কুঁজো

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়


তৃষা আবদার করলো, ‘বাবা, একটা অন্য রকমের ভুতের গল্প বলবে?’ কাল সকালেই ইউনিভার্সিটিতে পরপর তিনটে ক্লাস ছাড়াও ডিপার্টমেন্টের অনেক কাজ। পড়া শেষ করে চিঠির মুসাবিদা করছিলাম। প্রথম শীতের এগিয়ে আসা সন্ধে পেরিয়ে, টুরার ‘রাত আটটার শো’-ও শেষ হয়ে’, রাত প্রায় পৌনে নটা। ‘অন্য রকমের ভুতের গল্প মানে?’ আমার ভুরুটা ধনুকের মত হয়ে যায়। ‘বুঝতে পারছোনা? অন্য রকমের! এই কেবল লোকটা বিশ্বাস করেনা; তারপর একটা ভুত এলো; পোড়োবাড়িতে’, ভয় দেখালো; লোকটা অজ্ঞান হয়ে গেল; তারপর বিশ্বাস করলো; সেরকম নয়। বেশ অনেককে নিয়ে, ভয় ছাড়াও অনেক কিছু আছে, এরকম।’ এই ভুতের গল্পের রকমবাজিতে নাকাল হয়ে আমি অতীতে ডুব দিয়ে, তৃষাকে যে ভূতের গল্পটার শিশু সংস্করণ আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে বলতে পেরেছিলাম, সেটার মধ্যে ভুতের চেয়েও বেশি ছিলো গ্রামজীবন, রহস্য আর কিছুটা দুই ভাইয়ের সম্পর্কের মনোবিকলন। ভূমিকাটা ছিল অনেকটা এইরকম—
গ্রামটার নাম নসিবপুর। এরকম নামের গ্রাম পশ্চিমবঙ্গে কিম্বা বাংলাদেশে অনেক আছে। এই দুই বাংলাতেই তিন চার দশক আগেও তিন চার ধরণের গ্রাম দেখা যেত। পার্থক্যের কারণ যেমন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, তেমনি ভৌগোলিক। হয় গ্রামটা খোলামেলা, বড় বড় গাছ আর তাদের হালকা সবুজ পাতা, লালচে এঁটেল মাটি; লতাগুল্ম আছে, কিন্তু হাঁটার সময় জামাকাপড় টেনে ধরে না। মেটে পথ হলেও চৌরস। দুই তিন জন লোক পাশাপাশি হাঁটতে অসুবিধা বোধ করে না। গ্রামের মধ্যে বড় বড় পুকুর বা দিঘি। চারদিকে বাঁধানো পাড়। মাটির বাড়ি বেশি। কিন্তু পাশাপাশি আছে কোঠাবাড়ি। তাদেরও শ্রেণিবিভাগ আছে। কিছু বাড়ি যেমন-তেমন। গৃহকর্তার সাময়িক আর্থিক সামর্থ্য বা অসামর্থ্যের স্থায়ী স্বাক্ষর বয়ে ছিরিছাঁদ ছাড়াই তৈরি। কিন্তু গ্রামের প্রকৃতি মেনে অল্পসংখ্যক বা বেশিসংখ্যক বাড়ি দুতলা, এমনকি তিন তলা, আর কয়েকটি এমনকি বহুমহলা।
নয় তো গ্রামটা ঝুপসি, বুক চাপা। বড় গাছ বা বনস্পতি আছে। কিন্তু ছোটো গাছ অনেক বেশি। আরো বেশি আছে আগাছা, লতাগুল্ম। গাছের রঙ ঘন, কালচে সবুজ। গ্রাম ভর্তি ডোবায় বা ছোটো অগভীর পুকুরে, যেগুলো গ্রীষ্মকালে শুকিয়ে যায়। তাদের না আছে পাড়, না আছে ঘাট। অধিবাসীদের ক্ষমতাই নেই পাড়ে মাটি দেওয়ার বা ঘাটলা তৈরি করার, সংরক্ষণ তো অনেক দূরের কথা। বাড়িগুলিও অধিকাংশই মাটির। কোঠাবাড়ি কয়েকটিই। সেগুলি গ্রামে ছড়িয়েও আছে যথা-তথা, যেমন- তেমন, গাছ-গাছালির ফাঁকে আধো লুকিয়ে। এসব গ্রামে আকাশটাও যেন নিচু। দিগন্ত অনেক কাছে। অতীতে নিশ্চিতভাবেই ধরে’ নেওয়া যেতো যে প্রথম ধরণের গ্রামে উচ্চবর্ণের মানুষরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে। এসব গ্রামকে এক সময় বর্ধিষ্ণু গ্রাম, তথা গণ্ডগ্রাম বলা হোতো। আধুনিক বাংলায় অবশ্য অন্য বেশ কিছু শব্দের মতো গণ্ডগ্রাম শব্দটিরও মানে বদলে গেছে। এখন তার মানে ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরের মতো দূরবর্তী অজ পাড়া গাঁ। দ্বিতীয় ধরণের গ্রামগুলিতে, যাদের আজকের অর্থে গণ্ডগ্রাম বলা যায়, নিম্নবর্ণের বা নিম্নবর্গের গরিব মানুষদের সংখ্যাধিক্য ছিলো।
কিছু কিছু গ্রামে নদী ছিলো। কিছু গ্রামে ছিলনা। নদীরও ছিলো রকমফের। হয় বড় নদী গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যেতো গ্রামজীবনের দৈনন্দিন কর্মচঞ্চলতায় কিছুমাত্র বিঘ্ন না ঘটিয়ে, এক ঘোর বর্ষায় প্লাবন ছাড়া; তখন তো আর ড্যাম-রিজার্ভোয়ার পরবর্তী যুগের মতো হঠাৎ আসা চকিৎ বন্যা বা মারণ-বন্যা ছিলোনা। নয় তো গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে যেতো ছোটো নদী বা বড় নদীর খাল, ‘আমাদের ছোটো নদী, চলে আঁকে বাঁকে’ ঢঙে। এই ধরণের গ্রাম ছিলো অবশ্য পুব-বাংলায়ই বেশি, পশ্চিম বাংলায় তুলনায় কম। সেখানে গ্রামের মাঝে নদীটি গৃহস্থের বাড়ির একেবারে পাশে বইতো। তার থেকে উঠোনের মাঝখানে কুমির এসে বাড়ির একমাত্র বাচ্চাকে মুখে তুলে নিয়ে গেছে এমনও হয়েছে, অন্ততঃ জগদীশ গুপ্তর গল্পে।
নসিবপুর দ্বিতীয় ধরণের ঝুপসি গ্রাম। গ্রামটায় নদীনালাও আছে। গাছগাছালি বড্ড বেশি। আম, জাম, লিচু, কাঁঠালের বাগান তো আছেই, তার সঙ্গে আছে ঘরের পাশে, রাস্তার ধারে, পুকুর-ডোবার পাড়ে অজস্র গাছ, আর লতা। লম্বা গাছের মধ্যে তাল, নারকেল; বট, অশ্বত্থ, নিম, তেঁতুল, ইত্যাদি বনস্পতি; মাদার, মাকাল, শিমূল। মাঝারি আকারের গাছের মধ্যে খেজুর, ডুমুর, যজ্ঞিডুমুর, বাবলা, বাঁশ, শ্যাওড়া, গাব, কেওড়া, বিরাট বিরাট ফণিমনসা, ইত্যাদি। কম বেশি ছোটো গাছের মধ্যে পড়ে আশশ্যাওড়া, ভেরেণ্ডা, গাবভেরেণ্ডা, তেলাকুচো, সেঁকুল, বেঙুচ, আঁশফল, কুচঁফল, বুনো ল্যান্টানা অর্থাৎ পুটুশফুল কিম্বা বিস্কুটফুল, যার গোলাকৃতি বহুবর্ণের ফুলগুলো অজস্র পৃথক ছোট্টো কানের মাকড়ি বা দুলের মতো ফুলের সমষ্টি, কিন্তু যার পাতাগুলো হাতে ঘসলে বিকট গন্ধ। আর আছে অজস্র লতা ও পরজীবী। তারা গাছে গাছে জড়িয়ে, অজানা নামের ফুল ফুটিয়ে কেবল জায়গাটাকে সবুজ করেই তোলে না, একটা বুনো কুঞ্জ গড়ে তোলে। নসিবপুরে নদীও আছে। এক ক্রোশ দূরে ইছামতী তো বটেই, গ্রামের মধ্যেও আছে একটা হাত চার-পাঁচেক চওড়া খাল, যেখানে অল্প জল আর সামান্য পরিসরের মধ্যেও ইছামতী দিনে দুবার জোয়ার ভাঁটার খেল দেখায়। গ্রামের লোকরা অধিকাংশই বৈশ্যকপালী, নমঃশূদ্র, পোদ, তাম্বুলি বা তামলি, জেলে, মুচি, কয়েক ঘর বাগদি, আর বেশ ভালো সংখ্যক মুসলমান। মুসলমান ছেলে আর হিন্দু মেয়ের বিয়ে আকছার ঘটে। উল্টোটা অবশ্য ঘটে তুলনায় কম। কিন্তু তৃষা তাড়া দিচ্ছে, বলছে ‘রচনা লিখছো নাকি?’ আমি তড়িঘড়ি গল্পে ঢুকে পড়ি।
নিশিকান্ত
সক্কালবেলা হনহন করে’ বাড়ির পুকুরে যাচ্ছিলেন নিশিকান্ত রায়। নসিবপুরের গোটা পনেরো কুড়ি সম্পন্ন বা দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের একজন নিশিকান্ত। নিঃসন্দেহে গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ। একইভাবে নিশিকান্তর বাবা নিশানাথ রায় ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ। চটাসুদের কারবারি। নিশানাথ মার পেটে আসার কদিন পরই তাঁর বাবা মারা যান। এরকম আগেকার দিনে আকছারই ঘটতো। ইংরেজি ভাষায় ‘posthumous’ কথাটা তো সন্তান, পুরস্কার, স্বীকৃতি, সব অর্থেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কতকটা গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রভাবে, আর কতকটা নিশানাথের বাবার স্বভাবগুণে তাঁর বদনাম জুটেছিলো ‘বেদো রায়’, বেদো মানে জারজ। নিশিকান্ত এহেন কলঙ্ক আর পিতৃত্ব সত্ত্বেও যে নসিবপুরে সম্মান পান তা কেবল তাঁর মেধা আর স্বভাবের দৌলতে। গ্রামের লোকেই বলে, ‘দৈত্য কুলে প্রহ্লাদ’। কলকাতায় এক ময়রার দোকানে ‘বয়গিরি’ করে’, বহু কষ্ট সয়ে, নিশিকান্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম. এ.-তে (তখনকার দিনে তাই হোতো) প্রথম শ্রেণি পেয়ে পাশই করেননি, নিজের ক্ষমতায় সেই বেকারত্বের যুগে রেলে আধা-অফিসারের চাকরি জুটিয়ে, দক্ষিণ কলকাতার এক সম্পন্ন মানুষের রূপহীনা কিন্তু অশেষ গুণসম্পন্না মহিলাকে বিবাহ করে’ গ্রামে মুরুব্বি বা মাতব্বর হিসেবে গণ্য হয়েছেন। পৈত্রিক বাড়ির সংস্কারই শুধু করেননি, তাকে পাকা করে’, দুতলায় একখানা ঘরও তুলেছেন। রান্নাঘর এবং উঠোন পেরিয়ে আর একটা ঘর অবশ্য এখনও কাঁচা। নিশিকান্ত শ্বশুরের সূত্রে নিজে কালীঘাটে একটা পুরোন ধাঁচের তিনতলা বাড়ির মালিক। রেলের একটা কেন্দ্রীয় কলকাতার অফিসে চাকরিসূত্রে কলকাতায় থাকেন বটে, কিন্তু ছুটি ছাটায় গ্রামে আসেন বিধবা মা আর চার ভাইয়ের দেখাশুনো করতে। মেধাবী কিন্তু ছিটেল মেজভাই দিবাকান্ত ছাড়া বাকি ভাইয়েরা দাদাকে ভক্তি-শ্রদ্ধাও করে যথেষ্ট। গ্রামের লোকেরা ভুলেই গেছে যে নিশিকান্ত বেদো রায়ের ব্যাটা।
