব্দকে ভাষার ভেতর থেকে তুলে আনে; দ্বিতীয় হচ্ছে ভর, যা শব্দকে আবার নতুন করে তোলে। কবিতা হচ্ছে এক মৌলিক অভূতপূর্ব সৃষ্টি, একই সঙ্গে তা পঠিত ও আবৃত্ত হয়, অর্থাৎ সম্পৃক্তি দাবি করে। কবি একে সৃষ্টি করেন; পাঠক আবৃত্তির মধ্য দিয়ে একে পুনঃসৃষ্টি করেন। একক অখ- বাস্তবতার দুই মুহূর্ত হচ্ছে কবি ও পাঠক।
পাজের কথায় কবি ও পাঠক এভাবেই একবিন্দুতে মিলে যায়।
কবিতার ভাষা তাই বিশেষ ভাষা - আলঙ্কারিক ভাষা ও চিন্তার ভাষা। আক্ষরিক অর্থ অতিক্রম করে তা চিন্তাকে প্রকাশ করে। রবার্ট ফ্রস্ট বলছেন, কবিতা সম্বন্ধে অনেক কথাই বলা যায় তবে সবার উপরে স্থান করে নিয়েছে উপমা (মেটাফর), এই উপমার ব্যবহার হয় অবিরল, প্রায় পুরো কবিতা জুড়েই। উপমায় বলা হয় একটা, কিন্তু অর্থ দেয় আরেকটা, একটার আশ্রয়ে বলা হয় অন্য কথা। উপমার প্রতি আসক্তি কী শুধু ফ্রস্টের? জীবনানন্দও কী বলেননি উপমাই কবিত্ব?
বাংলা উপমা শব্দটির কোনো উৎস খুঁজে পাইনি, তবে ইংরেজি মেটাফর শব্দটির উৎস হচ্ছে লাতিন মেটাফোরা। মেটাফোরার আবার আদি উৎস হচ্ছে গ্রিক মেটাফেরেইন, যার অর্থ হচ্ছে ‘সঞ্চারিত’ করা। উপমায় এভাবেই একটা কিছুর আশ্রয়ে অন্য কোনো অর্থ সঞ্চারিত করে দেয়া হয়। সেই অর্থও ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ধরা পড়ে। কবিতা নিজেই যেন এক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে উপস্থিত হয়। অডেন বলেছেন, “কবিতা যেন এক কল্পব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিমানুষের মতো এটি অনন্য আর পাঠককে তা সরাসরি নিজের কথা বলে।” পল সেলান যখন কবিতাকে ‘বোতলে-পোরা বাণী’ বলে আখ্যায়িত করেন তখন তিনিও তাকে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেননি। একে তিনি সিন নদী বা কোনো সমুদ্রেও ছুঁড়ে ফেলে দেবেন না।
কবিতার সপক্ষে শীর্ষক গদ্য রচনায় শেলী বলেছেন, কবিতা হচ্ছে উপমায়িত শিল্প। আগে কখনও পরম্পরিত করে দেখা হয়নি কবি এমন বস্তুপুঞ্জের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করেন আর কবিতার ভাষাকে নতুন করে তোলেন। নতুন উপমা কবিতায় নতুন চিন্তা সঞ্চারিত করে দেয়। কবি পুরনো ব্যবহারে জীর্ণ ভাষাকে এভাবেই নতুন আর ঝকঝকে করে তোলেন। তবে পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণ না ঘটলে এই ভাষা জেগে ওঠে না, নতুন হয়ে ওঠার সুযোগও থাকে না। কবিতার উপমায়িত ভাষাকে নিজের মতো করে নানাভাবে দেখার ও উপলব্ধি করার মধ্য দিয়েই পাঠক কবিতার নতুন অর্থ পেয়ে থাকে। কবিতাকে, তাই বলা যায়, একধরনের পরম্পরিত শিল্প; কবি ও পাঠকের পরস্পর সহযোগেই কবিতা নির্মিত ও উপলব্ধ হয়।
কিন্তু কবিতায় উপমার ভূমিকা কতখানি? বরিস পাস্তারনাক বলেছিলেন, “বই হচ্ছে জলন্ত চতুষ্কোণ বিশিষ্ট এক বস্তুখ- - এর বেশি কিছু নয়।” শেলী আরও আগে বলেছিলেন, “কবি হচ্ছেন নাইটিঙ্গল যে অন্ধকারে বসে থাকেন আর নিজের এককীত্বকে সুরে সুরে উদ্যাপন করেন।” শেলীর কথায় কোনো পাঠক ছাড়াই কবি একাকী বসে কবিতা রচনা করেন। কবি হচ্ছেন তাই এক অদেখা ‘গায়ক’, পাঠক তাকে দেখতে পায় না; কবি ও পাঠক একে অন্যের কাছ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকেন। কবি ও পাঠকের সম্পর্ক তাই গভীর হলেও তা রহস্যময়। দার্শনিক টেড কোহেন অবশ্য বলেছেন উপমায় চর্চা করা হয় অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপনের। এর মধ্য দিয়েই কবি পাঠককে কবিতা পড়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানান। কবি প্রত্যাশা করেন পাঠকের বৌদ্ধিক ও আবেগিক সম্পৃক্তি আর কীভাবে কবিতার অর্থ সে তৈরি করে, তাও তিনি দেখতে চান। কবি ও পাঠকের সম্পর্ক তাই বহুমাত্রিক, সৃষ্টিশীল। এই পরম্পরিত সম্পর্ক বৌদ্ধিক ও আবেগিক। কবিতার রহস্য এভাবেই পাঠক পেতে শুরু করেন, কবির সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে।
কবিতার ইতিহাস সজীব জীবন্ত ইতিহাস। কবিতা তাই পাঠককে যুক্ত করে, পূর্ণ করে আর নিজেই নিজের ইতিহাসকে অতিক্রম করে পৌঁছে যায় সাম্প্রতিকতম সময়ে। ফলে বিগত কাল ও সাম্প্রতিক কালের ওই কবিতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্যে পাঠককে আরও বেশি দায়িত্বশীল, আরও বেশি সংবেদনশীল হতে হয়। জানতে হয় তার নানা প্রকরণ ও রূপ-রূপান্তরের কথা। প্রকরণরীতির দিক থেকে সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে সাহিত্য প্রধানত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত :
মহাকাব্য বা বর্ণনামূলক (ন্যারেটিভ) : এই ধরনের লেখায় বর্ণনাকারী উত্তমপুরুষে কথা বলেন, এরপর চরিত্রগুলোকে তাদের মতো করে কথা বলার সুযোগ করে দেন;
নাটক : এতে চরিত্ররাই সব কথা বলে, অথবা যা-কিছু বর্ণনা করার তা বর্ণনা করে;
গীতিকবিতা বা লিরিক : উত্তমপুরুষে সবকিছু বর্ণনা করা হয় বা লেখা হয়।
উল্লিখিত এই বিভাজন, বলাবাহুল্য, প্রচলন ঘটেছে সাহিত্যতত্ত্বের আদিগুরু আরস্তুতলের কাব্যতত্ত্ব অনুসরণে। তার ব্যাখ্যা অনুসারে মহাকাব্য, নাটক ও গীতিকবিতা সবসময় আবৃত্ত, উচ্চারিত, গীত বা স্ত্রোত্রের মতো করে পঠিত বা মঞ্চে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু পর্তুগালের কবি ফার্নান্দো পেসোয়া ‘বহুঅর্থবাচকতার ব্যাখ্যা’ শীর্ষক রচনায় বলেছেন :
অন্যান্য নানা বিভাজনের মতো এই বিভাজনও খুবই প্রয়োজনীয় ও স্পষ্ট, কিন্তু ভ্রান্ত। প্রকরণ দিয়ে এভাবে বিভিন্ন রচনার মধ্যে বিভাজন টানা যায় না; আর আমরা যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাবো গীতিকবিতা থেকে নাটক পর্যন্ত সব লেখার মধ্যে ধারাবাহিক একটা সম্পর্ক আছে। অভিঘাতের দিক থেকে অথবা দৃষ্টান্ত হিশেবে নাট্যকবিতার উৎসে, অর্থাৎ এয়েস্কিলাসের রচনায় যদি ফিরে যাই তাহলে আমরা দেখতে পাবো গীতিকবিতাকেই তিনি তার বিভিন্ন চরিত্রের মুখে বসিয়ে দিয়েছেন।
পেসোয়া, বিশশতকের আধুনিক শীর্ষকবিদের অন্যতম, নিজেও কবিতা লিখেছেন ভিন্ন ভিন্ন তিনটি নামে। সৃষ্টি করেছেন তিনধরনের রচনা বা প্রকরণ; তার সব রচনা তিনটি কল্পিত লেখকের নামে লেখা ও বিভাজিত। স্বনামেও কবিতা লিখেছেন তিনি - যে-কবিতা একই সঙ্গে নাট্যিক ও ব্যক্তিক। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে হুইটমানের সেই প্রবচন : “বিশ্বভুবনের মতো বহু হও।”
আরস্তুতলের সনাতন সাহিত্যবিভাজন সাধারণভাবে আঠারো শতক পর্যন্ত অনুসৃত হয়েছে। কিন্তু এরপর থেকে মহাকাব্য, উপন্যাস, নাটক ও গীতিকবিতা অব্যাহতভাবে ছায়া ও কায়ার মতো অবিমিশ্র হয়ে গেছে, একে অন্যের মধ্যে লুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে আরও ঝাপসা আরও অস্পষ্ট হয়ে গেছে তাদের মধ্যেকার বিভাজন; একটি সাহিত্যরীতি রূপান্তরিত হয়ে গেছে অন্য রূপ-রীতিতে, একধরনের প্রকরণ তার নিজের সীমানা ডিঙিয়ে ঢুকে পড়েছে অন্য প্রকরণের সীমানায়। বিশ্বসাহিত্যের পাঠক এইসময় থেকে তাই লক্ষ করতে থাকেন, ন্যারেটিভ বা গল্প কীভাবে গীতিকবিতাকে শাসন করছে; কীভাবে সাংগীতিক উপকরণ ও আবেগের ছন্দ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে বর্ণনামূলক কবিতায়; কীভাবে নাট্যিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া অসংখ্য বর্ণনামূলক রচনা ও লিরিককে দিচ্ছে আত্মপ্রতিষ্ঠার নতুন চাবিকাঠি। এখনও অবিরলভাবে চলছে এই বিমিশ্রণ, তবে এভাবে একধরনের লেখার অন্য ধরনের লেখায় মিলেমিশে যাওয়ার ইতিহাস একেবারে নতুন নয়। এই বিমিশ্রণের উৎস পাওয়া যায় ঐশীশক্তিময় ধর্মচর্চা ও আচার প্রতিপালনের মধ্যে।