নিশিকান্তর তাড়া ছিলো। কয়েকমাস ধরে’ মায়ের শরীর খারাপ আর মেজো ভাইয়ের মাথা খারাপের কারণে তিনি নসিবপুর থেকে কলকাতা যাতায়াত করছেন। স্ত্রীকেও এনে রেখেছেন। মার শরীর যেমন তেমন। বয়েস হয়েছে। কিন্তু মেধাবী ভাইটা ম্যাট্রিকুলেশনে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করে কলকাতায় আই.এ. পড়তে গেল, কিন্তু তার পর যে কী হোলো? কলেজে পরীক্ষার ফি-এর টাকায় এক বস্তা চাল কিনে, ‘তেলে জলে বাঙালি’ এই কথাটা বলতে বলতে বাড়ি ফিরে এলো। গ্রামের কবিরাজ ‘বায়ু কুপিত হয়েছে’, এই রোগনির্ণয় করে’ কয়েকটা বড়ি আর মধ্যমনারায়ণ তেল দিলেন বটে। কিন্তু তাতে অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি। পাড়ার ঢ্যাংএদের বাড়িতে বুড়ি জ্যেঠিমা কিছু টোটকা দেন। তাতেও অবস্থা তথৈবচ। ভাইয়ের মুখ থেকে ‘তেলে জলে বাঙালি’ এই জপমন্ত্র দূর হয়নি। উপরন্তু কয়েক দিন ধরেই ভাই বলতে শুরু করেছে, ‘গ্রামের ঘোর বিপদ, কেউ বাঁচবেনা। তেলে জলে বাঙালি।’ নিশিকান্তর চারিদিকে বিপদ। ভাইয়ের পড়াশুনো তো গোল্লায় গেল। ভেবেছিলেন ভাই আর একটা পাস দিয়ে রেলে বা অন্য কোথাও একটা চাকরিতে ঢুকে তাঁকে একটু সাহায্য করবে। সে গুড়েও বালি। আপাততঃ মাথাটা একটু শান্ত করে নিয়ে কোথাও একটা ঢুকিয়ে দিতে হবে। এদিকে অফিস সামলানোও দায় হয়েছে। অ্যাকাউণ্ট্‍‌স ডিপার্টমেন্টের পুরো দায়িত্ব। কিন্তু সকালবেলা মার্টিনের ছোটো রেলে বারাসত-বসিরহাট লাইনের ট্রেনে বেলগাছিয়া অবধি এসে, সেখান থেকে বাস পালটে ফেয়ার্‌লি প্লেসে পৌঁছন কি কম ঝঞ্ঝাট? ট্রেন যাবেও তো আড়াই ফুট লাইট গেজে, লোকের বাড়ির পাশ দিয়ে, কু-ঝিক-ঝিক শব্দ করতে করতে, আর কয়লার গুঁড়ো ছড়াতে ছড়াতে। যেন ত্রিভুবনে কোথাও কারুর তাড়া নেই। ‘লেট’ শব্দটাই তার অভিধানে নেই।
তৈরি হওয়াও কি কম যন্তন্না! কালিঘাটে নিয়মিত বাথরুম ব্যবহার করার পর পুকুরপাড়ে প্রাতঃকৃত্য সারাও অনভ্যেস হয়ে যাচ্ছে। তার উপর আছে কোষ্ঠকাঠিন্য। প্রাতঃকৃত্য সাঙ্গ হবার পর, পুকুরে নেমে শৌচ করে’, কানে আঙুল দিয়ে কয়েকটা ডুব দিয়ে, পুকুরেই গায়ত্রীমন্ত্র জপ করে, নাকে মুখে কিছু গুঁজে শাঁখচূড়ায় ট্রেন ধরতে হবে। বলতে ভুলে গেছি নিশিকান্ত ‘ভঙ্গ’, শ্রোত্রীয় ব্রাহ্মণ। একদিকে অকৌলীন্য আরেকদিকে বাবার অখ্যাতি ব্রাহ্মণত্বের পুরো সম্মান অনেকদিন অধরা রেখেছে। নিশিকান্তর মনের গোপনে সেটা ফেরত পাবার জন্যে তীব্র কামনা আছে।
বাড়ির সামনে শিবমন্দিরের সামনে দিয়ে বাঁ দিকে একটা ছোটো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে পুকুরে। রাস্তাটা সরু। দুদিকে আম, জাম, চালতা, গাব, মাকাল গাছ, রুদ্রপলাশ, অমলতাস বা বাঁদরলাঠি গাছ, তেলাকুচো, শিউলি, ঘেঁটু, কল্কেফুল, আঁশফল, শিয়ালকাঁটার ঝোপ আর অজস্র লতা। জামা কাপড় ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে, সাবধানে এগোতে হয়। নইলে গা-হাত-পা ছড়ে যায়। নিশিকান্ত পুকুরের ধারে গিয়ে একটা বেলগাছের তলায় বসেন। জায়গাটার সুবিধে হোলো পিছনে বেল গাছের গুঁড়ি, বাঁ পাশে একটা উইঢিবি, আর ডান পাশে একটা ছোটো তালগাছ থাকায় তিনদিক থেকেই দেখা যায়না। সামনের দিকে তো পুকুর। সেখানে দুটি ইঁট পাতাও রয়েছে। নিশিকান্ত মাঝে মাঝে সরিয়ে নেন। দাঁতে লাভা মাজন ঘসতে ঘসতে, প্রাতঃকৃত্য সেরে পুকুরে নামার আগে নিশিকান্ত পিছনে একবার তাকিয়ে দেখেন— তিন চার ফোঁটা কাঁচা রক্ত!
রক্ত! কোত্থেকে এলো! গতকাল ছুটির দিন শাকপাতা খাওয়ার কল্যাণেই হোক, বা মায়ের করে’ দেওয়া বেলের মোরব্বার গুণেই হোক, খুব একটা চাপ দিতে হয়নি। আর কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলেও নিশিকান্তর অর্শ নেই। কী মনে করে’ নিশিকান্ত উপর দিকে চান। দেখেন বেলগাছের একটা উঁচু ডাল থেকে একটা বাবুইবাসার মতো, নরম তন্তুবহুল উল্টো কুঁজোর মতো কী একটা ঝুলছে। রক্তের ফোঁটাগুলি ঠিক তার নিচে পড়ে আছে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার, যদিও নিশিকান্ত হলফ করে’ বলতে পারবেন না, তিনি যখন বেলগাছের নিচে আসেন তখন ওই কুঁজোটা গাছে ছিলো না। অবিশ্যি তিনি উপরে তাকান নি। কিন্তু থাকলে দূর থেকে সামনের দিক থেকে বেলগাছের দিকে আসবার সময় তাঁর চোখে নিশ্চয় পড়তো। পড়তো না? একটু আনমনা হয়েই নিশিকান্ত পুকুরে মুখ ধুয়ে নেন, একটু দূরে গিয়ে শৌচ করেন, আর তার পর স্নান করে’ গায়ত্রীমন্ত্র জপ না করেই বাড়ি চলে আসেন। ফেরার পথে আরেকবার ধাক্কা খান যখন দেখেন অমলতাস গাছটার নিচে একটা ছোট্টো ‘পচা নাক’ পাখি গলাকাটা, ডানাভাঙা, রক্তাক্ত, আধ খাওয়া অবস্থায় পড়ে আছে। কে মারলো পাখিটাকে? ভাম? খটাশ? চিল? শিকরে? তুরুমতি? বাজ? — এই পাখিকে মারতে পারবে কেবল এমন কেউ যে গাছে চড়তে পারে, অথবা ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্র, অথবা এমন চেহারার যাকে পচা নাক বা ‘shrike’ জাতীয় অতিচঞ্চল পাখি সম্ভাব্য আততায়ী ভাববেই না।
দুশ্চিন্তায় নিশিকান্ত আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে বাড়ি আসেন। এসে দ্বিগুণ অসোয়াস্তির সঙ্গে মেজ ভাইয়ের সতর্কবাণী শোনেন, ‘ঘোর বিপদ নসিবপুরের সামনে, কেউ বাঁচবেনা! আত্মোন্নতি? আকাশের দিকে তাকা। তেলে জলে বাঙালি।’ নিশিকান্ত ভাবেন পাগলের প্রলাপ আবার অন্য দিকে পাল্টাচ্ছে। তাঁর প্রতি ভাইয়ের গোপন ঈর্ষা কি মস্তিস্কবিকৃতির পথ ধরে’ বেরিয়ে আসছে? তার পর উদরপূর্তি, অফিসযাত্রা, অফিসে হিসেবের কাজ, ইত্যাদি সাত সতেরো ঝামেলায় সব ভুলে যান।
ফেরার পথে রেল ইস্টিশন থেকে বাড়ির দিকে হাঁটার সময় দেখা হয় ধনাদার সঙ্গে। ধনাদা সম্পর্কে জ্ঞাতি। নসিবপুরের আরেকজন রায়। তবে নিশিকান্তদের চেয়ে চিরকালই অনেক সম্পন্ন। গ্রামের একমাত্র তেতলা বাড়ির মালিক। নিশিকান্ত চিরকাল ওদের বৈঠকখানায় ছড়ানো সোফা, সেটি, কাউচ, চেয়ার, সেণ্টার টেবিল ইত্যাদিকে মনে মনে হিংসে করে’ এসেছেন। ভেবেছেন নিজের গ্রামের বাড়িতেও একদিন নিজের যোগ্যতায় ওরকম করবেন। কালিঘাটের নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে নিয়মিত নসিবপুরে আসার সেটাও একটা কারণ, যদিও উদারমনা বৌকে সেটা বলাই যাবে না। মেজ ভাইটা যদি পাগলা না হয়ে যেত? যে ফুলকি ওঁর নিজের মধ্যে ছিলো তার চিহ্ন মেজটার মধ্যেও দেখেছিলেন। বাকি ভাইগুলো ভিজে আমসত্বর মতোই নেতানো। ধনাদার মধ্যে একটা সুপিরিয়রিটির ভাব আগে ছিলো অনেক বেশি। কিন্তু নিশিকান্ত ম্যাথমেটিক্সে এম.এ.-তে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার পর, আর রেলোয়ের ভারি চাকরিটা বাগানোর পর বেশ একটু কমেছে। নিশিকান্তর ছেলে যে বাড়ির সামনে ট্রাইসাইকেল চালিয়ে ঘোরে, আর নিশিকান্তর কুদর্শনা বৌ যে কলকাতার বি.এ. পাস মেয়ে হওয়া সত্বেও সংসারসেবা শাশুড়ির, দেওরদের যত্নআত্তি করার পরও গ্রামের একমাত্র জলসরা পুকুর থেকে ঘড়া করে’ জল বয়ে আনার সময় গুন গুন করে’ সুকণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় একথা গ্রামের সকলের মতো উনিও জানেন। যেমন জানেন যে নিশিকান্তর বাড়িতে গ্রামোফোনে গহরজানের না কার নাকি রেকর্ড বাজে। বৌমা সেই গান অনায়াসে গলায়ও তুলছে। এই সব ব্যাপারের সঙ্গে তাঁর তেতলা বাড়ি তার বনেদি আসবাবপত্র নিয়েও আর এঁটে উঠতে পারছে না। তাঁর নিজের বা ভাই ভাইপোদের বৌরা ক’ অক্ষর গোমাংস। তারা নিশিকান্তর বৌয়ের মতো নতুন নতুন পদ রাঁধতেও পারেনা, আর ব্রাহ্মিকা ধরনের কুঁচিয়ে শাড়ি পরতেও পারে না। আটপৌরে করে’ শাড়ি পরা এই সব বহু যত্নে ধনী পরিবার থেকে বেছে আনা সুমুখশ্রী, গৌরবর্ণা, রান্না-গৃহকর্মনৈপুণ্ সর্বস্বা, বোকা, মুটোতে থাকা বৌমারা নিশিকান্তর কুরূপা বৌয়ের কাছে রোজই যত হেরে যাচ্ছে ততই ধনাদার সুরও ক্রমেই নরম হয়ে আসছে। আজ ধনাদা নিশিকান্তকে দেখেই এগিয়ে আসেন। মুখে উদ্বেগের চিহ্ন নিয়ে বলেন, ‘কি ভায়া! ফিরছো?’