কবিতা অবশ্য কখনই তার নিজের পবিত্র রহস্য পরিত্যাগ করেনি। কবিতার উদ্ভবই ঘটেছে স্ত্রোত্র ও নাচের মধ্য থেকে। ভাষাতাত্ত্বিক এডওয়ার্ড শাপির তাই তার ভাষা গ্রন্থে বলতে পেরেছেন, “কবিতা সর্বত্র তার আদি উৎস গান এবং নাচের সুনিয়ন্ত্রিত তাল, লয় ও পদবিক্ষেপ থেকে সবসময় অবিচ্ছিন্ন থেকেছে।” তবে লিখিত কবিতা ধর্মবুদ্ধির দ্বারা আচ্ছন্ন নয়। আধুনিক কবিতা হচ্ছে ব্যক্তিমানুষের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম; এর লক্ষ্যও সেই ব্যক্তিমানুষ। এই কবিতা অস্তিত্বের এষণায় উজ্জ্বল, মানবধর্মকেই যা প্রতিনিয়ত ফলিত করে চলে। পাঠক কবিতাপাঠের মধ্য দিয়েই অস্তিত্বের শিল্পমানবিক দূরদৃষ্টি অর্জন করতে পারেন। কবিতার মধ্য দিয়ে কবি ও পাঠকের মধ্যে ব্যক্তিক স্তরে অভিজ্ঞতার বিনিময় হয়; আর এটা ঘটে মূলত যাদুময় শব্দের স্বাদু সংস্থিতিতে। কবিই এভাবে কবিতা রচনা করেন। তবে আমাদের একথা ভুললে চলবে না যে একদিকে গানের সঙ্গে যেমন কবিতার গভীর সম্পর্ক, অন্যদিকে চিত্রকলার সঙ্গেও। কবিতার আছে সাংগীতিক মাত্রা, আছে চিত্রময়তা। কবিতা ও গান হচ্ছে সহোদরাশিল্প; কবিতা ও চিত্রকলাও। দৃষ্টি শ্রুতি কবিতায় সমীকৃত, যেন তারা ভাই-বোন অথবা প্রেমিক-প্রেমিকা।
কবিতার আবেদন শ্রুতির কাছে। লিরিক বা গীতিকবিতা নামটির মধ্যেই গানের অনুষঙ্গ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। লিরিকের ঠিকুজি অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে গ্রিক ষুৎধ থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি। গ্রিকরা লিরিককে আখ্যায়িত করেছেন ‘গীত কবিতা’ হিশেবে। কবিও একসময় প্রদর্শনপ্রিয় ছিলেন, অর্থাৎ তিনি সাংগীতিক প্রকাশে আনন্দ লাভ করতেন। কবিতা তাই গীত, আবৃত্ত বা শ্লোকের মতো উচ্চারিত হতো; কবিও ছিলেন চারণ, গায়ক বা ত্রুবাদুর। বাংলা সাহিত্যেও কবিতা আবির্ভুত হয় গানের মধ্য দিয়ে। আদি বাংলা গ্রন্থের নাম তাই চর্যাপদ বা চর্যাগীতিকা। বলা বাহুল্য ‘পদ’ ও ‘গীতিকা’ সমার্থক।
ইউরোপীয় সন্দীপনকালে (রেনেসাঁস) লিরিক নানা বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গাওয়া হতো, আবার গান থেকে কবিতাকে সরিয়ে আনার সূত্রপাতও ঘটে ওই সময়ে। মিল্টনের একটি কবিতাতে এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়। কবিকে লক্ষ করে তিনি লিখেছেন, “ঐশীসুরকে বিয়ে করুন, ওই সুরে মিশিয়ে দিন শৌর্য্য।” কিছুটা ভিন্ন অর্থে হলেও মাইকেল মধুসূদন দত্তও বলেছেন ‘শবদে শবদে’ বিয়ে দেয়ার কথা, যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। মধুসূদনও ছিলেন বঙ্গীয় সন্দীপনকালের সন্তান, কিন্তু ততদিনে মানুষের ঐশী মর্যাদার অবসান হয়েছে, কবিতাও ছিন্ন হয়ে গেছে গান থেকে। সন্দীপন কালেই ইংরেজ কবিরা প্রথম শ্রোতার জন্যে কবিতা না লিখে পাঠকের জন্যে কবিতা লিখেছেন। কবিতা এই সময় থেকেই দৃশ্যমাধ্যম হিশেবে লিখিত হতে থাকে, বইয়ের পৃষ্ঠায় ‘দর্শনীয়’ হয়ে ওঠে। পরে চোখের ওপর থেকে সরে গিয়ে কবিতা স্থান করে নেয় মর্মে। সন্দীপনকালের মূল কথাই ছিল এটি Ñ ব্যক্তিত্বের জাগরণ ও আত্মমুক্তি। কবিতাও এই সময় অস্মিতার আলোয় জ্বলে উঠলো, নতুন আবির্ভুত আত্মতার বোধে অন্তর্লোকে ঠাঁই করে নিল। গীতিকবিতা বৃহত্তর অন্তর্লীন ভাবনায় অভিষিক্ত হলো। আধুনিক কবিতা এভাবেই বহির্জগত থেকে অন্তর্জগতের দিকে ঘুরে গেল, কিছুটা হলেও অনুবর্তী হলো সংগীতের।
পাঠক প্রথমে কবিতা দেখে, পড়ে না; তার চোখ ঘুরে যায় বইয়ের পৃষ্ঠা জুড়ে। দেখার শুরু সেখান থেকে, এরপর পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি সে পড়তে থাকে। অমিয় চক্রবর্তী বলেছেন, “দৃষ্টিগোচরতার প্রধান বাহন হল সাহিত্য, ভাষা দিয়ে জাগানো তার কাজ।” কবিতার তাই আকার আছে, আছে নক্শা, আছে রূপ। কবিতাকে চিত্রকলার মতো দর্শনীয় শিল্প বলেও আখ্যায়িত করা যায়। পাঠক যখন কবিতা পড়তে শুরু করেন তখন কবিতা আবৃত্ত হতে থাকে; কবিতা তাই একই সঙ্গে দেখার ও উচ্চার্যের। ই ই কামিংসের কবিতা এই অর্থেই নক্শা কবিতা। কবিতাকে দৃশ্যমান করে তোলার ইতিহাস অনেক পুরনো। নক্শা কবিতা : অজানা সাহিত্যের সন্ধানে শীর্ষক গ্রন্থে ডিক হিগিনস এর চমকপ্রদ হদিস দিয়েছেন। গ্রিক, লাতিন ও হিব্রু সাহিত্য থেকে শুরু করে ইউরোপীয় সাহিত্য; চীনা নক্শা কবিতা, সংস্কৃত ‘চিত্রকাব্য’ এবং প্রাচীন ভারতীয় অনেক টেক্সট চিত্ররূপময়। হেলেনীয় গ্রিসে ছয় ধরনের নক্শা কবিতার সন্ধান পাওয়া গেছে : এর দু’টি বেদীর আকারে লেখা, অন্যগুলো ডিম্বাকার, কুঠারাকৃতি আর যুগল ডানার আকারে রচিত। ইংরেজিতেও ১৭৫০ সালের পূর্বে রচিত এরকম ১১০টি কবিতার সন্ধান পেয়েছেন হিগিনস। বলা বাহুল্য আবেগের যথাযথ আধার হিশেবে নক্শা কবিতা লেখা হয়েছে। আধুনিক কবিরাও লিখেছেন এই ধরনের কবিতা। ফরাসি পরাবাস্তববাদী কবি গিয়েম অ্যাপোলোনিয়ের নক্শা কবিতার জন্যে একটি পরিভাষা ব্যবহার করেছিলেন - ‘ক্যালিগ্রাম’। অ্যাপোলোনিয়ের ভেবেছিলেন আধুনিক কাব্যপ্রকল্পের অংশ হিশেবে তিনি এই কবিতা আবিষ্কার করেছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লাতিন ভাষায় যে ‘আকার কবিতা’র সন্ধান পাওয়া যায়, সেই কবিতাকেই তিনি ক্যালিগ্রাম বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অ্যাপোলিনিয়েরের এরকমই একটি কবিতা হচ্ছে ‘লা প্লুত’। কবিতাটি পাঁচ পঙ্ক্তির; কিন্তু পঙ্ক্তি হিশেবে নয় কলামের মতো করে পঙ্ক্তিগুলো দাঁড় করানো; পৃষ্ঠার উপর থেকে নিচের দিকে লম্বালম্বিভাবে বর্ণের নিচে বর্ণ সাজিয়ে শব্দ নির্মাণ করে কবিতাটি লেখা হয়েছে। কবিতাটির নাম ‘বৃষ্টি ঝরছে’। কবিতাটি অ্যাপোলোনিয়ের যেভাবে মুদ্রিত করেছিলেন সেভাবে ছেপে দিলে পাঠক কবিতাটি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে পারতেন, কিন্তু ছাপার সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি করা গেল না। তবে কবিতাটি অনুবাদ করলে অনেকটা এরকম দাঁড়ায় :
বৃষ্টি ঝরছে নারীস্বর বুঝি স্মৃতিতেও আজ মৃত তারা
বৃষ্টি ঝরছে তুমি বুঝি আমার মধুর জীবনের চমকপ্রদ সেইসব দিনের মুখোমুখি আহা
ছোট ছোট ফোঁটা
বিচরণশীল ওই সব মেঘ সমস্ত ভুবন জুড়ে হ্রেসারব তুলতে শুরু করেছে
মাতিয়ে তুলছে নগরের পর নগর
শোনো প্রাচীন কোনো গানকে লক্ষ করে আক্ষেপ আর ঘৃণায় বুঝি বৃষ্টি ঝরছে
শোনো একেবারে গহীন তল থেকে তুমি যাকে আকড়ে ধরে ছিলে ছিঁড়ে যাচ্ছে সেই বন্ধন
এই কবিতায়, বাংলা লেখার ধরন হিশেবে, পৃষ্ঠার বাম থেকে ডানে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে পাঁচটি পঙ্ক্তির অনুবাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু অ্যাপোলোনিয়ের পৃষ্ঠার উপর থেকে নিচের দিকে পঙ্ক্তি নামিয়ে কবিতাটি লিখেছেন। তবে একেবারে খাঁড়া করে নয়, পঙ্ক্তিগুলোকে তিনি কিছুটা আঁকাবাকা করে উপর থেকে নিজের দিকে দুলিয়ে দিয়েছেন। দেখলে মনে হবে কাচের জানালা বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা নিচের দিকে গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে। দেখা ও পড়ার সূত্রে এই কবিতায় একই সঙ্গে পাওয়া যায় কবিমনের অনুভূত নক্শা ও ছন্দোস্পন্দ। প্যারিসের এক বৃষ্টির দিনে আধুনিক কবিমন কীভাবে একাকীত্ব ও নৈঃসঙ্গ্যের মধ্যে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল তার চিত্ররূপময় বর্ণনা।
সমালোচকেরা বলেছেন পূর্বসুরি পল ভারলেনের সরল একরৈখিক একাকীত্ব নয়, এই কবিতার নক্শাটি লেখকের মনোজাত, অনুভূতির জটিল বুননে ঠাসা। প্রথম পঙ্ক্তিতে বৃষ্টির উল্লেখ, সুখানুভূতিও অপসৃত; দ্বিতীয় ও তৃতীয় পঙ্ক্তিতে এই বিষাদ আরও ঘন ও তীব্র হয়ে আসে: বাইরের পৃথিবীর দিকে - আধুনিক পৃথিবীর দিকে - ঘুরে যায় কবিতার গতিমুখ। ফোঁটায় ফোঁটায় যে বৃষ্টি পড়ছে তাও ওই বিষাদকে ধারণ করে আছে। কিন্তু কবির তো মুক্তি চাই - আত্মমুক্তি। ফলে বৃষ্টির ফোঁটা যে জানালার উপর পড়ছে, সেই জানালাকে ঘিরেই কবির মনে জাগলো রোমাঞ্চ, জানালাই হয়ে উঠলো তার আত্মমুক্তির পরিসর। কবিতাটিকে নিঃসন্দেহে চিত্রিত লিরিক বা চিত্রময় গীতিকবিতা হিশেবে চিহ্নিত করা যায়। এই চিত্র বা নক্শার রয়েছে গূঢ়ার্থ, অনেকটা উপমার মতো। দর্শক বা পাঠকের মধ্যে এই আকার তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করে; পাঠক যুগপত বিষয় ও বিষয়ী, প্রকরণ ও প্রতিপাদ্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। লিখিত বা ছাপা পৃষ্ঠার মধ্যে বৃষ্টি এনে হাজির করেন কবি, পাঠকের সামনেই চৈতন্যমথিত করে তা ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে থাকে। জীবনানন্দের কবিতায় উপমা-চিত্রকল্পের বহুল ব্যবহার দেখে রবীন্দ্রনাথ তার কবিতাকে চিত্ররূপময় বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
নক্শা কবিতার আরও একটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায় সৈয়দ শামসুল হকের ‘গেরিলা’ শীর্ষক কবিতায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই কবিতাটি একই সঙ্গে দেখার ও পড়ার অভিজ্ঞানে উজ্জ্বল। দেখলে মনে হবে সমস্ত পৃষ্ঠা জুড়ে একজন গেরিলা রাইফেল হাতে ঋজু হয়ে শত্রুনিধনে ধাবমান।
অবিরাম
দক্ষিণ ভিয়েৎনাম
কম্বোডিয়া
বাংলাদেশ
অ্যাংগোলায়
মোজাম্বিকে তুমি
নিসর্গের ভেতর দিয়ে
সর্তক নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাও সারাদিন সারারাত যখন গ্রামগুলো
জনশূন্য চাতাল চিড় খাওয়া আর উপাসনার চত্বরগুলো ঝরাপাতায়
অনবরত ঢেকে যায়
তোমাদের চলাচল
নিঃশ্বাসের শব্দের ভেতরে
যেন তুমি আমাদের দ্বিতীয়
শরীর কোন এক রবীন্দ্রনাথের
গান সমস্ত কিছুর কেন্দ্রেই আছে

কবিতা যে-রকমই লেখা হোক, চিত্ররূপময় বা সরলভাবে গ্রন্থিত, লক্ষ্য সেই পাঠক। কবিতা লেখা হতে পারে এই অদেখা শ্রোতা বা ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে। সেই শ্রোতৃম-লীর একজন হয়তো কবি নিজেই, রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা, গ্রিক কাব্যের দেবী মিউজ, বন্ধু, প্রেমাষ্পদ, বিমূর্ত-মূর্ত প্রাণসত্তা, প্রকৃতি অথবা ঈশ্বর অথবা নিরীঈশ্বর কেউ। কবিতায় প্রতিপাদ্য ও প্রকরণ উভয়ের গুরুত্ব সমান। “আকার ও প্রক্রিয়া এ দুটো জিনিস প্রাণজগতে অবিচ্ছিন্ন ঐক্যে প্রকাশ পায়,” বলেছিলেন অমিয় চক্রবর্তী। দৃষ্টান্ত সহযোগে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে এরপর তিনি লিখেছেন :
রূপের মধ্যেই প্রাণের ইচ্ছা নিরূপিত, সেই ইচ্ছাকে পৃথক করতে গেলে রূপও ধ্বংস হবে। শুধুমাত্র রূপ, প্রাণের প্রয়োজন তাতে নেই, এরকমের উৎপত্তি জৈবজগতে মিলবে না। পুষ্পিত ইচ্ছার সঙ্গে-সঙ্গেই কোরকের অভিব্যক্তি, সমস্ত ফুলের পরিণতি।
ফলে তার ভাষায় নির্দ্বিধায় বলা যায় :
কাব্য যেখানে প্রাণবন্ত, অর্থাৎ কাব্যপদবাচ্য, সেখানে রূপ আছে ভাব নেই এমন হতেই পারে না। লিরিকের আশ্চর্য ভাবকে তার প্রকাশ থেকে আলাদা করে দেখবার কি উপায় আছে? ভাব নেই কিন্তু কবিতার রূপ আশ্চর্য এমন হলে রূপের আশ্চর্যতাই থাকে না। বিশেষণটা ওখানে অপ্রযুক্ত।
কবিতায় ভাব ও রূপের এই সমন্বয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে অলঙ্কার। অলঙ্কারই শব্দকে সাধারণ আভিধানিক অর্থ অগ্রাহ্য করে বৈপ্লবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সাহায্য করে, শব্দের ভেতর থেকে হীরকের মতো বিচ্ছুরিত হয় অনেকান্ত অর্থ, ভাব। কবিতার ছন্দোস্পন্দও সৃষ্টি হয় অলঙ্কারের কারণে। যাদুবাস্তবময় এই শব্দ ও ছন্দই কবিতাকে করে তোলে স্মরণীয় উক্তিবিশেষ।
আধুনিকতার প্রধান কবিতাত্ত্বিক ও কবিপুরোধা এজরা পাউন্ড পঠনপাঠনের অ আ ক খ শীর্ষক গ্রন্থে বলেছেন, সময়কে নির্দিষ্ট মাত্রায় বিভাজিত করে কবিতায় ছন্দোস্পন্দ সৃষ্টি করেন কবি। রবার্ট গ্রেভ্স আরও একধাপ এগিয়ে আমাদের জানাচ্ছেন কবিতায় যে সাংগীতিক ছন্দোস্পন্দের সৃষ্টি হয় তা কবির মনোজগতের আবেগায়িত ছন্দোস্পন্দের ফল। প্রথমে কবির মন ভাবের আবেগে স্পন্দিত হয় এরপর শব্দে তা পুনর্বসতি লাভ করে। কবিতার সূত্রপাতই ঘটেছে মূলত এইভাবে। সুধীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, আবেগের সঙ্গে ছন্দের সংমিশ্রণেই কাব্যের উৎপত্তি, “আদিম মানুষ প্রথমে যবে নানা-প্রকার ছন্দোবদ্ধ ধ্বনিকে বিবিধ বস্তু ও বিভিন্ন আবেগের সঙ্গে দুশ্ছেদ্য সূত্রে বেঁধেছিল, সেই দিনই কাব্যের জন্মতিথি।” অমিয় চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, “ছন্দ আশ্চর্য হবার উপায় নেই যদি তার মধ্য দিয়ে কাব্যের আশ্চর্য ভাব ছন্দিত না হয়ে থাকে; ভাবের তরঙ্গেই ছন্দ।” আবেগের ছন্দই এভাবে শাব্দিক ছন্দের নক্শা তৈরি করে দেয়। এ প্রসঙ্গে দুটি কবিতার কিয়দংশ এখানে উদ্ধৃত করছি।
বাবুমশাই
‘সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কলকাতা
বেঁচে ছিলাম বলেই সবার কিনেছিলাম মাথা
আর তাছাড়া ভাই
আর তাছাড়া ভাই আমরা সবাই জেনেছিলাম হবে
নতুন সমাজ, চোখের সামনে বিপ্লবে বিপ্লবে
যাবে খোল-নলিচা

যাবে খোল-নলিচা পালটে, বিচার করবে নিচু জনে’
- কিন্তু সেদিন খুব কাছে নয় জানেন সেটা মনে
মিত্র বাবুমশয়

মিত্র বাবুমশয় বিষয়-আশয় বাড়িয়ে যান তাই
মাঝেমধ্যে ভাবেন তাদের নুন আনতে পান্তাই
নিত্য ফুরোয় যাদের

‘নিত্য ফুরোয় যাদের সাধ-আহ্লাদেও শেষ তলানিটুকু
চিরটা কাল রাখবে তাদের পায়ের তলার কুকুর
সেটা হয় না বাবা
... ...