নিশিকান্ত বলেন, ‘হ্যাঁ, কি ধকল যে যাচ্ছে ধনাদা! এখান থেকে কলকাতার অফিস করা কি কম ঝক্কি?’
ধনাদা বলেন, ‘আর ভায়া, তোমাদের কর্মব্যস্ততা তো আমাদের নেই। আমরা তো পূর্বপুরুষের ভেঙে খাচ্ছি। আমাদের তো দুটোই পেশা, “ফার্মিং আর সেলিং”। কিন্তু খবর শুনেছো?’
‘কী খবর আবার?’
‘গ্রামে নাকি বিভিন্ন জায়গায়, মানে বিভিন্ন বাড়িতে হাঁস, মুর্গি, অন্য পোষা পাখি বা প্রাণী নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে!’
কেন জানিনা নিশিকান্তর মনে হঠাৎ সকালবেলার গাছে ঝুলন্ত কুঁজো, তার নিচে রক্তের ফোঁটা, আর ফিরবার পথে খুবলানো, ডানাভাঙা, রক্তাক্ত, বিস্রস্ত পাখিটার কথা আর মেজ ভাইয়ের প্রলাপোক্তির সামান্য পরিবর্তনের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু রোগা, সামান্য কুঁজো, ভারি কাঁচের চশমা সত্বেও উচ্চতর গণিত নিশিকান্তর মনে একটা ঋজুতা আর যুক্তিনিষ্ঠতা দিয়েছে যা তাঁকে এই গ্রামের মানুষগুলোর সব ব্যাপারে রহস্য খোঁজার অভ্যেসকে অবজ্ঞা করতে সাহস দেয়। তিনি জানেন যে একদিকে তাঁর গ্রামে প্রকৃতির বুকচাপা প্রাচুর্য, আরেক দিকে অশিক্ষিত, নিম্নবর্গের মানুষের সংখ্যাধিক্য একদিকে কুসংস্কার, আর এক দিকে আধিভৌতিক ও অতিলৌকিক ব্যাপারের প্রতি আকর্ষণ জন্ম দেবে। গণিতবিদ জি. এইচ. হার্ডির নাস্তিকতার প্রভাব তাঁর মধ্যেও রয়েছে, গায়ত্রীমন্ত্র, ব্রাহ্মণত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সামাজিক আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদির পরস্পরবিরোধী চাপ বা প্রবণতার মধ্যেও। গণিতের অবরোহী যুক্তিবাদ কি বৃথা যায়? তিনি পাল্টা করেন, ‘ধনাদা,অন্য পোষা পাখি বা প্রাণী মানে কী? আর নিখোঁজ মানেই বা কী? আপনি তো জানেন যে মাঝে মাঝে ভাম বা খটাশ গেরস্তের বাড়ি থেকে হাঁস, মুর্গি নিয়ে যায়। আর ইংরেজ এসেছে বলে কি আমদের দেশে বনবেড়াল, গুলবাঘা, গোবাঘা, বাঘরোল একেবারে শেষ হয়ে গেছে? এতে এতো হৈ চৈ এর কি হোলো?’
ধনাদা বলেন, ‘ভায়া! এইটাই তোমাদের নিয়ে বিপদ। যতই বুদ্ধিশুদ্ধি থাক, দুপাতা ইংরেজি পড়ে মনে কর দেশটা বিলেত হয়ে গেছে। আরে ভাম বা খটাশ হাঁস, মুর্গি নিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে’ লোকের বাড়ি থেকে খাঁচায় আটকে রাখা খরগোশ নাচতে নাচতে উঁচু দেওয়াল পেরিয়ে একটা উল্টনো কুঁজোর মতো কিছুর সঙ্গে আকাশে অদৃশ্য হয়ে যাবে?’
ধনাদার অনেক কথার মধ্যে কুঁজোর কথা শুনে নিশিকান্ত সচকিত হন। সকালের দৃশ্যাবলী তাঁর মনের উপর দিয়ে ভেসে যায়। কিন্তু মরে গেলেও তিনি স্বধর্মচ্যুত হবেন না। তাঁর কাছে হিন্দুত্ব মানে হোলো শূদ্রকভাষ্য অথবা সাংখ্যদর্শন। নসিবপুরের কুলীন বামুনরা তাদের নামও শোনেনি। সেখানে আজ থেকে সতেরোশো বছর আগে বলা হয়েছিলো, ‘ঈশ্বরাসিদ্ধ প্রমাণাভাবাৎ’। তিনি যে একথা উচ্চৈঃস্বরে বলতে পারেন না, তার জন্য ঈশ্বরকৃষ্ণ, গৌড়পদ, আর গণিতবিদ হার্ডির কাছে মনে মনে ক্ষমা চেয়ে নেন। ওঁদের কারুকে তাঁর মতো তো আর ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামে, বেদো রায়ের ছেলে হয়ে জন্মাতে হয়নি। বিশ্বাসের স্বার্থে গ্রামের পুরনো ঘা তিনি নতুন করে’ খোঁচাতে রাজি নন। সুভদ্র শ্বশুর মশায়কেও কি কখনো বলতে পেরেছেন যে তিনি নিরীশ্বরবাদী? না কি কালচার্ড, সংবেদনশীল স্ত্রীকে? যদিও তাঁর সন্দেহ আছে যে ও সবটাই বোঝে। ধর্মীয় ব্যাপারে তাঁর নিরুত্তাপ সহনশীলতা কি ওই সদাসতর্ক সহনশীল মহিলার শ্যেনচক্ষু এড়িয়ে গিয়েছে? কিন্তু ও ও কি তাঁকে বোঝে? আর তিনি নিজে কি বোঝেন? একথা কেমন করে নিজের কাছেই অস্বীকার করবেন যে স্নানের সময় গায়ত্রীমন্ত্র বলতে তাঁর ভালো লাগে। কোথায় যেন ‘কুমারীঞ্চ ঋগ্বেদযুতাং তার্ক্ষ্যস্থাং পীতবাসসীম্।/ হংসস্থিতাং কুশহস্তাং সূর্যমণ্ডলসংস্থিতাম্ ’ গায়ত্রীকে, সবিতাদিগের জননীকে, স্মরণ করবার সময় তাঁর মনে পড়ে যায় প্রজ্ঞাদীপ্তি বা এনলাইটেণমেণ্টের কথা, আর তার প্রাণপুরুষ নিউটন, দেকারত্, বেকন, স্পিনোজার কথা। আরো আলো চাই তাঁর গ্রামে। অন্ধকার বিধ্বংসী আলো। কে আনবে? তিনি যে পারবেন না তা তাঁর চেয়ে বেশি কেউ জানেনা। বড় বোনটি আগেই গেছে। মেজো বোনটিকে উদ্ধার করেছে তাঁরই বয়সী একটি উদার রেলওয়ে কর্মচারী, যার কাছে বাবা বিনি পয়সায় চা আর বিড়ি খেতে যেতেন প্রতি বিকেলে রেল ইস্টিশনে। সেই সহৃদয়, পরম সুপুরুষ যুবক তাঁর দুধে-আলতা ফর্সা রঙের, কিন্তু যেমনতেমন দেখতে বোনকে তার জাতিগত ভঙ্গত্ব আর তাঁর বাবার স্বোপার্জিত অখ্যাতি সত্বেও যে কেবল সেই কারণেই বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলো সে কথা তিনি মনেপ্রাণে জানেন। কিন্তু গলায় ঝুলছে আরো দুটি বোন। ছোটোটি অনেকটাই মেজোর মত দেখতে আর সমান গৌরবর্ণা। কিন্তু সেজোটি কালো আর কুরূপা। তাঁর বাবার রঙ আর রূপ দুই পেয়েছে। তাদের বিয়ের সম্বন্ধের সময় গ্রামে এমনিতেই যে ভাংচি-র ঝড় উঠবে তার সঙ্গে নিজের নিরীশ্বরবাদের বোঝা নিশিকান্ত যোগ করবেন কোন সাহসে? কিন্তু তাই বলে’ তাঁকে এসব আষাঢ়ে গল্প মেনে নিতে হবে? মুখে অবশ্য এসবের সঙ্গে বিন্দুমাত্র যোগ না রেখে নিশিকান্ত বলেন, ‘তা, এবার তা হলে’ উড়ন্ত কুঁজোও যোগ হোলো!’