স্বাধীনতা তুমি

তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
সকিনা বিবির কপাল ভাঙলো
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো।
দানবের মতো চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস, বস্তি উজার হলো।
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে বলে ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে বলে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার
ভগ্ন¯তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর।
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতা-মাতার লাশের উপর।
প্রথম কবিতাটি লিখেছেন শঙ্খ ঘোষ, দ্বিতীয়টির রচয়িতা শামসুর রাহমান। প্রথম কবিতায় বিশেষ বিশেষ কয়েকটি পঙক্তি এবং দ্বিতীয় কবিতায় বিশেষ একটি বাক্যবন্ধ ধ্রুবপদের মতো বারবার ফিরে এসেছে। ছন্দোবেগের সৃষ্টি হয়েছে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে। তবে এর উৎস যে কবিমন, সেকথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। প্রথম কবিতায় সমাজবদলের লোকায়ত স্বপ্নকল্পনা এবং এর ব্যর্থতা লোকজ গানের আদলে এবং দ্বিতীয় কবিতায় স্বাধীনতা লাভের দুঃসহ স্মৃতিকে ছন্দের তাল-লয়ে কবি আরও গভীর করে তুলেছেন। আবেগের অনুবর্তী এইধরনের ছন্দোস্পন্দের ব্যবহার বিশ্বের অনেক কবিই সচেতন বা অবচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। এদেরই একজন হচ্ছেন লোরকা। তিনি ঘুমপাড়ানি গানের একটা দোলা বা ‘লুলাবাই’ হিস্পানি ঐতিহ্য থেকে গ্রহণ করে কবিতায় ব্যবহার করেছিলেন আর ওই ব্যবহারের মধ্য দিয়ে লোরকা তার কবিতাকে করে তুলেছিল বিষাদঘন, দূররক্তিম। শামসুর রাহমানের এই কবিতাতেও দুর্লক্ষ্য নয় সেই বিষাদমগ্নতা। কবির মানসচৈতন্যকে ছুঁয়ে তা পাঠকের মনেও সঞ্চারিত হয়ে যায়। ঘুমপাড়ানি গানকে লোরকা পরিণত করেছিলেন কবিতার ছন্দে, পল ভ্যালেরি বলেছিলেন গদ্যকে চৈতন্যের সংযোগে সুরমাধুর্য দিতে, কথাকে গানে, পদবিক্ষেপকে নাচে রূপান্তরিত করতে। কবিতায় এভাবে “একইসঙ্গে এমন এক মুহূর্ত সৃজন করতে হবে যা সক্রিয়তা ও স্বপ্নে” স্বতশ্চল। শামসুর রাহমানও এখানে সৃষ্টি করেছেন এমনই এক মুহূর্ত যা বেদনা ও আনন্দের অবিমিশ্র বোধে ফুটিয়ে তুলেছে স্বপ্ন ও সজ্ঞানতার অন্তর্লীন ধ্বনি।
আবেগ ও স্বপ্নের আবর্তন লিরিকেরই বৈশিষ্ট্য। সেলানের কাছে গীতিকবিতা তাই বোতলে-পোরা বাণী, ঢেউয়ের মতো যা ফিরে ফিরে আসে। রুশ কবি স্তেতায়েভাও সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে কবিতার ছন্দ-লয়কে তুলনা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন - ‘আবর্তনই লিরিকময়তা’। “ঢেউ সবসময় ফিরে আসে, কিন্তু ফিরে আসে ভিন্ন ভিন্ন ঢেউ হয়ে” Ñ লিখেছেন তিনি ‘ইতিহাসলগ্ন ও ইতিহাসবিমুখ কবি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে। তার কবিতায় এই ভাবনারই বিচ্ছুরণ ঘটেছে এভাবে :
একই জল -কিন্তু ভিন্ন ঢেউ।
কী আসে যায় ঢেউ-ই না হয় হলো।
কী আসে যায় যদি ফিরে আসে সেই ঢেউ।
কী আসে যায় যদি সবসময় ফিরে ফিরে আসে সেই ঢেউ।
সবচেয়ে বেশি যা আসে যায় তা হলো : ঢেউ ফিরে ফিরে আসে ভিন্ন ভিন্ন ঢেউ হয়ে,
সবসময় ফিরে আসে সমুদ্রের ঢেউ হয়ে।
ঢেউ কী? কম্পোজিশন ও পেশী। গীতিকবিতা এরকমই।
স্তেতায়েভার মতে কবিতা হচ্ছে পেশীময় কম্পোজিশন, ঢেউয়ের মতো চঞ্চল আর প্রবাহিত। পাঠক শুধু সেই প্রবাহিত স্রোতধারায় অংশ নিয়ে থাকেন। ছন্দোলয়ের মধ্যে আমরা নিজেদের সমর্পিত করি, এই সমর্পণ ঘটে ব্যক্তিক অস্মিতা, নিমজ্জন ও কাব্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির মধ্য দিয়ে। শুধু স্তেতায়েভাই নন, আধুনিক কবিদের অনেকেই নদী-সমুদ্র-জল নিয়ে কবিতা লিখেছেন। খুব সহজেই আমাদের এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাবে জীবনানন্দ দাশের ধানসিড়ি নদী অথবা উৎপলকুমার বসুর পুরীসিরিজ এবং আবার পুরীসিরিজের কথা। মনোবিজ্ঞানী গুস্তাভ য়ুং বলেছেন, “আত্মা যদি জলসিঞ্চনে সিক্ত হয় ... জেগে ওঠে প্রাণসত্তা।” স্বপ্ন ও মনোলোকের হদিস দিতে গিয়ে মনোবিদ জেমস হিলমান এর ব্যাখ্যা দিয়ে আরও লিখেছেন, “জল স্বপ্নলোকে ফিরিয়ে নেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, স্বপ্নের বাকপ্রতিমাগুলো জলের রূপক-উপমায় ফিরে আসে আর তা প্রবাহিত হতে থাকে কবি-শিল্পীর রচনায়। স্বপ্নে সিঞ্চিত হওয়া নির্দেশ করে মৃত্যুচিন্তায় বিষাদাক্রান্ত আত্মার জ্বলে ওঠা ও পুনরুজ্জীবনকে। সাহিত্যেও লক্ষ করা যাবে জলের এই ব্যবহার, নিমজ্জিত ব্যক্তি যেখানে জলসিঞ্চনে ফিরে পায় প্রাণ।” সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তো সরাসরি কবিতাকে ‘সমুদ্র’ আর কবিকে ‘নদী’ বলে চিহ্নিত করেছেন :
কাব্য সমুদ্রের মতো, এবং কবি নদীমাত্র। সে যদি ইচ্ছা করে, তবে পথপ্রান্তেও মরুভূমিতে নিজেকে অনায়াসে হাারিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সমুদ্রের মধ্যে আত্মনিমজ্জন চাইলে, একটা বিশেষ দিকে বইতে সে বাধ্য। তার সঙ্গে অন্য নদীর সাদৃশ্য এই দিগ্দর্শনে কিন্তু গভীরতায়, বেগে, রাসায়নিক উপরকণে স্বকীয় সত্তাকে স্বতন্ত্র রাখার সুযোগ ও অধিকার তার নিশ্চয়ই আছে। পক্ষান্তরে কাব্যসমুদ্রেও বৈচিত্র্যের অপ্রতুল নেই।
কবিতা চোখ থেকে সরে আসে কানে, অন্তর্লীন শ্রুতিতে, ব্যক্তিমানুষের ভেতরচোখে। এটি সিক্ত করে আমাদের মানবীয় ইন্দ্রিয়সমূহ Ñ স্পর্শ, স্বাদ ও ঘ্রাণকে; পরিশেষে অভিঘাত তোলে মর্মে। কবিতাকে আমরা এভাবে ইন্দ্রিয়ঘন করে তুলি ঠিকই তবে সর্বত্র এর ব্যবহার যথার্থ হয়ে উঠবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। কবিতা আমাদের মূর্ত থেকে অমূর্ততার দিকে নিয়ে যায়, মনের গহনে বা আত্মার ভেতরে আমরা ডুবে যাই, পৌঁছে যাই আত্মপর বোধাতীতলোকে যেখান থেকে জীবনকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। গ্যেটে লিখছেন :
কবিতায়, বিশেষ করে এর অচেতন অংশটিতে যুক্তি ও বোধ অনুপস্থিত থাকে। ফলে আমাদের সজ্ঞান ধারণালোককে ছাড়িয়ে তা অনাস্বাদিত অপার্থিবলোকে নিয়ে যায়।