ধনাদা যে আহত হয়েছেন তা নিশিকান্ত বোঝেন তাঁর প্রত্যাঘাতে, ‘এবার মানে? এর আগে কী কী হয়েছিলো ভায়া? আমরা তো আর তোমাদের বাড়ির লোকদের মতো অত হিসেবী নই! গুণে বলতে পারবোনা!’ নিশিকান্ত বোঝেন একই বাক্যে বেদো রায়ের সুদের হিসেব আর নিশিকান্ত রায়ের উচ্চতর গণিতের মাথা সূক্ষ্ম বাচিক তীরন্দাজির সামনে পড়লো। কিন্তু এসব তির্যক বাক্য তাঁর অভ্যেস হয়ে গেছে। তিনি ক্লান্তস্বরে বলেন, ‘ধনাদা, বড় ধকল গেছে সারাদিন। ঠেস দেবার মতো কিছুই বলিনি। আপনার কি আগের গুজব আর হুজুগগুলোর কথা মনে নেই! সেই যে বছর তিনেক আগে পোদ পাড়ায় কয়েকজন মুখে রক্ত তুলে মারা গেল, আর রটলো যে প্রত্যেকেরই মৃত্যুর আগের রাত্রে আকাশ থেকে হাওয়ায় দুলতে দুলতে নেমে এসেছে একটা হাঁড়ি, যার ভিতরে একটা আলো জ্বলছে আর গম্ভীর, মৃদু গলায় ভেসে আসছে “রক্ত চাই! রক্ত চাই!”; আর যে কারুর নাম বলা হচ্ছে, সে পরদিনই মারা যাচ্ছে; তখন কি আপনারা সে কথা বিশ্বাস করেননি? অথচ পরে হেল্‍‌থ সেন্টারের ডাক্তারদের কথা থেকে জানা গেল যে ব্যাপারটা একেবারেই অন্যরকম। যাকগে এখন বাড়ি যাই।’ এই বলে নিশিকান্ত অসন্তুষ্ট, হতাশ মুখে ধনাদাকে আর কোনো কথা বলতে না দিয়েই বাড়ির পথ ধরেন।
বাড়ি গিয়ে নিশিকান্ত তাজ্জব বনে যান, দেখেন বাড়ির উঠোনে বেশ ছোটখাটো একটা ভিড়। তার মধ্যে বৈশ্যকপালী, নমঃশূদ্র, পোদ, তাম্বুলি বা তামলি, জেলে, মুচি,বাগদি, মুসলমান সকলেই আছে। আর সব চেয়ে আশ্চর্যের কথা, তাদের মধ্যে সগৌরবে মধ্যমণির মতো বিরাজ করছে তাঁর মেজভাই দিবাকান্ত। পুকুর থেকে বালতিতে রাখা স্ত্রীর তোলা জলে হাত, পা, মুখ ধুতে ধুতে নিশিকান্ত লক্ষ করেন যে সমবেত গ্রামবাসীরা ‘কেমন আছো দা ঠাউর?’ বলে’ তাঁকে সম্মান জানালেও খুব একটা নিজের লোকের মতো আমল দিচ্ছেনা। মেজভাইকে ঘিরেই বসে আছে। কাল সক্কালবেলায় কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রাতঃকৃত্য, স্নান, জপ, ক্ষুন্নিবৃত্তি, ইত্যাদি সেরে অফিস যাওয়ার তাড়ায় সন্ধেবেলাতেই মাটির রান্নাঘরের দাওয়ায় নৈশাহার সেরে নিতে নিতে নিশিকান্ত গ্রামবাসীদের উত্তেজিত কথাবার্তা যেটুকু শুনতে পান, তার থেকে বোঝেন যে বেলগাছ থেকে ঝুলন্ত তাঁর দেখা সতন্তু নরম চেহারার উল্টো কুঁজো তার পর আরো অনেকেই দেখেছে। আশ্চর্যের কথা তারা মেজভাই দিবাকান্তকেই মুরুব্বি ঠাউরেছে। আরো বিস্ময়ের কথা দিবাকান্তর আমূল পরিবর্তন। মেজভাইটি আর উ‍‌দ্ভ্রান্ত মুখে ‘তেলে জলে বাঙালি’ আওড়াচ্ছেনা। বরং মন দিয়ে বোদ্ধার মতো মুখ করে’ তাদের কথা শুনছে। কিন্তু ইতিমধ্যে নিশিকান্তর খাওয়া হয়ে গেছে। তিনি উঠে পড়েন। তাঁর তাড়া আছে। স্ত্রীর জন্যে একটা নতুন রেকর্ড এনেছেন। কেশরীবাঈ কেরকার নামের এক উদীয়মাণা গায়িকার — বাগেশ্রী বাহারের উপর। তাড়াতাড়ি শুতে যাওয়ার আগে একবার শুনে নেবেন, আর স্ত্রীর উদ্ভাসিত মুখটি দেখে নেবেন। তার পর তো আবার সকালবেলার অগস্ত্যযাত্রা। এর মধ্যে ধনাদা আর গ্রামবাসীদের কথাবার্তা, আর গ্রাম্য কুসংস্কার সহনীয় জায়গায় নেই। তাঁর মনে পড়ে যায় বাইবেলের মথির সুসমাচারে ‘Sermont on the Mount’-এ উক্ত সুভাসিত, ‘Sufficeth unto the day the evils thereof’।
পরদিন অফিসে গিয়েই নিশিকান্ত বড় সাহেবের কাছ থেকে শোনেন যে তাঁকে তার পরদিনই নর্থ ইস্টার্ন রেলওয়ে ডিভিশনে অডিট করতে গোরখপুর যেতে হবে। সাত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে মার অনুমতি নিয়ে স্ত্রীকে শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যান। কারণ এখনো কাকেও বলা হয়নি যে ইতিমধ্যে স্ত্রীর পেটে আবার বাচ্চা এসেছে। যদিও এখনো আর্লি স্টেজ। আর তাঁর অবর্তমানে স্ত্রীকে এই ভুতুড়ে গ্রামের বাড়িতে রাখতে তিনি রাজি নন। আর গোরখপুর গিয়ে তিনি হিসেবের ভিড়ে আর ঝামেলায় গ্রামের সতন্তু উল্টোকুঁজোকে নিয়ে বাদানুবাদ ইত্যাদির কথা বেমালুম ভুলে যান। কিন্তু প্রায় দিন পনেরো পরে যখন মাকে তাঁর আর ভাইদের জন্যে ‘খরচ’ দিতে নিশিকান্ত গ্রামে ফেরেন, তখন দেখেন নসিবপুর রয়ে গেছে নসিবপুরেই। স্টেশন ছাড়িয়েই সামান্য একটু জায়গা গঞ্জ মতো। সেখানে দুতিনটে মুদির ও মণিহারি দোকানের বা মিষ্টির দোকানের হ্যাজাক বা পেট্রোম্যাক্স আলো, চা-তেলেভাজার দোকানে উনোনের উপর থেকে ভেসে আসা চা ও টার সুগন্ধে আকৃষ্ট মানুষের ভিড় ইত্যাদির ফলে দূর দূর গ্রামের ব্যাপ্ত অন্ধকারের দিকে যাত্রার আগে লোক দুদণ্ড জিরিয়ে নেয়। খবর নেয় আর খবর দেয়। এমনিতেই ‘বাজার’-ই তো গ্রামীণ সংস্কৃতিতে সংবাদ সরবরাহের শ্রেষ্ঠ জায়গা। আর আজ যেহেতু শুক্কুরবারের হাটবার ছিলো, সেই কারণে কিছু হাটুরে, কিছু ব্যাপারীরা পাওনা-গণ্ডা, সামাজিক-পারিবারিক প্রয়োজন ইত্যাদি কারণে রয়ে গেছে। ফলে, চা-তেলেভাজার দোকানে শেষ শরতের সন্ধেতে চতুর্দিকব্যাপ্ত নিস্তব্ধতার মধ্যে কাঁচের গ্লাসে দুধেল চায়ে চুমুক দিতে দিতে মুদি, মণিহারি, মিষ্টি, চা-তেলেভাজার দোকানে ক্রেতা বা মজলিশী মানুষের ভিড়ের কথাবার্তা থেকে নিশিকান্ত বুঝে যান যে এই ক্ষণস্থায়ী জমায়েত যে দ্রুত ভেঙে যাচ্ছেনা তার একমাত্র কারণ তাঁর নসিবপুর গ্রামের আধিভৌতিক ঝুলন্ত কুঁজো, যা নাকি সম্প্রতি দ্রুত স্থানপরিবর্তনের কারণে উড়ন্তও। আর তার শিকারের পরিধি, ধরণ ও সাহস সমপরিমাণ বেড়েছে। কয়েকটি চেনা মুখ তাঁর দিকে এগিয়ে এসে তাঁকে ‘দাঠাউর’ সম্বোধন করে’ আরো কিছু সরাসরি তথ্য দিয়ে যায়, যার থেকে নিশিকান্ত বোঝেন গ্রামের অবস্থা এখন আরো অনেক জটিল। আর গ্রামকে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে তাঁর গাণিতিক আর দৈনন্দিন উভয়ার্থেই ‘ইক্‌সেন্ট্রিক' মেজভাইটি।
প্রথম সন্ধে গ্রামের হিসেবে রাতের দিকে এগোচ্ছে। আধ ক্রোশের একটু বেশি হাঁটতে হবে গ্রামে পৌঁছতে। নিশিকান্ত হাঁটা শুরু করেন। ভাবনার কিছু নেই। সঙ্গে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ আছে। কিন্তু এখুনি দরকার হবে না। একে তো চেনা রাস্তা। তায় আকাশের এক ধারে শুক্লপক্ষের সপ্তমীর পঁয়তাল্লিশ শতাংশের আধখানা চাঁদ রেলপথের ধারে টেলিগ্রাফের তারে আটকে গিয়ে তার ম্লান জ্যোৎস্না দিয়ে পথ দেখাচ্ছে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! প্রায় কুড়ি মিনিট হাঁটার পর নিশিকান্ত খেয়াল করেন যে পৌঁছে যাওয়া দূরস্থান, তিনি তাঁর বসতবাড়ির ধারে কাছেও নেই। এমনকি চেনা পথনির্দেশকগুলিও পথে নেই, যেমন মল্লিক বাড়ির বড় ছেলের অকালমৃত্যুর পর তৈরি হওয়া প্রায় নতুন ‘বৃষকাঠ’, কিম্বা বাড়ির মিনিট দশেক পথ আগে রাস্তার বাঁ দিকের মাঠের এক পারে মুখুজ্জে বাড়িতে বড় দেয়ালগিরির দূর থেকে দেখা নেভা-জ্বলা, আলেয়া সদৃশ আলো। কোনোটাই নেই। উপরন্তু রাস্তার ধারের গাছগুলো যেন অন্য রকমের, কিছুটা চেনা, কিছুটা অচেনা, বড্ড বেশি উঁচু, বড্ড বেশি ঝাঁকড়া, পত্রবহুল, কেমন একটু বেখাপ্পা।। ঢ্যাংদের বাগানের এক ধারের সেই সারি সারি আম গাছগুলো বা রাস্তার একদম পাশে, নিচে মনসার থান-ওয়ালা বনস্পতি নিম গাছটি নেই। সম্প্রতি বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’ পড়ার পর নিশিকান্ত ‘ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি’-তে আফ্রিকার গাছ বিষয়ে কিছু পড়াশুনা করেছেন। তাঁর মাথায় একটি হাস্যকর চিন্তা আসে। গাছগুলো সত্যিই অন্য রকমের নয়তো? নিজের সঙ্গে ঠাট্টা করেই যেন নিশিকান্ত মাথাটা তুলে উপরে পাঁচ ব্যাটারির টর্চটি ঘোরান। যা দেখেন তাতে তাঁর হাড় হিম হয়ে যায়। কী গাছ এগুলো!!! বাওবাব, ড্রাগন ট্রি, জ্যাকালবেরি, বাফেলোথর্ন, মারুলা, নাটাল মেহগনি, উইলো লিফ ফিগ!! আর কাঁটাগাছগুলো? সেগুলোও তো তাঁর চিরচেনা বাবলা, ফণীমনসা, শিয়ালকাঁটা নয়! বরং নব্‌থর্ন, বা বিভিন্ন ধরনের অ্যাকেশিয়ার মতো। বিভ্রান্ত নিশিকান্ত ভাবেন— তাঁর কি তবে দুশ্চিন্তা, অতিপরিশ্রম বা অন্য কোনো অজানা কারণে বিভ্রম হচ্ছে? কিসের শরণ নেবেন, বিশুদ্ধ গণিত ছাড়া? নিশিকান্ত মনে করার চেষ্টা করেন প্রথম ও দ্বিতীয় ‘Bernouli numbers’, বা ‘Euler-Mascheroni constant’, এবং কেন ১৭২৯ দুই উপায়ে দুটি ঘনর যোগফলের লঘিষ্ঠতম সংখ্যা। তিনি পরম নিশ্চিন্ত হন যখন দেখেন যে বেশ কয়েক বছর রেলোয়ে অ্যাকাউন্ট্‍স-এর ধোপার গাধা হয়েও তিনি বিশুদ্ধ গণিতের অ-আ-ক-খ ভোলেননি। তাঁর হার্ডি-রামানুজন নাম্বার্সও মনে আছে। তিনি কেবল অন্যমনস্কতায় পথ হারিয়েছেন। যাকে গ্রামসংস্কৃতির কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভাষায় বলে ‘ভোলায় ধরা’। অর্থাৎ তিনি ভুল করে পোতাপাড়ার মোড় থেকে বাঁদিকে ঘোরার বদলে স্টেশন-চত্বরের গুজবে বিক্ষিপ্ত হয়ে’ ডানদিকে ঘুরেছেন। এবার কেবল বাঁদিকে সমান দূরত্ব যেতে হবে। আর এই জন্য ইউক্লিডের জ্যামিতি আর পিথাগোরাসের উপপাদ্যই যথেষ্ট। তার থেকে জন্ম নেওয়া ‘incommensurables’-এর সমস্যার দরকার নেই।
নিশ্চিন্ত নিশিকান্ত এবার ফেরার আগে আবার চার দিকে টর্চ ঘোরান। কিন্তু তারপর যা দেখেন তাতে তাঁর রক্ত আবারো ঠাণ্ডা হয়ে আসে। তিনি দেখেন যে প্রায় প্রতিটি অপ্রাকৃত গাছের ডাল-পালায় একটা বা দুটো নরম, সতন্তু কুঁজো ঝুলছে; আর গাছের নিচে ও চারদিকে ছড়ান অজস্র পাখির পালক ছাড়াও ইতস্ততঃ ছড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র প্রাণীদের দাঁত, নখ, লেজ ইত্যাদি দেহাবশেষ। এমনকি বেশ কয়েকটি সজারুর কাঁটা। ঠিক যেন কোনো হিংস্র শ্বাপদকুলের জঙ্গুলে ভোজসভা কয়েক ঘণ্টা আগে শেষ হয়েছে। এখনো টেবিল সাফ করা বাকি। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য নিশিকান্ত ছোটা শুরু করার আগে কেবল মাথায় রাখেন যে তিনি পিথাগোরাসের অতিবাহুতেই আছেন, যার সহজতম সমীকরণ হোলো ‘a2+b2=C2’। এখন কেবল জ্যামিতি-নির্দিষ্ট পথে দৌড়তে হবে। এই মরণপণ দৌড়ের শেষে নিশিকান্ত যখন সম্পূর্ণ অবসন্ন হয়ে’ নসিবপুরের বাড়িতে পৌঁছে মায়ের শঙ্কিত প্রশ্নাবলী এড়িয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান, তখন তাঁর নিদ্রাতুর মনেও কেবল এই কথাই বাজতে থাকে যে, এই সাময়িক দুর্বলতার কথা স্ত্রী দূরস্থান, এমনকি মাকেও বলা যাবে না, কেবল যুক্তিবাদের স্বার্থে। কার্টেজীয় যুক্তিবাদ দূরে থাকুক, এমনকি হিন্দু-সাংস্কৃতীয় উচ্চ-সংস্কৃতিও শিক্ষা দেয় যে, ‘স্বপ্নো নু, মায়া নু, মতিভ্রমো নু’। তিনি কি সেখানেও হারবেন?
কিন্তু সাপ্তাহিক কর্মশেষের শেষ দুই দিন শারীরিক অবসন্নতা আর মানসিক অবসাদের জেরে ঘরে সময় কাটানোর মধ্যেও নিশিকান্ত টের পেয়েছেন যে তাঁরই বাড়িতে দিবাকান্তকে ঘিরে একটা কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্যবস্তু ওই আধিভৌতিক ঝুলন্ত, উড়ন্ত কুঁজো; আর যার ফলে সন্ধেবেলা তাঁর বাড়িতে হ্যাজাক/পেট্রোম্যাক্ ইত্যাদির আলো, সমবেত মানুষজনের গলা, আওয়াজ আর ব্যস্ততা বাড়িটার পরিবেশটাকেই পাল্টে দিয়েছে। আর এই অর্ধশ্রুত বাক্যালাপের মধ্যে কুঁজো, লড়াই প্রভৃতি চেনা শব্দের মধ্যে একটি অচেনা শব্দ প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, সেটা হোলো ‘উখো’। নিশিকান্ত এই যুদ্ধায়োজনের ব্যাপারে সব খবর পান মার কাছ থেকেই। কিন্তু লক্ষ করেন যে এই সব ঘটনার বিবরণ দেওয়ার সময়, আর বিশেষতঃ সেগুলির মধ্যে দিবাকান্তর নেতৃত্বের উল্লেখ করার সময়, মার মুখে একটা নরম আলো খেলে যায়, যার কোনো চিহ্ন তিনি মার মুখে দেখেননি যখন ময়রার দোকানে ‘বয়গিরি’ করে’, বেদো রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র কেবল পরিবারের উন্নতির কথা মাথায় রেখে পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে মরণপণ লড়াই চালাচ্ছিল। নিশিকান্ত তাঁর গাণিতিক যুক্তিবাদ থেকেই বোঝেন যে একদিকে যেমন সফল পুত্রের উপর নির্ভরশীল এক মা তাঁর কোনো অসফল পুত্রের উত্থানে বেশি খুশি হবেন, তেমনি নিজের পরিবারের জন্যে কারুর নীরব, একক সংগ্রাম অক্লেশে হেরে যাবে আর কারুর আরো অনেক নিম্নতর সংগ্রামের কাছে, যার সঙ্গে সম্পৃক্ত যৌথজীবন। বোঝেন; তবুও তো বুকে কাঁটা বিঁধতে ছাড়েনা। কাঁটার তো শিক্ষা, কালচার, কিছুই নেই! সে লক্ষ জীবন ধরে’ কেবল বিঁধতেই জানে। ব্যক্তিস্বরূপতা আর গোষ্ঠীতন্ত্রের লড়াই সে কেমন করে’ বুঝবে?