কবিতা পড়তে পড়তেই পাঠক বুঝতে পারেন তারা এমন একটা কিছু অনুভব করতে পারছেন যা ব্যাখ্যা করা সহজ নয়, যুক্তি ও বোধ দিয়েও এর অর্থোদ্ধার হয় না। আসলে বাকপ্রতিমা বা ভাষা দিয়েই কবিরা সৃষ্টি করেন স্বপ্নময় জীবন ও সময়। এই জীবনের মধ্যে প্রবেশ করে নির্মল শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন যে-কোনো সংবেদনশীল মানুষ, আপন সত্তাকে তিনি চিনে নিতে পারেন সহজেই। কবিতার আছে মূলত জীবনদায়ী এক শক্তি। কবিতা তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠে যখন তার মধ্যে কবি সৃজনী যাদুমন্ত্রে ঢেউয়ের সৃষ্টি করতে পারেন, অর্থাৎ সৃষ্টি করতে পারেন নতুন কিছু। একক কোনো কবিতা, সেলান যেমন বলেছেন, বৃহত্তর কোনো অপার সমুদ্রের অংশ হয়ে উঠতে পারে, পাঠক অর্জন করতে পারেন অনাস্বাদিতপূর্ব কোনো গভীর অভিজ্ঞতা।
রবার্ট গ্রেভ্স ‘ইংরেজি কবিতা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “কবিতা বলতে আমি বুঝে থাকি নিয়ন্ত্রিত ও অনিয়ন্ত্রিত এক সমন্বিত শিল্পকে, যার একটি অংশ অন্য অংশটি ছাড়া অসহায়, অর্থহীন।” কোনো পাঠক, এমনকি কবিও পুরোপুরি বুঝতে পারেন না কবিতার প্রতিটি অনুসূক্ষ্ম অংশের প্রতিপাদ্য ও প্রকরণশৈলীকে, এর সচেতন ও অবচেতনাকে। কবিকে তাই কবিতা রচনার সময় অথবা তিনি যখন কবিতা লিখছেন না তখনও যে-কবিতাটি তিনি লিখতে চলেছেন বা লিখছেন কিন্তু সম্পূর্ণ করতে পারেননি, পুরোপুরি আচ্ছন্ন থাকতে হয়। কিভাবে একে বশে আনা যায় সে জন্যে কখনও কখনও তাকে বিনিদ্র দিন যাপন করতে হয়, কখনও ঘুমের মধ্যে থাকলেও অবচেতনায় ভেসে ওঠে অসমাপ্ত, অপূর্ণ কবিতাটির সম্ভাব্য পঙ্ক্তি। কখনও কখনও হয়তো লেখা হয়ে যায় সেই কবিতাটি, কখনও-বা অসমাপ্ত থেকে যায়; আর অসমাপ্ত কবিতা পাঠক কখনই পড়ার সুযোগ পান না। কবিতাকে নিয়ন্ত্রণ করা তাই সহজ নয়, এমনকি একটি কবিতা লিখে শেষ করার পরও কবির মন অপূর্ণতার বোধে অস্থির থাকতে পারে, মনে হতে পারে লেখা হয়েও বুঝি লেখা হলো না। এখান থেকেই মূলত শুরু করেন পাঠক। তারা তাদের সচেতন বোধবুদ্ধি আরোপ করে কবিতাকে বোঝার চেষ্টা করেন। তাদের অবচেতনায় যা সুপ্ত ছিল তাও এইসময় জেগে উঠতে পারে নতুন পড়া কবিতার তীব্র অভিঘাতে, একাত্ম হয়ে যেতে পারেন কবির সঙ্গে, ঘটতে পারে চৈতন্যের ঊর্ধ্বায়ন, প্রস্ফুটন, বিচ্ছুরণ।
কখনও দেখা যায় সচেতন যুক্তিবোধের উপর ভর করে কবিতা লিখছেন কবি, এইসময় কবির সৃজনীসত্তা থাকে জাগর। পল ভ্যালেরি এরকম মুহূর্তে রচিত কবিতাকে উল্লেখ করেছেন ‘আরোপিত পঙ্ক্তি’ বলে। কবি এসময় কবিতা রচনা করেন শ্রম দিয়ে, নির্মাণই তখন তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে, সৃষ্টি নয়। বোদলেয়ার অবশ্য এরকম বাঁকা চোখে দেখেননি কবির এই সচেতন নির্মাণকে, বরং এর সপক্ষে সপ্রশংস বাণী উচ্চারণ করেছেন, “শ্রমের মধ্য দিয়ে স্বপ্নকল্পনাও শিল্প হয়ে ওঠে।” এডগার অ্যালান পো ‘নির্মাণের দর্শন’ নামের একটি প্রবন্ধে কবিতা রচনায় সচেতন চর্চা ও সংশোধনের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন; যুক্তির ওপরও ছিল তার অগাধ নির্ভরতা।
সার্থক কবিতা রচনার জন্যে রবীন্দ্রনাথ জীবনদেবতার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। গ্রিক পুরাণে কাব্যের এক দেবী আছে মিউজ। গ্রিক কবিরা এই মিউজের কৃপাপ্রার্থী হতেন কল্পনায় ঋদ্ধ হয়ে উৎকৃষ্ট কবিতা রচনা করবার জন্যে। পাঠককে তাই একথা ভুললে চলবে না যে কবিতায় প্রায়ই ঢুকে পড়ে এমন অসংখ্য পঙ্ক্তি যা কবির অবচেতনা থেকে উঠে আসে, হয়তো টুকরো কোনো ছবি, বিমূর্ত কোনো দৃশ্য যা সজ্ঞালব্ধ অথবা আপাতভাবে অর্থহীন। কবি চিন্তন দিয়ে, যুক্তি দিয়ে কবিতা লেখেন না; তিনি লেখেন অনুভূতি দিয়ে আবেগের উপর ভর করে। এখানে মনে পড়ছে কার্তেসীয় সেই প্রখ্যাত উক্তি : “আমি চিন্তা করতে পারি, সেটাই আমার অস্তিত্ব।” পল ভ্যালেরি অবশ্য দেকার্তের এই বাণীকে ঘুরিয়ে বলেছেন, “কখনও কখনও আমি চিন্তা করতে পারি, কখনও কখনও তাই আমি অস্তিত্ববান।” তাহলে কবিরা অন্য সময়ে যে লেখা লেখেন তা অস্তিত্বহীন? ভ্যালেরি বলেছেন সেরকমটা কখনই ঘটে না, শুধু চিন্তার প্রাধান্য দেখা দিলেই কবি অনেক বেশি অস্তিত্ববান হয়ে ওঠেন; তবে কেবল চিন্তা দিয়ে কবিতা লেখা যায় না, যদিও কবিতাতেই পাওয়া যায় চিন্তনের সুসংহত প্রকাশ।

কবিতায় তাই প্রত্যক্ষ চিন্তন নয় অনুপ্রেরণার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু কবিতা কখনও কবির পুরোপুরি ইচ্ছাধীন হয় না, অর্থাৎ কবি ইচ্ছে করলেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না Ñ বলেছিলেন প্লেতো। কবিতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় প্যাশন বা তীব্র ভাবাবেগ, মুদ্রাদোষ, ছেলেখেলার মতো নানা অনুষঙ্গ আর অবচেতনা। কবিরা সবসময় এমন কিছু উসকে দিতে চান যাকে তিনি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। এটাই হচ্ছে সৃষ্টিশীলতার সেই অনিবার্য উন্মার্গগামিতা; এ জন্যেই প্লেতো সব সময় তটস্থ ছিলেন। কবির এই বাকস্বাধীনতা তাকে ক্ষুব্ধ-ক্রুদ্ধ করেছিল, চেয়েছিলেন তার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে কবির নির্বাসন। কিন্তু শুধু কী প্লেতো? সক্রেটিসও ছিলেন কবিদের বিরুদ্ধে, সাহিত্যের বিরুদ্ধে সমান খড়গহস্ত :
তৃতীয় আরেক ধরনের আচ্ছন্নতা অথবা পাগলামি আছে যার উৎস হচ্ছে গ্রিক কাব্যের দেবী মিউজ। এটি সুশীল, অকলুষ আত্মাকে গ্রাস করে আর বিমুগ্ধ তীব্র ভাবাবেগপূর্ণ প্রকাশকে উসকে দেয়, বিশেষ করে গীতিকবিতায় এটা ঘটে, প্রাচীন কালের অনেক কিছুই এর দ্বারা মহিমান্বিত হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি মিউজের এই উন্মার্গগামিতাকে পরিত্যাগ করে কবিতা রচনা করেন তাহলে তিনি ভালো কবি হয়ে উঠতে পারেন, পাগলামির উপাদান তাহলে তার লেখা থেকে ঝরে পড়বে, তিনিও ঝরে যাবেন; আর কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। (ফায়েদরাস)
সক্রেটিসের এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে কবিতা জিনিসটি অত্যন্ত মারাত্মক। মানুষের ব্যক্তিত্বের যে অংশটি অসুস্থ, বিকলাঙ্গ, অবিকশিত, তার সঙ্গেই কবিতার সম্পর্ক। কবির জাগরসত্তা, বোধ, বুদ্ধিবৃত্তি থেকে কবিতা পুরোপুরি বিযুক্ত। কিন্তু কবি শেলী মনে করেছেন, “কবিতা যুক্তিতর্ক নয়, ইচ্ছা করলেই এর উপর জোর খাটানো চলে না।” কবিতার সপক্ষে বলতে গিয়ে শেলী আরও বলেছিলেন :
কোনো মানুষ হুট করে বলতে পারেন না, “আমি কবিতা রচনা করবো।” মহৎ কবিরাও বলতে পারেন না এরকম কথা, কেননা অদৃশ্য অস্পষ্ট দূরাগত কোনো কিছুর প্রভাবে মনের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠে কবিতা, যেন ঝাপট এসে লাগে কোনো অনিয়ন্ত্রিত তীব্র হাওয়ার, বিদ্যুচ্চমকের মতো আলোয় আলোয় ভাসিয়ে দেয় দিকচক্রবাল।
কবিতা রচনার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অমিয় চক্রবর্তী একজায়গায় লিখেছেন :
নিজের মধ্য থেকে জেনেছি, চৈতন্যের বিশেষ ঘন মুহূর্তে কোন্ ঘটনা বাঁধা পড়বে, কোন্টা পড়বে না, তার হিসাব নেই। ... অন্তরের প্রচ্ছন্নতার সংযোগ-বর্জনের পালাটা আমাদের সচেষ্টতার অনায়ত্ত, উদ্দেশ্যের বাহিরে। সমস্ত ধারণাকে বহন করে, কোন ছিন্ন বাক্য, প্রক্ষিপ্ত রৌদ্রচ্ছটা দেখা দেবে তা আঙ্গিকের অথবা ভাবনার বহির্ব্যাখ্যানে নির্ধারিত হয় না।
এরকম পরিস্থিতিতে, বলা বাহুল্য, চেতনাস্রোতের কাছে সমর্পিত কবি কী ঘটছে বা ঘটতে চলেছে, বুঝতে পারেন না; আর তখনই আর্ত কণ্ঠে তিনি বলে ওঠেন, “উদ্ধার করো স্বর্গের দেবী, মিউজ।” পৃথিবীর কোনো কোনো কবি অবশ্য সচেতন নির্মাণশৈলির সহায়তায় যুক্তিজাল বিস্তার করে বুদ্ধিদীপ্ত কবিতা লিখেছেন, কিন্তু পাঠকের কাছে তা গ্রাহ্য হয়নি। গ্রাহ্য হয়েছে বরং সেইসব কবির কবিতা যারা ছিলেন অর্ধ-উন্মাদ অথবা প্রায়-উন্মাদ। এরাই স্বীকৃত হয়েছেন চক্ষুষ্মান কবি হিশেবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় আর্তুর র‌্যাঁবো, পার্সি বি শেলী, হার্ট ক্রেন, ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকা, জীবনানন্দ দাশ কিংবা বিনয় মজুমদারের কথা।
তবে কবিতার সবটাই কী অনির্দেশ্য উন্মাদের উক্তি? জেসুইট কবি তোমাসো সেভা অবশ্য এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন : “কবিতা হচ্ছে স্বপ্ন, এই স্বপ্ন কবি দেখেন যুক্তির উপস্থিতিতে।” কবিরা অবশ্য কখনও কখনও ভর করতে পারেন ফ্রয়েডের ‘নির্বুদ্ধিতা’ বা অচেতনতা অথবা ইয়ুংয়ের যৌথনির্জ্ঞান অর্থবা জ্যাঁক মারিতিয়েনের সৃজনীসজ্ঞার উপর। শিক্ষককবি জন বেরিম্যান তাই ছাত্রকবি মেরউইনকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন রহস্যে ডুবে যেতে, কাব্যলক্ষ্মী মিউজের বর প্রার্থনা করতে। ছাত্রকবি মেরউইনের ভাষ্য অনুসারে বেরিম্যান জানতেন, “কবিতার সবকিছুই হচ্ছে তীব্র ভাবাবেগে চঞ্চল, ভাবাবেগই হচ্ছে কবিপ্রতিভা।” জীবনানন্দ দাশ কবিতা রচনা প্রসঙ্গে জানাচ্ছেন ‘ভাবাক্রান্ত’ হয়েও তিনি কবিতা লেখার কথা ভাবতে পারেননি যতক্ষণ না ‘কল্পনা কিংবা কবিকল্পনা অথবা ভাবনা’ এসে ভর করেছে। তিনি মনে করেছিলেন, ‘ভাব প্রতিভাজাত অন্তঃপ্রেরণা’ ছাড়া শ্রেষ্ঠ কবিতা লেখা সম্ভব নয়। অনেকে আবার যেমন মনে করেন ভাবাবেগের সঙ্গে সচেতন সত্তার কোনো সম্পর্ক নেই, জীবনানন্দর তাতেও সায় ছিল না।
প্রশ্ন হচ্ছে সেটাই - পুরোপুরি অসচেতন হয়ে কী কবিতা লেখা সম্ভব? সত্যিকার অর্থে সচেতন কারুশিল্প ছাড়া ভালো কোনো কবিতাই লেখা হয় না। কবিতা তাই দাবি করে তীব্র মনোযোগ, চূড়ান্ত মনঃসংযোগ। এমন কবিতা পাওয়াও আবার দুষ্কর যেখানে অবচেতনা বা অচেতনতা এসে ভর করেনি। পাঠকও প্রবেশ করে শিল্পের নিয়ন্ত্রিত ও অনিয়ন্ত্রিত জগতে। কবিতা হচ্ছে আরব্য উপন্যাসের সেই দৈত্য, ছিপিআঁটা বোতল থেকে বেরিয়ে এসে পাঠকের কল্পনাকে যিনি মুক্তি দেন; কবিতার মধ্যেই পাঠক খুঁজে পায় স্বর্গ। কবি ও পাঠক দুজনে মিলেই তৈরি করে কবিতার গূঢ়ার্থ। কাব্যলক্ষ্মী মিউজ বা জীবনদেতার বর যেমন প্রার্থনা করেন কবি, তেমনি পেতে চান কল্পনাঋদ্ধ সহৃদয় সংবেদী পাঠককেও।
গীতিকবিতা, গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, একধরনের ভাষাশিল্প। কিন্তু এটি শুধু “সর্বশ্রেষ্ঠ শব্দের সর্বশ্রেষ্ঠ বিন্যাস” নয়। ভাষা এই শিল্পে নিজেকেই নিজে পূর্ণতা দেয়। ভাষার এতটা ঘনসন্নিবদ্ধ রূপ আর কোনো সাহিত্যে লক্ষ করা যাবে না। কবিতা শব্দকে তার সম্ভাবনার একেবারে চূড়ায় তুলে আনে, শব্দের শক্তিকে পুরোপুরি ব্যবহার করে। ভাষা কবিতাতেই সময়াতীত অনুভবে জ্বলে ওঠে, হয়ে ওঠে মৃত্যুঞ্জয়ী, পেয়ে যায় স্মরণীয় বাণীর মর্যাদা। কিন্তু সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি; তাই সবার পক্ষে কবিতা রচনা করাও সম্ভব হয় না। সাদা পৃষ্ঠায় শব্দের যে আঁচড় কবি কেটে চলেন তাতে বিশ্বভ্রহ্মা- আর যাবতীয় মানবীয় অনুভবকে ফুটিয়ে তোলা কী সত্যিই সহজ? ফ্লোরেন্সের কবি গিদো কাভালকান্তি হতাশ্বাসের সঙ্গে লিখেছিলেন : “কী হীনদরিদ্র আমরা, কলম বানাবো বলে পালক হাতে বিমূঢ় বসে থাকি, / হাতে ছোট ছোট কাচি আর শোকগ্রস্ত ছুরি।” কল্পনাশক্তির অভাব ও সীমাবদ্ধতা যে কবিকে কতটা বিমূঢ় ও হতবিহ্বল করে দিতে পারে, লেখকের শোকগ্রস্ত অব্যবহৃত ছুরির প্রতীকে সেই বেদনাকেই এখানে মূর্ত করে তুলেছেন কাভালকান্তি।
শুধু সেকালের কবি কাভালকান্তি নন, একালের বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক ইতালো কালভিনোর পরবর্তী শতাব্দীর জন্যে ছটি স্মারক শীর্ষক রচনায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে কাভালকান্তির এই ভাবনা :
সমস্ত ‘বাস্তবতা’ ও ‘রহস্যময়তা’ কেবল লেখালেখির মধ্য দিয়ে আকার পায়। এই লেখার মধ্যেই অন্তর্মুখিতা ও বহির্মুখিতা, বিশ্বভুবন ও আমি, অভিজ্ঞতা ও রহস্যময়তা - একই ভাষা-উপকরণের সাহায্যে নির্মিত হয়। চোখের বহুরূপময় বীক্ষণ এবং প্রাণশক্তি বড়ো বা ছোটো বর্ণমালা দিয়ে গঠিত সুসংগত পঙ্ক্তি, বিরতিচিহ্ন, কমা, বন্ধনী, নানা চিহ্ন, শস্যরাশির মতো পরস্পর বিজড়িত হয়ে এই পৃথিবীর অনেকান্ত প্রান্তকে মূর্ত করে তোলে, যে-পৃথিবী আগের মতোই পৃথক, ভিন্ন, যেন কোনো মরুঝড়ে বালিয়াড়ি সরে সরে যাচ্ছে।