পরের দিন সকালে বাড়ির একদম পাশে প্রাতঃকৃত্য সেরে’, তোলা জলে চান করে’, অফিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আগে মাকে এক মাসের টাকা-পয়সা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় নিশিকান্ত যখন জানান যে নিজের ও স্ত্রীর শরীরের কারণে তিনি এই সপ্তাহটা আসতে পারবেননা, তখন হঠাৎ কেন জানি মনে হয় মার মুখে একটা সোয়াস্তির ভাব দেখলেন। অবসন্ন মন আর অশক্ত শরীরের সঙ্গে বুকের ভিতরকার খচ খচ করা কাঁটাটা নিয়েই নিশিকান্ত শেষ শরৎ/প্রথম হেমন্তের সকালে আধ ক্রোশের বেশি রাস্তা হেটেঁ বট, অশ্বত্থ, জারুল ইত্যাদি দুদিকের চিরচেনা গাছে ছাওয়া পথে শাঁখচূড়ায় গিয়ে মার্টিনের ট্রেনে ওঠেন, তখন তাঁর অবচেতনে কেবল এইটুকু সান্ত্বনা থাকে যে আপাততঃ কয়েক দিন রাণীর রাজত্ব, আর মা কালীর দ্ব্যহস্পর্শে রক্ষিত কালীঘাটে তাঁকে এই ভয়াবহ আধিভৌতিকতার সম্মুখীন হতে হবেনা। ক্লান্ত, নিঃশেষিত নিশিকান্ত লাইট রেলওয়ের গদাইলস্করী যাত্রায় তাঁর প্রত্যাশিত ও কাঙ্ক্ষিত বিশ্রামটুকু পেয়ে ঘুমে তলিয়ে যান। কিন্তু তাও তারপর ফেয়ার্‍‌লি প্লেসে অফিসে পৌঁছে দেখেন মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। কোনো রকমে বিকাল পাঁচটা পার করে নিশিকান্ত যখন কালীঘাটে ফেরেন তখন তাঁর ধুম জ্বর। শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে শয্যা নেবার পরে যে মাস খানেক তিনি অসুস্থ থাকেন, তাতে ইতিমধ্যে কাঁচা পোয়াতি মেয়ের সমস্যা আর জামাইয়ের জ্বরবিকারে বিপন্ন স্নেহময় শ্বশুরমশাই, শ্বাশুড়িঠাকরুন আর স্ত্রী অচেতন নিশিকান্তর জ্বরবিকারের ঘোরে ‘কুঁজো’ আর ‘Bernouli numbers’, বা ‘Euler-Mascheroni constant’-এর কথা শুনে অতিষ্ঠ হওয়া আর অসহায়তা প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। কেবল একটাই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। সেটা হোলো আপাততঃ কোনো কারণেই এই মেধাবী ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ জামাইটিকে কিছুকাল তার গ্রামের বাড়িতে যেতে দেওয়া যাবেনা। ফলে আপাততঃ এই না-গল্পের সঙ্গে নিশিকান্তর আর কোনোই সম্পর্ক থাকেনা।
দিবাকান্ত
দিবাকান্ত ভাবছে, আর ভাবছে। গ্রামের অবস্থা খুব খারাপ! কত খারাপ তা বলে শেষ করা যাবে না। পাড়ায় পাড়ায় গাছের ডাল, ছাদের কার্নিশ, কোঠা বাড়ির লিন্টেল (নব্য অর্ধশিক্ষিতরা বলে লিন্টন, হা! হা! তেলে জলে বাঙালি), মাটির বাড়ির মাডগার্ড, কুঁড়ে ঘরের চালের ছাউনির বাতা বা যে কোনো সম্ভাব্য অসম্ভাব্য উঁচু জায়গা থেকে ঝুলছে অজস্র কুঁজো। আর গ্রামের লোকদের ক্ষতির লিস্টিও দিনকের দিন বাড়ছে। আগে পোষা পায়রা, হাঁস, মুরগি, বড়জোর ছোট্ট ছাগলছানা, ইত্যাদিতেই রক্ষা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি কয়েকটা হাড় হিম করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। বেশ কয়েকটা নিচু জাতের বাড়িতে নেয়াল বাছুর, সদ্যোজাত শিশু, এমনকি ছোটো বাচ্চার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনিতেই নমঃশূদ্র, পোদ, তামলি, জেলে, মুচি, বাগদি বা মুসলমান পাড়ায় বাড়িগুলো অনেক খোলামেলা, ঝোপজঙ্গলের মধ্যে। শেয়াল, গোবাঘা, গুলবাঘা, বাঘরোল, ভাম-খাটাশ ইত্যাদিদের নাগালের মধ্যে। ফলে বাছুর হারানো প্রায় একটা নিত্যি দিনের ব্যাপার। আর বাচ্চাগুলো আদাঁড়ে-পাদাঁড়ে, ঘাটে-আঘাটায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে জলে পড়ে বা জন্তু-জানোয়ারদের পাল্লায় পড়ে। উভয় ক্ষেত্রেই নিখোঁজ বাচ্চাটিকে নিয়ে একটু কান্নাকাটি হয়। কিন্তু তার পর থেকেই দিনযাপনের, আর প্রাণধারনের গ্লানিতে বিপর্যস্ত, অভাবী মানুষগুলো সন্তানশোকও ভুলে যায়। তাছাড়া বাংলাদেশের মাটির মতোই সমান উর্বরা মায়েদের যেখানে এক বছর, এমনকি দশ মাসের ‘আঞ্জা’, আর বছর ঘুরতেই আরেকটি শিশুর কান্না শোনা যায়, সেখানে মানুষের দাম এমন নয় যে নিখোঁজ বাচ্চাটির কথা কেউ বহু দিন মনে রাখবে। নিম্নবর্ণের, দরিদ্র, অভাবী, মানুষদের ক্ষেত্রে তাই ‘জগৎ পারাবারের তীরে ছেলেরা করে খেলা’। তারা খেলা করে আরো নিশ্চিন্তে, হারাধনের দশটি ছেলের প্রসঙ্গে যোগীন্দ্রনাথের বহু চেনা বিয়োগের আর স্বাভাবিকভাবেই কম চেনা যোগের নামতার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে।
কিন্তু এখন ব্যাপারটাই আলাদা। ব্যাপ্ত আতঙ্কের পরিবেশে বাছুর বা বাচ্চা হারানো অন্য সময়ের মতো জীবনের অনিবার্য ঘটনা নয়। তার সঙ্গে মিশে গেছে আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, অপ্রাকৃত ইত্যাদির প্রতি গ্রামীণ মানুষের সেই ভয় যার উৎস প্রকৃতির মধ্যে থাকাই। আর ব্যাপারটা তো মিথ্যেও নয়। কুঁজোগুলো তো নিশ্চিতভাবেই আমিষাশী। কারো সঙ্গে পরামর্শ করা দরকার। দাদা থাকলে ভালো হতো। দাদার মাথাটা পরিষ্কার। কিন্তু দাদা আর আসতে পারছেনা। কিম্বা শহুরে, বড়লোক কুটুমরা ওকে আর আসতে দিচ্ছেনা। দিবাকান্ত মনে মনে রেগে যান। ভবেন— না আসতে দিক্ গে! তেলে জলে বাঙালি। আমাদের বিপদের সময় তো আর কোনো শহরের কুটুম আমায় রক্ষা করতে আসবে না। গাঁয়ের সকলকে নিজেদের ব্যবস্থা করতে হবে। গাঁয়েই নেতৃত্ব খুজতে হবে। পোদ, বৈশ্যকপালী, নমঃশূদ্র, মুচি, জেলে, বাগদি, তামলি মায় মুসলমান — সকলকে ট্রেনিং দিতে হবে, কেমন করে কুঁজোগুলোর সঙ্গে লড়া যায় সে ব্যাপারে। দিবাকান্ত বোঝেন যে সামনে যা ঘটতে যাচ্ছে তা একটা পুরোদস্তুর যুদ্ধ। শত্রু তো কুঁজো, কিন্তু কেমন শত্রু? শত্রুকে বুঝতে পারা তো যুদ্ধজয়ের প্রধান শর্ত! আর তার থেকেই তো বোঝা যাবে অস্ত্র কী হবে? যদি কুঁজো এখনকার মতো অনেকক্ষণ এক জায়গায় স্থির থাকে তো এক রকম। কিন্তু ওরা যে উড়তে পারে এ ব্যাপারে তো কোনো সংশয়ই নেই, নইলে অলক্ষে হলেও স্থান পরিবর্তন করে কী করে’? আর অলক্ষে স্থান পরিবর্তন করে মানেই কুঁজো বুদ্ধিও ধরে। তাহলে বুদ্ধিমান, উড্ডীয়মান, তন্তুবান, আমিষাশী কুঁজোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অস্ত্র কী হবে? দিবাকান্ত বাড়িতে আগামীকাল আবার গ্রামসভা ডাকা স্থির করে।
বাংলাদেশের গ্রামের রাত্রি। দিবাকান্তর ঘুম আসছেনা। আসছেনা বলেই দিবাকান্ত আবার বোঝে যে যারা বলে রাত্রির নৈঃশব্দ্য, তারা কত ভুল বলে। প্রকৃতিতে নৈঃশব্দ্য বলে কিছু হয়ই না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে দিবাকান্ত শুনতে পায় বাড়ির বাইরে গাছের, পাতার ঝরঝর, সরসর, ছোটো প্রাণীর টিপটিপ, শিশিরের টুপটাপ, আরো অনেক অচেনা শব্দ। সে বোঝে যে উত্তেজিত মস্তিষ্ক মনের নিষেধের বিরুদ্ধেও খুঁজে বেড়াচ্ছে এই শব্দকল্পদ্রুমের মধ্যে কোন্‌টা কোন্‌টা প্রকৃতির মধ্যে অপ্রাকৃত কুঁজোর উড়ে বেড়ানোর শব্দ। এর পর যে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম আসে তার মধ্যে দিবাকান্ত স্বপ্নে দেখে তার কোনো সময়ে পড়া বাদা অঞ্চলের জমি দখলের লড়াই-এর দৃশ্য। যুযুধান দুই জোতদার পক্ষ আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছে ‘উখো’, অথবা ছোটো সুপুরি, তাল, পেয়ারা গাছের চাঁচা-ছোলা সমগ্র কাণ্ড, যার ডগার দিকটা ছুঁচলো করা। আকাশে উঠে গিয়ে সেই উখো যখন পালটি খেয়ে পড়ছে তখন কারো মাথা সামনে পেলে তাকে ফুঁড়ে দিচ্ছে। মাটিতে গেঁথে দিচ্ছে মানুষটাকে। ঘুমের মধ্যে থেকেই দিবাকান্ত সটান বিছানায় উঠে বসে। অস্ত্র পেয়ে গেলাম স্বপ্নে! একেই কি বলে স্বপ্নাদেশ? কারণ দাদার মতো অঙ্ক না জানলেও দিবাকান্ত জানে যে স্বপ্নে পাওয়া অস্ত্রের সাফল্যের পিছনে কারণ একটাই, উখোটার ‘মোমেন্টাম’। কুঁজোর মূল শক্তির বা দুর্বলতার আধার কোন্‌টা তা যখন জানা নেই, তখন ওটাকে লম্বালম্বি একেবারে মাঝখান থেকে ফুঁড়ে দেওয়াই হবে ভালো। তার জন্য নিশ্চল কুঁজোর ক্ষেত্রে সড়কি-বল্লমই হবে সবচে ভালো অস্ত্র। আর চলমাণ, কিম্বা উড্ডীন কুঁজোর জন্য চাই উখো। ছোঁড়বার পর ওঠার সময়ে না বিঁধলেও নামার সময় বিঁধবে। স্থানিক অর্থে দ্বি-ধার।