কাভালকান্তির মতোই সৃজনীসীমাবদ্ধতা নিয়ে কালভিনোর উদ্বেগ। সবকালের সব কবি-লেখক এই উদ্বেগে ভুগে থাকেন। সাহিত্যশিল্পের এটাই বোধহয় অনিবার্য পরিণতি।
কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করে যাওয়া সহজ যদি কিনা এমারসনের ভাষায় “সৃষ্টিশীল লেখার মতো সৃষ্টিশীল পাঠ থাকে।” কবিতাপাঠকের জন্যেও কথাটি সুপ্রযুক্ত। কবিতা আমাদের অভ্যন্তরে যে গভীরতা রয়েছে তাকে ছুঁয়ে দিতে চায়, জাগিয়ে দিতে চায় সমস্ত সপ্রাণ-নি®প্রাণ সত্তাসমীধকে। কিন্তু এজন্যে চাই পাঠকের স্বপ্নকল্পনাময় সক্রিয় অংশগ্রহণ। লেখকের শব্দের মধ্যে প্রতিফলিত হয় অনুভূত পৃথিবী, কিন্তু এই পৃথিবীকে যিনি অন্তর্লোকে জারিত করে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারেন, তিনি হচ্ছেন পাঠক। লেখালেখি হচ্ছে প্রতিভাস আর পাঠ হচ্ছে সংযোগ। কবি আসলে দু’জনেই - সংবেদনশীলিত পাঠকও কবি; সৃষ্টিশীল কবিও কবি। কিন্তু ঘটনাচক্রে একজন হয়েছেন পাঠক, অন্যজন কবি। ওবরা কবিতাতত্ত্বের ভূমিকায় হোর্হে লুই বোর্হেস লিখেছিলেন :
আপেলের স্বাদ (বার্কলের ব্যাখ্যায়) নির্ভর করে ফলের সঙ্গে পাত্রের সংযোগে, শুধু ফলের ওপর তা নির্ভরশীল নয়। একইভাবে (আমি বলতে চাই) কবিতা নির্ভর করে কবিতা ও পাঠকের মিলনের ওপর, শুধু বইয়ের পৃষ্ঠায় মুদ্রিত প্রতীকী পঙ্ক্তিগুলোর ওপর নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নান্দনিক ক্রিয়াশীলতা, রোমাঞ্চ, একেবারে শারীরিক আবেগ যা প্রতিটি পাঠের পর অনুভব করা যায়।
বোর্হেস আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন, কবিতা আমাদের কাছে তার ঐন্দ্রজালিক সম্মোহনী শক্তি নিয়ে উপস্থিত হয়। “দূরায়ত অতীতের চমকপ্রদ উন্মোচন আর আগত ভবিষ্যতকে আভাসিত” করে কবিতা আমাদের মন ও মানসচৈতন্যকে উদ্বোধিত করে।
কবিতা তাই নির্ভর করে পাঠক ও লেখক পরম্পরার ওপর। বইয়ের পৃষ্ঠার প্রমূর্ত প্রতীকযান তাই কবিতার জন্যে যথেষ্ট নয়। বোর্হেস ছিলেন ‘সম্পূর্ণ’ শিল্পে উৎসাহী আর খ-শল্পে বীতশ্রদ্ধ। পাঠক-কবি পরম্পরা শুধু নয়, কবিতার ভেতর দিয়ে উভয়ে অর্জন করে আত্মবোধ ও আত্মপরিচিতি; একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়। নিজের প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় তাই তিনি লিখেছিলেন :
যদি এই বইয়ের পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে কোনো সফল কবিতা অথবা অন্যকিছু উৎকীর্ণ থাকে, পাঠকের আগেই তা লিখে ফেলার জন্যে পাঠক আমার ঔদ্ধত্যকে ক্ষমা করে দেবেন। আমরা সবাই এক; আমাদের অসংলগ্ন পারম্পর্যহীন মনও প্রায় একই আর উদ্ভূত পরিস্থিতি আমাদের এতটাই প্রভাবিত করেছে যে এটা এক অর্থে বলতে গেলে একধরনের দুর্ঘটনাই Ñ আপনি হয়েছেন পাঠক আর আমি হয়েছি লেখক Ñ অনিশ্চিত, অত্যুৎসাহী লেখক।
এই সমীপবর্তিতা, কোনো সন্দেহ নেই অভিনব, চমকপ্রদ, লোকদেখানো নয়। এর মধ্যে সেই সত্যটিই প্রতিভাত হয়েছে যে কবির প্রার্থনা পাঠকের সংসক্তি; যে তীব্রমোথিত আবেগ দিয়ে তিনি কবিতাটি লিখেছিলেন সেই একই আবেগ ও সংরাগ নিয়ে পাঠক যেন কবিতাটি পড়েন। কবিতার সংশোধন শীর্ষক রচনায় সিমাস হিনি এই অবস্থাকেই বর্ণনা করেছেন “পিচ্ছিল উদ্দীপ্ত মুহূর্ত” বলে, যা শুধু নিবিড় কবিতাপাঠের মধ্য দিয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে। কবিতা এভাবেই তার স্বাধীন স্বার্বভৌম পৃথিবী সৃষ্টি করে; কবিতা নিজেই নিজের স্রষ্টা ও সৃষ্টি।
কবিতা আসলে শিল্পামানবিক সংরাগে আমাদের আত্মাকে উদ্বোধিত করে, প্রাণিত করে; কবি ও পাঠক উভয়কেই সমানুভবে প্রাণমনস্বিনি করে তোলে। অন্যান্য শিল্পের মতো কবিতারও তাই সমঝদার চাই, চাই এমন গ্রহিতা যে শুধু নিজেই প্রাণিত হবে না, বোধনের আলোকে শিল্পীকেও রঞ্জিত করবে। এ হলো সেই দ্বান্দ্বিকতা জাঁ-পল সার্ত্রে যার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তার সাহিত্য কী শীর্ষক তত্ত্বগ্রন্থে এইভাবে :
সৃষ্টিশীল কাজের প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে ভাবলে সৃষ্টিশীল কাজ হচ্ছে অসম্পূর্ণ আর বিমূর্ত মুহূর্তমাত্র। যদি লেখক একাই তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে চান, তাহলে তিনি যত খুশি লিখে যেতে পারেন। শিল্প হিসেবে তার কাজ কখনই দিনের আলো দেখবে না এবং হয় তিনি কলম বন্ধ করে বসে থাকবেন অথবা হতাশায় ডুবে যাবেন। কিন্তু লেখার কাজ বললে পড়াকেও নির্দেশ করা হয়; এ হচ্ছে একধরনের দ্বান্দ্বিক পরম্পরাগত সম্পর্ক; আর এই কাজের মাধ্যমে যুক্ত হয় ভিন্ন দুই প্রতিনিধি। এ হচ্ছে লেখক ও পাঠকের যৌথ উদ্যোগ যা পুরোপুরিভাবে সুসংহত ও কাল্পনিক বস্তু ও মন নিয়ে কাজ করে। এছাড়া কোনো শিল্প হয় না।
আধুনিক কবিতা দুর্বোধ্য, পাঠকের দিক থেকে এরকম একটি অভিযোগ প্রায়শই তোলা হয়। সুধীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, আধুনিক কবিতা দুর্বোধ্য হলেও দুরূহ নয়। কবিতাকে বোঝার প্রস্তুতি ও স্বাভাবিক অনুভবশক্তি যদি তার থাকে তাহলে আধুনিক কবিতা তার কাছে দুর্বোধ্য বলে বিবেচিত হবে না :
যে-দুরূহতার জন্ম পাঠকের আলস্যে, তার জন্যে কবির উপরে দোষারোপ অন্যায়। দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত বাদ দিলেও, কলার অন্যান্য বিভাগে প্রবেশাধিকার যে-আগ্রহ, অভিনিবেশ ও অনুশীলনের অপেক্ষা রাখে, কবি যদি তার বিভাগ থেকে সেই পরিমাণের শ্রদ্ধা ও একাগ্রতা চায়, তাহলে তার দাবি নিশ্চয়ই সঙ্গত।
আধুনিক কবিতার পাঠকের কাছে কবির এটাই দাবি, পাঠককে কবিতা বোঝার চেষ্টা করতে হবে, তার থাকতে হবে পঠনপাঠনের পূর্বপ্রস্তুতি। সুধীন্দ্রনাথ মনে করেন, কবি-পাঠকের সমস্যাই মূলত কবিতার সনাতন সমস্যা।
কাব্যবিবেচনার জন্মদিন থেকে প্রত্যেক সমালোচক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যে-প্রশ্নের জবাব দিতে চেয়েছেন, তা এই : লেখক অধোগতির ধাপে নেমে পাঠকের পাশে দাঁড়াবে, না পাঠক সিঁড়ি বেয়ে লেখকের স্তরে উঠবে?
বলা বাহুল্য কবি যদি অনাবশ্যকভাবে কোনো কবিতাকে দুরূহ করে না ফেলেন তার সৃষ্টিশীলতার অক্ষমতা বা অতিরঞ্জন দিয়ে, পাঠককেই তাহলে কবির স্তরে এসে দাঁড়াতে হবে। কবিতার মর্মগ্রহণের জন্যে যে খুব বেশি বিদ্যা-বুৎপত্তির প্রয়োজন পড়ে তা নয়, প্রয়োজন হচ্ছে মর্মগ্রহণের শক্তি - সহৃদয়সংবেদী মন। তবে পাঠকের তুলনায় ভাব ও ভাষায় কাব্যের ইতিহাসে কবি সর্বকালেই অগ্রবর্তী অবস্থানে অধিষ্ঠিত; তিনি ‘অতিচেতন মানুষ’; ফলে পাঠককেই কবিকে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। কবির দায়িত্বও এখানে কম নয়, কবিতা দিয়েই পাঠককে কবিতার দিকে টেনে আনতে হবে, কবিতা দিয়েই পাঠককে দীক্ষিত করতে হবে। সুধীন্দ্রনাথের ভাষায়, “ব্যক্তিমানব কী উপায়ে বিশ্বমানবের সঙ্গে মিশবে, তার সন্ধানেই কবিপ্রতিভার একমাত্র স্বার্থকতা।” তবে পাঠক সবসময় কবির পরবশ হয়ে থাকবে, এমন ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই, এটা অনিবার্যও নয়। কবির আজ্ঞাবহ হয়ে পাঠক যদি স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে কবিতার মর্মে পৌঁছুতে পারে, হয়তো সেটা কবিনির্দেশিত পথ নয়, কবিতার অন্য কোনো অর্থ দাঁড় করাতে পারে - কবি যে-অর্থে কবিতাটি রচনা করেননি, তাহলেই কবিতার স্বার্থকতা, কবির স্বার্থকতা। ফলে কোন পথে পাঠক “এগোবে, কোনখানে জিরোবে, কত বার পড়বে, কখন উঠবে, এ সমস্তই তার অভিরুচি-সাপেক্ষ। কবি চায় শুধু তার গতি, তার যাত্রারম্ভ ও যাত্রাশেষের সন্নিপাত; এবং চলতে চলতে সে যদি গোলকধাঁধায় পড়ে ঘুরপাক খেতে থাকে, তবু কবি তাকে বাঁচাতে যাবে না, যদি সে এমন পথে গন্তব্যে পৌঁ’ছায় যা কবির নিজেরও অগোচর, তাহলেও কবি তার বাধ সাধবে না, বরং তার কপালে জুটবে অধিকতর সম্মান।”
কবিতার দিগন্ত জুড়ে তাই পাঠকের উপস্থিতি, আদিগন্ত তার নগ্ন পদধ্বনি। বোতলে-পোরা বাণী হয়তো কবি লিখেছিলেন নিজেকে উদ্দেশ্য করে, অথবা কাউকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু পাঠক তাকে খুঁজে খুঁজে ফেরে, কান পেতে শোনে কবির অশ্রুত বাণী, খুলে ফেলে বোতলের ছিপি আর ভাষাকে ঘনিয়ে উঠতে দেয়, হয়ে উঠতে সাহায্য করে। পাঠকই হয়ে ওঠে শ্রোতা, পঠিত হলেই কবিতার স্বর নিজেই নিজেকে তখন আবিষ্কার করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো কবি কে? কবি প্রকৃতপক্ষে এক নির্মাতা, স্রষ্টা; পাঠককে যিনি শিল্পপ্রতিভায় ভাস্বর করে তোলেন। পাঠককে আবাহন করেন এমন এক শিল্পলোকে যেখানে সবার প্রবেশাধিকার সহজ নয়, কেবলমাত্র সংবেদনশীল মানুষই কবিতাপাঠের মধ্য দিয়ে শিল্পমানবিক বেদনায় উত্তীর্ণ হতে পারেন মানবে। জীবনানন্দের দৃষ্টিতে :
কবি তো সেই মানুষই যিনি সত্যকে অনুভব করতে পারেন এবং ভাষার আবেগ প্রদীপ্তির সাহায্যে আামাদের হৃদয়ের ভিতর পৌঁছিয়ে দিতে পারেন। অর্থাৎ কবির সত্য হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করলাম। কিন্তু সেইজন্যই কবি সত্য প্রচারকমাত্র (সমাজ সংস্কারক) হলেন না। এবং কবির সত্যও সৌন্দর্যজারিত দাঁড়িয়ে রয়েছে সৌন্দর্যের হাত ধরে; সকাল বেলা। মাথার উপরে আকাশে অনেক উঁচুতে রৌদ্রের সাগরে যে অদৃশ্য পাখি গান করে মানুষের সমস্ত বহিরিন্দ্রয়কে ফাঁকি দিয়ে যেন তেমনি সুন্দর সত্য; সেই নির্ঝর থেকেই ভেঙে-ভেঙে কবিতার অন্তরাত্মায়ও খুঁজছে নানারকম নদী, সমুদ্র ও সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে যেন।
এও সেই নদী-সমুদ্র, যার তটভূমিতে একাকী পরিভ্রমণ করতে করতে সেলানের চোখে পড়েছিল বোতলে-পোরা কবিতার চিরকুট। এই কবিতার অনুকম্পন থেকে সংরক্ত সংবেদী মানুষের রেহাই নেই। জাগরণ ও সুপ্তির মধ্য দিয়ে কবি ও পাঠক এখানে একাত্ম হয়ে যান। কেননা কবিতা শেষাবধি জীবনেরই উৎসারণ। আমাদের সময়ের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ ও গভীর কবিতাসমালোচক জীবনানন্দকে আবারও উদ্ধৃত করে বলি :
কবিতা ... প্রথমত লোকত্তর সৃষ্টি, সৌন্দর্যসৃষ্টি; দ্বিতীয়ত হয় তা জীবন নিয়ে, যার মধ্যে গৌণত লুকিয়ে থাকে জীবনের প্রহেলিকা কিংবা তার আলোচনা, একটা অরুণ আভা, যার মূলে জীবনের সমস্যার গিঁট হয়তো শিথিল হয়ে আসে। রূপহীনা কেমন এক স্বর্গীয় পাখির ডানায় আবেগের মত এসে আমাদের নিয়ে যায় এমন এক আবহাওয়ায় যেখানে জীবনের দুঃখ ও সংগ্রাম, বিস্ময় ও আনন্দ, মানুষের হৃদয়ের ভিতরকার ঐ উচ্চ আকাশের মেঘের শিং, সূর্যাস্ত, সন্ধার জাফরানআলো ও নতুন জন্মে জারিত অন্ধকার এবং নতুন সূর্যের জ্যোতি সমস্তই আমাদের ধরা দেয়। আমাদের হৃদয় যেন স্তম্ভিত ও শুষ্ক হয়ে থাকে - উচ্চতর স্তরে উঠে জীবনকে পর্যালোচনা করবার অস্ফুট চক্রাকার সিঁড়ির সন্ধান পায় যেন সে। শুধু ভবিষ্যতের ইমারতই নয়, একটা বর্তমান অত্যাশ্চর্য অননুভূতপূর্ব আস্বাদন ঘিরে থাকে তাকে; এবং কোনো-কোনো সময়ে সব জড়িয়ে একটা ব্যক্তির প্রশান্তি পায় সে।
শেষাবধি কবিতা সেই যৌথশিল্প - কবির রচনা আর পাঠকের পাঠের মধ্য দিয়ে যা পরিপূর্ণ শিল্প হিশেবে উত্তীর্ণ হয়ে যায়। কোনো কবি বা পাঠক এই ডায়ালেকটিক্স বা দ্বান্দ্বিকতা বা সমানুকম্পনকে এড়িয়ে যেতে পারেন না। কবিতার সার্থকতা এইখানেই।

তাইওয়ান
জানুয়ারি ২৪, ২০০৯