আর ঘুম হবেনা। পুবের আকাশটা একটু ফরসা হয়ে লালচে আভা দেখা যেতেই দিবাকান্ত ভারি, কালো ফ্রেমের, মোটা, ঘষা ঘষা দেখতে কাঁচের চশমাটা চোখে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বাড়ির উলটো দিকে শিবমন্দির। মাঝখান দিয়ে একটা জঙ্গুলে সরু রাস্তা পুকুরের দিকে চলে’ গেছে। ওটার জন্যেই দিবাকান্ত আজকাল পুকুরে ‘জল সরতে’ গেলেও সাধারণতঃ চশমা পরেই যায়। একটু এগিয়েই বোঝে চশমা না আনলে আজ বড় ক্ষতি হোতো। হয়তো চোখেই পড়তোনা যে পুকুরের রাস্তার দুপাশে আম, জাম, চালতা, গাব, মাকাল গাছ, রুদ্রপলাশ, অমলতাস বা বাঁদরলাঠি, তেলাকুচো, আর অন্য সবকটি গাছেই কাতারে কাতারে ঝুলন্ত কুঁজো। জামগাছটা রাস্তার একেবারে পাশে। তার থেকে ঝুলন্ত কুঁজোকটার প্রায় নিচে দাঁড়িয়ে দিবাকান্তর মনে হয় যেন একদম নিচের বাঁ পাশে দাঁতের সারি দেখতে পাচ্ছে। কতকটা বোয়াল মাছের মতো ছোটো ধারালো দাঁত। দিবাকান্তর কাঁপুনি ধরে। প্রায় দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ির বাঁ‍য়ে পিছন দিকে একটা ছোট্টো ডোবা আছে। অবরে সবরে বাড়ির মেয়েরা প্রথম দফার বাসন-কোসন ধোয়া, ময়লা কাপড় কাচা ইত্যাদি করে’, আর বর্ষার সময় কখনো সখনো একটা দুটো ডুবও দিয়ে দেয়। দিবাকান্ত ডোবার ধারেই প্রাতঃকৃত্য সেরে নিয়ে কোনো রকমে একটু শৌচ করে’ বাড়ি ফিরে আসে। সময় নেই। যা করার আজকের সভাতেই ঠিক করতে হবে।
বিকালে সভা বসে। আর পোদ, কপালী, নমঃশূদ্র, বাগদি, মুসলমান ইত্যাদিদের দিবাকান্ত বাদা অঞ্চলের লড়াই আর উখোর কার্যকারিতা, কিভাবে উখো তৈরি ও ব্যবহার করতে হবে তা বুঝিয়ে দেন। বাছাই করা চারটে দলও তৈরি হয়। মুসলমানদের আমানুল আর শুক্কুর, কপালীদের রমেশ, নমঃশূদ্রদের সতীশ, পোদদের রাম এদের নেতৃত্ব পায়। দিবাকান্ত মুচিদের বলেন চট দিয়ে শখানেক সরু লম্বা ব্যাগ সেলাই করতে। একটা লম্বা হ্যাণ্ডেলও থাকবে, কাঁধ থেকে ঝোলাবার জন্যে। তাতেই থাকবে প্রত্যেক যোদ্ধার উখো, সড়কি, বল্লম। আর জেলেদের বলেন কয়েকটা খ্যাপলা জাল তৈরি করতে। ঠিক হয় তিনদিন পর পুণ্ণুমে আছে। ঐদিনই কুঁজোগুলোকে বিঁধিয়ে মারা হবে। পুণ্ণুমেতে দেখার সুবিধে হবে, লড়ারও। গ্রামে সাজ সাজ রব পড়ে’ যায়।
রণভূমি
হৈমন্তী পূর্ণিমার দিন সন্ধে সাড়ে সাতটা। ‘জোছনা ফিনিক দিচ্ছে’। বেশ একটু উত্তুরে হাওয়া। সেই হাওয়াতেই যেন খোয়াক্ষীরের রঙের চাপবাঁধা জ্যোৎস্না গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে যাচ্ছে। গাছের নিচে, বাড়ির দেয়ালে, বাধা পেয়ে ছড়াচ্ছে সেই বাধা-পাওয়া জ্যোৎস্নারই তৈরি করা এক অপ্রাকৃত আলো-আঁধারি। পাতার ফাঁক দিয়ে আসা জ্যোৎস্নার জাফরি কাটা আলো, বনের ভিতরে জ্যোৎস্নার তৈরি করা আবছায়া, কুঁড়ে-কোঠার আশে পাশে হাতার পর হাতা ভর্তি রাবড়ির মতো পড়ে থাকা জ্যোৎস্নার প্রভা সবারই দৃষ্টিশক্তি বাড়াচ্ছে যেমন, তেমনি একটা নাম না জানা অসোয়াস্তিরও জন্ম দিচ্ছে। তাকে বেশি আমল না দিয়ে লড়াকুরা দলে দলে পা টিপে টিপে গ্রামের প্রতি এলাকায়, আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। কাঁধ থেকে ঝুলন্ত চটের থলিতে উখো, সড়কি, বল্লম নিয়ে, হাতে জাল নিয়ে, লাঠি উঁচিয়ে প্রতি দল, প্রতি যোদ্ধা পা টিপে টিপে এগোচ্ছে। চার দলপতির হাতে চারটি পাঁচ-ব্যাটারির টর্চ। রাত নটার মধ্যে যে যটা পারে কুঁজোকে সড়কির ঘায়ে খুঁচিয়ে, উখোর ঘায়ে আকাশ থেকে নামিয়ে এনে, লাঠির ঘায়ে চুরমার করে’ নিকেশ করবে। তার পর বিশালাক্ষী মন্দিরের পাশের মাঠে চার দলের প্রতিনিধি জমায়েত হবে, আরো তথ্য জানতে, দিবাকান্তকে খবর দিতে ও নির্দেশ নিতে।
কিন্তু এসব তো অনেক পরের ব্যাপার। কী খবর দেবে? অবাক কাণ্ড, চারটি দলই দেখে কোথাও একটাও কুঁজো নেই। বাছাই বাহিনী সহ গ্রামের প্রত্যেকটা লোক প্রতিটা গাছ, প্রতিটি বাড়ির ছাদের কার্নিশ, ‘লিন্টন’, প্রতিটি ঘরের বাতা, মাডগার্ড, প্রতিটি উঠোনের মাচা, প্রত্যেকটা উঁচু জায়গা আঁতিপাঁতি করে খোঁজে। খুঁজে খুঁজে হয়রাণ হয়। কিন্তু কোথ্থাও একটা কুঁজোর চিহ্নমাত্র নেই। দু-এক জন অত্যুৎসাহী লম্বা গাছের উপরে উঠে খুঁজেপেতে দু একটা পরিত্যক্ত বাবুই বাসা বের করে’ নিচে ফেলে। আরো কয়েকজন আঁকশি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অন্য কয়েকটি পাখির বাসা ফেলে। তাদের দু-একটার মধ্যে আবার ফিকে রক্তের দাগ। রক্তের দাগ মানে তো কুঁজোদের কাজ। কিন্তু কুঁজোগুলো গেল কোথা? উবে গেল নাকি? সকলে তাজ্জব বনে যায়। এত বড় আয়োজন মাঠে মারা যাবে? কুঁজোগুলোকে ধ্বংস করার অন্য কী উপায় আছে? সব দল থেকেই খবর যায় দিবাকান্তর কাছে। কিন্তু দিবাকান্ত নিজেই তো পুকুর ঘাটের রাস্তায় এই অবাক পরিবর্তন খেয়াল করেছে! গোটা রাস্তায় যেখানে প্রত্যেক গাছে কুঁজো থিকথিক করছিলো, সেখানে গাছগুলো এত সাফ সুতরো হয়ে গেল কী করে’? দিবাকান্ত সকলকে চলে আসতে নির্দেশ দেয়। তার কথামতো সকলেই বিশালাক্ষী মন্দিরের পাশের মাঠে চলেও আসে। বিরাট মাঠের মধ্যেও রাত্তিরে এই লোকসমাগম পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
হেমন্তের নির্মেঘ আকাশ। পশ্চিম আকাশে দিগন্তের বেশ খানিকটা উপরে চাঁদ ফুটে আছে। বিশালাক্ষীর মাঠ জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। চতুর্দিক এতক্ষণ নিস্তব্ধই ছিল। কিন্তু সব কটা দল এসে জোটার পর সবার ফিসফিসানি, অনুচ্চ কণ্ঠও একটা গুঞ্জন তৈরি করছে। দিবাকান্ত দাঁড়িয়ে আছে একা, সবার সামনে। মাঠের সবখান থেকে প্রশ্ন আসে, ‘দা ঠাউর! এর মানে কী? এবার আমাদের কী হবে?’ দিবাকান্ত ভেবে চিন্তে বলে যে, ‘আমাদের তৈরি থাকতে হবে। নতুন ভাবে এই বিপদ আবার আসবে। নতুন ভাবে আমাদের তাকে মোকাবিলা করতে হবে।’ কিন্তু দিবাকান্ত নিজেই বোঝে যে গলায় বিশ্বাস ফুটছে না। জমায়েতও যেন এই ফাঁকা আওয়াজে সন্তুষ্ট হছে না। একটা অসন্তোষের গুঞ্জন আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কয়েকজন হাত তুলে সবাইকে থামাবার চেষ্টা করে। কিন্তু হঠাৎই যেন গুঞ্জনটা আরো উচ্চগ্রামে পৌঁছোয়। দিবাকান্ত এবার চিৎকার করে ওঠে, ‘হচ্ছে কী? চ্যাঁচ্যাঁনি বন্ধ কর! থামো সবাই। খামোখা না চেঁচিয়ে বরং এসো, এক সঙ্গে ভাবি, কাল থেকে এই কুঁজোগুলোকে আবার দেখলে আমরা কী করে তার মওড়া নেবো?’ কিন্তু হঠাৎই দিবাকান্তর আর অন্যদের খেয়াল হয় যে এই তিরস্কারটা মাঠে মারা যাচ্ছে। গোলমাল, কলরব, গুঞ্জন। যাই বলো, তার উৎস এই জমায়েত নয়, আর সেটা বাড়ছেই? ব্যাপার কী? একটু পরেই বোঝা যায় গুঞ্জনটা যে কেবল এই জনসমাবেশ থেকে আসছেনা তাই নয়, এর স্বরটা মানুষিকও নয়। ওঁওওওওওওম্-এর মত, কিম্বা গ্রা-উ-উ-উ-ম্ এর মতো গম্ভীর একটা মিষ্টি আওয়াজ একটু দূর থেকে ভেসে আসছে। উপস্থিত সবার, এমনকি দিবাকান্তরও, গায়ে কাঁটা দেয়। সবারই মনে হয় এটা এমন একটা রাত যে যা কিছু ঘটতে পারে। কয়েকজন এও ভাবতে থাকে গুটি গুটি বাড়ির দিকে হাঁটা দেবে কিনা। কিন্তু পা দুটো তো যেন বৃষকাঠের মতো মাটিতে পোঁতা মতো আছে, নড়বে কেমন করে। কেউ কিছু করার আগেই কিন্তু নির্মেঘ, জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাওয়া আকাশের পুব দিক থেকে একটা কালো, গোল মতো কিছু দুলতে দুলতে নেমে আসে রায়বাড়ির জঙ্গলটা পেরিয়ে ওই দিকে, হয়তো পুকুরটাও পেরিয়ে কোথাও।
শদুয়েক লোক বৃষকাঠের মতো মাটিতে পা পুঁতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন নড়ার ক্ষমতাও নেই। কারুর মুখে কোনো কথা নেই। দিবাকান্তই অনেক পর নিস্তব্ধতা ভাঙে। ‘ভয় পেলে চলবে না। এসো আমরা আস্তে আস্তে গিয়ে, একটু দূর থেকে আগে দেখি ব্যা পা রটা কী?’ কিন্তু এটা বলতে গিয়েই তার গলা ফ্যাঁসফেঁসিয়ে, ভেঙে যায়। যান্ত্রিকভাবে তার পিছু নেয় সবাই। পুকুরে যাবার সরু জঙ্গুলে পথ দিয়ে যাবার সময় সবারই যেন প্রাণটা গলায় এসে ঠেকে আছে। সবাই টেরিয়ে তাকায় আম, জাম, চালতা, গাব, মাকাল গাছ, রুদ্রপলাশ, অমলতাস, বাঁদরলাঠি, তেলাকুচো, ইত্যাদি গাছগুলির দিকে। ভয়ে ভয়ে। এতদিন ধরে চোখ সয়ে যাওয়া উল্টোকুঁজোগুলোকে দেখতে পাওয়ার ভয়, নাকি না পাওয়ার ভয়, নাকি দুটোই? ভয়ই বলো আর ভরসাই বলো, নেই, কোঠাও কিচ্ছুটি নেই। গাছের ফাঁক দিয়ে সরসর হাওয়া যেন ভেংচি কাটছে সব্বাইকে। দিবাকান্ত ছাড়াও অনেকেরই মনে হয় আর রাস্তা শেষ হবার পর ঘাটের সিঁড়ির উপরে পরের পর সারিতে দাঁড়িয়ে সবাই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে। কেউ কাউকে ঠেলে না, অস্ফুট আওয়াজও করে না। কারণ পুকুরের পাড়ে উল্টোদিকে একটা কালো বড় মাটির হাঁড়ি। ভিতরে হয়তো একটা প্রদীপ জ্বলছে। হাঁড়ির মুখটা থেকে কাঁপা কাঁপা আলো জ্যোৎস্না কাটিয়েও দেখা যাচ্ছে। সেইখান থেকেই একটা মৃদু কম্পনের মতোই ভেসে আসছে একটা আরো মৃদু আওয়াজ, রাত্তিরে সায়েবদের এরোপ্লেনের মতো, ‘কচি র-ক্-ক্-ক্ত চাই, র-ক্- ক্-ক্ত চাই, র-ক্-ক্ত চাই, রক্ত চাই, কচি মাস, কচি হাড়, র-ক্-ক্-ক্ত চা-আ-আ-আই।’ হাঁড়ির মুখ থেকে অবিরত বেরিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর কটা রক্তত্রিষ্ণু, রক্তপ শব্দের ভয়ানক, অস্থির কম্পন।
গোটা নসিবপুর গ্রামটাই যেন বজ্রাহত, বাক্‌রুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামে কত কিছু হয়েছে, ভুতেধরা, ভুতে পাওয়া, বোবায় ধরা, ভোলায় ধরা। কত কিছু দেখেছে গ্রামের লোক — ওঝাদের চালপড়া, জলপড়া, আয়না চালানি, পিঁড়ে চালানি, এমনকি গাছ চালানো। কিছুটা তার বিশ্বাস করেছে, কিছুটা করেনি। শাঁখচূড়া থেকে নসিবপুর রাত্রে হেঁটে আসার সময় লোক দেখেছে দশ হাত ব্যবধানের দুটো বাজে পোড়া তালগাছের উপর দুই পা রেখে একটা লাল পেড়ে শাড়ি পরা, ঘোমটায় মুখ ঢাকা মেয়ে। যখন লোকে বলেছে ওটা আর কিছুই নয়, একলা পথিকের ভয়তরাসি মনের উপর আলোছায়ার বিভ্রমের প্রভাব, তখন নসিবপুরের লোকে মেনেও নিয়েছে। কিন্তু আজ যেটা ঘটছে সেটা কী? অতিপ্রাকৃত, অতিলৌকিক, নাকি অলৌ্কিক? শব্দগুলি না জেনেও তার এই আক্রমণে নসিবপুরের লোক দিশেহারা। ভুত তো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি থাকা গ্রামীণ সংস্কৃতির, লোকজীবনের এক অঙ্গ। কিন্তু তাই বলে এমনটাও হয় নাকি? রাত্তিরকে উড়িয়ে দেওয়া এই কাকজ্যোৎস্নায়, এক গ্রাম লোকের সামনে? এবার তো যে কোনো জ্যোৎস্না ধোওয়া শুক্লপক্ষের রাত্তিরে, কিম্বা নিরেট, কালিবর্ণ অমাবস্যার রাত্তিরে গ্রাম আর তার মানুষ যে কোনো অতিপ্রাকৃতের আক্রমণের সামনে বেআব্রু, অরক্ষিত হয়ে গেলো? এমনটাও হতে দেওয়া যায় নাকি? নসিবপুরের বৈশ্যকপালী, নমঃশূদ্র, পোদ, তামলি, জেলে, মুচি, বাগদি, মুসলমানরা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে’ যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভির্মি খায়।
তা নয় খেল। কিন্তু হঠাৎই এই কঠিন, জমাট নিস্তব্ধতা ভেদ করে’ কার ঐ বিকৃত গলা বেরিয়ে এলো! এই গলা নাকি দিবাকান্তর, দা-ঠাউরের? কারুর বিশ্বাস হতে চায় না। কিন্তু গলা তো গেলো। কথাগুলো কি ভয়ঙ্কর! দিবাকান্তর, দা-ঠাউরের, চ্যায়রাখানাই বা কী করে’ এত তাড়াতাড়ি এতটা পাল্টে গেল? ঘষা কাঁচের চশমার ভিতর থেকে মাছের চোখের মতো মরা চোখদুটো ধক ধক করে জ্বলছে। তীর ছেঁড়া ধনুকের মতো দিবাকান্ত তিন ফুট লাফিয়ে উঠেছে, ‘রক্ত চাই? বাচ্চার রক্ত? যা, বাচ্চা আছে। আর গ্রামে আসবিনা! তেলে জলে বাঙালি!’, বলেই কাউকে হাঁ হাঁ করে ওঠার কোনো সুযোগ না দিয়েই দিবাকান্ত পাঁই পাঁই দৌড়ে পুকুরের বাঁ ধার দিয়ে পৌঁছে যায় হাঁড়িটার কাছে। পকেট থেকে একটা ছোটো ছুরি বার করে’, তাতে ঝটিতি বুড়ো আঙুল চিরে রক্ত ঢেলে দেয় হাঁড়িটার ভিতর। কিসের উপর তা এই ফিনিক দেওয়া জ্যোৎস্নার মধ্যেও এত দূর থেকে কারুর নজর চলে না। কিন্তু সব্বাই সভয়ে দেখে হাঁড়িটার পাশেই দিবাকান্ত অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে, আর তার প্রায় গা ছুঁয়েই হাঁড়িটা ‘ক্-ক্-ক-চি র-ক্-ক্-ক্ত চা-আ-আ-ই’ বলতে বলতে, দুলতে দুলতে উপরে উঠতে থাকে, আর সভয়ে সবাই দেখে যে পুকুর পার হয়ে, কিছুটা তাদের দিকেই এসে, বিশালাক্ষীর মন্দিরের উপর দিয়ে উপর আকাশে উঠে, মেঘহীন আকাশেই মিলিয়ে যায়। সম্বিত ফিরে সবাই দিবাকান্তর মুখের উপর পুকুরের জল ছিটিয়ে, তাকে কাঁধে তুলে, বাড়ি পৌঁছে দেয়। স্বতঃস্ফূর্ত ধ্বনি ওঠে, ‘জয়, দা ঠাউর! তুমিই গেরামকে বাঁচিয়ে দিলে।’
উপসংহার
গ্রামজীবনের অনেক অভিজ্ঞতার মতোই এই ঘটনাটিরও কোনো সঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। তবে কয়েকটা কথা জানাবার আছে। এই ঘটনার পরপরই, সাত দিন থেকে মাস কয়েকের মধ্যে ধনাদার বাড়ির তিনটি অন্তঃসত্ত্বা বৌমা মৃত সন্তান প্রসব করেছেন। আরো দুঃখের খবর নিশিকান্তর স্ত্রীর পেটের বাচ্চাটিও বাঁচেনি। নিশিকান্তর স্ত্রী এখনো সেই শক থেকে সেরে ওঠেননি। শান্ত, সুশীলা, মিতভাষিণী মহিলাটি হঠাৎ কেমন চুপ মেরে গেছেন। শ্বশুরও খুবই কাতর এতে। শাশুড়ি খুবই অন্যায়ভাবে তার জন্যে জামাইয়ের গ্রামকে, আর বিশেষ করে দিবাকান্তকেই দায়ী করেছেন। কিন্তু কোন শাশুড়িই বা পদস্থ জামাইয়ের অপোগণ্ড ভাইদের সব কিছু ঘটনাঘটনের জন্যে দায়ী না করেন? তবে, একটা ভালো খবর। দিবাকান্ত সম্পূর্ণ সেরে উঠেছে। এতটাই যে সে এখন রেলে চাকরি করছে, আর কলকাতায় বাসা করে আছে। তার মুখে ‘তেলে জলে বাঙালি’ লব্জ আর শোনা যায়না। এমনকি লিলুয়া ওয়র্কশপে অবাঙালি সহকর্মীদের সামনেও নয়। দিবাকান্ত এখন অ্যানিমিক স্ত্রী, হঠাৎ এসে যাওয়া এক ছেলে আর দুই মেয়ে, কম মাইনে, আর বাড়ির সম্পত্তির ভাগ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। ভুত বা ভবিষ্যত কিছু নিয়েই তার আর সময় নেই। মা মারা গেছেন। বাকি ভাইরাও বিভিন্ন সময়ে নিশিকান্তর চেষ্টা চরিত্তিরের ফলে রেলেই বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পদে ঢুকে পড়েছে। ভাইদের সবার আগ্রহে, ও তাঁর আর ভাইদের অর্থে নসিবপুরের পৈত্রিক বাড়িরটিরও সংস্কার হয়েছে। একতলায় বাড়তি ঘর ছাড়াও দুতলা উঠেছে। এক কথায় নিশিকান্তর আজন্মলালিত উচ্চাশা আজ বাস্তব। ধনাদা গোহারা হেরে গেছে। কিন্তু তবুও নিশিকান্ত আর দেশের বাড়িতে যান না। কারণটাও কাউকে বলা যাবে না। কেমন করেই বা বলবেন? স্ত্রীর গর্ভাধানের পর থেকেই সায়েব ডাক্তার দেখিয়েছেন। শ্বশুর বাড়ির বা নিজের বাড়ির কাউকেই মেয়েছেলেকে, বৌ মানুষকে এইভাবে পুরুষ ডাক্তারের সামনে বেআব্রু করার কথা বলাই যায় না। ডাক্তার আগাগোড়া বলেছিলেন সব ঠিক আছে। কিন্তু যে বাচ্চা নির্বিঘ্নে প্রসব হোলো, ছেলে না মেয়ে, যাই হোক, তাকে দেখে ডাক্তার কেন বললেন, ‘আমার সমগ্র চিকিৎসক জীবনে এমন দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা নেই। মনে হচ্ছে এই শিশুটির শরীরটিকে মায়ের পেটের মধ্যেই কেউ নীরক্ত করে’ দিয়েছে’। আর সেই কথা শুনেই নিশিকান্তর কেন মনে পড়েছিল দু বছর আগে শেষ শরতের সন্ধেতে, নিজের দেশে বাওবাব, ড্রাগন ট্রি, ইত্যাদির অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সেই জঙ্গুলে ভোজসভার কথা? আর কেনই বা মনে পড়ে গিয়েছিল লোকমুখে শোনা সেই হাঁড়িটার কথা যে দিবাকান্তর আঙুল চিরে দেওয়া রক্তে সন্তুষ্ট হয়ে শিশুরক্তের সন্ধানে উড়ে গিয়েছিল? দিবাকান্ত তো গ্রামে নিজের মত করে’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল? সে কেন আর গ্রামে থাকেনা? ইলেকট্রিক ট্রেনে যাতায়াতের সময় তো অনেক কমে গেছে! চাকরির পর বাড়িতে রামানুজনের ‘infinite series’, ‘improper integrals’, ‘continued fractions’, ‘number theory’ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে নিশিকান্ত এইসব না মেলা অঙ্ক নিয়েই ভেবে যান।
[অ]সমাপ্ত